বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন
তাপিত হৃদয়/ যেখানে শীতল হয়/ সেখানে বস্তু রবে জেনো নিশ্চয়...
বাম হাতের মধ্যমা আর অনামিকায় ধরা লাল বেনসনটায় সুখ টান দিতে দিতে নান্নু পাগলা যখন হেঁড়ে গলায় গানটা গেয়ে সামনে দিয়ে হেঁটে পার হচ্ছিল, তখন রাত প্রায় ১২টা। শাহবাগের সেই রমরমা অবস্থা এখন আর নেই। মেট্টোরেলের লাইন বসার আগে জায়গাটা পুরোপুরি অন্য একরকমের ছিল! কোটি মানুষের শহরের এক বিরাট ব্যস্ত মোড়, তারপরও ওইখানটায় গিয়েই সকলের গতিটা যেন একটু স্তিমিত হয়ে পড়তো! নিন্দুকেরা মোড়ের যানজটকে মুখ্য দায়ে অভিযুক্ত করতে পারেন কিন্তু আমি বলি ওটিই সেই এক্স-ফ্যাক্টর! যার টানে শাহবাগ হচ্ছে শাহবাগ, আর গুলবাগ হচ্ছে গুলবাগ।
শাহবাগের একটা টান ছিল। কিসের যেন একটা টান। তা শুধু মানুষই নয়, পশু-পাখি, গাছপালা, যানবাহন সবাই সেটা অনুভব করতো। সেই জায়গাটা এখন পুরোপুরিই হারিয়ে গেছে। সেদিন শাহবাগ মোড়ের কাছাকাছিই থানার গেট থেকে একটু সামনে দাঁড়িয়ে টং দোকানের চা পান করতে করতে সেটিই ভাবছিলাম। আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম ১০ বছর আগে ফেলে যাওয়া জীবনের একটি অধ্যায়ের দিকে। কত কত কথা যে মনে পড়ে যেতে চাইছিল মুহূর্তের মধ্যে আর কত মানুষের মুখও যে ভেসে উঠতে চাইছিল স্মৃতির মানসপটে, কিন্তু কাউকে সুযোগ দিলো না নান্নু পাগলা। সবার আগে একেবারে বাস্তবেই উদয় হলো চক্ষুতটে।
নান্নু পাগলা একবার আমাকে সিগারেট খাওয়ার পক্ষে এমন এক মোক্ষম যুক্ত দিয়েছিল যে তারপর আমি আর কখনোই সিগারেট ছাড়ার কথা ভাবার সাহস করি নি। তাও যুগের অধিককাল আগের কথা। কি যে তার যুক্তিটি ছিল, তাও ভুলে গিয়েছি। কিন্তু যুক্তিটি যে মোক্ষম ছিল, তা ভুলি নি।
সেই নান্নু পাগলাকে সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখে অকারণে মনটা ভাল হয়ে গেল। ওর হাতে লাল বেনসন জ্বলছিল। তাই দেখে আমার নিজেরও খানিক লাল বেনসন টানার সাধ হলো। দোকানে টাকা মিটিয়ে দিয়ে পথে নেমে গেলাম। সিগারেটও জ্বালিয়ে নিয়েছিলাম।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর গিয়ে আশাহত হতে হলো। জায়গাটায় একসময় কত শত শত মানুষ প্রতিদিন সন্ধ্যায় ধর্ণা দিতো। তরুণ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, ছাত্র, চোর, কট্টর, মুক্তমনা, চিন্তাশীল, স্বপ্নবান, ভবঘুরে, নারী, পুরুষ- সব ধরনের মানুষ। সন্ধ্যার পর গমগম করতো পুরো এলাকাটা। প্রতিটা চায়ের দোকানে চারটা-পাঁচটা পর্যন্ত চায়ের কেটলি একসঙ্গে চুলায় চাপিয়ে দিয়ে সামাল দিতে হতো যুবসমাজের তৃষ্ণা। মাঝে মাঝে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোর মতো কোন কিশোরীর খিলখিলে হাসি ছড়িয়ে পড়তো আলো-আধাঁরীঘেরা সেই পরিবেশে। চারপাশটা অদ্ভুত সুন্দর দেখাতো। ওই জায়গাটার সঙ্গে, ওইখানকার সবকিছুর সঙ্গে অজানা একটা টান অনুভূত হতো সে সময়। আজ চারপাশটা বড় বড় সবুজ ঘাসে ঢেকে গেছে। অযত্নের চেয়ে বেশি প্রকট হয়ে বাজে যেটা, সেটা হচ্ছে প্রবল আক্রোশে, স্বেচ্ছায় অপরিকল্পিতভাবে পার্কটা থেকে শুধু প্রাণের আসরটুকু কুপিয়ে খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। আর সব আগের মতোই নোংরা, বিচ্ছিন্ন, আধখাওয়া হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এদিকে সেদিকে।
নান্নু পাগলাকে দেখে মনটা যতোটা ভাল হয়ে গিয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে মনটা ততটাই খারাপ হয়ে গেল। তাই মনে মনে কবিতা ভাবার চেষ্টা শুরু করলাম।
তোমার চোখ
তোমার চোখের ঘোলা মনিটায়
ডুব দিয়ে এক বালক সাঁতরায়।
ওকে ডেকে আমার
কান মলে দিতে ইচ্ছে করে।
অমন করে কি কারো চোখেতে ডুবতে আছে?
