ইউজার লগইন

অর্বাচীন খোলস আমার

বাতাসের পরশ দিন কে দিন শীতলতার চুমো দেয়। সে চুমোতে শিহরন জাগে বড্ড কাপুনির। উষ্ঞ ঠোট শুকিয়ে শুকনো পাতার মতো বিবর্ন হতে থাকে। তাই সকালে ঘুম ভাংতে চায় না, ঘরকুনো শরীরে জানালায় তাকিয়ে থেকে গোলগে চুমু দিতে দিতে ডুবে যাই পুরোনো অতীতে। মাথার চুল গুলো এই অল্প কদিনে পেকে গেলো, চোখের নীচে ঝুল দাগ। ডাকাবুকো শরীরের কখনোই ছিলাম না, তবু কেনো যেনো মুখের চামড়া ঝুলে গেছে। বয়স যেনো ঠেকেছে ৫০ এর কোঠায়।

এমন সময় দরজায় নক,"শফিক, ঘুম ভেঙ্গেছে?"
: আসো। গোলোগ নেবে?
: নাহ। আমি নাস্তা করে ফেলেছি। আকবর কোথায়?
: শুয়ে আছে। রাতভর ট্যা ট্যা। অসহ্য, ঘুমের তেরোটা বাজিয়েছ।
: ছিঃ শফিক! এভাবে বলে না। ওকে যদি আজকে আমি রাখি কোনো আপত্তি আছে?
: এলিন, তুমি রেখে দাও!

আমি ডাইনিং টেবিলে বসে পড়লাম! এলিন বিড় বিড় করতে আকবরকে নিতে চলে গেলো। কিছুদিন এমন করলে আমি শিওর এলিন সোশ্যাল সার্ভিসে কল দেবে, আকবরকে নিয়ে যাবে। হয়তো আকবরের জন্য সেটাই ভালো। আমার মতো মদ্যপ পিতার দরকার নাই ওর! রামের একটা বোতল পড়ে আছে ফ্রিজারের ওপর। এক গ্লাস নিয়ে বসলাম। মেঘলা দিনে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। আইফোনটা বন্ধ কাল থেকে। চার্জ নেই। দেয়াও হয়নি। দিয়ে কে হবে, ফোন করার মতো তো কেউ নেই!

মাথাটা ঝিম ধরতে ধরতে উঠতেই মনে হলো পুরো বাসা অসম্ভব ফাঁকা, এই পৌনঃপুনিক একাকিত্ব থেকে দূরে পালাতে গিয়ে সেই বৃত্তেই আটকা পড়লাম। মারিহ্যাম যাবার টিকেট পড়ে আছে। আজকে সন্ধ্যায় একটা ট্রিপ আছে। ঘুরে আসলে কেমন হয়?

গায়ে কোট জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিছু কেনা কাটা করার দরকার আকবরের জন্য। দুধ শেষ, ডাইপার শেষ। পুচকিটারও কিছু দরকার।

ট্রেনে উঠে মনে হলো এলিনকে ফোন দেয়া দরকার। ফোন হাতে নিয়ে দেখি ফোনে নেই চার্জ, উফফ! ফোনে চার্জ না থেকে ভলোই মনে হলো, ফোনের কালো স্ক্রীনে নিজের চেহারাটা আবার দেখলাম। সাদাপাকা চুল আর দাড়িতে মুখ ঢেকে গেছে। নিজেকে বন মানুষ মনে হচ্ছে।

টি সেন্ট্রাল নেমে সারগেলসতরীতে হাটা দিলাম। জনারন্য দেখে মনে হলো মেলা বসেছে কত বর্ণে মানুষের। সবাই তার আলাদা জগৎ নিয়ে ব্যাস্ত, সুখী, মত্ত সবকিছু নিয়ে। একটা সেলুনে ঢুকলাম। ককেশীয় এক সুন্দরী ঠাট্টার সুরে বললো,"হ্যালো, জনি ওয়েইন, ড্রেসম্যানের মডেল হবে নাকি?"
: ড্রেসম্যানের মডেল হলে তোমার মতো সুন্দরীতো পাবো না?
: ও আচ্ছে! আমাকে পাবার জন্যে এতটুকু কি করবে না?
: তাহলে তুমি যেটা পছ্ন্দ করো! বোহেমিয়ান এলভিস?
: আই লাইক এলভিস!

