ইউজার লগইন

তথ্য বাতায়ন

১৯৯০ সালে সার্নের গবেষক টিম বার্ণার্স লি যখন গবেষকদের তথ্য আদান প্রদানের সুবিধার জন্যে কম্পিউটারগুলোর ভেতরে আন্তঃসংযোগ গড়ে তোলার পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন এবং পরবর্তীতে এই ধারণা বিস্তৃত করে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করলেন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় বিভিন্ন দুরবর্তী কম্পিউটারের ভেতরে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হলো।

বর্তমানের বিশাল অন্তর্জালিক জগত আদতে এই ধারণার সম্প্রসারণ। ব্যবহারকারী একটি নির্দিষ্ট কম্পিউটারে বসে ওয়েব আড্রেস টাইপ করলে সেটা যান্ত্রিক সংবেদন হিসেবে ছড়িয়ে যায় এবং অন্য কোথাও কোনো হার্ড ডিস্কে জমা থাকা আরও কিছু সংকেত এর সাথে সংযোগ স্থাপন করে। ফলে ব্যবহারকারী সেই হার্ড ডিস্কে প্রবেশাধিকার লাভ করেন। হাজার হাজার পাতা কোড লিখে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কম্পিউটারগুলোর ভবেতরে যোগাযোগ স্থাপনের ধারণা নিয়ে টিম বার্নার্স লি- এর ধারণা বদলেছে সময়ের সাথে। একেবারে প্রথম প্রজন্মের ইন্টারনেট উদ্ভাবকদের ধারণা তারা তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং পারস্পরিক সংযোগের যে ধরনের গণতান্ত্রিক ধারণাকে কেন্দ্র করে এই প্রটোকল উদ্ভাবন করেছিলেন- উদ্ভাবনের ২ দশক পর একই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তথ্য দমন এবং তথ্য অধিকার হরণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সুনির্দিষ্ট কিছু কোড টাইপ করলে কিংবা আমরা যেটাকে আইপি আড্রেস বলছি- সেই আইপি এড্রেস ব্লক করলে আমরা নির্দিষ্ট কিছু হার্ডড্রাইভের সাথে সংযোগের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। ফলে বিশ্বের এক অঞ্চলের মানুষ অন্য একটি অঞ্চলের আঞ্চলিক তথ্য ভান্ডারে প্রবেশাধিকার হারাচ্ছে এমন কি প্রশাসন-রাষ্ট্রনেতারা নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। টিম বার্নর্স লি এখনও মনে করেন ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থায় এখনও মানুষের তথ্য ও যোগাযোগের প্রয়োজন মেটানোর গণতান্ত্রিক ক্ষমতা আছে তবে তারা যেভাবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন সে ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করলে এই ধরণের সরকারী-বেসরকারী আরোপ থেকে পারস্পরিক যোগাযোগকে স্বাধীন করা সম্ভব। এনোনিমাস ব্রাউজারগুলো আরও কয়েকহাজার লাইনের কোডিং এর মাধ্যমে আইপি এড্রেসকে বদলে ফেলছে, তবে এই ধরণের জটিল ব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। তথ্য সংযোগ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ , তথ্য সংরক্ষণ এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সংরক্ষিত তথ্যের অপব্যবহার ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। এই ধরণের অব্যবস্থার অবসান হওয়া দরকার।

তথ্য সংরক্ষণ এবং তথ্য বিপণনে মধ্যসত্ত্বভোগী হিসেবে উপস্থিত বিভিন্ন বড় বড় প্রাযুক্তিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেখানে প্রতি মুহূর্তে ব্যবহারকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করছেন, তারাও ব্যক্তির গোপনীয়তাকে প্রধান্য দেয় না তেমন।

