অসমাপ্ত বাস্তবতা... ৩
১.
'যদিও হারিয়ে গিয়েছি এইতো জরুরি খবর' লিখার জন্য কয়দিন ধরে সময় বের করার চেষ্টা করছলাম কিন্তু হয়ে উঠছিল না। কেন সেটা বলবো, তবে তার আগে একটা চিন্তা শেয়ার করে নিই। ইদানীং এই সিরিজের শিরোনামটা নিয়ে দ্বিধায় ভুগছি।
শুরুতে ভেবেছিলাম 'হারিয়ে গিয়েছি এই তো জরুরি খবর' কথাটা এই লেখাগুলোর মেজাজের সাথে সবচেয়ে ভাল যায়। তবে শিল্পী অর্ণবের গানের কথা এটা। যতোই যুৎসই হোক, এটাকে নিয়ে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব না। কেননা এটা আমার নিজের আবিস্কার না। আরেকজনের আবিস্কারের উপর নিজের চিন্তা-ভাবনা আরোপ করা। শিল্পী অর্ণবের ভক্ত আমি চিরকালই। অসংখ্য ধন্যবাদ তাকে তার সৃষ্টিশীলতা আমাদের সাথে ভাগ করে নেয়ার জন্য।
কিন্তু এই পর্ব থেকে সিরিজটার নাম পাল্টে "অসমাপ্ত বাস্তবতা" রাখছি। ধার করা নাম নিয়ে চলাফেরা আর না।
২.
এইবার আসা যাক জীবনের আলাপনে। দৈনন্দিন জীবন চলছে কোনো বিশেষ পরিবর্তন ছাড়াই। যেটাই করতে চাই কিংবা শুরু করি, কেন যেন সময়ের অভাবে শেষ পর্যন্ত করে ওঠা হয় না। যদিও আমার প্রতিদিনের রুটিনে আসলে খুব বেশি কোনো কাজ নেই। তারপরও কেন যেন কোনকিছুর জন্যই কোনো সময় পাওয়া যায় না।
সকাল সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে উঠে দৌঁড়াই ক্লাসে যাবার জন্য। ন'টায় শুরু হয়ে ক্লাস, বেলা দেড়টা পর্যন্ত চলে। জার্মান ভাষা শেখার ক্লাস। তারপর দুপুর বেলায় যেদিন যেখানে খানা জোটে, খেয়ে-দেয়ে, ব্যাগ আর বোঁচকা কাঁধে, লাইব্রেরিতে গিয়ে ঠাঁই নিই। সন্ধ্যার পর রুমে ফিরে হালকা কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কোন কোন দিন হয়তো একটা সিনেমা দেখি। সে সময় সামান্য টেট্রা-হাইড্রো ক্যানাবিনল মেশানো একটা বা দু'টো সিগারেট খাই।
এর মধ্যেই কোন কোন দিন খেলাধূলা করা হয়, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হওয়া হয়, আবার কোন কোন দিন কিছু না করেও কাটিয়ে দেয়া হয়। জাস্ট শুয়ে শুয়ে। এমনকি বালিশের পাশ থেকে কোন বই টেনে নিয়ে পাতা উল্টাতেও ইচ্ছে করে না।
প্রশ্ন আসতে পারে, এরকম ধীরগতির একটা জীবনেও কি করে সময়ের অভাব দেখা দেয়? দেয়, অলস হলে দেখা দেয়।
আসলে আলসেমীর ব্যাধি আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে উদ্যমশূন্যতা। কিন্তু সময় তো তার দুর্বার গতিতে ছুটছেই। সে কি আমার জন্য বসে থাকবে? থাকবে না। আমাকেই তার সাথে তাল মেলাতে হবে। আর সেজন্য আলসেমীটা বাদ দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। তবে এটা মুখে বলা যতো সহজ, কাজে প্রমাণ করা ততোটাই কঠিন।
একটা সময় অবশ্য আমার একজন ছিল। যে ঠেলে-ঠুলে আমায় দিয়ে সব জরুরি কাজ করিয়ে নিতে পারতো। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ব্যচেলর ও মাস্টার্সের ক্লাস ও পরীক্ষাগুলো সময়মতো দিতে পেরেছিলাম অনেকাংশেই তার সৌজন্যে। সে এমনকি বাড়ি এসে আমায় ঘুম থেকে তুলে সাথে করে নিয়ে গিয়ে, ক্লাসে কিংবা পরীক্ষার হলে বসিয়ে দিয়ে আসতো।
এর আগের দিন বলছিলাম আমাদের মধ্যে কে কাকে বেশি ভালবাসতো- সেটা নিয়ে ঝগড়ার কথা। আজ বলবো, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে ক্লাসে যেতাম সেই কথা। এটাও আমাদের দু'জনের গল্প।
৩.