সর্বনাশা কালবোশেখী- এক পলকে গঙ্গা থেকে
সাগর মাঝে ভাসিয়ে নিলে?
হায়রে বালক, জানিস নি কি কখনো আগে
বালিকাচোখে কালবোশেখী-
হাসতে হাসতে নামতে পারে।
তোমার চোখের ঘোলা মনিটায়
এমন কত গল্প জমে,
চোখ ঝাপটে গল্পগুলো
মুছতে হয় কষ্ট করে।
তোমার চোখের ঘোলা মনিটা
অনেক দূরে অনেক দূরে।
কবিতা ভাবতে নিলেই আমার মন আস্তে আস্তে ভাল হওয়া শুরু করে। এবারও ব্যতিক্রম হলো না। একটা ভাবনা থেকে আরেকটা ভাবনার উৎপত্তি ঘটা শুরু হলো। আমাদের দেশে যেমন প্রচুর শিশু প্রতি বছর জন্মায় যাদের চোখ কালো নয়। অন্য যেকোন রং হলেই সে শিশুদেরকে, তাদের সমবয়সী মহলে "বিড়ালচক্ষু" বা "বিলাই চোখ" বা শুধু "বিলাই" বলে ডাকাটা মোটামুটি দেশের সব অঞ্চলেই প্রচলিত। অথচ সাধারণ কালো চোখ যেমন সুন্দর, তেমন অন্য রংয়ের চোখেও রয়েছে অনন্যতা। সুন্দর ও ইতিবাচকভাবে বিষয়টির কদর করার রীতি যদি সমাজে চালু থাকতো, বিলাই বলে ডাকার রীতি না থেকে- তাহলে তা আমাদের শিশুদের জন্য কত উপকারী হতে পারতো? আমাদের কবি-সাহিত্যিকদেরও দেখা যায় না, অন্য রংয়ের চোখের তারিফ করতে সেভাবে। ভাবতে ভাবতে টিএসসি এলাকার গেটটা দিয়ে বের হয়ে এলাম পার্কটা থেকে।
টিএসসি'তে এখন ছাদ পড়েছে। ওই যে বললাম না মেট্টোরেলের কথা। ঠিক রাজু ভাস্কর্যটার উপর দিয়ে মেট্টোরেলের লাইনটা গিয়েছে এমন না- একটু পাশ দিয়ে গেছে। তবে তাতেই টিএসসি'র খোলামেলা ভাবটা কদর্য এক বন্দিত্বের ভেতর আটকা পড়ে গেছে। মানুষজন এখনও আগের মতোই সব জায়গায় বসে, বসছে- দেখে-শুনে মনে হলো। কিন্তু আগে মানুষজনকে দেখে মনে হতো, তারা বসে আছে। গল্প-গুজব করছে। আর এখন মনে হলো, কেউ কংক্রীটের খাম্বার সঙ্গে হেলান দিয়ে আছে তো, কেউ কোন একদিক দিয়ে উঠে যাওয়া রেলিং ধরে বাদরঝোলা হয়ে আছে। মাথার ওপর মেট্টোরেলের লাইন বসাতে গিয়ে, রাস্তা কেটে বড় বড় কংক্রীটের খাম্বা বসাতে হয়েছে, তাতে পুরো জায়গাটা ছোট্ট একটা চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত হয়েছে। যে চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণ আবার সেখানে বিচরণরত মানুষ।
