ইউজার লগইন

রাজীব হায়দার হত্যাকান্ডের রায়- ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

রাজীব হায়দার হত্যা মামলার রায় দিয়েছে আজ। রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাজীব হায়দারের বাবা জানিয়েছেন “ আমি ন্যায়বিচার পাইনি। আমি হতাশ।” সকল আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি ( ফাঁসী কিংবা যাবজ্জীবন) না হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন রাজীব হায়দার হত্যাকান্ডে অভিযুক্তদের অপরাধের ভয়াবহতা আদালত যথাযথ উপলব্ধি করেন নি, আদালত নমনীয় রায় দিয়েছে।

ত রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেছেন ‘শুনেছি, ব্লগারদের অনেকেই এমন লেখা প্রকাশ করেন, যা কেউ পড়লে তাঁদের খুন করতে উৎসাহিত হয়। এ ধরনের লেখা থেকে অবশ্যই ব্লগারদের বিরত থাকতে হবে। আবার সামান্য কারণে মানুষ খুন করার মতো ঘটনাও আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এখনকার কিছু কিছু যুবক বিপথগামী হচ্ছে, এটিও ভাবনার বিষয়।’

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে লিখেছেন
“তদন্ত ঠিকমতো হলে রাজিব যে তার বাসা থেকে তার বান্ধবী তানজিলার সাথে বেরিয়ে গেল সেই তানজিলার জবানবন্দি নিতে পারতেন আইও। আমাদের আসলে সবাইকে বিবেক নিয়ে চলতে হবে, ধৈর্য্য নিয়ে চলতে হবে।”

তবে বিচারকের রায়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো " হত্যার আলামত মিললেও তদন্ত কর্মকর্তা চাক্ষুষ কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারেনি"
“তদন্তের গতি অনেক লম্বা হয়েছে; আসামিপক্ষ থেকে কেউ সাজা কমানোর দাবি করেনি। সবাই খালাস চেয়েছেন – কিন্তু খালাস দেওয়ার মতো কাউকে পাইনি। হত্যায় অংশগ্রহণের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

গণমাধ্যমের বরাতে রায় প্রদানকালে বিচারকের পর্যবেক্ষণ কিংবা মন্তব্যগুলো যেমন
"মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিহত ব্লগার রাজীব হায়দার একজন প্রকৌশলী ছিলেন। আবার মামলার অধিকাংশ আসামি দাবি করেছেন তাঁরা প্রকৌশলী। প্রকৌশলীদের হাতেই প্রকৌশলী খুন হয়েছেন।"

পড়ে মনে হয়েছে ২০১৩ সালে রাজীব হায়দার হত্যা কিংবা এই বছর ফেব্রুয়ারী থেকে চলতে থাকা হত্যাযজ্ঞগুলো আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যে কারণে আলোড়ন তুলেছে আমাদের রাষ্ট্র এখনও বাক স্বাধীনতা, ভিন্ন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সকল মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি সম্মান এবং মর্যাদা বিষয়গুলো নিয়ে খুব বেশী সচেতন নয়। আমাদের বিচার ব্যবস্থায় রাজীব হায়দার হত্যাকান্ড একটি বাস্তবতা, সম্ভবত অকাল মৃত্যু তবে এই হত্যাকান্ডের কোনো উদ্দেশ্য আমাদের বিচার ব্যবস্থা উদঘাটন করতে পারে নি।

প্রেম-পরকীয়া- ব্যক্তিগত আক্রোশ- জিঘাংসা- সম্পদের অধিকার নিয়ে হানাহানি এমন কোনো স্পষ্ট মানসিক- অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের উপস্থিতি এখানে নেই। রাজীব হায়দারের সাথে হত্যাকারীদের কোনো অর্থনৈতিক লেনদেন ছিলো না, নারীঘটিত কোনো গোলোযোগ ছিলো না। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কিংবা অর্থনৈতিক ভাবে প্রতারিত হয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে হত্যাকারীরা রাজীব হায়দারকে হত্যা করে নি। তারা মুফতি জসিমউদ্দীনের বয়ান শুনে হত্যাকান্ড সংঘটনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

