ইউজার লগইন

অমরত্বের সন্ধানে

বব মার্লে মাত্র ৩৬ বছরে বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার পায়ের আঙ্গুলে প্রায় নিরাময়যোগ্য স্কীন ক্যান্সারের অস্তিত্ব ধরা পরার পর ডাক্তাররা তাকে পায়ের আঙ্গুল কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলো। বব মার্লে বিশ্বাস করতেন শাররীক বিকৃতি কিংবা অঙ্গচ্ছেদ অনন্ত পরকালে তার পুনর্জন্মকে বাধাগ্রস্ত করবে। সমস্ত শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পরায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সভ্যতার ইতিহাসে বব মার্লেই এমন অদ্ভুত ধারণায় বিশ্বাস করতেন এমনটা ভাবা ভুল। মিশরীয় সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় অন্তত মিশরের ফারাওরা পূনর্জন্মে বিশ্বাস করতেন এবং শাররীক কাঠামোকে প্রায় অক্ষত রাখার প্রক্রিয়াও তারা উদ্ভাবন করেছিলেন। শব সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছিলো মায়া সভ্যতার মানুষেরাও।

প্রাণের উদ্ভব এবং প্রাণের বিনাশ মানুষকে কৌতুহলী করেছে। তারা প্রতিনিয়ত জীবনের লক্ষ্য অনুসন্ধান করেছে। প্রাণের স্পন্দন এবং মৃত্যুর নৈঃশব্দ তাদের আলোড়িত করেছে। তারা সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। অস্তি এবং নাস্তির এই দ্বন্দ্ব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই ছিলো। যাদৃচ্ছিক অনুমানের পসরা সাজিয়ে তারা নিজেদের ভেতরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন, খুন করেছেন, খুন হয়েছেন, জীবন এবং মৃত্যুর রহস্য তাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।

পুরোহিততন্ত্র ফারাওদের শাসনামলে ভীষণ ক্ষমতাধর ছিলো। সম্রাটদের মৃত্যুপরবর্তী জীবনে প্রবেশ এবং পুনরুত্থানের বিদ্যাধারী আচারনিষ্ট পুরোহিত তন্ত্র ধনে-সম্মানে ফারাওদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। নেফ্রিতিতিপূর্ববর্তী ফারাও এবং পুরোহিতেরা ছিলেন অন্ধকারের পূজারী। মিশরের রানী হওয়ার পর নেফ্রিতিতি প্রথম সূর্যদেবের উপাসনা শুরু করেন। রাজার ফরমানে রাতারাতি প্রধানতম উপাস্য পরিবর্তন কিংবা বিদ্রোহ মিশরের সমাজকেও দুইভাবে বিভক্ত করে ফেলে। নেফ্রিতিতি এবং আখেনাতেন সূর্যদেবের উপাসনার জন্যে ভিন্ন একটি নগর গড়ে তুলেন। তবে আখেনাতেনের মৃত্যুর পর নেফ্রিতিতিকে পুনরায় পুরোহিত তন্ত্রের সাথে সমঝোতা করতে হয়। নিজের ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার করে নেফ্রিতিতি রাতের দেবীর আরাধনা শুরু করেন এবং ক্ষিপ্ত পুরোহিত তন্ত্র সূর্যদেবের উপাসনাকল্পে নির্মিত সম্পূর্ণ নগর ধ্বংস করে ফেলে।

কেউ কেউ অনুমান করছেন নেফ্রিতিতি আখেনাতেনের মৃত্যুর পর ফারাও হিসেবে রাজ্য শাসন করেছেন এবং মৃত্যুর পর তাকেও ফারাওদের মতো সম্মান দিয়ে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে কোনো এক সময়ে ক্রুদ্ধ পুরোহিততন্ত্রের সমর্থকেরা তার মৃতদেহ বিকৃত করে ফেলে। সে সময়ের বিশ্বাস ছিলো মৃত দেশের শাররীক বিকৃতি ঘটলে সে মানুষ পুনর্জীবিত হতে পারবে না।

আয়ুর সীমানা ছাড়িয়ে জীব তার অস্তিত্ব ছড়িয়ে দিতে চায়। তারা সঙ্গমলিপ্ত হয়, সন্তান উৎপাদন করে, সবচেয়ে সুষম দেহের অধিকারী পছন্দসই সঙ্গী অর্জন করতে প্রতিযোগিতা করে, প্রতিদ্বন্দ্বীর সন্তানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। মানুষেরাও এমন ক্রুর, নিষ্ঠুর অতীত অতিক্রম করেছে। নগরপত্তন, সমাজ ও ধর্ম নির্মানের পথে অনেক ধরণের নিয়মনীতি চাপিয়ে দিয়েছে এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসে অন্য মানুষের সন্তানকেও সমান মানবিক মর্যাদা দিতে শিখেছে।আমাদের সভ্যতা সম্ভবত নিজের ডিএনএ সময়ের বিস্তৃত ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ অস্বীকার করে প্রতদ্বন্দ্বীর ডিএনএ সুরক্ষা এবং প্রতিপালনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া।

