জীবিকা অথবা জীবন-১
এদিকটায় সকাল হলেই নানা রকম বিচিত্র হাক-ডাক আর নানাবিধ খুটখাট-ধুমধাম শব্দের খই ফুটতে থাকে অবিরাম। পাশেই কয়েকটি ওয়ার্কসপ, দুটি লেদ-কারখানা আর একটি টিনের বালতি তৈরির কারখানা। বলতে গেলে এগুলোই এ এলাকার প্রাণ। লোকজনের জগতও এই কটি কর্মক্ষেত্রকে ঘিরেই। এখানকার যতগুলো ঘরবাড়ি আছে প্রতিটি ঘর থেকেই কেউ না কেউ এখানকার কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। আর এ কারণেই গাড়ির ওয়ার্কসপের কর্মচারি গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে পারে টিনের বালতির কারখানার জিয়াকে, তর বিটির জ্বরের কী অবস্থা? কিংবা লেদ মেশিনে কর্মরত হিমু পোদ্দার কাজের ফাঁকে কণ্ঠস্বর উঁচু করে গনি গ্যারেজ ঘরের টায়ারম্যান আলিমুদ্দিনকে বলে, উরে আলিম্যা, ছা খাইতায়নিরে বো?
যদিও জামতলা নামের এ জায়গাটিতে একটি জামগাছ তো দূরের কথা কোনো রকম গাছের অস্তিত্বই নেই। তবে খানিকটা দূরে মারোয়ারিদের ট্যানারির পেছনের খালের দুপাশে কিছু শিয়ালমূত্রা গাছের অস্তিত্ব চোখে পড়লেও তাদের শ্রেণীটা কখনোই গাছের আওতাভুক্ত হয় না। তাদের পরিচয় হয় ঝোপ-ঝাঁড় অথবা জঙলা। হলুদ অথবা লালচে হলুদ কখনো বা কমলা রঙের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলে ছেয়ে যায় খালের দুপাশ। সৌন্দর্য বলতে অতটুকুই।
এলাকাটার প্রায় সবগুলো ঘরবাড়ি আর কারখানা গড়ে উঠেছে অবৈধভাবেই। কিন্তু যারা এখানে কাজ করছে তারা কেউ নিজেদের অবৈধ মনে করে না। তারা জানে, তাদের মালিক খুবই ভালো লোক। সামান্য ভাড়ার বিনিময়ে এখানে থাকতে দিয়েছে তাদের।
ছোটছোট এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন পাশাপাশি আর গা লাগালাগি, তেমনি মানুষগুলোও বেশ গলাগলি। যারা কথা বলার সময় নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া কথা বলতে চায় না। প্রত্যেকেই যার যার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু কারো কোনো কথা বুঝতে অসুবিধা হয় বলেও মনে হয় না। এখানে কোনো অশান্তি নেই বা কারো মাঝে অমিল নেই। আপাত দৃষ্টিতে এমনটাই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন এলাকার আবহাওয়া কেমন থমথমে হয়ে উঠলো। মনে হচ্ছিলো দূরের ট্যানারির বর্জপরিপূর্ণ প্রায় মরা খালটির পচা পানির দুর্গন্ধে আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠবার ফলে শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে লোকগুলোর।
সন্ধ্যার পর লোকজন আগের মত আর জায়গায় জায়গায় গোল হয়ে বসে কুপি বা হ্যারিকেনের আলোয় মেতে ওঠে না তাস কিংবা দাবা লুডোর আড্ডায়। কিংবা মেয়েরা কেউ কেউ ছোটছোট বাচ্চা কোলে ঘরের সামনের সামান্য বেড়া দেওয়া জায়গাটুকুর ভেতর চাপা কণ্ঠে কোনো এক অদ্ভূত বিষয় নিয়ে আলাপ করতে করতে তেমনি চাপা আর রিনরিনে কণ্ঠে হেসে ওঠে না। এখন কারো ঘরের সামনেই কারো উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ে না। কেবল কিছুদিন আগেই সপরিবারে গ্রামে চলে যাওয়া নিহার রঞ্জন মল্লিকের পরিত্যক্ত ঘরটাতে কয়েকজন উঠতি বয়সের ছেলে-ছোকরা মিলে ক্যারম খেলার ফাঁকে ফাঁকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ গুটি ফেলা নিয়ে অথবা জটিল কোনো কৌণিক অবস্থান থেকে স্ট্রাইকার বসিয়ে দূরূহ কোনো সাফল্যের আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠছে মাঝেমধ্যে।
শোনা যায়, নিহার রঞ্জন গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে বলে গেলেও আসলে সে সপরিবার চলে গেছে ভারতের মণিপুর। সেখানে তার অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে বলে আগে কোনো এক সময় গল্পে গল্পে বলছিলো কারো কাছে। আর তা এখন আড়ালে আড়ালে ফিরছে অনেকের মুখেই। কারো কারো ধারণা নিহার আসলে ভয় পেয়েছিলো। যেদিন শোনা গেল শেখ মজিবর রহমান নামের কোনো এক নেতা ঘোষনা করেছেন, দেশ প্রেমিক বাঙালিদের যার ঘরে যা কিছু আছে তা নিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানি আর তাদের দালালদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। আর এ ঘোষনার প্রেক্ষিতে বালতি কারখানার ম্যানেজার গোলাম আলি প্লেনসিটের সাপ্লাইয়ার তাম্বির মিয়ার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার সময় রাগ করে বলে উঠেছিলো, শ্যাখ মজিবর কি হাকিস্তানরে ভাঙ্গিবার যড়যন্ত গইজ্যে?
