ইউজার লগইন

সংখ্যালঘুত্ব

মানুষ শুধু মানুষ পরিচয়ে অপূর্ণাঙ্গ বোধ করে তাই নিজেদের আলাদা আলাদা বর্গে ভাগ করে। রাষ্ট্র মানুষের পরিচিত কাঠামো মেনেই আদম শুমারি করে নাগরিকের গায়ে গোত্র, ধর্মের লেবাস জড়ায়। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শরীর থেকে জাতি,গোত্র, ধর্মের লেবাস মুছে ফেললে হয়তো বিভিন্ন ধরণের সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নকে নাগরিক অধিকারের জায়গা থেকে মোকাবেলা করা সম্ভব হতো, তবে রাষ্ট্রে সহসা এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আশা করা অনুচিত।

ভারতীয় জনতা দলের একজন নেতা বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতিত হচ্ছে এমন বক্তব্য উপস্থাপনের পর বদরউদ্দীন উমর সনাতন ধর্মাবলবীদের সংখ্যালঘুত্ব প্রশ্নটিকে ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা? বদরউদ্দীন উমর অসস্তিকর এই প্রশ্নের উত্তরে মতায় প্রতিনিধিত্ব এবং নির্যাতনের বাস্তবতা বিবেচনা করে দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত সংখ্যালঘুর মর্যাদা দিয়েছেন।

তার কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশে বাঙালীর শাসন চলছে। প্রায় শত শতাংশ বাঙালী রাষ্ট্রে নিজেদের দুর্বল অস্তিত্বে ধুঁকতে থাকা আদাবাসী সম্প্রদায়, যারা কখনও বাঙালী জাতিসত্ত্বার অংশীদার হতে চায় নি, তারা স্বাধীন বাংলাদেশে চুড়ান্ত উপেক্ষিত।

বদরউদ্দিন উমর বলছেন বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে না, জনসংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রতি ১০ জন মানুষের একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাই হাজার জনের ভেতরে যদি ৫০ জন নিপীড়নের শিকার হয়, তাহলে জনসংখ্যা প্রতিনিধিত্ববিবেচনায় ৫ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী আক্রান্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর সাথে জড়িত মানুষেরা নিজেদের ভূমিগ্রাসের লোভ-লালসায় ক্ষমতাহীনদের ধর্ম পরিচয় বিবেচনা করে কাউকেই রেহাই দিচ্ছে না। ৫ জন হিন্দু নিপীড়িত হলে একই সাথে ৪৫ জন মুসলমানও নিপীড়িত হয়। এই নিপীড়িত মুসলমানেরা গণমাধ্যমের সহানুভুতি পায় না তেমন।

ক্ষমতাবানদের হাতে ক্ষমতাহীনদের নিপীড়নের মাত্রা কি আক্রান্তের ধর্ম, গোত্র ও জাতিগত পরিচয়ের উপর নির্ভর করে? প্রতিটি ব্যক্তিগত দুর্ভোগকে পরিসংখ্যানে বদলে ফেললে দেখা যাবে প্রতি হাজার মুসলমান জনগণের ভেতরে যতজন নিপীড়িত হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন, প্রতি হাজার হিন্দু জনগোষ্ঠী হয়তো তার তুলনায় সামান্য বেশী নির্যাতিত নিপীড়িত হচ্ছেন কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর নিপীড়নের সংখ্যাটালি করলে দেখা যাবে নিপীড়িত বিবেচনায় হাজারকরায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিপীড়ণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা। এবং বাংলাদেশ ভয়াবহ রকমের জাতিগত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই নিপীড়িত জনগোষ্ঠী সারা বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন ছড়িয়ে আছে এবং এদের অধিকাংশের বসত ভিটা, চাষের জমি দখল হয়ে গেছে, তারা কোনো মতে টিকে আছে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশ ক্রমাগত বাংলাদেশী মুসলিমদের রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। হাজারকরায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর তুলনায় হিন্দু জনগোষ্ঠী বেশী নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং হয়রানির শিকার হচ্ছে। এটাও বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতার একটা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দিকও আছে। বাঙালী মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের ভেতরে বদ্ধমূল ধারণা সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা ভারত অনুগত। ভারত বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিপীড়ন নিয়ে কোনো মন্তব্য করলে এই ধরণের জাতীয়তাবাদী বিরূপতা পরিমাণে বাড়ে।

জবাবদিহিতাহীন রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীরা সাধারণ মানুষের ভেতরের বিদ্বেষ আরও উস্কে দিচ্ছেন সম্ভবত। তারা তাদের বীর্য-বিক্রম এবং ক্ষমতা প্রদর্শণের জন্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীর নাগরিকদের বেছে নিলে সেটা সংবাদ শিরোণাম হয় কিন্তু নাগরিক অধিকার রক্ষায় অনিচ্ছুক রাষ্ট্রে এইসব অন্যায়-অবিচার-নিপীড়নের কোনো বিচার হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বিচারবিভাগীয় দীর্ঘসুত্রিতা সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের হীনমন্য করে ফেলেছে। দীর্ঘদিন অন্যায় হজম করতে করতে তারা মেনেই নিয়েছেন বাংলাদেশের মাটিতে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের ধিকৃত জীবন যাপন করে যেতে হবে।এদের কেউ কেউ শাররীক নিগৃহনের বিচার চেয়েছেন, তবে মুর্তিপূজারী ভারত অনুগত এইসব " মালাউন"দের এমন ধৃষ্টতা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বীরপুরুষদের মনপুত হয় নি। এইসব বিচারপ্রত্যাশী মানুষদের তারা পুনরায় শাররীক নিগ্রহ করেছেন। প্রশাসন এরপরও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করে নি। এই ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক নির্লিপ্ততার উদাহরণ সামনে রেখে বলা যায় বদরউদ্দীন উমর যে ক্ষমতাকাঠামো থেকে প্রকৃত সংখ্যালঘুর সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন, সেখানে বিস্তর গলদ আছে। বাংলাদেশে শুধুমাত্র জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার অবাধ বিস্তার নেই বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সকল ধরণের সাম্প্রদায়িকতার চর্চাকে বলিষ্ঠ করছে।

মানুষের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস কিংবা তার সংস্কৃতিযাপন সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বিবেচনার আদর্শ কাঠামো না। বাংলাদেশে শতকরা ৯০ জন মুসলিন, ১০ জন হিন্দু। হয়তো প্রতি ১০০ জনের ২ জন মানুষ ভিন্ন কোনো ধর্ম মত অনুসরণ করেন এবং প্রতি লক্ষ মানুষের ভেতরে ১/২ জন হয়তো কোনো ধর্মমতের অনুসরণ করেন না। যদি শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস বিবেচনা করা হয় তবে প্রথাগত ধর্মে অবিশ্বাসী মানুষেরা বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘুর মর্যাদা পেতে পারে। নাগরিক সচেতনতা, নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মানসিকতা বিবেচনা করলে হয়তো দেখা যাবে এই অন্ধ সময়ে প্রতিটা নাগরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধচারণ করা মানুষগুলো বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরু মানুষেরা মূলত উচ্ছিস্টলোভী, এরা বিভিন্ন অঘটনে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির প্রত্যাশায় বসে থাকে।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.