ইউজার লগইন

জানালা ও কিছু বিকেলের গল্প

একটা মিস্টি কন্ঠের গুঞ্জনে শেষ
বিকেলের দিকে ঘুম ভাংলো রুদ্রর,
ঘড়িতে ৪:১৭ বাজে।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো
পাশের ছাদে একটা মেয়ে
রেলিংয়ে হাত দিয়ে দাড়িয়ে
রবীন্দ্র সংগীত গাইছে,
মেয়েটার কন্ঠে যেন বিধাতা মধু
ঢেলে দিয়েছে।
অপূর্ব সেই সুরের সুধা রুদ্র মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে
গিলতে লাগলো,
শেষ বিকেলের সোনালী আলো এসে
পড়েছে মেয়েটার চোখে মুখে।
রুদ্রদের জানালা থেকে মেয়েটার
মুখটা দেখা যাচ্ছিলনা।
ছাদের এক কোনে কয়েকটা ফুলের টব,
তার একপাশে একটা পাখির খাচা
ঝুলানো,
তাতে একজোরা পাখি,
এমন সময় রুদ্রর ফোন বেঝে উঠলো,,
রুদ্র ফোনে কথা বলে আবার জানালার
সামনে এসে দাড়ালো,
মেয়েটা নেই, চলে গেছে
রুদ্র এদিক ওদিক তাকিয়ে রুমের ভেতর
চলে গেল।
এই মেয়েটাকে রুদ্র এই ছাদে আর কখনো
দেখেনি,
সম্ভবত ওই বিল্ডিং য়ে নতুন এসেছে।
পরদিন বিকেলবেলা রুদ্র আগ্রহ নিয়ে
জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালো,,
মেয়েটাকে দেখে যেন রুদ্র স্বস্তি
পেল।
পাখি দুটোকে খাবার খাওয়াচ্ছে
সে,
পরনে নীল আর পার্পল কালারের
থ্রিপিছ
ওড়না দিয়ে গোমটা দিয়ে আছে।
পাখি গুলোকে খাওয়ানোর মাঝে গুন
গুন করে
গান গাইছে,,,
"আমি কেবলি স্বপনওও
করেছি বপন
এত চমৎকার কন্ঠ এই মেয়েটার!!!
রুদ্র বিশ্বাস করতে পারছেনা।
খাচাটা রেখে দিয়ে মেয়েটা চলে
যাবে!
এমন সময় রুদ্র ডাক দিল,
এই যে শুনছেন....
মেয়েটা রুদ্রর ডাকে চমকে উঠলো.
কে?..
কে বলছেন?
রুদ্র জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে
ডাক দিল।
এই..
এইযে আমি,
মেয়েটা ঘাড় ফিরারেই রুদ্র দেখল
ওর চোখে কালো চশমা।
রুদ্র কিছুটা অবাক হলো!
এই বিকেল বেলায় কেউ কালো চশমা
পরে ছাদে আসে?
অদ্ভুত!!!
মেয়েটা রেলিং হাতরে বেড়াচ্ছে।
কে আপনি?
কোথা থেকে বলছেন?
রুদ্র কিছুটা অবাক হয়ে বলল!
কেন আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন
না?
মেয়েটা এবার হেসে দিল,
কি করে দেখবো?
দেখার মত দৃষ্টি শক্তি বিধার দেয়নি
আমায়,
কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছিলনা
রুদ্র।
আমি দুঃখিত,
আসলে আমি জানতাম না আপনি
চোখে দেখেন না।
দুঃখিত হবার প্রয়োজন নেই,
আমি রুদ্র, অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ি
আমি এই বাসাতেই থাকি আপনি?
মেয়েটা হাসি দিয়ে বলল..
আমি জুলি, এই বাসায় নতুন এসেছি।
রুদ্র কপাল কুচকে বলল...
ও আচ্ছা,,
এজন্যই আপনাকে আগে কখনো দেখিনি।
আপনি চমৎকার গান গাইতে পারেন
তো!!!
আমি কিন্তু ইতিমধ্যেই আপনার ফ্যান
হয়ে গেছি,
জুলি হেসে ফেলল,,
একদম বাড়িয়ে বলবেন না
আমি মোটেও ভালো গান গাইতে
পারিনা।
কথায় কথায় জুলির সাথে ভাল একটা
সখ্যতা গড়ে উঠলো রুদ্রর।
পিছন থেকে একটা ১২/১৩ বছরের মেয়ে
ডাক দিল,
আন্টি চলো মা তোমায় ডাকছে,
জুলি মেয়েটার হাত ধরে সিড়ি বেয়ে
নিচে নেমে গেল।
জুলিকে নিয়ে রুদ্র ভাবতে লাগলো,,
এমন অপরুপ একটা মেয়ে
এত মিষ্টি কন্ঠের অধিকারী!
সে কিনা জগতের কোন আলো
দেখেনা!
শুধু শ্রবন শক্তি দিয়ে গড়ে তোলেছে
