গল্প: তুমি আমার কাছে তুমি যা বলবা তাই (পর্ব- ৪)
নামটা জেনেই বিদ্যুৎ চমকের মতো সব কথা মনে পড়ে গিয়েছিল আমার। তারপর কথা হয়েছিল ওর সঙ্গে টানা চারটি ঘন্টা। তবে তাতে আমাদের কারোই একদম কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না, জানেন? অথচ প্রায় আজীবনই মানুষের সঙ্গে মেশার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে আমি। কাউকে একটু ভাল লাগলে প্রথমে দুইটা মাস অপেক্ষা করি- পছন্দটা কতোটা গভীর সেটা বোঝার জন্য। তারপর তার সঙ্গে টুকটাক আলাপ শুরু করি। সেই আমি-ই কিনা প্রথমদিনই নিজের সব গার্ড নামিয়ে রেখে, সরল-সহজ, বোকা আর আত্মপ্রেমী চরিত্রটা খোলাখুলি দেখতে দিয়েছিলাম মিসিসিপিকে। অনুধাবন করতে দিয়েছিলাম আমার চিন্তাধারা। সে-ও আমাকে ঠিক একইভাবে বরণ করে নিয়েছিল তার মানসপটে। তাই কয়েক মাসেই একে অপরের খুব প্রানের মানুষ হয়ে উঠেছিলাম আমরা।
দিনের সকল কথা সে সময় জমিয়ে রাখা হতো তার জন্যই। আমার দৈনন্দিন জীবনে যা ঘটছে, তার অনেক কিছুই যেন প্রতিনিয়ত মেসেজে লিখে আর ছবিতে উঠিয়ে তাকে পাঠিয়ে না রাখলে চলছিল না আর! মিসিসিপিও তার দৈনন্দিন আর সার্বক্ষণিক জীবনের একটা বড় অংশ আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। সারাদিন কে-কখন-কোথায়-কি করছি, তার খবর দু'জনের কাছেই থাকে আমাদের। সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার দুরে অন্য গোলার্ধে বসে, আমরা একে অপরের সময় মিলিয়ে 'শুভ সকাল' আর 'শুভরাত্রি' জানিয়ে দিন আনি-দিন খাই।
শুরুর সেই দিনের এনার্জি ছড়িয়ে পড়িয়েছিল পরবর্তীতে সারাটা বছরের ওপরে। প্রথম ছয় মাস তো আমরা প্রায় অন্ধের মতোই দুজনের ভেতর ডুবে ছিলাম শুধু। তারপর প্রথম টের পেয়েছিলাম কতোটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি একে অপরের উপর আমরা। তবে বুঝতে পারছিলাম না একটা জিনিস, আমাদের সম্পর্কটা আসলে কেমন!
