ইউজার লগইন

রোমেল চৌধুরী'এর ব্লগ

যাবার বেলায়

আমার দুয়ারে শব্দেরা কড়া নাড়ে,
হিমেল বাতাসে কাঁপে সন্ধ্যার ছায়া
অস্ফুটে ডাকে ইশারায় চুপিসারে,
‘আয়, চলে যাই, ফেলে রেখে সব মায়া!

কোথায়, কখন, উড়ে যেতে হবে হুট—
ঝরা পাতাদের তা কি কভু জানা থাকে?
এই পড়ে থাকা, এই দেয়া কোন ছুট,
অচেনা পথের শীতার্ত বাঁকে বাঁকে!

কনীনিকা থেকে কিছু আলো মুছে গেলে
হাতড়ে হাতড়ে গোধূলির পথ চলা,
তবু অবিনাশী কিছু প্রেম-অবহেলা
সযতনে রাখে রূপশালী আলো জ্বেলে!

সাঁঝ-বেলা শেষে ক্রমশ অন্ধকারে
মিশেছে কাদের ধুসর-বরণ পথ?
ক্লান্ত-চিত্তে, অবসাদে, বারে বারে
টেনে নেয়া সেথা জীবনের ভাঙা রথ!

আমার দুয়ারে কালো ছায়া কড়া নেড়ে
যতই বলুক, যাবার সময় হলো—
প্রিয় পৃথিবীকে আরেকটু ভালোবেসে
বলব, ‘দেখি তো! ষোড়শী নেকাব তোলো!’

কি বিষ রেখেছ ঢেলে...

কখনও কি ভালোবাসা জীবনের কানাগলি দিয়ে
ভুল করে হেঁটে যাবে পথ?
কোথাও ধুসর দূরে...
ঝাঁক বেঁধে নামে যদি
নম্র-নীল আলোর কপোত!

সমুদ্র-দর্শন

কখনো মনের কোণে স্বপ্ন কি বুনেছি আমি হতে এক তুখোড় নাবিক?
আকাশের নীল ছুঁয়ে দিতে দিতে—সফেন সমুদ্রজলে
ডুবিয়েছি ক্লান্ত পা—খুব ভোরে, কুমারী আলোতে!
অথবা ভূমধ্যসাগর-নোনাজল-উঁচু উঁচু ঢেউ,
ছুঁয়েছে কি আমায় এসে, হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছে রহস্য-অতল?
দেখেছি অবচেতনের খুব কাছ ঘেঁষে
যৌবনা জলপরী ক্রীড়ারত যেন;
লজ্জার ঈষৎ ব্রীড়া কম্পমান জলের ডগায় ছুঁড়ে দিতে দিতে!
অথবা নিমগ্ন কোন নীলকণ্ঠ—সমুদ্র মন্থনে!

জীবনের প্রতি পলে কত কিছু দেখা হল,
শেখা হল তার চেয়ে হয়তোবা কিছু কম,
রেখাগুলো ক্রমে ক্রমে ঘনীভূত হতে হতে
অবশেষে খুঁজে নিল প্রিয় কিছু অবয়ব!
আবার তা কোথায় হারালো...
তবু আমি বারবার অবশ্যম্ভাবী ফিরেছি তোমারই কাছে—
তোমার চোখের মত এত নীল ধরে রাখা সমুদ্র আমি তো দেখিনি!

আগে কি সোন্দর দিন কাটাইতাম!

প্রকৃতির পাঠশালায় পড়ে থাকি…
সবুজ প্রান্তর ছাপিয়ে বিস্তৃতি তার কতই অবাধ
সবুজ পাতাকে পড়ি, ঘাসফুল তুলে নিই হাতে,
দু'পায়ে মেখে নিই দূর্বাদলে লেগে থাকা ভোরের শিশির,
শৈশবের 'সবুজ-সাথী' দুলে উঠে স্মৃতির ঝালরে।

খুঁজে-খুঁটে দেখি বৃক্ষ-লতা-পাতা,
বয়সী বটের মতো আমিও সুস্থিত হই, শেকড় ছড়াই।
বৃক্ষের বাকলে খুঁজি প্রপিতামহীর মুখের ভাঁজ
নীড়ে ফেরা পাখিদের ঝুমঝুমি কোলাহলে ভারী হয়ে আসে
গোধুলির গোলাপী আকাশ।

অতঃপর সন্ধ্যা হলে ঝিঁ ঝিঁ ঢাকে
মন্ত্রের মতো প্রাচীন সংগীত এক, মস্তিস্কের কোষে কোষে
ধ্যানী হয়; থেকে থেকে সন্ধ্যের সুরেলা আযান ভেসে আসে
রাত্রিতে পুঁথি পাঠ গানের আসর
রহমান বয়াতির ধরণে আমাকে জানান দেয়
"আগে কি সোন্দর দিন কাটাইতাম!"

বিধি বাম!
তোমার সবুজ প্রান্তরে বিষাক্ত সীসার মতো
কে যেন ছড়ায় সন্ত্রাস, ভাঙ্গে নীড়,
ঘর-মন-গেরস্থালি তছনছ, পোড়ামাটি, বিধ্বস্ত মন্দির
কে যেন নিমেষে গুঁড়িয়ে দেয় স্বপ্নসাধ, আমাদের সম্প্রীতি অবাধ।
প্রতিমার ভাঙা হাত, দেহের বিচ্ছিন্ন অংশ চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে…
এ কোন 'রক্তাক্ত প্রান্তর' দেখি আজ?

হে প্রিয় মাতৃভূমি, জননী আমার!

নিসর্গের বুক চিরে ছুটে চলেছি

বর্ষার কি এক গূঢ় মন্ত্র আছে―ঘোর লাগা প্রকৃতির পরতে পরতে শিহরণ বুনে রাখে!