ইউজার লগইন

মুহাম্মদ জাফরি ইকবালের অভব্য নিবন্ধের প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য

কোনো লেখকের উপন্যাসের চরিত্ররা উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে যে ধরণের উপলব্ধি প্রকাশ করে কিংবা যেসব বক্তব্য দেয়- লেখকের বক্তব্য হিসেবে সেসব উপস্থাপন করাটা লেখকের প্রতি এক ধরণের অন্যায় আচরণ। লেখক যখন কোনো উপন্যাসের চরিত্রচিত্রন করেন, উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে সেসব চরিত্র নিজের মতো জ্যান্ত, তারা লেখকের কল্পনায় বসবাস করলেও আদতে তারা এক ধরনের স্বাধীন স্বত্ত্বা, তাদের নিজস্ব অভিমত আছে, লেখক সেসব স্বাধীন সত্ত্বার উপলব্ধিগুলো লেখার সময় নিজের অভিমত সব সময় চরিত্রের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না।
কিন্তু লেখক ব্যক্তিগত নিবন্ধে কিংবা সাক্ষাৎকারে যেসব অভিমত ব্যক্ত করেন, সেসব বক্তব্যের দায়ভার সম্পূর্ণই লেখকের। সেটা লেখকের সুচিন্তিত স্বাধীন অভিমত এবং লেখককে সেসব বক্তব্যের দায়ভার বহন করতে হয়।

মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক, তিনি শিশু কিশোর সবার জন্যেই লিখছেন। তিনি প্রতিমাসে দেশের অনেকগুলো গণমাধ্যমের জন্যে ২টি নিবন্ধ লিখেন, সেই নিবন্ধগুলো প্রায় সবকয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বিজ্ঞান গবেষক হলেও সংবাদপত্র নিবন্ধগুলোতে তিনি গবেষকসূলভ নির্মোহ নির্লিপ্ততা বজায় রাখেন না, এইসব সংবাদপত্র নিবন্ধ তার আবেগ, আক্ষেপ, অভিমান, আনন্দ, ক্ষোভ ধারণ করে। এখানে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল নিছক একজন ব্যক্তি, যারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আবেগগুলো বাজারমূল্যে বিক্রী হয়। গত ২৮শে জানুয়ারী তিনি শহীদ সংখ্যা এবং আমাদের অর্ধশত বুদ্ধিজীবী শিরোণামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন।

মুহাম্মদ জাফর ইকবালের দৃঢ় বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা ৩০ লক্ষের বেশী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬৮ হাজার গ্রাম ছিলো, প্রতিটি গ্রামে যদি ৫০ জন মানুষও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরতায় নিহত হয়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পরপর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাংলাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে কতজন মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। ১৯৭২-৭৩ সালে কাজটা সহজসাধ্য ছিলো, সরকার রাজনৈতিক কর্মী এবং পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতায় এমন ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পূর্ণ তালিকা তৈরীর উদ্যোগও গ্রহন করেছিলেন, কিন্তু সে উদ্যোগের চুড়ান্ত ফলাফল আমাদের জানা নেই।
প্রবাসী সরকার ১৯৭১ সালের জুন-জুলাই মাসে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে প্রতিটি আহত-নিহত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে এককালীন ১০০০ টাকা আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। সে সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা প্রধানমন্ত্রী বরাবর তাদের বাহিনীর আহত নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পাঠিয়ে তাদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। বিজয়দিবস পরবর্তী সময়ে যখন প্রবাসী সরকার সকল দাপ্তরিক নথিপত্র সহ বাংলাদেশে ফিরে আসেন, এসব নথিগুলো ঠিক মতো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। নথিগুলোর একাংশ ছিলো বাংলা একাডেমীর সংগ্রহে, একাংশ ছিলো চলচিত্র ও বেতার আর্কাইভে, জাতীয় যাদুঘরের তত্ত্বাবধানে ছিলো কিছু নথিপত্র এবং পরবর্তী সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর অনেকগুলোই হারিয়ে যায় কিংবা ধ্বংস হয়ে যায়।