যেসব দিন আমার সকাল ন'টায় ক্লাস-পরীক্ষা ইত্যাদি থাকতো, সেসব দিন সে আমাকে ফোন করা শুরু করতো নূন্যতম সাতটা থেকে। আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যে আমাকে নেয়ার জন্য হাজির হয়ে যেতো বাসার সামনে। আমি হয়তো কোনমতে ঘুম থেকে উঠে পায়জামাটা পাল্টে আর দন্তপাটিদ্বয় ব্রাশ করে ঢুলু ঢুলু চোখে নিচে নেমেছি মাত্র। ওকে দেখেই মনটা ভাল হয়ে যেতো। আর তারপর বাকিটা ছেড়ে দিতাম তার হাতে।
আমার রুটিন বের করে কোথায় ক্লাস হচ্ছে, কি সাবজেক্ট, নাকি পরীক্ষা- এ সব সে নিজেই মুখস্ত করে ফেলতো। তারপর রিকশাওয়ালাকে সেই মতো চলতে নির্দেশ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটা হতাশার হাসি দিয়ে জানতে চাইতো, আমি না থাকলে তোর কি হবে সে সম্পর্কে কোনো আইডিয়া আছে?
আমি মাথা নেড়ে বলতাম, নাহ্। সেই আইডিয়া দিয়ে কাম কি, যেটা কোনোদিন কাজ লাগানো যাবে না?
আসলেই এক সময় আমরা দুইজন ভেবেছিলাম; যা কিছুই হোক, আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব না। তাই ও না থাকলে জীবন কিভাবে চলবে, তা নিয়ে ভাবার দরকার কখনও অনুভব করি নি। এমনকি ব্রেক-আপ করে দিনের পর দিন একা একা থাকলেও কখনও মনে হয় নি ওকে ছাড়া আজীবন থাকতে হবে। জানতাম কোনো একটা পর্যায়ে আমাদের মান-অভিমান মিটেই যাবে।
৪.
ভাল হতো যদি সে সময় সাবধানতাবশত নিজের কাজগুলো নিজে নিজে করা এবং নিজের লাইফটাকে গুছিয়ে যাপন করার কৌশলগুলো শিখে রাখতাম। অনেক ভালো হতো তাহলে। আজকাল ওগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি ভীষণভাবে।
এই যেমন সেদিন ডর্মিটরি কর্তৃপক্ষ চিঠি পাঠিয়েছে, আর কতদিন তুমি আমাদের ডর্মিটরিতে থাকবে জানাও। আমি জানানোর শেষ তারিখটা দেখে, রেখে দিয়েছিলাম চিঠিটা। ভেবেছিলাম সময় আছে। যাবো'খন আগামী দেড়-দু' সপ্তাহের মধ্যে।
গতকাল রাতে চিঠিটা খাতার ভাঁজ থেকে বের হয়ে এলো। খুলে দেখলাম শেষ তারিখ পার হয়েছে এক সপ্তাহ আগে। আজ সকালে ক্লাসে যাবার আগে পড়িমরি ছুটলাম। ডর্মিটরি কর্তৃপক্ষ যদিও কোনো কটু কথা বলে নি, কিন্তু অনেককে এ কারণে অর্থদণ্ড গুণতে হয়েছে অতীতে। হয়তো আমি মাত্র এক সপ্তাহ দেরি করেছি বলে, বেশি কোনো সমস্যায় পড়তে হয় নি।
৫.