সুন্দরীর মা এস্তোনিয়ান, বাবা সুইডিশ। সিঙ্গেল। ইন্ডিয়ানদের সাথে কখনো ফ্লার্ট করে নাই। মজা পেলো, হাতে কার্ড ধরিয়ে দিলো সেলুনের। আমি হাসি দিয়ে চলে আসলাম। কার্ডটা রেখে দিলাম বুক পকেটে, কারন পেছনে তার নম্বর লেখা আছে যদিও দেখিনি। কিছু কিছু ব্যাপার দেখতে হয় না, এগুলো হবেই ইউরোপে। এর জন্যই এটা ইউরোপ, এটা সুইডেন।

ভাইকিং লাইনে শেষবার যখন মাইমুনাকে নিয়ে গেলাম তখন সব ফিনিশ আর রাশিয়ান মেয়ে আর মদ্যপ ইমগ্রান্টদের আখড়া। খাবারের মান আগের চেয়েও খারাপ। মাইমুনার কাছে কেমন লেগেছে জানি না তবে এটা ঠিক ক্লাসি মানুষের জন্য না। যেখানে দুটো কথা বললেই ক্যাবিনে ঢুকতে চায়, তার বিনিময়ে কিছু পেতে চায় অথবা মদ্যপ ইমিগ্রান্টদের ছোটলোকি স্বভাব সেখানে এর চেয়ে বেশী কিছু আশা করা যায় না। মারীহ্যাম দ্বীপটা খারাপ না। ওখানে ইন্ডিগোর স্টেকটা পছন্দ সাথে রাশিয়ান এক ধরনের বীয়ার পাওয়া যায়। আমার যাবার উদ্দেশ্য ঐ স্টেকটার জন্যই।

যাই হোক, ঝুর ঝুর ইলশে গুড়ি বৃষ্টি মাড়িয়ে বিশাল জাহাজের চেক পার করে তিনতলার এক্সোটিক কেবিনে ঢুকে পড়লাম। বারে আছে টাকিলা, ভোদকা আরও কত কি! ভোদকার ছোট তিনটা শট নিলাম। একটা শাওয়ার নিলাম। জাহাজ চলতে শুরু করলো কিছুক্ষন পর। একটু পরেই শুরু হবে পার্টি নাইট। রেডি হয়ে গেলাম ডিনার বাফেটে একটু পেট ভরবার জন্য।

সেই একই চিত্র, সস্তা রাশিয়ান মেয়ে আর মদ দুটোতে ডুবে আছে পার্টি। আমি এক কোনার টেবিলে বসে ওয়াইনের ছিপি খুললাম। বাল্টিক সাগরের নিস্তরঙ্গ সৌন্দর্য দেখে মাইমুনা বলেছিলো,"আমাদের পদ্মা নদীও এর চেয়ে বেশী তরুন!"

ওর এরকম ভাবালু টাইপের ছোট ছোট রসিকতা আমার ভালো লাগতো। রসিকতা গুলো খুবই ক্ষনিকের কিন্তু মনের মধ্যে এক ধরনের হাসির জোয়ার বইয়ে দিতো। খুব করে চাইতাম এই ছোট্ট রসিকতাটুকু টেনে লম্বা করি। দু'জনের হাসির মাঝে অন্তরঙ্গতায় রাঙ্গিয়ে খুব কাছাকাছি থাকি চিরটাকাল।

এমন সময় সামনের চেয়ারে এক রাশিয়ান সুন্দরী বসে পড়লো।
: হাই, আমি এলেনা! তুমি?
: শফিক। রাশিয়ান?
: নাহ, ফিনিশ! তবে মা রাশিয়ান ছিলো।
: সুইডেনে ঘুরতে গিয়েছিলে?
: ঘোরার কিছু নেই। বোরিং দেশ। ওখানকার ছেলেরা বোরিং।
: তাই?
: তোমরা তো খুব রোমান্টিক। আমি হিন্দি সিরিয়াল খুব পছন্দ করি, ম্যায় টুমসে ফেয়ার খারটি হো!
: গুড। আমি কেবিনে একা। হাতে দু'ঘন্টা সময় আছে। যাবে?

