ইউজার লগইন

এলোমেলো বাচ্চাবেলা

আমি মোটামুটি ভুদাই কিসিমের মানুষ, মীরের লেখাটা পড়ে কিছুটা অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক ভেবে-চিন্তেও পুরো ছেলেবেলা হাতড়ে টাতড়েও গুছিয়ে লেখার মতো ডেঁপোমি তেমন পাচ্ছিলাম না। তবে চুপেচাপে ঠারে-ঠুরে আকাজ-কুকাজ নেহায়ে্ৎ কমও করি নাই। আম্মা যখন ইশকুলের মাস্টারনি ছিলো, নানী'র সাথে সাথে থাকতাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটা গ্রামে... গ্রামের নামটা বড়ো আজীব, অবশ্য আর দশটা গ্রামের যেমন হয় আর কি... ছয়ফুল্লাকান্দি। যদিও সেইকালে এই শুদ্ধ নামটা মোটেই জানতাম না... সবাই বলতো ছোবলাকান্দি... আর আমি ভাবতাম সেইখানকার সবাই বুঝি ভীষণ ছ্যাবলা, তাই এই নাম।

বাপ থাকতো চাকরীর কাজে চট্টগ্রামে, মা সারাদিন ইশকুলে... যদিওবা নানী দেখেশুনে রাখতেন, কিন্তু তারও তো কাজ কর্মের অভাব ছিলোনা, একলা ঘর সামরানো আর লাকড়ির চুলার রান্নার ঝক্কি তো আর কম না। ছোট মামা সকালে উঠে চলে যেতো তার চায়ের দোকানে। আমি মাঝেই মাঝেই গিয়ে সেই দোকানে বিশাল দুধের হাড়ির উপরে জমে থাকা সরটুকুর দিকে জুলজুল করে চেয়ে থাকতাম, সেইটাকে একটু ভেজে নিয়ে চিনি দিয়ে একটা কাপ ভর্তি করে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো। আহ! তার কি যে স্বাদ! মামার দোকানের পাশেই গ্রাম্য ময়রার দোকান আর সেই দোকানের গর্মাগর্ম রসগোল্লা... উমম! অবশ্য ওই দুই জিনিস বাদে আর কোন খাদ্য নাকি আমাকে পিটিয়েও খাওয়ানো যেতোনা। আমি যে কোনকালে এমনই ল্যাকপ্যাকা ছিলাম যে আড়াই বছর বয়সের আগে ঠিকঠাক হাঁটতেও শিখি নাই, সেইটা আজকের আমার জলহস্তী স্টাইলের বপু দেখে কেউ বিশ্বাস করবেনা।

সারাদিন কোন শাসনের বালাই নাই, বাড়ির পাশেই বাজার... সেইখানে সুযোগ পেলেই দৌড় আর দোকানের ফাঁকে এক্কাদোক্কা খেলা প্রায় সমবয়েসী খালাতো বোন আঁখির সাথে। শরীর যতোই ল্যাকপ্যাকা হোক, চেহারাখানা ছিলো গোলগাল, তাই বাজারের সব দোকানদারের নাকি প্রিয়পাত্রী ছিলাম, এক ফটোগ্রাফার মামা আমাকে পেলেই হরেক পোজে ছবি তুলে দিতেন, সাদাকালো সেইসব ছবি বহুদিন পর্যন্ত বাসায় ছিলো, একবার বাড়ি বদলের সময়ে হারিয়ে গিয়ে ছোটবেলার সেই একটা অধ্যায় কই মিলিয়ে গেলো। আম্মা বাড়ি ফেরার আগ পর্যন্ত তো আমার রাজত্ব, মাঝে খালি নানী একটু খাওয়ানোর চেষ্টা করতো, কিন্তু আমার সাথে পেরে উঠতো না। সারাদিন টোটো কোম্পানীর পরে আম্মা বাড়িতে এসেই আমাকে গোসল করানোর চেষ্টা করতো, আর আমি কলপাড় থেকে বস্ত্রবিহীন অবস্থায় গায়ে আধা সাবান নিয়েই দৌড় দিতাম বাজারের দিকে, পেছন পেছন আম্মা তো আর বাজারের ভেতর যেতে পারতো না, তাই খালাতো ভাইদের কাউকে পাঠিয়ে আসামীকে হাতকড়া পরিয়ে বধ্যভূমিতে আনা হতো। গোসলের মতো অদরকারী জঘন্য জিনিসটা যে কেন করা লাগতো সেইটা আমার মহান মস্তিষ্কে কিছুতেই ঢুকতো না। এরপরে কিছু তো খেতে হতোই। আমি নাকি সুরে কাঁদতাম পুরো সময়টা, আর বলতাম, ''ভাত দেক্কেরে লো।'' এই কথার মর্মার্থ যে কি সে এক খোদা-তালা জানেন।