অসমাপ্ত শহীদ সংখ্যা শুমারী কি কারণে পরিত্যাক্ত হলো কিংবা কি বিবেচনায় স্থগিত হলো তা স্পষ্ট জানা না থাকায় অনেক ধরণের বিভ্রান্তি তৈরী হয়েছে, শহীদ সংখ্যা বিষয়ক বিভ্রান্তি সেসবের অন্যতম। ১৯৭২ সালের প্রথম থেকেই দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা এবং অন্যান্য দৈনিক পত্রিকায় স্থানীয় পর্যায়ে নিহতের আনুমানিক সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কল্যান চৌধুরী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ( ৩১শে মার্চ ১৯৭২ পর্যন্ত) এবং স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ থেকে মুক্তিযুদ্ধে নিহত মানুষের অসম্পূর্ণ একটি তালিকা করেন, সে তালিকা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে ১২ লক্ষ ৪৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। (কল্যান চৌধুরী, জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ, পৃষ্টা ১৯৯ থেকে ২০২)

সংশোধিত আন্তর্জাতিক আইনের(২০০৯) ভিত্তিতে গঠিত আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিউ এজ পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখে এবং ব্যক্তিগত ব্লগে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সর্বমোট সংখ্যা বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে অভিযুক্ত এবং বাংলাদেশ থেকে বহিস্কৃত হওয়ার আগে পর্যন্ত ডেভিড বার্গম্যান নিয়মিত এই ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নিজের ব্লগ বাংলাদেশ ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এ নিয়মিত লিখেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারিক প্রক্রিয়ার দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপনের সময় আদালতে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে ১১ই নভেম্বর ২০১১ তিনি মন্তব্য করেছেন আদালত কোনো রকম তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন না করেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নিহত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন ৩০ লক্ষ। ৩০ লক্ষ সংখ্যাটি নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের ভিন্ন মত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষকদের অভিমত লিপিবদ্ধ করেছেন এবং বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করা হলে আদালত ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং আদালত অবমাননার অভিযোগে ডেভিড বার্গম্যানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ১ সপ্তাহ কারাবাসের আদেশ দেন।

ডেভিড বার্গম্যান নিজের অবস্থানের সপক্ষে বিস্তারিত যুক্তি উত্থাপন করেছিলেন আদালতে তবে আদালত রাত রায়ে উল্লেখ করেছেন “freedom of expression can be exercised in good faith and public interest. David Bergman neither has good faith nor an issue of public interest.”

বাক স্বাধীনতায় অনধিকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লরেন্স লিফসুলৎজের মন্তব্য প্রতিবেদনের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। ৫২ জন বুদ্ধিজীবী ডেভিড বার্গম্যানের রায়ের তার তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি প্রদান করেন। বিবৃতিদাতাদের তালিকায় রয়েছেন মহিউদ্দিন আহমেদ, যিনি মুনতাসির মামুনের সাথে পাকিস্তানী জেনারেলদের মন শিরোণামের সাক্ষাৎকার গ্রন্থের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে জড়িত ছিলেন। রয়েছেন আফসান চৌধুরী, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র গ্রন্থনার সাথে জড়িত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন। রয়েছেন বীনা ডি কস্তা, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নারী অধিকার নিয়ে গবেষণা করছেন।বিবৃতিদাতা শাহীন আখতার এ বছর সাহিত্যে অবদানের জন্যে ২১শে পদক পেয়েছেন। রয়েছেন জাফরউল্লাহ চৌধুরী, ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে নির্মিত হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাথে প্রথম থেকেই জড়িত ছিলেন। ইমতিয়াজ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত এখন। তবে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের অর্ধশতাধিক বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা অবশ্য তাদের বিবৃতিতে সরাসরি নিহতের সংখ্যা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সর্বমোট সংখ্যা এখনও অনির্দিষ্ট এবং তারা বলেছেন আদালতের এই ধরণের রায় মুক্তিযুদ্ধে নিহত মানুষ বিষয়ক গবেষণাকে নিরুৎসাহিত করবে। যে অর্ধশতাধিক বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ক্ষোভ, সেসব বিবৃতিদাতারা নিজস্ব পরিচয়ে বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদপত্রে তাদের প্রতিক্রিয়া লিখতে পারেন, তবে অধিকাংশই মুহাম্মদ জাফর ইকবালের এই শিশুতোষ প্রতিক্রিয়ার পালটা কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত আছেন।
মুহাম্মদ জাফর ইকবালের এই প্রতিক্রিয়ায় তিনি যখন লিখেন " যে দেশের বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করেন, সেই দেশে খালেদা জিয়ার মতো একজন সেটাকে আরও এক কাঠি এগিয়ে নিয়ে গেলে আমাদের অবাক হবার কিছু নেই। পাকিস্তানের জন্য তাঁর মমতা আছে। একাত্তরে তিনি পাকিস্তানিদের সঙ্গে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন।"

