ইউজার লগইন

বিজ্ঞান

কেনো বিজ্ঞান নিয়ে এত মাতামাতি? অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো মীমাংসিত হয়ে গেলে আমাদের সামষ্টিক জীবনযাপনরীতিতে কোনো পরিবর্তন কি আদৌ আসবে? আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেকটাই অভ্যাস আর সংস্কৃতিনির্ভর, সেখানে বিজ্ঞানচেতনার খুব বেশী উপস্থিতি নেই

আমাদের নিত্যদিনের জীবনযাপনে হকিং আইন্সটাইন ডারউইন হাক্সলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা টহলপুলিশ। মহাবিশ্ব "লেট দেয়ার বি লাইট এন্ড দেয়ার ইজ লাইট" ভঙ্গিতে শুরু হয়েছে না কি শূণ্য থেকে মহাবিশ্বের স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশ হয়েছে প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী থেকে বিক্যাশের টাকা মোবাইল একাউন্টে ঢুকলো কি না এই প্রশ্নের সঠিক জবাব।

বাজারদরে আসন্ন বাজেটের অভিঘাত, পথ ভুলে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা গ্রহাণুর অভিঘাতের চেয়ে আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ । আমরা এভাবেই বাঁচি। আমাদের পরিচিত দৃশ্যমাণ জগতের ছোটোখাটো ত্রুটি বিচ্যুতি, স্থানীয় এবং জাতীয় রাজনীতি যেভাবে আমাদের বাঁচতে চাওয়ার স্পৃহাকে আক্রান্ত করে সেসব ঘটনার সাময়িক তীব্র প্রতিক্রিয়ায় প্রতিটি চলমান মুহূর্তে উচ্চকিত হয়ে বেঁচে থাকা প্রহরগুলোতে হয়তো এইসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের নজরে আসে। আমরা অহংবাদী জ্ঞানপ্রদর্শনের অবসেশনে না ভুগলে হয়তো এসব তথ্য নিয়ে আলোচনা করতাম না।

প্রযুক্তি এবং যন্ত্র ব্যবহারে পেছনের সারিতে থাকা উন্নয়নশীল একটি দেশের নাগরিক হিসেবে এটা আমাদের সামাজিক বাস্তবতা এমন না, প্রতিবছর গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে কয়েকটা বোনেল পুরস্কার পাওয়া উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সাধারণ মানুষের জন্যেও বিষয়গুলো সমান রকম সত্য।

দৈনন্দিনের জীবনযাপন সংস্কৃতিতে বিজ্ঞানচর্চার খুব বেশী গুরুত্ব না থাকলেওা প্রতিবছর বিশ্বের প্রতিটি দেশের শিক্ষার্থীদের একাংশ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আগ্রহী হয়। অধিকাংশই মূলত বাজারমুখী প্রযুক্তি নির্মাণের কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে যায় কারণ সেখানেই রিসার্চ ফান্ডিং বেশী। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করলে সেসব প্রযুক্তিগত খাতেই চাকরীর সুযোগ বেশী। দিন শেষে মানুষকে পেটের ভাবনাই ভাবতে হয়।

এর বাইরেও সকল অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সম্ভাবনাকে মোটা দাগে অস্বীকার করে অনেকেই একেবারে মৌলিক প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজছে। কি তাদের অনুপ্রাণীত করে আমি জানি না। তাদের এবং আমার ভেতরে অন্তত ২০ বছরের ব্যবধান, তারা এখনও বিংশ শতকের সাতের দশকে তৈরী হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে, আমি যেসব ধারণা প্রতিদিন ব্যবহার করি সেসবের অধিকাংশই বিকশিত হয়েছে বিংশ দশকের পাঁচের দশকে।

আমি বিশ্বাস করি মহাবিশ্বের উৎপত্তি, জীবনের উৎপত্তি এবং ধারাবাহিক ক্রমবিবর্তন- এমন মৌলিক প্রশ্নের সর্বজনসম্মত একটি উত্তর খুঁজে পাওয়া গেলেও সেটা মোটাদাগে সভ্যতাকে খুব বেশী বদলে দিবে না। ক্ষমতাকেন্দ্রীক হানাহানিতে উদ্বাস্তু কোনোমতে সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে জীবন বাঁচাতে পরিজন নিয়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কাছে, রেশনের লাইনে দাঁড়ানো মানুষটার কাছে, রাস্তার টহলপুলিশ কিংবা ভ্রাম্যমাণ দেশপসারিনী কিংবা তাদের তাবত খদ্দেরের কাছে এইসব মৌলিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