বেশিক্ষণ টিকতে পারবো বলে মনেও হচ্ছিলো না। তাড়াতাড়ি রাস্তা পেরিয়ে, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির গেটটার দিকে হাঁটা দিলাম। এই গেটটা আর অপরপাশের রোকেয়া হলের গেটটা চিরকাল একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিল। প্রতিদিন সকালে উঠে তারা একে অপরকে দেখে, সারাদিন একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, রাতে একে অপরের সামনে ঘুমুতে যায় কিন্তু কখনো রাস্তাটুকু পার হয়ে গেট দু'টি এক হয়ে যেতে পারে না।
দুইটি জড়, স্থির, কংক্রিট, ইট, লোহা ইত্যাদিতে নির্মিত স্থাপনা কেন মানুষের মতো একে অপরের কাছে আসতে চাইবে- কিংবা কি করে আসবে যেহেতু তাদের প্রাণই নেই- ইত্যাদি ভাবনাকে নাহয় দূরেই সরিয়ে রাখি। কিন্তু তারা যে একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে ঠাঁই দু'টো জীবন পার করে দিচ্ছে- এটা কেন আমার মনে হলো তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আমি বেলালের দোকানের সামনে চলে এলাম। যেখানে তখনো পাতলা টক দিয়ে পাকোড়া, সিঙ্গারা, সমুচা ও চা পাওয়া যাচ্ছিল। ভাবলাম চিনি ছাড়া এক কাপ কড়া লিকারের চা খাওয়া যাক। সঙ্গে বেনসন এন্ড হেজেস্- লাল রংয়ের সিগারেটটা। নতুন একটা প্যাকেট থেকে বের করা হলে সবচেয়ে ভাল হয়। জাকির ভাইকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে, তারও ব্যবস্থা হলো। জাকির ভাই সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর সামনেই, বেলালের দোকানটার পাশে সিগারেট বিক্রি করেন। দশ বছর আগে ভদ্রলোকের সঙ্গে মাসিক চুক্তিতে বাকির হিসাব চলতো আমার। এখনও মনে আছে আমার। উনি অবশ্য ভুলে গিয়েছিলেন। খালি চেহারাটা মনে ছিল।
সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র একেকটা নক্ষত্রকণা আমরা সবাই। অল্পকিছু সময়ের জন্য মানবরূপে ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছি। এরপর যে আবার কখনো অমন কোন গেট হয়ে আবির্ভূত হবো না, তার কি গ্যারান্টি- বেলালের আনা ধূমায়িত চায়ের কাপটিতে চুমুক এবং তারপর বেনসনের মুখাগ্নি ঘটিয়ে আমার মাথায় প্রথম খেলতে এসেছিল এ চিন্তাটিই।
হিন্দুধর্মের বহুল প্রচলিত গল্প পুনর্জন্মের সঙ্গে চিন্তাটির মিল রয়েছে আলবাত। কিন্তু তাতে কি দমে আমার মস্তিষ্ক কর্মবীর? গেট হয়ে যদি কোন জীবনে জন্ম নিতেই হয়, তাহলে সে কিসের গেট হবে সেটা নিয়ে তখন ভাবছে। আর ওদিকে আমি ইতি-উতি তাকাচ্ছি পরিচিত কাউকে দেখা যায় কিনা ভাবতে ভাবতে। এহসানকে দেখা গেল দূর থেকে একটা বাইক নিয়ে দ্রুত টান দিয়ে কাছে এসে দাঁড়াতে। আরে ভাই, আপনে?
