ইউজার লগইন

অনেক নক্ষত্রের ভীড়ে একজন মহম্মদ রফি!

মহাম্মদ রফি এক গরীব বিধবাকে মানি অর্ডারে টাকা পাঠাতেন। সেই গ্রামীন বিধবা মহিলা জানতো এক বড়লোক নিয়মিত মানি অর্ডার করে তাকে। রফি সাহেব প্রয়ানের পরের মাসে উনি গিয়েছেন টাকা আর আসে না, পরের মাসেও গেলেন টাকা আর আসে না। উনি সেই ঠিকানায় গিয়ে জানলেন উনাকে টাকা পাঠাতেন রফি সাহেব, উনি মারা গিয়েছেন, ভদ্রমহিলা আকাশ থেকে পড়লেন এত বড় শিল্পী উনাকে এত বছর ধরে টাকা পাঠতেন উনি বুঝলেনও না।
যেদিন রফি সাহেব মারা গিয়েছেন, সেদিন তুমুল ঝড় বৃষ্টি, তার ভেতরে ২০-৩০ হাজার লোক উনার লাশবাহী গাড়ী দেখতে দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তায়।
সঞ্জয় গান্ধীর সাথে কিশোর কুমারের ঝগড়া হয়েছিলো। উনি সঞ্জয়গান্ধীর বাসায় গেলেন, খুব বিনীতভাবে জানালেন আমার কলিগ কিশোর কুমার যদি কোনো ভুল করে থাকে তবে আমি বিনীত ভাবে ক্ষমা চাচ্ছি।
বিচিত্র ভাষায় গান গাইবার প্রতি উনার প্যাশন ছিল। সে ভাষায় গান গাইবার আগে তিনি চেষ্টা করতেন উচ্চারণ ভুল যেন না হয়। মালায়লাম ভাষায় তিনি গান গাইতে চাননি দুর্বোধ্য উচ্চারণের জন্য। এক মালায়লাম পরিচালক উনার মনোবেদনা বুঝতে পেরে উনাকে দিয়ে মালায়ালি সিনেমায় হিন্দি গান গাইয়েছেন
পেমেন্ট নিয়ে উনি কোনো সময় আলোচনা করতেন না। যে যা দিক তাতেই খুশী। উনি খুতখুতে ছিলেন রয়েলিটি নিয়ে, রয়েলিটি সংক্রান্ত এক বাদানুবাদের কারনে লতাজির সাথে উনি গান গাইতেন ঠিকই কিন্তু কথা বলেন নাই কিছু বছর।
যেদিন মহাম্মদ রফি মারা যান সেদিন তার পায়ের কাছে বসে দীর্ঘক্ষণ অঝরে বিলাপ করে কেঁদেছেন কিশোর কুমার। অথচ নিজের অগনিত দুঃসংবাদেও কিশোর কুমারকে এমন ভাবে কাদতে কেউ দেখে নি।
মহাম্মাদ রফির জন্ম অম্রিতসরে, তার বাবা ছিল পীর ফকির ধরনের ফকির। পারিবারিক আয়ের উৎস ছিল সেলুন। বাবার সাথে মারফতি গান গাইতে গিয়ে তার ভাই আবিস্কার করে সে রফি দারুন গান গায়। কিশোর বয়স থেকেই তার সিংগিং ক্যারিয়ার শুরু।
মান্না দে সব সময় বলতেন আমরা লড়াই করি নাম্বার টূ পজিশনের জন্য। নাম্বার ওয়ান তো সব সময় রফি সাহেব।
বিদেশে এক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বলে ফেলেছিলেন উনি নাকি ২৬০০০ গান বিভিন্ন ভাষায় গিয়েছেন। এ ছাব্বিশহাজার থিয়রী জীবনিকাররা দেখেছে উনি গান গেয়েছে ৭৪০০র কিছু বেশী। ৫১৭ ধরনের সিনেমার ক্যারেক্টারে তার প্লেব্যাক গিয়েছে।
সত্তরের দশকে উনি একবার কাবুলে গিয়েছেন। কিছু ফারসি গান গেয়েছেন সেখানে। তাকে স্কুলের মত ইংরেজী শিখিয়েছিলো এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক, তিনি দুটো ইংরেজী গানও গেয়েছেন। ১৪টা ভারতীয় ভাষায় আর ৪ টা বিদেশী ভাষায় উনি গান গেয়েছেন। বাংলা ভজন গাইবার সময় উনার বুকে ব্যাথা শুরু হয়, সেইদিনই তিনি মারা যান।
কখনো জোরে কথা বলতেন না, কেউ কোনোদিন তাকে রাগতে দেখে নি, জরিওয়ালা সেন্ডেল পরতেন, পায়ে ধুলা লাগতো, অমিতাভ বচ্চনের ধারনা সেই ধুলা গুলাও রফি সাহেবের পা ছুয়ে প্রণাম করার জন্য উদগ্রীব থাকতো। জীবনে ডিসিপ্লিন খুব মানতেন, সময় মতো, খাওয়া রেয়াজ নামাজ সব করতেন। একটূ এদিক সেদিক হলেই তার মন খারাপ থাকতো।
ব্যাক্তিগত জীবনে উনার সব থেকে পছন্দের শিল্পী ছিলেন- কে এল সায়গল।
এইচ এমভি তার স্যাড গানের এক কালেকশন বের করার জন্য এলবাম ফটোশ্যুট লাগবে। উনাকে কোনোভাবেই স্যাড ফেস করা যাচ্ছে না, তাই তার আইকনিক সব সময়ের হাসিটাই এলবামের জন্য রাখা হলো। আর ডি বর্মণ, লক্ষীকান্ত পেয়ারে লাল, শংকর জয়কিষান এরা ছিল উনার প্রিয় মিউজিক ডিরেক্টর। সবাইকে মিষ্টি কিনে খাওয়াতেন ভালো গান হলেই।
দুইদিন সরকারী ছুটি ছিল ভারতে উনার প্রয়াণ শোকে। এরকম নজির আর নেই,
মহম্মদ রফি মাত্র একরুপিতেও এক সিনেমায় হিন্দি গান গেয়েছেন।