সেইকালে ক্ষণরাগী ছিলাম সেই তথ্যটাও শুনেছি বহুবার। একবারের ঘটনা ঝাপসা মনে আছে। সেই ঘটনার আবার ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরিও আছে। পাশের বাড়ির জোসনা খালা ছিলেন মহা ফাজিল। আমার আর আঁখির ঝগড়া বাঁধিয়ে মহা আমোদ পেতেন মহিলা। আমাদেরকে ক্ষেপাতে তার মোটেই কসরৎ করতে হতোনা। আমাদের কাছে এসে বলতেন '' জানো? আঁখিয়ে নি তোমারে আইন্যানি কইসে''। ''আনিকায় তোমারে আইখ্যানি কইসে।'' ব্যাস, আর যায় কোথা? দুইজনে মিলে ধুন্দুমার। মারামারি যদিও কম হতো... দুজনে মিলে চেঁচামেচিটাই চলতো বেশি। একদিন আমার রাগ চরমে উঠায় ইটা মেরে ওর মাথা ফাটিয়ে ফেলেছিলাম। পুরো ঘটনা মনে নাই... তবে নানী ওকে কোলে নিয়ে মাথা কামিয়ে দিতে দিতে আমাকে বিড়বিড় করে বকছিলেন ওইটুকু মনে আছে বেশ। আম্মা ফিরে এলে পিটানি খাইছিলাম কিনা সেইটাও মনে করতে পারিনা। যদিও খাওয়ারই কথা।

এর বাইরের বাকি সব বাঁদরামী আর মনে নাই। পুরোটা গেছো হওয়ার আগেই নানা ঘটনাপ্রবাহে মায়ের হাত ধরে ময়মনসিংহ চলে আসতে হয়েছে। সেই যাত্রাও সারা রাস্তা আম্মার জানটা কয়লা বানিয়েছি। যেখানেই বাস থেমেছে সেইখানেই কেঁদেকেটে নেমে যাওয়ার বিস্তর চেষ্টা নাকি করেছিলাম আর পেটের ভেতরের জিনিসপাতি তো উঠবা মাত্র উগড়েছি। এহেন আমারও পায়ের তলায় সর্ষে জন্মাবে এই কথা মোটেই টের পাওয়া যায়নি তখন।

লেখাটা দিব্যি এইখানে এসে আটকায়ে গেলো। আর তো কিসু নাই লেখার। কি আজীব!

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


আর কিছু লেখার নাই এটা হতেই পারে না। পড়ছিলাম আর হঠাৎ করে ফুরিয়ে গেলো, ধ্যাৎ কোন মানে হয় Sad(

আনিকা's picture


আমার মতো গজনফর আর একটাও পাইবা না... লেখার বেলায় কচু আর মোচার ঘন্ট... আর ভাবে মহারাজা... হি হি হি... আমার মতো দুইপয়সার মানুষের আবার রাইটার্স ব্লক ও হয়, বুঝলা?

লীনা দিলরুবা's picture


আপনি বড় ভালো লেখেন। বিষণ্ন ডায়েরির বাইরের এই স্মৃতিচারণা একটানেই পড়ে ফেললাম।

যেখানেই বাস থেমেছে সেইখানেই কেঁদেকেটে নেমে যাওয়ার বিস্তর চেষ্টা নাকি করেছিলাম আর পেটের ভেতরের জিনিসপাতি তো উঠবা মাত্র উগড়েছি। এহেন আমারও পায়ের তলায় সর্ষে জন্মাবে এই কথা মোটেই টের পাওয়া যায়নি তখন

একটা স্টার নেন Star

আনিকা's picture


বড়ো ভালো যদি আসলেই লিখতে পারতাম! Sad

হাসান রায়হান's picture


লেখা চমৎকার। দেখো আরো কিছু মনে করতে পারো কীনা।

আনিকা's picture


চাইলে একটা বাচ্চাকালের সিরিজ নামানো যায়, কিন্তু যেইসব সিরিজ আগে শুরু করছি ওইগুলারই তো কোন পাত্তা নাইক্যা।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


নামাই ফেলেন। Smile

রশীদা আফরোজ's picture


বড় ভালো লাগল।

আনিকা's picture


Smile

১০

রায়েহাত শুভ's picture


ধুরো মিয়া। এটুকু লিখলে কি ভালো লাগে? খুব মজার একটা চকলেট খেতে খেতে হঠাত হাত থেকে পড়ে গেলে যেরকম লাগে সেরকম লাগতেছে Confused

১১

আনিকা's picture


Big smile

১২

জ্যোতি's picture


আপনে ভুদাই কেডা কইলো? আপনে তো জোশশশশ। কত্ত মজার কাস্টার্ড বানাইতে পারেন। বেহেসতি খানা।আবার কবে খাওয়াইবেন?

১৩

আনিকা's picture


খালি কাস্টার্ড খাইয়াই টেস্টিমনিয়াল দিয়া ফেললেন আপু... Wink... ?

১৪

একজন মায়াবতী's picture


''ভাত দেক্কেরে লো'

এইটা কি হইতে পারে আমি মনে হয় বুঝসি। Big smile

এহেন আমারও পায়ের তলায় সর্ষে জন্মাবে এই কথা মোটেই টের পাওয়া যায়নি তখন।

খুব ভালো লাগছে আপু। Smile

১৫

আনিকা's picture


Smile

১৬

মীর's picture


লেখাটা চমৎকার হয়েছে। আপনি দারুণ লেখেন!
'অসমাপ্ত' টার্গেট নিয়ে একটা সিরিজ চালু করে দেন।

১৭

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


জন্ম থেকে শুরু কইরা ইস্কুল কলেজ পার করলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে,
এর আশেপাশে যে কত্ত গ্রাম আছে মাথাতেই আসেনাই একবারও..! Puzzled

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আনিকা's picture

নিজের সম্পর্কে

কি লিখবো জানিনা...