আমরা কলেজ জীবনের সহপাঠী। জীবনের অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে কাছাকাছি হয়েছি। সে আমার সবকিছু যেমনটা বোঝে, তেমন আগে আর কাউকে বুঝতে দেখি নি। আবার আমি-ও ওর গলার স্বর শুনে বুঝে ফেলি- সবকিছু কি ঠিক আছে না ঠিক নেই! চাইলেই মনে মনে একে অপরের জন্য এক আকাশ সমান আশ্রয় বিছিয়ে দিতে পরি আমরা। উভয়ের অদম্য আগ্রহই সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল সেসব ঘটনার। একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের যেকোন উপলক্ষের জন্যই আকুল হয়ে থাকতাম আমরা। যদিও তেমন কোন বাঁধা ছিলও না আমাদের, শুধু দু'জনের মাঝের মহাদেশসম দুরত্বটুকু ছাড়া।
তাই গভীর রাতে যখন ঘুমিয়ে পড়ার সময় হতো, তখন খারাপ লাগতো আমাদের। জানতাম সুস্থ থাকার জন্য ঘুম জরুরি কিন্তু ওর-ও ইচ্ছে হতো না ঘুমাতে, আমারও ইচ্ছে করতো না ওকে ছাড়তে। নির্ঘুম রাত কাটতো প্রায়শই দুজনের। কিন্তু ক্লান্ত হতাম না মোটেও। যেন একে অপরের সঙ্গে কথা বলে রাত কাটালেই, হয়ে যেত আমাদের ঘুম। সেসময় কতদিন যে ভেবেছি, ঘুম ভেঙ্গে চোখ মেলে ওকে দেখতে পাবো। কখনো ঘটে নি যদিও।
তবে স্বপ্ন দেখতাম প্রায়ই। এই তো সেদিনই এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম, যার সত্যে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য যেকোন মূ্ল্য আমি চুকাতে প্রস্তুত ছিলাম। যদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হতাম, সাথে সাথে যুদ্ধ ছেড়ে গোলাপের ট্রাক নিয়ে ফিলিস্তিনের দিকে রওনা হতাম। পুতিন, বুড়ো বাইডেন, ট্রাম্প, কিংবা এমনকি কমলা হ্যারিস হলেও- কড়জোরে নিজের যুদ্ধাপরাধ এবং সংশ্লিষ্ট সব সাজা মাথা পেতে নিতাম। ইলন মাস্ক হলে আমার সবগুলো স্যাটেলাইট পৃথিবীর গরীবদের বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দিতাম। এক্স-কে আবার টুইটার বানিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাইতাম অ্যাম্বার হার্ড আর জনি ডেপের কাছে, তাদের জীবনটাকে নিজের লোভ সংবরণের অক্ষমতা দ্বারা বিষিয়ে তোলার জন্য।
স্বপ্নটার কথা বলি এবার! মিসিসিপির সঙ্গে আমার তখনও সামনাসামনি দেখা হয় নি, শুধু মেসেজ-ফোনকল-ভিডিও ইত্যাদিই একমাত্র স্মৃতি জমানোর সম্বল; এমন এক দিন দুপুরে অফিসের কাজের ফাঁকে একবার তন্দ্রামতো একটা কিছু লেগে এসেছিল। তাই আমি অফিসের বিশ্রামকক্ষে গিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিয়েছিলাম, কয়েক মিনিটের ব্রেক নেয়ার উদ্দেশ্যে।
কাজটি আমি মাঝেমাঝেই করতাম। অফিসে লাঞ্চ সারার পর ১০ বা ১৫ মিনিটের একটি নিরিবিলি বিরতি, আমাদের অফিসের বিশ্রামকক্ষটায়। বিশেষ করে যেসব দিন অফিস থেকে সব কলিগরা মিলে একসঙ্গে বাইরে খেতে যাওয়া হতো না, সেসব দিন। কেননা ওই সব দিনগুলোতে সাধারণত বাসা থেকে নিয়ে আসা সাধারণ ভাত-ডাল ইত্যাদি খাওয়া হতো। তারপর ভাতঘুম-এর নামে একটু দেশীয় নস্টালজিয়া- এই আরকি!
আসলে মানুষের মনের ভেতরটাই হচ্ছে সবকিছুর আঁধার। ওখানেই সব ঘটনাগুলোর জন্ম হয়। নাহলে ভাতঘুম কথাটা শুনলে কেন দেশের কথা মনে হয় সবার আগে- আর কোন কথা নয়? অন্য জাতির মানুষেরা কি একই কাজ করে না? আলবত করে। তারপরও কোথায় যেন একটা ছোট্ট স্বদেশী সুর বেজে ওঠে, কেউ দুপুরবেলায় ভাতঘুম দিয়েছে শুনলে।
যাক সে অন্য আলোচনা। একটু ছড়িয়ে লিখছি বলে আবার ভাববেন না যেন, আমার চিন্তার সুতোর পেছনে কোন নাটাই নেই। নাহয় একটা গল্প একটু রয়ে-সয়েই বলি, একটু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সাজাই। অসুবিধা তো নেই, তাই না?
