ইউজার লগইন

গল্প: তাকে এড়িয়ে যতটুকু পথ যাওয়ার কথা

বেশ কিছুদিন মিসিসিপির কথা মনে পড়ে নি অংকনের। এক্সের ফেসবুক প্রোফাইল স্টক করাটা ঠু-মেইনস্ট্রীম জানার পরও, মাঝে মাঝে সেটা করতো সে। হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেটা করাও। অংকনের নির্জন সুদীর্ঘ পাকা সড়কের নীরবতাময় জীবনকে এলোমেলো করে দিতে, দুইশত সত্তুর কিলো পার আওয়ার গতির একটা মেরুন রঙয়ের ফোক্সভাগেন ভিটু হয়ে হাজির হয়েছিল ইয়ানা। এক দিস্তা অস্থির ফিচার আর আকাশসম একটা হৃদয় নিয়ে। ইংরেজিতে যাকে বলে আ পারফেক্ট সুইটহার্ট। ইয়ানা ছিল তাই।

সকালে সে অংকনকে ঘুম থেকে তুলতো বেহালা বাজিয়ে। চোখ খুলে মোটা ফ্রেমের চশমার গ্লাসের পেছনে বড় বড় দু'টো কালো চোখভর্তি মায়া দেখে অংকনের মনে হতো, আশপাশে যা ঘটছে তার কিছুই সত্যি নয়। জন্মদিনের উপহার হিসাবে ইয়ানার আঁকা নিজের পোর্ট্রেট পেয়ে অংকনের মনে হতো সে কোনো এক অচেনা জগতে উপস্থিত হয়েছে, যেখানকার হিসাব-নিকাশ ওর চেনা-জানা পৃথিবীর মতো কুটিল নয়।

ইয়ানা মোটা ফ্রেমের চশমা পড়ে ছেলেবেলা থেকেই। চশমার ফ্রেমটা মানিয়ে গেছে ওর মুখের সাথে এমনভাবে যে ওটা ছাড়া ইয়ানাকে দেখলে প্রত্যেকবারই খানিকটা অচেনা লাগে অংকনের। ওই চশমাই ছিল ওদের দু'জনের পরিচয়ের সূত্র।

এক সকালে পাওয়া অপ্রত্যাশিত ছুটি অংকন উপভোগ করছিল কম্বলের নিচের ঘুমের রাজ্যে বিচরণের মাধ্যমে, যে সময় ওই চশমাটার আগমন তার জীবনে। আমাজন থেকে ডেলিভারি এসেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে দরোজা খুলে আমাজনের গেঞ্জি পরা পোস্টম্যানকে দেখে অবাকই হয়েছিল সে। চশমার ফ্রেম যে ইদানীংকালে সে কেনে নি, সেটা জানতো বিলক্ষণ। তাও জিনিসটা রিসিভ করেছিল নির্ভুল নাম আর ঠিকানা লেখা দেখে। ভেবেছিল কোনো বন্ধু বুঝি উপহার পাঠিয়েছে। জন্মদিনের বাকি আরও আটদিন। ব্বাবাহ! এখনই উপহার আসা শুরু করেছে- ভেবে খানিকটা অবাক আর আনন্দিত হয়েছিল সে। অংকনও চশমা ব্যবহার করে, তবে ইয়ানার মতো মোটা ফ্রেমের না।

পরদিন সকালে অফিসে ঢুকেই শুনতে হয়েছিল উপরওয়ালার বকুনি। চাকুরীর মায়া অংকনের অনেক, তাই চুপচাপ সব শুনে নিজের কিউবিকলে এসে বসতেই মোবাইলটা বেজে উঠেছিল পকেটে। 'হ্যালো, আপনি কি অংকন হাসনাইন বলছেন?'

