ইউজার লগইন

বৃষ্টি কাহিনী

কাল সারারাত বৃষ্টি পরেছে। প্রায় ভোর রাত পর্যন্তই টালির ছাদে বৃষ্টির শব্দ শুনেছি। অনেকটা বিখ্যাত টিনের চালের শব্দের মতই। দেশের কথা মনে পরছিল। বৃষ্টিতে না ভিজলে আম্মা খুবই বিরক্ত হতো। বলত, এটা কেমন মেয়ে? বেরসিক। তোর বোনদের দেখে শেখা উচিত। বাঙ্গালী হয়ে বৃষ্টিতে ভিজবি না?
আমার বন্ধুরা ভাবত আমি চাপা মারি। মায়েরা তো বৃষ্টিতে ভিজলে বকা দেয়। না ভিজলে কেউ বকা দেয় না কি? তাছাড়া আমার আম্মাকে দেখলে এত রাগী মনে হয় যে এমন কথা বলা অসম্ভব। বিশ্বাস অবিশ্বাস তাদের ব্যাপার। আর আমার আম্মা রাগী এটাও ঠিক। তবে গান শোনা, গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি করা, গল্পের বই পড়া, বিঞ্জানের নানা এক্সপেরিমেন্ট করা, ছবি আঁকা, গাছ লাগানো এক কথায় পড়াশোন বাইরের অন্য সাংস্কৃতিক মতন সব কাজে আম্মার খুব আগ্রহ। ছোট বেলা থেকেই আম্মা ছড়া বানানো, অদ্ভুত রান্না করা, কতবেল, বেল , নারিকেল জাতীয় শক্ত খোসায় ছবি আঁকা ছিল আম্মার কাজ। আমার নানী নাকি এসব করলে কোনদিন বকা দিত না। আমার আম্মাও তা।
আমার বাবা নাকি ছিলেন আরেকটু বেশি। বৃষ্টি , বই , গান, আর লেখা, এই ছিল জীবন।আম্মা বাবার মত বানাতে চেয়েছেন আমাদের। আমার বড় আপা অবশ্য বাবার মতই হয়েছেন। বাবার সাথে বেশি সময় কাটানোর ভাগ্য হয়েছিল তো তাই। আমার বাবা বন্কিম , রবিন্দ্রনাথ তো পড়তেনই , সাথে মাসুদ রানা আর তিন গোয়েন্দাও পড়তেন। ছুটির দিন সকাল থেকে চলত আপাকে নিয়ে নান সবজি আর ফুল গাছ লাগানো। সাথে চলত গান শোনা। বাবার মৃত্যুর পর সেই বই আর গানের ক্যাসেটগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে আমার পাই আর ডিএনএ এর সূত্রে স্বভাব।
আমার বাবা লিখতেনও। নাটক লিখে মঞ্চস্থ করাটা তার সখ ছিল। তখনকার সময় সেই নাটক দেখতে নাকি আশেপাশের গ্রামের সবাই চলে আসত। নাটক শেষ হলেও অভিনেতাদেরকে সেই চরিত্রের নামে ডাকা হত অনেকদিন।
এ সবই আমি আমার গ্রামে ঘুরে ঘুরে সবার কাছ থেকে জেনেছি। মৃত্যুর ২০ বছর পরও সবাই আমার বাবাকে মনে রেখেছে নিজের আপন ভেবে। আমাকে ধরে অনেকেই কেঁদেছে।
শুরু করেছিলাম বৃষ্টি দিয়ে আর এখন চোখের বৃষ্টিতে চলে এসেছি। এবার বন্ধুদের সাথে বৃষ্টবিলাসের কথা বলি। বাংলাদেশের বৃষ্টি মানেই খুব সুন্দর। আমার শহরের বন্ধুরা ছিল একটু নাকি স্বভাবের। বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় পরলে নাকি টনসিল ফুলে যাবে। বিরক্ত লাগত। টনসিলের জন্য বৃষ্টি মিস করবি? একদিন জোর করে বৃষ্টিতে ভিজলাম সবাইকে নিয়ে। আমার পক্ষে ছিল দু'জন। বাকিরা বন্ধুত্ব রক্ষায় ভিজল। অনেকজন একসাথে। সবাই মেয়ে ছিলাম না অবশ্য। ছেলে বন্ধুও ছিল। কারন অনেকগুলো মেয়ে এক সাথে থাকলে অনেকেরই তো আবার মুখে বাজে কথা ফুটে। তা বাদ দেই। পরের দিন কলেজে আমি আর আরেক বন্ধু ছাড়া কেউ আসে নি। সবাই জ্বর আর টনসিলের অত্যাচারে কাবু। রেস্টুরেন্টে সবাই মিলে খাওয়ার জন্য যে টাকা জমেছিল, তা থেকে ফুল কিনে সবার বাড়িতে গিয়ে গিয়ে দেখে এসেছিলাম দুজনো নাস্তার সাথে সাথে চোখ রাঙানি, গালি আর মাইর ও খেয়েছিলাম।
সারারাত বৃষ্টির পর সকালটা কত সুন্দর লাগে, সেটা সবাই জানে। আজও কাজে ছুটতে ছুটতে বেশ লাগছিল। শীতের জড়তাটা শেষ পর্যন্ত কাটল। বাতাসটা পরিচিত। আজ বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধও ছিল। দুপুর পেরিয়ে বিকাল হতে চলছে বৃষ্টি ধোয়া সৌন্দর্যটা সারাদিন মনটা ভাল করে রাখল।
বৃষ্টি ছাড়া বেঁচে থাকা??? সম্ভবই না।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ঢাকাতেও কাল রাতে বিষ্টি হলো অনেকক্ষন, অনুভুতি গুলো মিলে গেল অনেক টুকুই। Smile

আপনি অনেক ভাগ্যবতী একজন মানুয়, কি অসাধারন দুইজনের ছায়ায় বেড়ে উঠেছেন। পড়তেও কত্ত ভালো লাগে। ^_^

শারমিন's picture


দুইজন না একজনের ছায়ায়। আমি আমার বাবাকে পাই নি।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


মন খারাপ করে দিয়ে থাকলে, দুঃখিত.. Sad

শারমিন's picture


আরে না। এতে আমার মন খারাপ হয় না।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শারমিন's picture

নিজের সম্পর্কে

খুবই বদমেজাজী। স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি। অন্য মানুষের চেয়ে নিজের সাথে নিজে কথা বলতেই বেশি ভাল লাগে। আর ভাল লাগে গান শুনতে শুনতে ডায়রি লিখে কাঁদতে।