খালেদা জিয়া পাকিস্তানীদের সঙ্গে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন বাক্যটার ভেতরে এক ধরণের কুৎসিত ইঙ্গিত আছে, মুহাম্মদ জাফর ইকবালের শিশুতোষ ক্ষোভের তুলনায় তার এই ইতর অশালীন অভব্য বক্তব্য অনেক বেশী অসস্তিকর। খালেদা জিয়া প্রসঙ্গে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের এই অবস্থান আওয়ামী লীগের অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থক কিছু ইতরদের অবস্থানের মতো। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের অশালীন বক্তব্য পড়ে মনে হতে পারে ১৯৭১ সালে খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রের ৮ম খন্ডে ১৯৭২ সালের একটি সংবাদপত্র প্রতিবেদন গ্রন্থিত হয়েছে, সেখানে খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কিভাবে গ্রেফতার করে তার বর্ণনা আছে।

শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারকে গৃহান্তরীন করে রেখেছিলো। গৃহান্তরীন অবস্থা থেকে দেয়াল টপকে পালিয়ে গিয়ে শেখ কামাল এবং শেখ জামাল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। শেখ কামাল মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর কোলকাতায় আতাউল গনি ওসমানীর সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, শেখ জামাল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলেও সরাসরি যুদ্ধ করেন নি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অধীনে গৃহবন্দী থাকাকালীন অবস্থায় শেখ হাসিনার পূত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম হয়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ১৬ই ডেসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করার পর তারা গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীত অধীনে গৃহবন্দী থাকা এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অধীনে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী অবস্থায় থাকার ভেতরে আসলে কি ধরণের তফাত আছে সেটা আমার জানা নেই।

মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এখনও তার এই অশোভন মন্তব্যের জন্যে দুঃখপ্রকাশ করেন নি। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের এমন অভব্য বক্তব্যের স্পষ্ট প্রতিবাদ এখনও সংবাদপত্রে আসে নি।

যাই হোক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের নিবন্ধের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন মুক্তশ্রী চাকমা সাথী। তিনি ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন কুমিল্লায় দারোগা হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তার নানা শহীদ হলেও রাষ্ট্রের শহীদ তালিকায় এখনও তার নাম লিপিবদ্ধ হয় নি। তার মা দীর্ঘদিন যাবত রাষ্ট্রের শহীদ তালিকায় তার নানার নাম উঠানোর চেষ্টা করছেন, তবে অফ দ্যা রেকর্ড মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন " হিন্দুরা শহীদ হয় না।" ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম অবিশ্বাসী এবং অমুসলিম অধ্যাপকেরা অবশ্য এই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে শহীদ হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। যদি কখনও সেই কর্মকর্তা শহীদ তালিকা সংশোধনের সুযোগ পান তবে নূতুন চন্দ্র সিংহ, রনবি প্রসাদ সাহা কিংবা অন্যান্য বিশিষ্ট হিন্দু নাগরিক, যাদের এখনও শহীদ হিসেবে অভিহিত করা হয়, তাদের শহীদ বলার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেন ধর্মীয় আদালতে।

