রাঁঙিয়ে দাও লাল সবুজে
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কম বেশী সকলেরই জানা, আমরা জানি ১৯৭১ সালে একটা যুদ্ধ হয়েছিলো আর সেই যুদ্ধে বাঙ্গালী জাতি পরাজিত করেছিলো ততকালীন পশ্চিম পাকিস্তানকে, আর ছিনিয়ে এনেছিলো লাল সবুজের পতাকা।
আজ আর সেই কথা বলবো না, আজ বলবো অন্য এক বিজয়ের কথা।
একাত্তরের চুড়ান্ত বিজয়ের পূর্বেই দেশ ছেড়েছিলো ৭১এর ঘাতকদের এদেশীয় দোসরদের অনেকেই, যারা দেশে ছিলো তারাও গা ঢাকা দিয়েছিলো। ৭৫এর ১৫ই আগষ্টে যখন স্বাধীনতার মূল নায়ককে স্বপরিবারে হত্যা করা হলো, তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগলো এক এক করে সেই রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের হোতারা। কেউ কেউ ধর্মীয় ভাব ধরে, ইসলামিক চিন্তাবিদ সেজে নিজেদের আসল পরিচয় আড়াল করে ফেলার চেষ্টা চালাতে থাকে। অনেকাংশে তারা সফলও হলো। কারণ এদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভীরু এবং অনেক মানুষ তাই বিশ্বাস করতো যা পত্রিকায় আসতো, যা প্রচার করা হতো গন মাধ্যম গুলোতে। আবার অনেকেই তার চেয়ে বেশী বিশ্বাস করে শোনা কথায়। সহজ সরল বাঙ্গালীদের এই সরলতার সুযোগ নিলো এই রাজাকারেরা। তারা জানতো , ধর্মের ভয় দেখালেই অনেক মানুষের মুখ বন্ধ করা সম্ভব ছিলো আর তাই তারা শুরু করলো নতুন অভিযান, আর তা হলো ধর্মের নাম দিয়ে মানুষের ভেতরে ঢুকা আর এক সময় যখন দেখবে একজন মানুষ তাদের প্রচার করা সেই মওদুদী ধর্মের পিল খেয়ে নেশাগ্রস্ত তখন কৌশলে তাদের মন থেকে মুছে দেয়া হবে ৭১এর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
এক্ষেত্রে উল্লেখ করবো, আমার খুব ছোট বেলার এক সহপাঠীর একটা গল্প। ছোট বেলা থেকেই সে খুব মেধাবী ছিলো। ছোট বেলায় আমি তাকে সব সময় দেখতাম আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বড় হতে থাকে, ব্যাচেলর শেষ, করে মাস্টার্স, হঠাত দেখি সে খুব ধার্মিক হয়ে গেছে। এতে দোষের কিছুই নেই। একজন মানুষ যদি সত্যিকারের ধর্ম কর্ম করে তাতে কারোই কোন অভিযোগ থাকার কথা নয়। বরং ভালো যে সে মিথ্যা বলবেনা, কারো ক্ষতি করবেনা এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু তার সাথে বেশ বাকবিতন্ডতা শুরু হলো আমার এই নিয়ে যখন বুঝতে পারলাম তার ভেতরে ইসলামের সাথে সাথে জামায়াতি-শিবিরের আফিমও ঢুকে গেছে। এই কথা বুঝতে আমার কষ্ট হয়নি যখন সে একদিন আমাকে বলে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য সে জামায়াতকে ঘৃণা করতে পারেনা। এরপর বাকী ঘটনা আর নাই বা বলি।
যারা এখনো জামায়াতের অনেক নেতাকে ইসলামিক চিন্তাবিদ ভাবেন, কিংবা ধর্মগুরু ভাবেন, তাদের জন্যই আজকের এই লিখা। আজ বাংলার ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরে বাঙ্গালী জাতির যেই প্রাণের দাবী ছিলো ঘাতক-দালালদের বিচার সেই বিচারের প্রথম রায় ঘোষিত হলো। অনেকের কাছেই সুপরিচিত ইসলামিক চিন্তাবিদ হিসেবে "মাওলানা আবুল কালাম আজাদ" ওরফে বাচ্চু রাজাকার-কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল ২ থেকে ৮টি অভিযোগের মধ্যে ৭টি সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ হবার কারণে মৃত্যূদন্ড এর শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
কেই এই বাচ্চু রাজাকার? সত্যি বলতে আমি নিজেও জানতাম না, চিনতাম না। তবে তার চেহারা চিনতাম এনটিভি তে দেখেছিলাম তাই। দেখতাম একজন দাঁড়িওয়ালা ভদ্রলোক "আপনার জিজ্ঞাসা" নামক একটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ইসলামিক প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এনটিভিতে। এভাবে আর কটা বছর পেরোলেতো এই মাওলানার নামের শুরুতেও আল্লামা শব্দটা যোগ হয়ে যেতো, যেমনটি হয়েছে দেল্লা রাজাকার তথা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী নামক কুখ্যাত খুনীর নামের শুরুতে।
এই বাচ্চু রাজাকারের বিস্তারিত পড়ে নিতে পারেন এইখানে।