আপনার জগত,
ভাবতেই কষ্ট লাগছে রুদ্রর।
জুলির প্রতি এক ধরনের ভালোলাগা
জাগলো রুদ্রের অন্তরে।
জুলির পোষা পাখি দুটো
চিলেকোঠার কার্নিশে দোল খাচ্ছে
আপন মনে।
প্রত্যেকদিন দুপুরের লাঞ্চ সেরে
ঘুমানোটা রুদ্রর অভ্যেস,
হঠৎ আবছা ঘুমের মাঝে কারো গলার শব্দ
শুনতে পেয়ে রুদ্রর ঘুমটা ভেংগে গেল।
জুলির গলার আওয়াজ শুনতে পেল রুদ্র,
রুদ্র আপনি আছেন?
রুদ্র....
রুদ্র বিছানা ছেড়ে জানালায় গিয়ে
দাড়ালো
হ্যা আমি আছি জুলি,
ভালো আছেন আপনি?
রুদ্রর কন্ঠ শুনতে পেয়ে জুলি এগিয়ে এল,
ও আপনি এসেছেন তাহলে!
আমি ভাবলাম আজ হয়ত আসবেন না।
আমি খুব ভালো আছি রুদ্র
আপনি ভালো আছেন তো?
হুম, ভালো আছি
জুলি একটা কথা বলব?
জ্বী বলেন...
আপনিত চোখে দেখতে পাননা!
ছাদে হাটা হাটি করতে ভয় পাননা?
জুলি মুখটা গম্ভীর করে ফেলল.
না পাইনা।
জুলি আপনি রাগ করেছেন?
আমি দুঃখিত জুলি,
আপনাকে এ ধরনের প্রশ্ন করা আমার
উচিত হয়নি।
জুলি হেসে ফেলল...
আরে না রাগ করব কেন?
জানেন রুদ্র গত চার মাস ধরে আমি
আমার বাবা মার সাথেও কথা বলিনি,
কেন জানেন?
ওনারা আমাকে বোঝা মনে করে।
রুদ্র দেখতে পেল জুলির চোখের কোনে
জলের বিন্দু
যেন এখুনি গড়িয়ে পরবে,
আজ জুলির চোখে কালো চশমা নেই
কি সহজ সরল সাবলীল মায়াময়
চেহারা,
দেখলে বোঝাই যায়না সে অন্ধ।
জুলি একটা কথা বলব?
হ্যা বলুন..
আমাকে আপনার বন্ধু করে নিবেন
প্লিজ,,
আপনার সকল সুখ দুঃখের অংশীদার হতে
চাই।
জুলি খানিক ক্ষন মাথা নিচু করে রইল
বন্ধু হবেন?
আচ্ছা আপনাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন
করে নিলাম।
তাহলে আর আপনি নয় জুলি,,
তুমি করে বলো,
জুলি হেসে উঠল..
আচ্ছা তাই ডাকবো।
আচ্ছা জুলি,, ছাদে হেটে বেড়াতে
তোমার ভালো লাগে?
হে........
অনেক ভালো লাগে,
বাসায় শুয়ে বসে যখন বোর হয়ে যাই তখন
ছাদে
আসি।
রুদ্র আমি যে ছাদে দাড়িয়ে আছি
সেখান থেকে তোমার জানালার
দুরত্ব কতটুকু?
কেন জুলি?
কাছা কাছি হলে তোমার হাতটা
ছুয়ে দেখতাম।
যতটুকু দুরত্ব আছে তাতে তুমি আমার হাত
ছুতে
পারবেনা,
ও আচ্ছা!!!
আমার না!
ছাদের রেলিং ধরে দাড়িয়ে
থাকতে ভালো লাগে,
জুলি আপনি রাতে চাদ দেখেন?
প্রশ্নটা করেই রুদ্র লজ্জা পেল,
যে এই পৃথিবীর আলোই দেখেনা!
তাকে চাদ দেখতে বলাটা অত্যান্ত
অপমান জনক ব্যাপার
সরি জুলি, মুখ ফসকে বলে ফেলেছি
হ্যা দেখিতো,,
জুলির দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো
রুদ্র!!!
দেখি চাদ দেখি, অন্তরের চোখে
অনুভব করি হ্রদয় দিয়ে,
গড যাদের চোখের আলো কেড়ে নেয়
তাদের অন্তর চক্ষু খোলে দেয়।
আমি অন্তর দিয়ে বিশ্ব দেখি রুদ্র,
কথা গুলো বলতে বলতে কেদে ফেলল
জুলি।
রুদ্র জুলিকে সান্তনা দিতে উদ্যত হল,
জুলির উড়নার আড়ালের ক্রুশটা চোখে
পড়ল
রুদ্রর।
ও জুলি তাহলে খ্রীষ্টান!!
জুলি একটা প্রশ্ন করব? যদি কিছু না মনে
করো
কি রুদ্র?
জুলি তুমি কখনো কাউকে
ভালোবেসেছিলে?
জুলি হেসে উঠল,,,
হ্যা বাসি তো! গড যীশুকে
ভালোবাসি
আর কাউকে ভালোবাসার মত যোগ্যতা
আমার নেই
রুদ্র,
নিজেকে কেন তুচ্ছ ভাব জুলি?
আমায় ভালোবাসবে?
জুলি খানিক চুপ করে থেকে জবাব
দিল....
বাসিতো ভালো,
তোমার মত এত ভালো বন্ধু আর কোথায়
পাব বলো?
