ইউজার লগইন

রাজনীতিবিদ বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প

অবশেষে নোমান মামা দিব্যজ্ঞান লাভ করলেন। জ্ঞানলাভের জন্য বনে-বাদাড়ে ঘুরতে হয়নি, বিশেষ গাছের নিচেও বসতে হয়নি_ দেশপ্রেমের দীক্ষাটুকুই যথেষ্ট। দিব্যজ্ঞানালোকের সঠিক প্রয়োগে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন_দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনীতি নয়, রাজনীতিবিদদেরই সংস্কার আবশ্যক! রাজনীতিবিদ পরিশুদ্ধ হলে আপনাআপনি রাজনীতিও মূলধারায় ফিরবে!
রাজনীতিবিদ বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প হাতে নিয়ে কোমরে গামছা বেঁধে নামলেন মামা। প্রথমে দড়িই বাঁধতে চেয়েছেন। গামছায় রাজনীতির গন্ধ আছে।
দড়ি না পাওয়ায় আক্ষরিক অর্থেই গামছা বাঁধলেন! জনসেবামূলক কাজে মেরুদণ্ড সোজা রাখা জরুরি। মেরুদণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কোমরের!
নিজ এলাকায় পরিপূর্ণ সংস্কারের পরই বাংলাদেশের সব অঞ্চলে নজর দিতে হবে। প্রথমে তিনি সাক্ষাতের চেষ্টা করলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপির সঙ্গে। এমপি দুরস্ত, তার পিয়নের নাগাল পেতে গলদঘর্ম হতে হয়েছে টানা ৪ মাস! অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ১১ মাস পর পাওয়া গেল এমপি সাহেবকে। যারপরনাই বিরক্ত তিনি_'কী ব্যাপার, অসময়ে ডিসটার্ব করছেন কেন?'
মামা হাসিমুখে বললেন, 'স্যার, সময়মতোই এসেছিলাম। আপনার দেখা না পাওয়ায় ...!'
'শোনেন, আপনি মাত্র একজন ভোটার। একটা ভোটে আমার চলে না_নজর লাখ লাখ ভোটারের দিকে। আপনি আমাকে ভোট নাও দিতে পারেন!'
'ভোট পাওয়াটাই একমাত্র কথা নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় ...!'
এমপি সাহেবের কপাল কুঞ্চিত হলো। মামাকে বাগাড়ম্বরের সুযোগ না দিয়ে বললেন, 'যা বলার ২ মিনিটে শেষ করেন। আমাদের সরকারের মেয়াদ শেষ, সামনে ইলেকশন, বিরোধী দলের আন্দোলন_বুঝতেই পারছেন অবস্থা কতটা চরমে!'
মামা মোটামুটি ১০ মিনিটে বক্তব্য পেশ করলেন_রাজনীতিতে পরিচ্ছন্নতা আনতে হবে, সরকারি অফিসগুলোকে ঘুষ ছাড়তে হবে, বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করা যাবে না, ছাত্রদের সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হবে ...।
এমপি হেরে গেছেন। যেহেতু রেগে গেছেন! মামাকে গেটআউট না করে নিজেই সশব্দে গেটআউট হয়ে গেলেন!
নোমান মামা এবার নামলেন বিএনপির নেতাদের খোঁজে। প্রায় প্রতিদিনই হরতাল থাকে। ভেবেছেন রাজপথেই পাবেন শীর্ষ নেতাকর্মীদের। কিন্তু না, অনেক খোঁজ-খবরের পর বিএনপির একজন বড় নেতাকে পাওয়া গেল তালাবদ্ধ ঘরে। বাইরে থেকে তালা মেরে ভেতরে অবস্থান করছেন তিনি। সেখানে পেঁৗছতে আদাজল খেতে হয়নি ঠিকই, নিয়মিত খাবারের পরিমাণটা বাড়াতে হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কথা শুনে নেতা বললেন, 'আপনি সিটি করপোরেশনে ঝাড়ূদারের চাকরি নিন!'
মামা বললেন, 'চাকরির চেয়ে দেশ বড়!' বোঝাতে থাকলেন হরতাল-অবরোধের নামে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি কেন? কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানো কেন? কেনইবা ক্ষমতার লোভে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার প্রচেষ্টা? স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা কেন ...?'
নেতা প্রশ্ন করলেন, 'আপনি সরকারের চর নন তো?'
মামা জোর গলায় জানিয়ে দিলেন, তাঁবেদার নন, চর তো ননই! নেতা বিরক্ত হলেন। তার দলের চ্যালাচামুণ্ডারা এসে কিল-চড়-ঘুষি-লাথি আর অশ্রাব্য গালাগাল দিতে দিতে মামাকে রাস্তায় বের করে ধাক্কা মারল_যত্তসব!