তার কর্মকান্ডের বিস্তারিত পূনরায় এখানে লিখে পোস্ট বড় করার চেয়ে চলে যাই আমাদের সকলের অনুভূতির কথায়। আমি কাল রাত থেকে ঠিকভাবে ঘুমাতে পারিনি, কতক্ষণে এই রায় জানবো তার জন্য। অবশ্যই শুধু রায় পেয়েই আমি পূর্ণ তৃপ্ত হইনি, যা আমি মনে করি বাঙ্গালীরা সকলেই আমার সাথে একমত হবেন। এত গোয়েন্দা নজরদারীর মধ্যে পালিয়ে যাওয়া এই বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসীর রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আমি স্বস্তি পাবো না। তবে শুধুকি এই একজনের ফাঁসী দেখে আমরা খুশী হয়ে যাবো? না তা মোটেই নয়, প্রথম রায় হিসেবে আমাদের আবেগের কারণে অবশ্যই আমরা আনন্দ প্রকাশ করবো, সরকার, ট্রাইবুন্যাল এবং ট্রাইবুন্যালকে সহযোগীতা প্রদান কারী সকল সংগঠনকে বিশেষ করে ইন্টারন্যাশানার ক্রাইমস স্ট্রেটেজি ফোরাম এর সকল স্বেচ্ছাসেবকদের, সকল ব্লগারদের যারা শুরু থেকেই আমাদের জানাতে চেয়েছেন এসকল ঘাতকদের পরিচয়, সচেতন করেছেন এপ্রজন্মকে, অনলাইন একটিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল (বড় ভাই -এটা একান্তই আমি ডাকি), নিঝুম মজুমদার ভাই, রায়হান রশীদ ভাই এই মানুষগুলোর কথা স্মরণ রাখবে এই প্রজন্ম, এদের সবাইকে ধন্যবাদ দেয়ার সাথে সাথে আমি এও বলতে চাই, আসুন আমরা আমাদের এই আন্দোলন জারি রাখি শেষ রায়টি পর্যন্ত, এদেশ থেকে শেষ দালালটির বীজ ধ্বংস করা পর্যন্ত আমরা চালিয়ে যাই এই আন্দোলন, আমরা এই দালালদের প্রত্যেকের ফাঁসী দেখতে চাই এই বাংলা মাটিতে।
আমি জানিনা, তবে এই প্রজন্মের ইতিহাস সচেতনতা এবং ৭১এর চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা দেখে মনে হয় সবাই বুঝি আমার মত করেই অনুভব করেন যে এদেরকে নির্মূল করা এত সহজ হবেনা। এরা আজ অনেক বেশী সংঘবদ্ধ, এবং অনেক বেশী গভীরে পৌঁছে গেছে, আমাদের কোন একটি বিভাগ, কোন একটি স্থান বাদ নেই যেখানে তারা তাদের এজেন্ট ঢুকিয়ে দেয়নি, তার ছোট্ট একটি প্রমাণ পড়ে নিতে পারেন এখান থেকে।
এরপর, আমিতো উপরে উল্লেখিত আমার সেই ছোট বেলার বন্ধুর সাথে সম্পর্ক রাখিনি, যার বাসা হেঁটে যেতে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ আমার বাসা থেকে, আমিতো আজ সকালে এই রায় দেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি, তাই অফিস রওয়ানা হয়েও অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এসেছি বাসায়, ঘরে ঢুকে হাউ মাউ করে কেঁদেছি বেশ কিছুক্ষণ, আপনারা কি এভাবে একটু চিন্তা করতে পারেন, আমরা কি পারিনা সকল ক্ষেত্রে এই জামায়াত-শিবির নামক এই ক্যান্সারকে পরিত্যাগ করতে? আমরা কি পারিনা, যেখানেই দেখবো তাদের সেখানেই প্রতিরোধ করতে? আমরা কি পারিনা দল-মত নির্বিশেষে অন্তত এই রাজাকারদের ব্যাপারে এক হতে? আমরা কি পারিনা এই রাজাকার এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা এখনো আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত করছে তাদেকে ছুড়ে ফেলতে আমাদের সব কিছু থেকে?
অনেকেই বলবেন না পারিনা, তাদেরো রাজনীতি করার অধিকার আছে, এটা গণতান্ত্রিক দেশ। তাদেরকে একটি কথা বলছি, এখনি সময় এদেরকে বর্জন করার, আর দেরী করলে আজ হতে বেশ কিছু বছর পরে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম জানবে কিছু ভারতের দালালের ইন্ধনে এই দেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছিলো, আর আমরা তখন পরিচয় দিতে হবে নিজেদের দেশদ্রোহীদের উত্তরসুরী হিসেবে।
আমরা তা হতে দিতে পারিনা, নতুন প্রজন্ম এভাবে মেনে নেবেনা আর ৭১এর চেতনার অপমান, আজ প্রথম রায়ে সমগ্র দেশ এবং জাতি যে পরিমাণ উচ্ছাস প্রকাশ করেছে, যে পরিমান আনন্দ তাদের চোখে মুখে, ৭১এর এর চেতনা আবারো পূনরোজ্জীবিত করবে এই প্রজন্ম, রাঁঙ্গিয়ে দিবে এই দেশকে, এই বাংলাকে লাল সবুজে।





বাংলাদেশ -
কালকে থেকে কিছু মজাদার সট্যাটাস পড়ছি ফেবুতে, ডিজিটাল সরকার বড় বেশি অতীত নিয়ে ব্যসত, অথচ এই সময়ের সমস্যার দিকে মন দেয়া কতো জরুরী
মন্তব্য করুন