রাষ্ট্রের কিংবা প্রতিষ্ঠানের আভিজাত্যের সূচক হয়ে না উঠলে হয়তো নোবেল পুরস্কার নিয়ে সংবাদমাধ্যমে এত আলোচনা হতো না। যারা চোখমুখ শক্ত করে একটা মেকী গাম্ভীর্য বজায় রেখে, আমরাই সব প্রশ্নের মীমাংসা করে ফেললাম ভাব নিয়ে বসে আছে, সেইসব উজবুকদের সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া নিয়ে অন্য কারো বাড়তি উৎসাহ কিংবা উচ্ছ্বাস নেই। ৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়রান মানুষের সংখ্যা হয়তো ৭০ হাজার, এবং এই বিষয়ে নিয়মিত খোজখবর রাখে এই রকম মানুষের সংখ্যা সর্বসাকুলে ৭০ লক্ষ হবে না। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানচর্চার সার্বিক পরিসর এটুকুই। এর বাইরে হয়তো আরও ৭ কোটি মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে প্রযুক্তি জগতের খন্ডাংশের খোঁজখবর রাখে। বিজ্ঞান বলতে আমরা যেসব বড় বড় ভাববাদী ধারণা মাথায় নিয়ে বসে আছি, সেটা পৃথিবীর ১ শতাংশ জনগোষ্ঠীকেও স্পর্শ্ব করে না।

এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বাংলাদেশে গণভোট হলে যে পরিমাণ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে বিপক্ষে নিজেদের মতবাদ জানাবে পৃথিবীতে বিজ্ঞান বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা মানুষের সংখ্যা তার চেয়ে কম। এরপরও বিজ্ঞান আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছর জীবনের দুর্বিপাকে ওয়াশিংটন ডিসি শহরে যেতে হয়েছিলো কয়েকবার। সে শহরের মিউজিয়ামগুলো ভ্রমনার্থীদের জন্যে উন্মুক্ত। ঢুকতে কোনো পয়সা লাগে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে যতবার ইচ্ছা যাওয়া যায়। আমি তেমন কোনো একটি মিউজিয়ামে ঢুকে দেখছিলাম শব্দ সংকলনের ইতিহাস। গবেষকেরা শব্দ এবং সুরকে ধারণ করার কৌশল নিয়ে ভেবেছেন। তাদের ধারাবাহিক গবেষণা সফল হয়েছে বলেই লংপ্লে বাজারে এসেছে। তাদের এই ধারাবাহিক প্রয়াসের কিছু ঐতিহাসিক সংকলন সেখানে ছিলো। বর্তমানের ব্লু রে প্রযুক্তি বিবেচনা করলে লং প্লে রেকর্ডিং প্রযুক্তি একেবারে প্রাগৌতিহাসিক। শব্দ এবং সংকেত ধারণা প্রক্রিয়ার গুণগত মাণ বেড়েছে কিন্তু মোটা দাগে ভাবলে প্রক্রিয়াটা এখনও একই রকম।

শব্দ কম্পন তৈরী করে। আমরা যখন কথা বলি তখন আমাদের গলায় হাত রাখলে এই কম্পনের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। এই কম্পনকে বৈদ্যুতিক তরংগে রূপান্তরিত করা, সেই কম্পন গোলাকার চাকতিতে ধারণ করা এবং ভিন্ন একটি যন্ত্রের মাধ্যমে সেই কম্পনকে পুনরায় শব্দকম্পনে রূপান্তরিত করা- এই চক্র অনুসরণ করছি আমরা। সময়ের সাথে আমাদের দক্ষতা বেড়েছে। আমরা ছবিকেও রঙ এর তীব্রতা অনুযায়ী কম্পনে পরিবর্তনের দক্ষতা অর্জন করেছি, আমরা এখন সেসব ছবিকেও বৈদ্যুতিক তরংগে পরিবর্তিত করতে পারি। এইসব ছোটোখাটো বিযুক্তি-সংযুক্তি আমলে না নিয়ে যদি গোলাকার চাকরিতে শব্দ সংকেত ধারণের প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবি সেটা খুব বেশী জটিল কিছু না।
শব্দ কম্পন তৈরী করে, একটি নির্দিষ্ট গতিতে ঘুরতে থাকা কোনো চাকতির উপরে সুক্ষ্ণ কোনো শলাকা ধরে রাখলে সে শলাকা শব্দের কম্পনের সাথে কাঁপবে এবং শব্দের একটা অমোচনীয় ছবি গোলাকার চাকতিতে রয়ে যাবে। আমরা এই চাকতিকে রোদে শুকিয়ে আগুণে পোড়ালে সেই শব্দছবি চাকতিতে অবিকৃত রয়ে যাবে দীর্ঘ সময়। উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় হয়তো সেই শব্দছবি পুনরায় শব্দে রূপান্তরিত করা সম্ভব। প্রক্রিয়াটির সাম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করছে কিছু মানুষ।