এ নিয়ে তুমুল বাক-বিতণ্ডার পর হঠাৎ গোলাম আলি সিন্দুকের ডালা খুলে একতাড়া নোট ছুঁড়ে দিয়েছিলো তাম্বিরের মুখের ওপর। তারপর বলে উঠেছিলো, তোঁয়ার লগে ব্যবসা আর ন গরিম! তুঁই মালাউন ইন্ডিয়ার দালাল!
তাম্বির হাসিমুখে টাকাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বের হওয়ার সময় বলেছিলো, হামাক ইন্ডিয়ার দালাল কইলে, তোমাক জানি কাও মুসলিম লিগের দালাল কতি না পারে!
গোলাম আলি সত্যি সত্যিই মুসলিম লিগের জন্য সর্বস্ব দিয়ে দিতে রাজি। কিন্তু সে মুহূর্তে তাম্বির মিয়ার কথায় প্রচণ্ড রাগে কাঁপতে থাকলে তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিলো না। শেষে নিজকে সামলাতেই হয়তো সে ফের চেয়ারে বসে পড়েছিলো ধপ করে।
এ সংবাদটি বাতাসের আগেই যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এমন কি মারোয়ারিদের ট্যানারির শ্রমিকদের মাঝেও এ কথা পৌঁছে গেলে অকস্মাৎ একদিন জয়বাংলা ধ্বণিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ট্যানারি এলাকা। আর এ ধ্বণি বসন্তের বেগবান হাওয়ার বিপরীত ঢেউ উপেক্ষা করে কাঁপতে কাঁপতে এসে পৌঁছে যায় জামতলা এলাকাতেও। কোনো এক রহস্যময় কারণে এলাকার লোকজনের মুখ থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলো প্রসন্ন আর সুখিসুখি ভাবটি। তার বদলে সেখানে যেন নতুন করে জেঁকে বসেছিলো, দুশ্চিন্তা, অবিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী একটি মলিন ছাপ।
(চলবে)





ছা খাইতায়নিরে বো?--এডা মানে কি চা খাবেন ভাই না?
১৯৭১ নিয়া সিরিজ নাকি? আপ্নের আরেকটা সিরিজ দেখলাম কালসাপ না কি জানি নাম, এইবাে একটা উপন্যাস গুচ্ছ বাইর করে ফেলেন।
সংলাপটা সিল্ডি। আপনের ধারণা ঠিকাছে।
পরামর্শের জন্য শুক্রিয়া জানাই। তবে, ওইসব গুচ্ছের আকাম করতে ভরসা পাই না। শুনতে পাই পুরষ্কার পাওয়া বইও তিন-চারটার বেশি বিক্রি হয় না। তবে ফ্রি দেওয়ার হিম্মত হইলে অবশ্যই চেষ্টা করবো। আপনেও পাইবেন।
ভালো লাগলো। পরের পর্ব জলদি আসুক।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
চলতে থাকুক...।
চেষ্টা থাকবে। ধন্যবাদ।
ভালো লাগলো
চলুক।
চেষ্টা থাকবে। পাঠকের ভালোলাগা আমার ব্যাটারি। ধন্যবাদ।
পপকর্ন হাতে নিয়ে গ্যাট হয়ে বসলাম। পরের পর্ব জলদি আসুক
ভুট্টার খই খাইতে খাইতে কার্টুন দেখতে মজা। পড়াটায় তেমন মজা পাওয়া যায় না। খই খইয়া পইড়েন।
শুরুটা চমৎকার হয়েছে।
পর্বগুলো আর একটু বড় করা যায়?
এখনও মনেমনে আছে গল্প হিসেবে শেষ করার। কিন্তু পরিস্থিতি কী হয় দেখি। পর্বগুলোর আকৃতি এমনই রাখছি ইচ্ছে করে। সরাসির ধারাবাইহক লেখার অপচেষ্টা বলতে পারেন। ভালো থাইকেন। ধন্যবাদ।
চলুক.।.।
হুম! চলবে!
সাবলিল লেখা....
বসলাম বাকি পর্বের আশায় ... গরু কিনতে যাওয়ার আগেই আর একটা পর্ব দিয়েন ভাইডি
ঈদ উপহার আরকি 
শুনলাম গরু কিন্যা ফালাইসেন। দেরি হয়ে গেল যে...
শুধু কল্পনানির্ভর না হয়ে বাস্তবতার ছোঁয়াচ থাকলে মুক্তিযুদ্ধ না-দেখা জনতা উপকৃত হবে । শুরুর মতই সবটা সুন্দর হবে আশা করি ।
আমার বেশিরভাগ লেখাই পুরোপুরি কল্পনা নির্ভর। কিন্তু বাস্তবতা বর্জিত নয়। চষ্টা করি বাস্তবানুগ রাখতে। এ লেখাটাও তেমনি একটা। পড়া ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
যাই এবার পরের পর্ব পড়ে আসি।
অনেক কষ্ট করলেন বলে ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন