ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ ২৮ - দোররা

dhusor godhuli-28.jpg

মফিজ মিয়া সালিশের বেশ ভাল ব্যবস্থাই করেছে। খালেক মেম্বারকে দিয়ে তার পক্ষে কথা বলার জন্য অনেক লোকজনই জড়ো করে ফেলেছে। সে যেটা বলবে এরা সবাই তার পক্ষেই সমর্থন দিবে। কেবল ব্যতিক্রম সাত্তার মাষ্টার, কাজেম মাঝি আর আতিক। এরা কিছুটা ঝামেলা করতে পারে। তবে জনমতের ভিত্তিতে তাদের মতামতই গুরুত্ব পাবে বেশী।
একশ দোররা! মৌলভী সাবের ফতোয়া শুনে বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে বিভার। ছুটে গিয়ে মফিজ মিয়ার পা জড়িয়ে ধরে
– চাচাজান আমার মাইয়াডারে বাচান, ওরে এত বড় শাস্তি দিয়েন না। ও বাচবো না, মইরা যাইব।
-আমি কি করমু কও? আমার মান সন্মান তো মাটিতে মিশাইয়া দিছো তোমরা। ভাইয়ের মাইয়া বইলা থাকতে দিছিলাম, তার ভালই মূল্য দিছো। বিচারে সবাই যা ঠিক করবে তাই হইবে, আমার কিছু কওনের নাই।
-তোমরা এই কচি নির্দোষ মাইয়াডারে এত বড় শাস্তি দিতাছো, আর যে বদমাইশ এই মাইয়াডার সর্বনাশ করল তার কি বিচার করলা? সভায় উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে সাত্তার মাষ্টার বলে ওঠে।
-মাইয়াডা সুযোগ না দিলে পোলাডা এমন কাম করতে পারতো? মাইয়াডার দোষ নাই? মফিজ মিয়া জবাব দেয়।
-তুমি কি কইতে চাও? মাইয়াডা নিজের ঘরে থাইক্যা দোষ করছে?
-ঘর কোন ব্যাপার না, এইহানে মাইয়াডার ইন্ধন না থাকলে পোলাডা এইকাম করতে সাহস পাইত না। অন্য কারো ঘরে তো যায়নাই! খালেক মেম্বার বলে ওঠে

মঈনুদ্দিন মৌলভী দেখতে পায় তার অনেক দিনের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। বিভাকে এই সুযোগে তাড়াতে না পারলে এই ভিটাটুকু তার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তাই সে মরিয়া হয়ে সাত্তার মাষ্টার আর তার পক্ষের লোকদের থামানোর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে- আপনাগো মনে আল্লা খোদার ডর নাই? ইসলামে জেনাকারীর কঠিন শাস্তির বিধান আছে। আপনারা সবাইরে পাপের ভাগী বানাইয়েন না।

-মৌলভিসাব, আল্লা খোদার ডর আমগো সবারই আছে, কতা অইলো গিয়া এই মাইয়াডা তার নিজের ঘরে থাইক্যা লাঞ্ছিত হইছে। আমরা সবাই বুঝতে পারছি এইহানে জেনাকারী মাইয়াডা না। কেবল আপনাগো চোক্ষে পড়তাছে না। বিচার হওয়া দরকার ঐ হারু মেম্বরের বদমাইশ পোলাডার, এই কতা কেউ কইতাছে না। বলে ওঠে আতিক।
-হারু মেম্বরের পোলা যে এই কাম করছে তার কোন প্রমাণ আছে? বিনা প্রমাণে কাউরে অভিযুক্ত করণ যায়না। খালেক মেম্বারের পাশ থেকে বলে ওঠে বাদল
-তাইলে এই মাইয়াডারে দোষী করা অইতাছে কিসের প্রমাণে? কাজেম মাঝি বলে ওঠে