সভ্যতার সূচনালগ্নেই মাটির তৈজসপত্র নির্মাণ করতে শিখেছে মানুষ। কুমার যেভাবে থালা বাসন হাঁড়ি কলসি তৈরী করে সেই প্রক্রিয়াটা হয়তো হাজার বছরের পুরোনো। নমনীয় কাদার তাল ঘূর্ণায়মান কাঠামোতে রেখে আঙ্গুল, কাঠ কিংবা সুতো ব্যবহার করে কেটে, ছাঁচ বদলে তৈজসপত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াতে হয়তো শব্দসংকেত তৈজসপত্রের গায়ে আঁকা রয়ে গেছে। উপযুক্ত যন্ত্র পেলে, ঘূর্ণায়মান কাঠামোর গতি জানা থাকলে সে সময়ের শব্দগুলো অবিকৃত উদ্ধার করা সম্ভব- যাদুবাস্তবতার মতো রোমাঞ্চকর এই বাস্তবতা। হাজার বছরের পুরোনো পরত্যাক্ত জনবসতিতে খুঁজে পাওয়া থালা বাটি কলসিকে একবার সেই যন্ত্রে ঢুকালেই হাজার বছরের পুরোনো মানুষেরা সবাক হয়ে উঠবে। আমরা সেসব শব্দ শুনেই যে তাদের জীবনযাপনের সবকিছু জেনে যাবো এমন না। সময়ের সাথে ভাষা বদলেছে, শব্দ উচ্চারণের ধরণ এমন কি শব্দের ব্যবহারিক অর্থ বদলে গেছে। তবে যদি কোনোভাবে এই প্রাযুক্তিক প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়িত হয়, আমাদের সামনে হাজার বছরের পুরোনো সময় বাঙ্ময় হয়ে উঠবে। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের স্বর শুনতে পাবো। তারা কিভাবে ভাষা ব্যবহার করতো, তাদের উচ্চারণগত সীমাবদ্ধতা কিংবা তাদের ঝোঁকগুলো জানতে পারবো।

নরসিংদীতে ২ হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে খুঁজে পাওয়া অর্ধেক ভাঙা কলসীটা যন্ত্রে রাখতেই কুমারের তীক্ষ্ণ স্বর শোনা যাচ্ছে। কুমার তার সহকর্মীর সাথে কথা বলছে কিংবা নিজের দুর্ভাগ্যের আক্ষেপ জানাচ্ছে কিংবা তার স্ত্রী সন্তানের সাথে কথা বলছে, কলসীর গায়ে কুমারের পারিবারিক জীবনের গল্প লেখা আছে, আমরা অবিকল সেসব গল্প শুনছি- সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাই রোমাঞ্চকর। কেউ যদি বাজেট, বাজারদর টহলপুলিশের ঝঞ্ঝাট ভুলে কিছু সময়ের জন্যেও ভাবে প্রযুক্তি আমাদের সামনে কি সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে হয়তো সেও বিজ্ঞান বিষয়ে তার অবস্থান বদলাবে। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি অতীতের সাথে ভবিষ্যতের সংযোগসেতু। আমাদের কল্পনা এবং সে কল্পনার পরিকল্পিত বাস্তবায়ন আমাদের ক্রমাগত আরও বেশী পরস্পরসংলগ্ন করছে। আমরা এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে রাতের অন্ধকারে আমাদের হাত ছানি দিয়ে ডাকছে ১৪ শত কোটি বছরের মহাবিশ্ব। আমাদের কয়েক হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার ইতিহাস লেখা আছে মাটির আখরে, আমরা সে স্বর শোনা অপেক্ষায় আছি। আমরা আমাদের সময়ের ইতিহাস ধরে রাখছি, মহাবিশ্বের অন্যত্র প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা যাচাই করছি, মহাশূণ্যে আমাদের অস্তিত্বের স্মারক ছড়িয়ে দিচ্ছি- বিজ্ঞান এমন সম্ভাবনাকে প্রতিনিয়ত বাস্তবায়িত করছে। বিজ্ঞান আমাদের অস্তিত্বের ছাপ এঁকে দিচ্ছে সময়ের গায়ে- এটুকুর জন্যে হলেও বিজ্ঞান নিয়ে মাতামাতি করা যায়।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.