তথ্য ও জ্ঞান হোক সবার জন্যে উন্মুক্ত এমন একটি ধারণা সামনে রেখে আকেক্সান্ড্রা এলব্যাক্যান মূলত বিভিন্ন গবেষণা জার্ণালের বিশাল সংরক্ষণাগার সবার জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। সায়েন্স-হাব প্রজেক্ট শুরু হওয়া পর এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। শুধুমাত্র দরিদ্র দেশগুলো নয়, বরং উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর গবেষকরাও সায়েন্স হাব ডিপোজিটরি ব্যবহার করছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের তথ্য ও গবেষণা অধিদপ্তরের দায়িত্ব হাতে পেয়েই নেদারল্যান্ডের মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০২০ সালের ভেতরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নিবন্ধগুলো সবার জন্যে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। নেদারল্যান্ডের গবেষকদের অধিকাংশ গবেষণা নিবন্ধই এখন সকল গবেষকদের জন্যে উন্মুক্ত।

২০১২ সালে ব্রাজিল তথ্য যোগাযোগ আইন অনুমোদন করেছে। এই আইনে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের সমান তথ্য ধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের, রাষ্ট্র নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তুলে তথ্য বৈষম্য বিলোপ করতে বাধ্য।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা, দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা, অক্ষুন্ন রেখে, ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অক্ষুন্ন রেখে, তাদের অন্তর্জালিক অর্থনৈতিক লেনদেনের সুরক্ষা প্রদান এবং তাদের অন্তর্জালিক হয়রানি নিবারণে প্রয়োজনীয় আইনী অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে সে আইনে।

আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সকল ধরণের ব্যক্তিগত যোগাযোগকে এক ধরণের অপরাধ চিহ্নিত করে তথ্য যোগাযোগ আইন নামে একটা নতুন ধাঁচের অন্তর্জালিক তথ্য নিবারণ আইনের খসরা উত্থাপন করেছি।

অবাধ তথ্যযোগাযোগ বাতায়নে অনেক প্রসঙ্গই অমীমাংসিত। অপরাধের ধরণ, অপরাধের সীমা এখনও অনির্ণীত। আমরা প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল হার্ডড্রাইভ জঙ্গলে নিজেদের ভাবনার অনুলিপি তুলে রাখছি। এই জঙ্গলে কিংবা তথ্য জঞ্জালে কিছুই হারিয়ে যায় না। তথ্য জঞ্জাল সব মনে রাখে। সময়ের সাথে স্মৃতি ফিকে হয়ে আসার সম্ভাবনা এখনকার অন্তর্জালিক সময়ে একেবারেই বিলীন হয়ে গেছে। সময়ের ধারণা এখন একটা দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রমের মতো। আমাদের কোনো অতীত নেই, প্রলম্বিত বর্তমানে আমাদের বসবাস। সুতরাং ২০১১-১২ সালে ইউ টিউবে তুলে রাখা বিশেষ ভিডিও, যা সে সময়ে বৈশ্বিক অসহিষ্ণুতা তৈরী করলো এবং অন্তত শতজনের প্রাণহানির কারণ হলো- নতুন করে সেই একই ভিডিও দেখিয়ে উস্কানি দিয়ে আরও শতজনের প্রাণহানি করা সম্ভব।
প্রতিটি মানববৈরীতার হুমকি সময়ের সাথে অতীত হয়ে যাচ্ছে না বরং তার সবটুকু উন্মাদনা ও উস্কানি সমেত তারা জমা থাকছে আমাদের তথ্যজঞ্জালে। উস্কানিমূলক বক্তব্য জমা রেখে প্রতিনিয়ত এমন জঙ্গীবাদী উন্মাদনা তৈরীর ঝুঁকি বহাল রাখার সাথে তথ্যের অবাধ প্রসারের উদ্যোগ কখনও সাংঘর্ষিক, কখনও প্রয়োজনীয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের ব্যক্তির উপরেই ভরসা রাখতে হয়। কখন কোন ব্যক্তি বিগড়ে যাবে, কখন ছুড়ি-চাপাতি-বন্দুক- আর এসল্ট রাইফেল হাতে নিয়ে অন্যের প্রাণ সংহারে উদবুদ্ধ হবে আমরা জানি না। মানুষের উপরে অগাধ আস্থা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ তবে এর কোনো বিকল্প এখনও নেই।

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.