তুমি যদি কখনো চলে যাও খুব মিস করব
তোমায় জুলি,
আমি যদি কখনো চলে যাই!
এই জানালা দিয়ে দুর আকাশের দিকে
তাকিয়ে থেক,
আমায় দেখতে পারবে।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধা হয়ে গেল
জুলিকে নিতে সেই ছোট মেয়েটা
এলো,,,
রুদ্র ভালো থেক,
আমি যাই
গড ব্লেস ইয়ু রুদ্র।
মেয়েটার হাত ধরে আস্তে আস্তে
নেমে যাচ্ছে জুলি,
রুদ্র জানালাটা বন্ধ করে চলে এল রুমে
পরদিন রুদ্র জানালার সামনে দাড়িয়ে
রইলো
সময় বয়ে যায় কিন্তু আজ আর জুলিকে
দেখা যাচ্ছেনা।
রুদ্রর ভিতর এক অস্থিরতা কাজ করতে
লাগলো,,
জুলির কিছু হলো নাকি?
জুলি কি অসুস্থ?
জুলির জন্য রুদ্রর মন ছটফট করতে লাগলো।
তাহলে কি জুলিকে ভালোবাসে রুদ্র!
কিন্তু কিভাবে সম্ভব?
জুলিতো খ্রিষ্টান!!
অনেক ভেবে রুদ্র পাশের বিল্ডিং এ
জুলিদের বাসার উদ্দেশ্যে বাসা
থেকে বের হল।
দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে
দোতলার দুই নাম্নার ফ্লাটের
কলিংবেল চাপলো রুদ্র।
একটা ভদ্র মহিলা দরজা খুলে জিজ্ঞেস
করলো-
কাকে চাই?
এটা জুলিদের বাসা?
হ্যা জুলিদের বাসা, আপনি?
আমি পাশের বিল্ডিং এ থাকি জুলি
আমার বন্ধু,
মহিলা রুদ্রকে বসতে বলে ভিতরে গেল
রুদ্র এদিক সেদিক দেখতে লাগলো
রুমের একপাশে যিশুর অনেক বড় একটা
মুর্তি,
রুদ্র কৌতুহল নিয়ে সব দেখতে লাগলো।
এমন সময় ভদ্র মহিলা হাতে একটা চিঠি
ও কিছু ফুল নিয়ে হাজির হল,
তুমার নাম রুদ্র?
জ্বী আমার নাম রুদ্র
মহিলা চিঠিটা ও ফুল গুলো রুদ্রর দিকে
বাড়িয়ে দিল,
আমি জুলির মা
জুলি চায়না আমাদের সাথে থাকুক
তাই সারা জীবনের জন্য চার্চে চলে
গেছে।
রুদ্র কাপা কাপা হাতে চিঠিটা হাত
বাড়িয়ে নিল।
হু হু করে কেদে উঠলো রুদ্রর শুন্য বুকটা।
তার পর চলে এল নিজের রুমে।
তারপর আস্তে আস্তে চিঠিটা
খুললো....
"rudro"
আমার এ হঠাৎ চলে যাওয়ায় মন খারাপ
করো না
তোমার সাথে শেষ দেখা ও করতে
পারলাম না।
নিজেকে চার্চের মধ্যে নিয়োজিত
করতে চাই
এই সমাজ সংসার ছেড়ে সারা
জীবনের জন্যে চলে এলাম।
আমার আমিকে মানুষের সেবায়
নিয়োজিত করতে চাই,
জানো রুদ্র যাওয়ার আগে আমি ছাদে
এসেছিলাম তোমার সাথে শেষ
দেখা করার জন্য,
কিন্তু তোমার দেখা পাইনি।
ভাগ্য জোরে তোমার মত একটা বন্ধু
পেয়েছিলাম,
তোমার সাথে কাটানো সেই সব
সোনালী বিকেল গুলোকে সৃতি করে
সাথে নিয়ে গেলাম।
মা বাবার সাথে থাকতে কার না
ইচ্ছে করে!
ইচ্ছে সত্বেও পারলাম না থাকতে।
ভালো থেক রুদ্র, অজান্তে কোন অপরাধ
করে থাকলে
ক্ষমা করে দিও,,
God bless u....
"joli disuja.........

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

রুদ্র আসিফ's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি খুব অগোছালো একজন মানুষ
জাগতিক নিয়ম নীতির বাইরে আমার অবস্থান ।
বাউন্ডুলে স্বভাবটাই আমার মাঝে বিদ্যমান..
একা চলতে ভালবাসি..
রাতে একা একা রাস্তায় হাটি.
মাঝে মাঝে হারিয়ে যাই আপন খেয়ালে ।
পড়তে ভালবাসি, লিখতেও চেস্টা করি কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখাটা
অসমাপ্ত ই থেকে যায় ।
একটু ফুরসত পেলেই নিজের সাথে নিজে
কথা বলি →

আপাতত এতটুকুই লিখলাম



♥happy bloging......