মুক্তশ্রী চাকমা সাথীর ফেসবুকে জানানো প্রতিক্রিয়ার প্রত্যুত্তরে আরিফ জেবতিক লিখেছেন
'স্বামীর কলিগ কাম বন্ধুর পক্ষে বিবৃতি দেয়ায় কোনো দোষ দেখি না। ব্যক্তি সম্পর্কের বাইরে দাঁড়িয়েও পক্ষে বা বিপক্ষে যে কেউ বিবৃতি দেয়ার অধিকার রাখেন।
তবে ঠেকায় বেঠেকায় পড়লে নানা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এটা যেমন বলা উচিত তেমনি একথা বলতেও ভুললে চলবে না যে বাপের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিল, বাপ আগ্রহ ভরেই সেই ক্যাম্পের দেখভাল করতেনন, ভয় পেয়ে নয়।
মানুষ অবশ্যই তাঁর পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের জন্য দায়ী নয়, কিন্তু নানার পরিচয়ের দোহাই দিলে, বাপের পাপও স্বীকার করা কর্তব্য।

আরিফ জেবতিকের এই প্রতিক্রিয়া মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের অবদান বিষয়ে আমাদের সমতলের মানুষদের যে ধরণের অজ্ঞতাপ্রসুত ধারণা রয়েছে তার পরিচায়ক বললেও ভুল হবে, সেটা এক ধরণের বর্ণবাদী সাম্প্রদায়িক মন্তব্য। মুক্তশ্রী চাকমা সাথীর বাবা বিজয় কেতন চাকমা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন এবং সে বছর আওয়ামী লীগ দীপংকর তালুকদারকে তাদের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। বিজয় কেতন চাকমা সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন সে বছর। তিনি রাঙামাটিতে হস্তশিল্প ও কারুপণ্য প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার বাবা মোহন বাঁশী চাকমা হাতীর দাঁতের কারুশিল্প করতেন।বিজয় কেতন চাকমা তার কাছেই হাতীর দাঁতের কাজ শিখেন। ১৯৭১ সালে মোহনবাঁশী চাকমার বাসগৃহে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিলো এবং বিজয় কেতন চাকমা সে ক্যাম্পের দেখভাল করতেন- অভিযোগটুকু অনেক বেশী আপত্তিকর। মুক্তশ্রী চাকমা অবশ্য এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন
" বাপ বলতে উনি কাকে বুঝাইতেসেন আমি এখনো বুঝিনাই। এইখানে দুইটা সম্ভাবনা আছে। ক) আমার নিজের বাপ, খ) চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ( যুদ্ধাপরাধী )। যদি আমার নিজের বাপ কে বোঝানো হয়ে থাকে তাহলে এ প্রয়াস অসুস্থতার লক্ষণ । আমার বাপ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত একজন এবং এ সংক্রান্ত প্রমান আমাদের কাছে রয়েছে। আমি ঐ কাগজ আপনাদের কাছে পাঠাতে পারি যদি আপনারা চান। বাবা ৯৬ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন বলেই যদি উনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ দল বলে আপনি মনে করেন, তাহলে ভাই, পাহাড়ের শোষণের ইতিহাস এবং তার ফল স্বরুপ পাহাড়ের রাজনীতি কেমন, আপনি এখনো তা বুঝেন না। যদি ত্রিদিব রয় কে বোঝান হয়ে থাকে আমার বাপ হিসেবে রেফার করে, তাহলে ভাই অট্টহাসি দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছু বলার নাই।"

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করার আগেই অনেক চাকমা যুবক মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে যায়। তাদের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গেলেও তাদের ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৭১ এর জুন মাসে উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির ঘুরে এসে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী কামরুজ্জামান তার প্রতিবেদনে লিখেছিলেন আওয়ামী লীগের এমএলএরা মুক্তিযুদ্ধ করতে ইচ্ছুক সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ দিতে নারাজ। তারা নিজস্ব বিবেচনায় এই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছেন। সমতলের সাঁওতাল, গারো পাহারের হাজং কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসীরা এত প্রতিকূলতার ভেতরেও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহন করেছেন। তাদের নারীরাও সমতলের বাঙালী মুসলমান কিংবা হিন্দুদের মতো নির্যাতিত নিপীড়িত হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের আঁচ তাদের গায়েও সমান ভাবে লেগেছে। শুধুমাত্র একজন চাকমা রাজার পাকিস্তানী সরকারের আনুগত্য মেনে নেওয়ার বিষয়কে সামনে এনে সকল আদিবাসীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীপনার অভিযোগ আনা এক ধরণের স্পষ্ট বর্ণবাদী আচরণ।