নান্নু পাগলার সঙ্গে হওয়া দেখাটা আসলে তেমন কাজের কিছু হয় নি। লোকটা শুধু হাঁটতে হাঁটতে সামনে দিয়ে চলে গেছে। এহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল ভিন্নরকম। অনেকক্ষণ কথাবার্তা হলো। জীবনের পথে পাড়ি দেয়ার গল্প শুনলাম। ছেলেটার বাইকে করে খানিক ঘোরাঘুরি হলো ক্যাম্পাসে। পুরোনো জায়গাগুলো আবার একবার দেখা হলো। বিশেষ করে কলাভবন, মধুর কেন্টিন, মল চত্বর, মুহসীন হল ইত্যাদি জায়গাগুলো দিয়ে আলো-আধাঁরির মাঝে পাড়ি দিতে দিতে আমার পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো সব টাটকা হয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিল।
আজ কত শত দিবস পর সে দিনগুলোর ভাবছি আমি! কত দূর পাড়ি দেয়ার পর!। অথচ এক সময় প্রতিটি দিন, এ পথগুলো দিয়ে সর্বক্ষণ যাতায়াত ছিল আমার। সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত, গভীর রাত, ভোর- এমন কোন বেলা কি ছিল, যে বেলায় ওই এলাকাগুলায় আমার যাওয়া হয় নি? এবং যাওয়া হয়েছেও প্রতিবার গভীর আকর্ষণ সঙ্গে করে। হয়তো মুহসীন হলে যাচ্ছি হট্টমন্দিরে, বা মধুর কেন্টিনে যাচ্ছি রিপোর্ট লিখে অফিসে পাঠাতে, কিংবা গ্যারেজে যাচ্ছি মৌতাত আর আড্ডার খোঁজে। সেসব জায়গায় যাওয়া থেকে কেউ কখনো আমায় ঠেকাতে পারতো না। আমার সব কাজ পরিকল্পিত হতো, ওইসব কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। অমন প্যাশন নিয়ে দিনের পর দিন কোনো একটা জায়গায় আপনি গিয়ে দেখেন না- কেমন লাগে আপনার! আর তাই তো আমার জীবনের কলকব্জাটাই একটু কেমন যেন পাল্টে গেছে। চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্ম সবই করি একটু অন্যভাবে। কিংবা বলা যায় হয় একটু অন্যভাবে। আমি নিজে অবশ্য এ বিষয়ে নিজের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে নিয়েছি। পৃথিবীতে কতোই তো অন্যরকমের মানুষ আছে, তাই না? আর মৃত্যুর পর যদি গেট হতে হয়, তো আমি ঠিক করেছি পুরোনো আমলের কোন প্রাসাদের গেট হবো।
অনেকগুলো কারণে আমি পুরোনো আমলের কোন প্রাসাদের গেট হবো বলে মনোস্থির করেছি। পৃথিবীর বেশিরভাগ পুরোনো আমলের প্রাসাদের গেটগুলো এখন অচল। খুব দরকার না পড়লে, খোলা-লাগা করা হয় না। এ হচ্ছে সুবিধা নং এক। আবার পুরোনো আমলের প্রাসাদগুলোর ভৌগলিক অবস্থানও প্রায়শই আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা কোন ছবির মতো সুন্দর ইউরোপীর গ্রামে। আশপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য হচ্ছে সুবিধা নং দুই। পরের জন্মে পুরোনো আমলের প্রাসাদের গেট হয়ে জন্মানোর সুবিধা নং তিন তথা বৃহত্তম সুবিধাটি হচ্ছে, সাধারণত জায়গাগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা লেগে থাকে। অর্থাত বোরিং লাগবে না গেট হয়ে সারাজীবন এক জায়গা ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে। যতদিন না কোন ভূমিকম্প বা দুর্যোগ আমায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে না রেখে যায়। ভালোই হবে, খারাপ হবে না।
এহসানকে বিদায় জানানোর পর, আবারো বেলালের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে একটি কৃত্রিম ফোয়ারা। এটি নতুন বানানো হয়েছে। আমাদের সময় জায়গাটা ফাঁকা ছিল। রেভেনাস নামে একটা খাবারের ছোট্ট দোকান ছিল। ছোট্ট দোকান হলেও তাতে দুপুরের বিরিয়ানি আর তেহারিটা দারুণ দিতো। আর সারাদিন ভাজিভুজি তো লেগেই ছিল। ওসব ছোট্ট দোকান উঠিয়ে এখন সুবিশাল ফোয়ার হয়েছে।
---
(বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন মূলত অস্থায়ী নামকরন)





মন্তব্য করুন