এরকম ছোট-খাটো সংকট অজস্র আছে। মিটিয়ে ফেলাটা কঠিন না, কিন্তু মিটিয়ে যে ফেলবো- সেই মোটিভেশনটা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এই যেমন মার্সিডিজ গাড়ির কোম্পানি ব্রেমেন শহরে তাদের যে কারখানা রয়েছে, সেখানে 'ছুটা বুয়া' ধরনের লোক খুঁজছে। কারখানা থেকে বের হওয়া নতুন গাড়ি ধোয়া-মোছার কাজের জন্য। দুই থেকে তিন মাসের কাজ। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘন্টা। সপ্তাহান্তে ছুটি। দুই-তিন মাসে চার থেকে ছয় লাখ টাকা আয় হয় সহজেই এসব কাজে। মার্সিডিজ বেতনও ভাল দেয়।
ওরা লোক খোঁজে সব সিজনেই। শুধু যথাযথ ই-মেইল ঠিকানাটিতে আগ্রহপ্রকাশ করে একটি চিঠি পাঠানো। অথচ এতটুকু কাজও করা হচ্ছে না। নিজেকেই নানাবিধ অজুহাত দেখাচ্ছি আমি। আমার এখন থিসিসের সময়, অতো সময় নেই ই-মেইল ঠিকানা খুঁজে বের করে ওদেরকে লেখার, ইত্যাদি।
অথচ কাজে যাওয়াটাও জরুরি। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলে অনেক পরিস্কার জিনিসও ঘোলাটে লাগে দেখতে। আর অন্য একটা শহরে গিয়ে এক-দু'মাস থাকা, কাজ করা ইত্যাদিতে আনন্দ আছে ভালোই।
হয়তো এক সময় কাজটার জন্য আবেদন করেও ফেলবো। তারপর সেই সব বন্ধু-বান্ধব, যাদের সাথে আমি সাধারণত কাজ করতে যাই; তাদের সাথে বোঁচকা-গাঁইট বেঁধে আবার পথে নেমে পড়বো।
শেষবার আমরা দলবেঁধে লাইপছিশে কাজ করতে গিয়েছিলাম। শুদ্ধ জার্মান উচ্চারণে শহরটির নাম লাইপজিগ। তবে মধ্য-জার্মানীতে তথা বায়ার্নের দিকে 'জিগ'-কে প্রায়ই 'ছিশ' উচ্চারণ করেন স্থানীয়রা। জিগ কিংবা ছিশ দিয়ে শেষ হয় এমন অনেক শব্দ রয়েছে জার্মান ভাষায়, যেমন, ভিটছিশ, ছোয়ানছিশ, মেটছিশ, শুইটছিশ ইত্যাদি। সবগুলোর 'ছিশ' প্রত্যয়কে চাইলে 'জিগ' দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়।
৬.
সেদিন আমাদের কথা হয়েছিল বহুকাল পর। কি কথা হয়েছিল- তা নিয়ে লিখবো অন্য কোন এক সময়। আজ বরং কথার পরে কি ঘটলো সেই কথা বলি।
খুব ভালো ভাবে মনে নেই যদিও, কেননা ঘটনার আকস্মিকতায় আমার শরীরের সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট 'হ্যাং' করেছিল তখন। অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম বোধহয়, কথা শেষ হওয়ার পর।
তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আনমনে। ঘুম থেকে যখন উঠেছিলাম তখন মধ্যরাত। সে সময় আমার জানালার সামনে আদুরে ভঙ্গিতে শুয়ে থাকা জনশূন্য রাস্তাটির উপরে ঠিকরে পড়ছিল জ্যোৎস্নার আলো। তাই দেখছিলাম আনমনে ঘুম ভেঙ্গে।
দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, মনটা সাময়িকভাবে 'হ্যাং' হয়ে যাওয়ায় আসলে ভালোই হয়েছিল। নাহলে কি কি কথা হয়েছে, সবকিছু মনে থাকতো এবং সামলানো সহজ হতো না। তবে হ্যাঁ, একটা পর্যায়ে সেই রাতে আমি অনেকক্ষণ ধরে তারাপদ রায়ের 'এক জন্ম' কবিতাটা নিয়ে ভেবেছিলাম- এটা মনে আছে।
"অনেকদিন দেখা হবে না
তারপর একদিন দেখা হবে।
দুজনেই দুজনকে বলবো,
‘অনেকদিন দেখা হয় নি’।
এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়ত জানা যাবে
বা হয়ত জানা যাবে না,
যে
তোমার সঙ্গে আমার
অথবা
আমার সঙ্গে তোমার
আর দেখা হবে না।"
৭.
কবিতাটায় কোনো আশ্রয় নেই। হাহাকার দিয়ে ভরানো হয়েছে শূন্যতা। কি ভয়ের একটা ব্যপার, তাই না? অথচ একইসাথে কি দূর্দান্ত সুন্দরও! শিল্প আসলে এমনই হয়।
আচ্ছা, আমরা সবাই কি এভাবেই হাহাকার দিয়ে শূন্যতা ভরাই আজীবন? জানি না। হৃদয় নামের এক যন্ত্রণা বুকের ভেতর সেট করা।
এই-ই মূলত এখনকার বাস্তবতা। অসমাপ্ত, তাই লিখে চলেছি এখনও। খুঁজে ফিরছি শেষের ঠিকানা।
---





মন্তব্য করুন