মানুষ প্রতিনিয়ত অমরত্ব খুঁজেছে। প্রাচীন উদ্ভিদ আর শিলাচূর্ণের নানবিধ মিশ্রনে প্রাণবর্ধক রসায়ন অনুসন্ধান করেছে। অবশেষে স্বীকার করেছে পার্থিব জীবন আয়ুর সীমানাবদ্ধ, অসীম অনন্ত জীবন স্রষ্ট্রার অলৌকিক মাহত্ব্যের প্রকাশ। স্রষ্ট্রার অনুগ্রহ পেলে তারাও অনন্ত মহাজীবন পাবে- সুতরাং স্রষ্ট্রাকে নানাবিধ উপঢৌকন আর উপাচারে তুষ্ট করতে হবে। উপঢৌকন এবং উপাচারের নিয়মতান্ত্রিকতা এক ধরণের অর্থনৈতিক চক্র তৈরী করেছে, রীতিনীতি পালনের দক্ষতা অর্জন করে একদল মানুষ পুরোহিত হয়েছে।সে সমাজের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করেছে জীবন এবং মৃত্যুর সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা এই মানুষগুলোর আছে। স্রষ্ট্রাকে প্রদত্ত উপঢৌকনের একটা বড় অংশ তারা এদের পারিশ্রমিক প্রদানে ব্যয় করেছে।

সকল সভ্যতায় ভিন্ন ভিন্ন কেতায় পুরোহিত তন্ত্রের অস্তিত্ব থাকলেও সময়ের সাথে তাদের সর্বজনগ্রাহ্যতা কমেছে। খ্যাতনামা শিল্পী ভাস্করদের দিয়ে মানুষ নিজের প্রতিকৃতি তৈরী করেছে,। স্বকীর্তি বর্ণনায় চারণকবি নিয়োগ করেছে, গায়কেরা সুরে সুরে তাদের জীবনগাঁথা শুনিয়েছেন । এসব গল্পগাঁথার কোনোটা জনপ্রিয় লোককাহিনীর উপাদান হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে গিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষের অসংখ্য জীবনকাহিনী জুড়ে একটা অখন্ড পৌরাণিক সাহিত্যশাখা তৈরী হয়েছে। এইসব পুরাণ গাঁথায় নাম পরিচয় হারালেও তাদের জীবনের খন্ডাংশ এখনও লিপিবদ্ধ আছে।

আমরা অনেক বেশী বস্তুবাদী হয়ে উঠলেও অমরত্ব প্রশ্নে এখনও আমরা আদতে সেই প্রাচীণ মানুষ। সভ্য হয়ে ওঠার পথপরিক্রমায় আমরা হয়তো আমাদের ক্রুরতা দমন করতে শিখেছি কিন্তু জীবনকাল ছাপিয়ে যাওয়ার লোভ-লালসা ত্যাগ করতে পারি নি। প্রাচীণ কালে অখন্ড যৌবন ধরে রাখতে যারা রক্ত আর দুধে গোসল করতো, তাদের অনেকে এখন কসমেটিক সার্জারি করছে। মানুষ আধুনিক সময়ে নিজের জীবনযাপনের বিজ্ঞাপনে ব্যতিব্যস্ত। তারা অনবরত ছবি তুলছে, অনবরত নিজের জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাগুলো রঙ চড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, অন্য কেউ লিপিবদ্ধ করতে আগ্রহী না হলে নিজেই আত্মজীবনি লিখে ছাপাচ্ছে প্রতিদিন।

আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স গবেষণার একটা অংশ মানুষের ভাবনা সংশ্লেষণ। গবেষকরা ভাবছেন অদুর ভবিষ্যতে তারা এমন প্রযুক্তি এবং এমন গাণিতিক যুক্তি উদ্ভাবন করতে পারবেন যা প্রতিটা মানুষের মানসিক গড়ন এবং স্মৃতির ডিজিটাল প্রতিলিপি তৈরী করতে পারবে। সময়ের সাথে ব্যক্তি জীর্ণ হবে, ব্যক্তির মৃত্যু হবে, কিন্তু তার এই ডিজিটাল প্রতিলিপি অনন্তকাল কোনো দুরবর্তী ডিজিটাল ডাটাবেজে শূণ্য আর একের নানাবিধ সজ্জ্বায় টিকে থাকবে অনন্তকাল। এভাবেই মানুষ নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখবে।
অন্য একদল গবেষক এমন ডিজিটাল অস্তিত্ব সংরক্ষণের ধারণাকে খুব বেশী প্রয়োজনীয় ভাবছেন না। তারা মৃতদেহ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবছেন। আমরা পুনরায় ফারাওদের যুগে প্রবেশ করছি সম্ভবত। ধনী ব্যক্তিরা নিজের প্রায় মৃত শরীর সংরক্ষণ করছেন, তাদের ধারণা পরবর্তীতে যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান আরও উন্নত হবে তখন তারা জরাকে জয় করে যযাতি হবেন।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শারমিন's picture


কেউ কেউ এমনিই সবার মনে যুগ যুগ অমর থাকবে, কেউ কেউ তাকে মনে রাখতে বাধ্য করবে। যেমন বেগম সুফিয়া কামালকে শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখছি আর হিটলারকে বাধ্য হয়ে। এটাকে জীবন ধারাই হয়ত বলে। আমি আমার ধর্ম মেনে চলি বলে চিন্তা করছি না। যেভাবে এসেছিলাম সেভাবেই যাব।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.