ফোন করেছিল ইয়ানা। সে আমাজন অফিসে ফোন করে জানতে পেরেছে, ফ্রেমটা তাকে বিদেশ থেকে যে বন্ধু পাঠিয়েছে সে ভুল করে অংকনের ঠিকানা লিখে দিয়েছে অর্ডার করার সময়। কেন? কারণ সেই ব্যক্তি অংকন আর ইয়ানা দুইজনের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড। অংকনের জন্য সে একটা উপহার কিনেছে, যেটা সপ্তাহখানেক পরে পাঠানোর কথা ছিল তার। তবে ঠিকানাটা প্রস্তুত ছিল হাতের কাছে। যদিও শেষ রক্ষা হয় নি। ইয়ানার জন্য চশমার ফ্রেম অর্ডার করতে গিয়ে অংকনের ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে সেখানে। অসাবধানতাবশত।

অবিশ্বাস্য! এটাই ছিল অংকনে প্রথম ও একমাত্র রি-অ্যাকশন। তারপর ইয়ানা আর ওর দেখা হয় 'মোশটেস্টডু' রেস্তোরায়। দুপুরের খাবারের সময়। সেই দিনই। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে তাদের অনেক গল্প হয়। একে অপরকে জানানো হয় চশমা নিয়ে তাদের যতো মজার বা বিব্রত হওয়ার অভিজ্ঞতাগুলো। সেই সাথে জানা হয় দু'জনের একসাথে কাটানো সময়ের গতির হিসাব।

সেদিন রেস্তোরা থেকে বের হয়ে দু'জন দু'দিকে চলে যাওয়ার আগে তারা ফোন নাম্বার আদান-প্রদান করেছিল কোনো কিছু না ভেবেই। আর দশজন যেভাবে একে অপরের সাথে প্রথম পরিচয়ের পর নাম্বার আদান-প্রদান করে সেভাবেই।

তবে দু'জন দু'দিকে চলে যাওয়ার পর থেকে মাথায় বাজতে শুরু করেছিল সেই পুরোনা বাদ্যের সুর। আর শুরু হয়ে গিয়েছিল একটা অপেক্ষার পালা, দেখার জন্য কে আগে টোকা দেয় কিংবা আদৌ দেয় কিনা। ওদের দু'জনের মধ্যেই চলছিল ঠিক একই চিন্তা। ওদের দু'জনেরই দু'জনকে ভীষণ ভাল লেগেছিল, কিন্তু কেউই অপরজনের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। এমনকি ওদের কারও কাছে কোনো ক্লু-ও ছিল না।

সমস্যা সমাধানে কিউপিডকেই এগিয়ে আসতে হয়েছিল আবার। মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের কাছ থেকে নিজের প্রকৃত জন্মদিনের উপহারটা পাওয়ার পর অংকনের প্রথমেই মনে হয়েছিল কথাটা ইয়ানাকে জানানোর কথা। কেননা অংকনের জন্যও সেই বন্ধু একটা চশমার ফ্রেম পাঠিয়েছিল, তবে সেটা ইয়ানারটার মতো মোটা ছিল না।

হোয়াটস্যাপে টেক্সটটা পাওয়ার পর ইয়ানার প্রথম যে কথাটা মনে হয়েছিল, এতোদিন সময় লাগলো ছেলেটার? একটা টেক্সট পাঠাতে?

সেই শুরু হয়েছিল অংকন আর ইয়ানার জাদুময়তায় ভেসে বেড়ানোর দিনগুলো। প্রথম দিকে ওরা বোধহয় কয়েকদিনেই হাজার-হাজার টেক্সটের বন্যায় হোয়াটস্যাপ ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অনেক দূরের একটা পাহাড়ি ঝর্ণার চূড়ায়। তারপর সেখান থেকে নৌকাটা ফেলে দিয়ে, ওরা চড়ে বসেছিল ওভার টেলিফোনে কথা বলার সাম্পানে। টানা কয়েকদিন চোখের চারিদিকে কালো চক্র নিয়ে অফিস করেছিল অংকন। সেই ক'টা দিন প্রতিদিন নিজের ডেস্কে মাথা রেখে গোপনে গোপনে ঘুমিয়েছিল ইয়ানা। দু'জনের কথা যেন ফুরাচ্ছিলই না।

তারপর একদিন যখন রাস্তায় ওরা মুখোমুখি হয়ে গেল একে অপরের, তখন দু'জনের মনে একসাথে একটাই কথা ভেসে উঠেছিল- এই তো পাওয়া গেছে উদ্ভুত সমস্যার সমাধান। তারপর শহরের এলেবেলে রাস্তায় চড়ুইয়ের জোড়া বেড়ে গিয়েছিল আরও একটি। ওরা দু'জন প্রতি বিকেলে অফিস শেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত একসাথে ঘুরতে পছন্দ করতো। তারপর অংকন ওকে বাসার গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ফিরে যেত নিজের কুঠুরিতে।