রাজনৈতিক আক্রোশ, রাজনৈতিক মতাদর্শিক অন্ধত্ব কিংবা নিছক আত্মগরিমা প্রচারের স্বার্থে বাংলাদেশের অনেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঐতিহাসিক ভাষ্য লিখেছেন। কুৎসাজীবী মানুষেরা নিজেদের ভেতরে যেসব কুৎসিত ঠাট্টা মশকরা করেন, সেসব ঠাট্টা মশকরা কুৎসাকে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন " একাত্তরের বড় বড় মানুষের মুখের কথা"র ভিত্তিতে ইতিহাস রচনাকারী তথাকথিত নতুন দিনের ঐতিহাসিকেরা। সংবাদপত্র প্রতিবেদন এবং আক্রান্ত মানুষের ভাষ্য ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। তথ্যনির্ভর ইতিহাস লেখার প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরণের উপকরণগুলো তথ্যের প্রাথমিক ভান্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সময়পরিক্রমায় এই ধরণের তথ্যগুলো আরও পরিশীলিত হয়, অসংখ্য মানুষের বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাষ্যে এক ধরণের সামগ্রীক চিত্র স্পষ্ট হয়। সাধারণ মানুষের ভাষ্য থেকে নৈর্ব্যাক্তিক নির্লিপ্ত ইতিহাস রচনার প্রক্রিয়ায় অনেকের ব্যক্তিগত উপলব্ধি, আক্রোশ কিংবা ক্ষোভকে সচেতনভাবেই উপেক্ষা কিংবা অবজ্ঞা করা হয়। বাংলাদেশের নতুন দিনের ইতিহাসবিদেরা, যারা পাতার পর পাতা এই ধরণের স্মৃতিকথা কিংবা চর্বিতচর্বন পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত, তারা হয়তো " এক্সক্লুসিভিটি" প্রমানের জন্যে কিংবা " রাজনৈতিক আদর্শিক দাসত্ব জনিত" কারণে অহেতুক কুৎসাগুলোকে অনেক বেশী ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করতে আগ্রহী। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের মতো শিক্ষিত ব্যক্তিরাও এই ধরনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি, ব্যক্তিগত আগ্রহে কিংবা নিছক ক্রুদ্ধ হয়ে যারা ইতিহাস চর্চায় ঝাঁপিয়ে পরছে তারাও একই ধরনের সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত। সংকীর্ণ মানসিকতা কিংবা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে বর্তমানের অপেশাদার ইতিহাস চর্চা মুক্তিযুদ্ধের গৌরব অনুধাবনে খুব বেশী সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না । তাজউদ্দিন আহমেদ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম ভাষণে কিংবা পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে সাংবাদিকদের দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে যেসব কথা বলেছিলেন সে বক্তব্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সারাংশ। আমরা সময়ের সাথে প্রবাসী সরকারের উদ্দীপনা, আদর্শবিচ্যুত হয়েছি। বর্তমানের বিরূপ সময়ের বাস্তবতা হলো প্রবাসী সরকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বর্তমানের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটা রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবহেলিত একটি দায়িত্ব পালন। মুক্তিযুদ্ধে আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের জন্যে এই বিচার প্রক্রিয়া এক ধরণের প্রতিকী বিচার প্রক্রিয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত সকল মানুষের অপরাধ নির্ধারণ এবং তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এখন আর সম্ভব না। অপরাধীদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। অপরাধের মূল হোতা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে এবং উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে পাকিস্তানী সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিচার সমাপ্ত হলে স্বাধীনতা যুদ্ধের বর্বরতার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে এই উদ্যোগ গ্রহনের অনুরোধ করা ব্যতীত সাধারণ মানুষের অন্য কিছু করণীয় নেই।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.