মেয়েটা একটু থতমত খেয়ে গেলো। আমি উঠে দাড়িয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলাম। মেয়েটি মন্ত্র মুগ্ধের মতো আমার হাত জড়িয়ে ধরলো। লিফতে গিয়েই ওকে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড চুমোতে আটকে ফেললাম। সেই আটকানো বন্ধন পরবর্তী চার ঘন্টা আমাদের কেবিনে রেখে দিলো।

ভোরের আলো চমকাতেই আমি শাওয়ারে চলে গেলাম। শাওয়ারটা দরকার ছিলো। রুমে ঢুকে দেখি সম্পূর্ন ন গ্ন হয়ে মেয়েটা শুয়ে আছে। মসৃন এবং স্বর্নালী চামড়ার মেয়েটির শরীরের বাঁকগুলো বেশ ধারালো। নিতম্বের দিকে সূচালো বাবল খাজ মুগ্ধ করে। চোখের টানা চাহনীতে ময়ূরী হার মানে। এতটা রূপের মাঝেও ভালোবাসার ছোয়া নেই। সুইডেনে থাকার জন্য সে সবকিছুই করবে। ভাষাটা শিখে যাবার পরের দিন চাকুরী খুজবে, কার্ড হাতে পেলে নতুন ঘর নেবে। এর মধ্যে একটা বাচ্চা নিয়ে নিজের মতো করে জীবন শুরু করবে। এটা ওদের সবচেয়ে লিস্ট প্রায়োরিটি। হায়েস্ট প্রায়োরিটি কোনো সুইডিশ ধনকুবের।

ওকে কেবিনে রেখেই বেরিয়ে গেলাম। মারিহামে এই সময় সূর্য্যের এতোটা তেজ নেই। আকাশে মেঘ থাকায় সোনালী রোদে এক মিস্টি ভাব আছে। ডক বরাবর হেটে সোজা নিগাটানের একটা ব্লক পার হলেই ইন্ডিগো। ১১ টা থেকে খুলবে। হাতে আছে ১ ঘন্টা। জাহাজ ছাড়তে আরও ৩ ঘন্টা। এটায় না গেলে আরও তিনদিন এখানে পড়ে থাকতে হবে। সমস্যা নেই। তিন ভরে স্টেক খাবো। খারাপ হবে না।

ট্যুরবিয়ন এর হেড কুক। বিশাল পেটের সাথে মুখের বিশাল হাসি। কিন্তু অমায়িক। সুইডেনে জন্ম তবু এই মরার দেশে পড়ে আছে। ওর ভাষায় মারিহ্যামের বাতাসে এমন কিছু আছে যাতে স্টেকে আলাদা এখটা স্বাদ পাওয়া যায়। আসলেই একটা স্বাদ, সাথে এসপারাগস আর ওয়ানের ডীপ সস। দুটো বীয়ারের সাথে একটা পুরো স্টেক আর পটেটো স্ম্যাশ। লেবানিজ ওয়াইনের সাথে হালকা জ্যাজ আর বনেদী ফিনিশদের উচ্চস্বরেঃ হাসার শব্দ কানে যেনো মিউজিকের মতো বাজছে।

এখানে থেকে গেলে কেমন হয়? এমন সময় পকেটে মোবাইলের ভাইব্রেশন পেলাম! কি আশ্চর্য্য! আমার মোবাইলে তো চার্জ নেই! পকেটে হাত দিয়েই বুঝলাম সর্বনাশ। ঐ রাশিয়ান মেয়েটার আইফোন নিয়ে এসেছি! সর্বনাশ!

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

দূরতম গর্জন's picture

নিজের সম্পর্কে

মহাশূন্যের গুন গুন শুনতে চাই, কান পেতে রই তারাদের আহ্বানে। দূরতম গর্জন যখন সৈকতে আছড়ে পড়ে, আমি পা ফেলে উপভোগ করি সাগরের কূর্ণিশ। মানুষ হয়ে জন্মাবার অহংকারই শুধু বিদ্যমান, অথচ নিত্য বেচে আছি তেলাপোকার শৌর্য্যে!