সেদিনের ছোট্ট ভাতঘুম-পরবর্তী স্বপ্নরাজ্যে পরিভ্রমণের কালে কোত্থেকে যেন মিসিসিপি এসে জুটে গিয়েছিল পাশে। প্রথমদিকে অবাক হয়েছিলাম। স্বপ্নে আমি কি করছিলাম, কোথায় করছিলাম- সেসবই গৌণ হয়ে মিসিসিপি'র উপস্থিতি মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। তাই স্বপ্নের ভেতরেই তাকে নিয়ে দেখতে শুরু করি আরেকটি স্বপ্ন। যেখানে আমরা দুজন নীল সাগরের দিকে তাকিয়ে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সূর্যটা সে সময় পশ্চিমতীরে অস্ত যাচ্ছিল আর সেদিকে তাকিয়ে ভিজে উঠছিল দুজনেরই চোখ। কি কারণে চোখ ভিজে উঠছিল, তা মনে নেই ভালমতো। আর ঠিক তখনই আমার কানের কাছে জাহাজের ভেঁপু বেজে উঠেছিল।
কানের কাছে তারস্বরে জাহাজের ভেঁপু বেজে ওঠায় স্বপ্নের ভেতর যে স্বপ্নটা দেখছিলাম সেটা ভেঙ্গে যায়, এবং আমি ফিরে আসি প্রথম স্বপ্নটায়। যেখানে আমি একা ছিলাম। মিসিসিপিকে চারপাশে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না আর। আকুল হয়ে উঠছিলাম ধীরে ধীরে। ঘুমের ভেতরেই হাঁসফাঁস লাগছিল। একসময় ওকে ডাকতে ডাকতে ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসেছিলাম আমি। তারপর থেকে একটা কথাই শুধু মনে হচ্ছিল, ওই জাহাজটা খুঁজে বের করতেই হবে আমাকে, যেটার ভেঁপুর শব্দে আমার স্বপ্নের ভেতরকার স্বপ্নটা ভেঙ্গে গিয়েছিল।
মিসিসিপির সঙ্গে সবকিছু নিয়ে কথা হতো। আমার স্বপ্নগুলো শুনে কখনও শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠতো সে। আবার কখনও কপট রাগও দেখাতো। কেন ওকে ছাড়াই ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি আমি?- তাই। কি করে ওর সঙ্গে ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, তা নিয়ে কথা বলতাম আমরা। নানান উপায় থাকলেও কোনটাই কারো মনমতো হতো না।
একসঙ্গে স্বপ্ন দেখার সহজ সহজ উপায়গুলোর কোনটিই মনমতো না হওয়ার পেছনে আমাদের দু'জনের জীবনের সে সময়কার পরিস্থিতির ভূমিকা ছিল বেশ খানিকটা। দু'জনই বুঝতাম যেকোন চিন্তার সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যতও জড়িত। তাই আমাদের কারোই কোন কিছুই হুট বলতে করে বসতে ইচ্ছে হতো না।
তাই দ্রুতই একবার দেশে যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সেটা নেয়ার পর জীবনে এসেছিল এক সুদীর্ঘ ক্যালেন্ডারের-তারিখ-পর্যবেক্ষণ-কর্মসূচি পালনের কাল। প্রতিদিন রাতে নিয়ম করে ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়াতাম আমরা। একটা একটা করে দিন পার হতো, আর সেই দিনটির ওপর দু'জন দুই দেশের দুইটি ক্যালেন্ডারে ক্রস চিহ্ন আঁকতাম। আর সারাদিন কখনো মেসেজে, কখনো অডিও কলে কিংবা কখনো হয়তোবা ভিডিও কলে পরিকল্পনা করতাম- কি কি করবো আমরা দেখা হলে।
৯৫ তম ক্রস চিহ্নটি দাগানোর পর, নার্ভাস নাইনটিজে ভেঙ্গেছিল আমাদের প্রথমবারের জুটি। ৯৬ তম দিনের সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে শাদা শিফনের শাড়ি আর আকাশী নীল রংয়ের ব্লাউজ পড়া শরতের কাশফুলের মতো মেয়েটিকে আমি দেখতে পাই। নিজের চারপাশটা এক আদুরে দ্যূতিতে ভরিয়ে নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল মেয়েটি। হয়তো ভেবেছিল, আমি বিদেশে থেকে থেকে লাটসাহেব হয়েছি, তাই হাতে করে নিয়ে এসেছিল একতোড়া রঙিন ফুল।
সেসবের দিকে খুব বেশি নজর দিতে পারি নি আমি, প্রিয় পাঠক। সেজন্য যারপরনাই দু:খিত। মিসিসিপিকে দেখতে পেয়েই কি যে হয়ে গিয়েছিল আমার! স্থান-কাল সব ভুলে সজোরে জাপটে ধরেছিলাম ওকে দুই হাত বাড়িয়ে!