বিচারক হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী পেলে হয়তো সকল আসামীকে যথাযথ শাস্তি প্রদান করতেন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে অভিযুক্তরা রাজীব হায়দার হত্যাকান্ডে যেভাবে নিজেদের সংশ্লিষ্ঠতা প্রকাশ করেছেন, তদন্ত কর্মকর্তাদের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং সেসব জবানবন্দীর ভিত্তিতে বিচারক যথাযথ রায় প্রদান করেছেন।

আমাদের বিচার ব্যবস্থায় রাজীব হায়দার হত্যাকান্ড গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাক স্বাধীনতার পরিমাপ নির্ধারণের লিটমাস টেস্ট বিবেচিত হতে পারে না। ধর্ম কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব উপহাস, পরিহাস, যথাযথ কিংবা কুৎসিত সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন কি না এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের স্পষ্ট অবস্থান হলো ধর্ম এবং ধর্মীয় ব্যক্তি পবিত্র সত্ত্বা, কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী এই পবিত্রতাকে কলুষিত করতে পারে কিংবা ধর্মবিশ্বাসীর অনুভুতি আহত করতে পারে এমন বক্তব্য প্রকাশ করতে পারবে না। রাষ্ট্র বাক স্বাধীনতা বিষয়ে যে অবস্থান গ্রহন করেছে, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা গত এক বছরে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রনির্ধারিত সরল অবস্থানের সমান্তরালে নিজেদের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

ধর্মীয় অনুভুতি আহত হওয়ায় ক্ষুব্ধ কয়েকজন প্রকৌশলী একজন ধর্মবিজ্ঞ মানুষের বক্তব্যে অনুপ্রাণীত হয়ে অপর একজন প্রকৌশলীকে হত্যা করে নিজেদের ধর্মীয় কর্তব্য পালন করেছে- এমন কোনো অবস্থান রাষ্ট্র গ্রহন করে নি। রাষ্ট্র হত্যাকান্ডের বিচার করেছে। বিচারের রায়ে অভিযুক্ত সকল আসামীর সর্বোচ্চ শাস্তি হয় নি বলে ব্যক্তিগত হতাশা প্রকাশ করা যেতে পারে কিন্তু আদালত যদি সকল আসামীকেই সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করতো তবে কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হতো?

ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথের প্রতি অসহিষ্ণুতার যেসব নৃশংস উদাহরণ প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, যেভাবে বাক স্বাধীনতা- চিন্তার স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে সে পরিপ্রেক্ষিতে সকল মতাদর্শের সকল নাগরিকের সমান মর্যাদা সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নৃশংসতার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত সকল ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও রাষ্ট্রে ন্যয় প্রতিষ্ঠিত হবে না। কয়েকজনের ফাঁসীর দাবীতে নয় বরং সকল মানুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবীতে আন্দোলন গড়ে উঠলে, ধর্ম অবিশ্বাসী মানুষের প্রতি নৃশংসতার চর্চার আকাংক্ষা কিংবা ভিন্ন মতাদর্শের প্রতি জিঘাংসা সমাজের ভাবনা কাঠামো থেকে মুছে দেওয়া সম্ভব হলে আমরা এমন একটা রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারবো যেখানে রাজীব হায়দাররা অকাল মৃত্যুর মুখোমুখি হবে না।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রন's picture


কয়েকটা শব্দে শেষ করবো, বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বিচার টা যে হয়েছে তার জন্য কিছুটা শান্তনা খুঁজে পাই তবে প্রত্যাশিত বিচারটি পাওয়া হলো না এই রায়ে Sad

ক্ষমা করবেন রাজীব ভাই!

অতিথি's picture


বাক স্বাধীনতা মানে এই নয় যে কোন জাতি বা গোষ্টিকে হেয় করে কথা বলা। বাকস্বাধীনতা মানে এই নয় যে অশ্লীল ভাষায় কথা বলা।ওই জঘন্য থাবা বাবা মরে গিয়ে বেচে গিয়েছে। তা না হলে হয়তবা ওর পরিস্থিতি মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর হত। কোন সুস্থ মানুষ কখনো নাস্তিক হতে পারে না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.