অল্প দিনের মাথায় যখন ওরা আবিস্কার করলো শুধু সন্ধ্যায় একে অপরকে পেলে হচ্ছে না, তখন ওদের আবার ফোনে কথা বলার দিনগুলোর মতো উদভ্রান্তি পেয়ে বসলো। এবারে লক্ষণ হিসাবে দেখা দিল চাঞ্চল্য, অস্থিরতা ইত্যাদি। মনের ভুলে অংকন কাছের বন্ধুদের সাথে খিটখিটেভাবে কথাও বলে ফেললো একদিন। ইয়ানা থাকতো বান্ধবীর বাসায়। পেইং গেস্ট হিসেবে। সে তার বান্ধবীকে সব খুলে বলার পর বান্ধবীই সমাধান বাতলে দেয়, 'অংকনের সাথে কিছুদিন একসাথে থেকে ব্যাপারটা দ্যাখ কেমন হয়।'

অংকনের একজনের সংসারে চাপাচাপি করে দু'জন ওরা বেশ মানিয়েও নিয়েছিল কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো অন্য এক জায়গায়। অংকন বুঝতে পারছিল বেশ কিছুদিন ধরে মিসিসিপির কথা মনে পড়ছে না তার। কারণ কারও কথা মনে পড়তে হলে তাকে কোনো না কোনো একটা মাত্রায় ভুলে থাকতে তো হয় আগে। ইয়ানার সাথে কাটানো সময়গুলোতে অংকন মিসিসিপিকে ভুলে থাকছিল না আসলে এক মুহূর্তও।

ইয়ানার বেহালার সুরে শুরু হওয়া দিনগুলোকে মলিন করে দিতে সন্ধ্যার আঁধার ঝাপি ভরে আমদানি করছিল পুরোনো দিনের স্মৃতিদেরকে। রাতে যখন ইয়ানা গান গেয়ে গেয়ে ঘুম পাড়াতো অংকনকে, তখন মিসিসিপিকে একটা গান গাইতে রাজি করানোটা কতোটা কঠিন ছিল ভেবে কেমন যেন এক ভীষণ চাপা কষ্ট ছেঁকে ধরতো ছেলেটাকে।

অথচ সে কষ্টের উৎসটা ঠিক কোথায় তা পরিস্কারভাবে ঠাহর করতে পারছিল না অংকন কোনোমতেই। সে কখনও মিসিসিপিকে ছেড়ে একা একা জীবনের পথে পা বাড়াতে চায় নি। অথচ মিসিসিপি আর তার পরিবারের লোকজন মিলে কোনো রাস্তাও খোলা রাখে নি। শত বাধা-বিপত্তি আর প্যানডোরার বাক্সোদ্ভুত অনুভূতিকে গ্রাস করে অংকনের বিভিন্ন সময় ছুটে যেতে ইচ্ছে করেছে মিসিসিপির কাছে। কিন্তু উপায় ছিল না। মিসিসিপির চারপাশে যে বিশাল দেয়াল গড়ে তুলেছিল সমাজ, তা ভাঙার সাধ্য ছিল না।

কিছু করার ছিল না বেচারার। অফিস অনেকদিন থেকে দূরের একটা শহরে বদলি করে পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছিল অংকনকে, কারণ সেখানে হাল ধরার জন্য একটা ছোকরা দরকার ছিল উপরওয়ালাদের। অংকন এতোদিন গড়িমসি করলেও, এবারে নিজেই চেয়ে নিলো বদলিটা।

ইয়ানাকে রেখে এক সন্ধ্যায় গাড়িতে করে নতুন শহরের পানে রওনার হওয়ার আগে শেষবারের মতো নিজের প্রাণের শহরটাকে দেখতে দেখতে হু হু করে কেঁদে দিয়েছিল বোকা ছেলেটা। মিসিসিপির মতো করে ওর মনে কখনও কেউ ছিল না। কেউ কখনও পারবেও না ওর মতো একটা জায়গা করে নিতে। নির্মম সত্যটা উপলব্ধি করার জন্যই ইয়ানার আগমন ঘটেছিল জীবনে, বুঝতে একটুও বাকি ছিল না সেটা।

---

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ওয়াও! শহরের ব্যাপারটা ভাল্লাগছে অনেক।

মীর's picture


থ্যাংকিউ বর্ণ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

more efficient in reading than writing. will feel honored if I could be all of your mate. nothing more to write.