মনের ক্ষত এবং শরীরের ক্ষত সারতে মোটামুটি এক মাস লাগলো। তাই বলে দমলেন না। শুভ কাজে বাধা আসবেই। বাধা ডিঙিয়ে যে সামনে এগোতে পারে সে-ই মহাপুরুষ।
মামা খুঁজে বের করলেন জামায়াতে ইসলামীর এক পাতিনেতাকে। ইচ্ছা ছিল, বড় নেতাদের সঙ্গেই মতবিনিময় করবেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এক অংশ জেলখানায়, বড় অংশ পলাতক। খুঁজে পাওয়া নেতা পাতি হলে কী হবে, ঝাঁঝ অনেক। মামা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন_বোমাবাজি-অস্ত্রবাজি কেন; ক্ষুর-চাকুর ব্যবহার আর বোমা মেরে মানুষ হত্যার রাজনীতি সংবিধানের কোন পাতায় আছে ...?
পাতিনেতা মধুর কণ্ঠে বললেন, 'এসব বিষয় বুঝতে আপনাকে আমাদের এখানে ক্লাস করতে হবে। সপ্তাহে তিনদিন। তারপর নিজেই বুঝবেন আমরা যা করছি সবই ভালো!'
'সপ্তাহে তিনদিন মগজ ধোলাই করবেন? পরিণত মস্তিষ্ক ধোলাই করাটা কষ্টকর হবে না?'
'ওভাবে নিচ্ছেন কেন, আপনি এখানে শিখবেন!'
'ভুলে যাচ্ছেন কেন_শিখতে নয়, আপনাদের সুস্থধারার রাজনীতি শেখাতে এসেছি!'
মগজ ধোলাইয়ের জায়গায় শারীরিক ধোলাই হতে কিছুমাত্র বাধা নেই! শরীরজুড়ে ধোলাইয়ের চিহ্ন নিয়ে ফিরলেন মামা। এবারও চিকিৎসা বাবদ ভালোই টাকা গেল।
মামা এবার গেলেন বাম রাজনীতির ধারক-বাহক বড় একটি দলের অফিসে। দলপ্রধানকে সহজেই পাওয়া গেল। মামা তাকে ডান-বাম বোঝালেন। এও বললেন_বাম রাজনীতি বৈশিষ্ট্য হারাতে বসেছে। বড় রাজনৈতিক দলের শরিক দলে পরিণত হচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়। কোনো কোনো বাম নেতা খদ্দরের পাঞ্জাবি, কম-দামি পাজামা পরেন ঠিকই; কিন্তু বাসায় এসিতে ঘুমান, বিলাসি জীবনযাপন করেন। আদর্শ-নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধের ধস নেমে যাচ্ছে ...।
নেতা মামাকে সমাজতন্ত্র, বিপ্লব, মার্কস, লেনিন, বুর্জোয়া-লুটেরা শ্রেণী, প্রলেতারিয়েত, পরিবারতন্ত্র, রাজনীতির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট_লাল চা পান সহযোগে এমন অনেক ভারী ভারী জ্ঞানের কথা বোঝালেন। অফিস থেকে বেরিয়ে মামা মাথাটাকে জ্ঞান-আক্রান্ত ভারী বোধ করলেন। অনেক চেষ্টার পরও মনে করতে পারলেন না তিনি কে_নাম কী, এখানে কেন এসেছেন!
কিছুদিন পর নোমান মামা আরেকটি রাজনৈতিক দল খুঁজে বের করলেন। এদের নামডাক নেই, তবে সংখ্যায় বড়। দলের নাম সর্বদলীয় ঐক্য। বিভিন্ন দল থেকে ভেগে আসা নেতাকর্মীরাই এ দলে যোগ দেয়। প্রত্যেকেই গঠন করেন নতুন একটি রাজনৈতিক দল। যে দলের প্রধান নিজেই। এখন পর্যন্ত দলের সংখ্যা ৩০৭২। শনৈ শনৈ সংখ্যাটি বাড়তেই আছে। যে কোনো মিছিল বা সমাবেশে কমপক্ষে ৫০ জন কর্মীর সমাগম হয়।
মামা তাদের বোঝালেন, চলমান রাজনীতিতে নতুন দলের আবশ্যকতা তেমন নেই। খিচুড়ি মার্কা দলের তো নয়ই। তারা উল্টো বোঝালেন বিষে বিষক্ষয়। বড় দলগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, অগণতান্ত্রিক মনোভাবকে সঠিক পথে রাখার জন্য এরকম দলের দরকার অবশ্যই আছে; নইলে গণতন্ত্র পথ হারাবে। মামার বোধোদয় হলো_আসলেই তো! তিনিও একটি ফরম কিনলেন, নম্বর ৩০৭৩। ভুঁইফোড় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে ফরম ফিলআপ করতে করতে সশব্দে উচ্চারণ করলেন_বিষে বিষক্ষয়!

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


বিষে বিষময় Puzzled

সামছা আকিদা জাহান's picture


তানবীরা বলেছে বিষে বিষময় আর আমি বলি এমন পাঠা মামা কই পাই।

শফিক হাসান's picture


Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শফিক হাসান's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বপ্নবাজ নই, স্বপ্নবিলাসি মানুষ আমি। গল্প লেখার চেষ্টা করি, কতটুকু কী হয় জানি না।