সিনেমাটা আমি দেখি নাই। তবে পত্রিকা মারফৎ জানলাম, রনবীর কাপুরের নতুন সিনেমায় নাকি নায়িকা আনুষ্কা ডায়লগ দেয়, রফি সাব তো গান গায় না, মনে হয় সারাদিন কাঁদছে। প্রতি ৩ বছর পর পর বলিউডে আনুষ্কার মত নায়িকা খুঁজলে পাওয়া যাবে, প্রতি ৮ বছর পরপর রনবীর কাপুরের মত রোমান্টিক হিরো আসে, প্রতি যুগেই একজন লেইম পরিচালক করণ জোহরকে পাওয়াই যাবে, কিন্তু আগামী ৭০-৮০ বছরে একজন মহম্মদ রফি আসবে না। উনার তুলনা শুধু উনি। এত চিপ কমেন্ট সিনেমাতে না থাকলেও কিছু আসতো যেত না।

রফির যে ১০ টা গান আমার প্রিয় এবং গান গুলোও খুব পপুলার--
লিখে যো খাত তুজে সিনেমা- কন্যাদান
বাহারও ফুল বারসাও- সিনেমা- সুরাজ
বাদান পে সিতারে- সিনেমার নাম মনে নাই
বার বার দেখো- সিনেমা- চায়না টাউন
আজকাল তেরে মেরে পিয়্যার- সিনেমা- ব্রম্মচারী
ইয়া চাঁদ সা রোশন চেহারা- সিনেমা- কাস্মীর কি কলি
আবি না যাউ ছোর কার- সিনেমা- হাম দোনো
দিন ঢাল ঝায়ে- সিনেমা- গাইড
গুলাবি আখে-সিনেমা- ট্রেন
রফির কন্ঠে নজরুলগীতিও আমার খুব ভালো লাগে। আমার এক ভাইয়ের রফি সাহেবের ও পাখির বুকে তীর মারা গানটা বুকের ভেতর বাজে , ছোটবেলায় মাইকে শুনতো ৷ অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল 'আ যা তুযকো পুকারে মেরে গীত' ৷ মাইক সার্ভিসের পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনতো৷ আমার এক বন্ধুর বাবাকে মোবাইল গিফট করার পর আংকেল প্রথম ডায়লগ দিয়েছিলো- মহম্মদ রফি সাহেবের গান ভরে দে। আর ফেসবুকে পোষ্ট দেয়ার পর বর্ণ বলেছিলো ব্লগে রেখে দিতে। তাই কিছু লাইন যোগ করে লিখলাম। আরো কিছু কথা লেখা যেত তা আরেকদিন লিখবো।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


অনেক অজানা তথ্য জানতে পেলাম। খুব ভাল লাগলো। তথ্যসূত্র উল্লেখ থাকলে আরো ভাল লাগতো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই পয়সার মানুষ।চায়ের দোকানেই দিন পার করি তাই!