মুহূর্তের ভেতর ওর শরীরের মিষ্টি আবেশে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমি। চোখ বন্ধ করতেই টের পেয়েছিলাম ওর বুকের সাথে আমার বুক যেন বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া কোন বইয়ের দুইটি পাতার মতো মিশে আছে। আর ভেতর ভেতর বিপুল বেগে ওঠানামা করছে দু'টি হৃদয়। উত্তেজনায় সে দু'টি যেমন ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়তে চাচ্ছে, আবার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটায় এক অনাবিল প্রশান্তির ধারাও বইছে দু'জনের বুকে একই সঙ্গে। চুম্বকের মতো অসাড় হয়ে খানিকটা সময় শুধু ডুবেই ছিলাম একজন আরেকজনের ভেতরে আমরা।
বাইরে থেকে যারা ঘটনাটি দেখেছিলেন, তাদের কাছে হয়তো মনে হয়ে থাকতে পারে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটেছে সবকিছু। কিন্তু সেটা শুধুই বাইরে বাইরে। মনের ভেতর সে ঘটনার রেশ এতটাই প্রবলভাবে বয়ে চলছিল সে সময়টায়, যে বছরখানেকের অপেক্ষার পর দেখা হলেও আমাদেরকে অনেকটা সময় শুধু চুপ করে বসে থাকতে হয়েছিল- প্রথমবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরার সেই অনন্য অনুভূতিটি পুরোপুরি অনুধাবন করতে।
আসলে অমন ঘটনা মানুষের সঙ্গে সাধারণত খুব কমই ঘটে। কিংবা ঘটলেও পারিপার্শ্বিকতা মানুষকে খুব কমই তা বুঝতে দেয়। মিসিসিপি আর আমি ভাগ্যবান ছিলাম। সেদিন ওই ঘটনাটিকে আমরা গভীর সাগরের মুক্তার মতো একটি স্মৃতি হিসেবে সেঁচে তুলতে পেরেছিলাম।
দুজনের মিলে যত্ন করে সে মুক্তাটি আমাদের যৌথ খামারে সাজিয়ে রেখেছি। এখনও মাঝে মাঝে সেটি বের করে খুলে দেখি। মুহূর্তেই সেদিনের কথা মনে পড়ে যায়। যেদিন আমরা চারপাশের অসংখ্য মানুষের মাঝে দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে ধরে এক কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম।
অমন স্মৃতির আসলেই কোন বিনিময় মূল্য হয় না। বিমানবন্দরে সামনাসামনি দেখা হওয়ার পরের কয়েকটি দিনে আমরা দু'জনে মিলে আরো বেশ কিছু স্মৃতির মুক্তা আহরণ করেছিলাম। সেগুলো নিয়ে সামনে আরো কথা বলবো।
---





মন্তব্য করুন