খালেক মেম্বার মনে মনে ভাবে গিয়াসকে যেভাবে হোক এই কেস থেকে বাঁচাতে হবে। ভাতিজাকে বাঁচানোর ফলে বাদল কিংবা তার প্রতি মজনুর বিদ্বেষী মনোভাব সহজেই দূর হবে। খুব সহজেই ওকে সহজেই বাগে আনা যাবে। আজ সে মজনুদের পক্ষে দাঁড়ালে ভবিষ্যতের কোন ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করাও এত সহজ হবে না। তাই সে গিয়াসের পক্ষে সাফাই গাইতেই বলে ওঠে- আমরা সবাই জানি, কাইল দুফুরে এই মাইয়াডার ঘরে একজন বেগানা পুরুষ ঢুকছিলো, ভাবীসাব তারে বিভার ঘর থেইক্যা বাইর অইয়া যাইতে দ্যাখছে কিন্তু চেহারা দ্যাহে নাই। তাইলে কি দাড়াইলো?
তার ও বাদলের ঠিক করা উপস্থিত লোকজনের শোরগোলে অনেক কথাই চাপা পড়ে যায়। কেউ বলে একশ দোররা মারা হোক আবার কারো দাবী মাথা ন্যাড়া করে সারা গ্রাম ঘুরানো হোক, কারো বা মতামত একঘরে করে রাখা হোক।
-এইডা কোন বিচার অইতাছে না, এইডা প্রহসন। প্রতিবাদ করে ওঠে আতিক।

মফিজ মিয়া দেখতে পাচ্ছে ব্যাপারটা তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে এবার মাষ্টারদেরকে সভা থেকে তাড়ানোর জন্য ফন্দি আঁটতে থাকে। সবাইকে শান্ত থাকতে বলে। তারপর বলে,
-এইহানে বে-শরিয়তি কোন কতা চলবে না। ধর্মের বিধান অনুযায়ীই বিচার করতে অইব। আমার ভাইজি বইলা ঠিক বিচারডা না করলে আইজ যারা বিচার নিয়া প্রশ্ন তুলতাছে তারাই ভবিষ্যতে আমার দিকেই আঙ্গুল তুলবো। এই কাম আমি করতে দিমু না। মৌলভিসাব, কারো কতা হুননের করকার নাই। ধর্মের বিধান অনুযায়ী আপনি সঠিক বিচারডাই করবেন।

-তাইলে আর আমগো ডাকছো ক্যান? তোমরা তো বিচার আগে থেইক্যাই ঠিক কইরা রাখছো। তোমরাই কর। এই বলে সাত্তার মাষ্টার, কাজেম মাঝি আর আতিক সভা ছেড়ে বের হয়ে যায়।

মাষ্টারদের দল সভা ছেড়ে চলে গেলে যেন স্বস্তি নেমে আসে মফিজ মিয়া আর মঈনুদ্দীন মৌলভীর মনে। সবাইকে শান্ত করে মৌলভীসাব বিচার কার্য শেষ করেন। বয়স কম বিবেচনায় একশ’র স্থলে আশি দোররা আর মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হবে বলে ধার্য্য হয়।

সন্ধ্যার আগেই শুরু হয় রায় কার্যকর করার ব্যবস্থা। মাথা ন্যাড়া করার পর শুরু হয় দোররা মারা। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল প্রভাকে অবশ্য বেশীক্ষণ আর সইতে হয়নি শাস্তি। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।

ঘন কাল আঁধার রাত, বিভার কাছে মনে হয় যেন জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত। বার বার শুধু চোখে ভাসতে থাকে মেয়েটার যন্ত্রণাক্লিষ্ট অসহায় চেহারা আর চিৎকার। ‘আমারে আর মাইরেন না। উহ! বাবা! মা আমারে বাঁচাও’। সারা রাত ধরে মানুষের কথাগুলো কানে বাজতে থাকে। একশ দোররা মারা হোক, মাথা ন্যাড়া করে সারা গ্রাম ঘুরানো হোক, একঘরে করে রাখা হোক, সব তার চেনা জানা মানুষগুলো!

প্রতিবেশীহীন বাগানের এই নির্জন প্রান্তে নিস্তব্ধ কালরাত্রির গাঢ় অন্ধকারও উপহাস করে ওর অসহায়ত্বকে। সৃষ্টিকর্তার এ কোন খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে ও? একটু একটু করে রাত গভীর হয় আর সেই সাথে বাড়ে ওর মনের ভয়, শঙ্কা। রাতে জ্বরে আবোল তাবোল বকতে থাকে প্রভা। মা আমারে গলা টিপা মাইরা ফ্যালাও, আমার বাঁইচা থাইকা কি অইব? মেয়ের মুখ চেপে ধরে বিভা। এমন কতা কইস না মা। তুই একটু ভাল অইলে আমরা উজানিচরে চইলা যামু। হেই হানে নাকি নতুন চর জাগছে। এইহানে আর থাকুম না। সারা রাত ধরে গা মুছিয়ে দেয়, মাথায় পানি দিয়া দেয়। শেষ রাতের দিকে জ্বর নেমে গেলে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে বিভা।

সকাল বেলা চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় বিভার। বাইরে এসে দেখে চাচা-চাচী এসে হাজির।
-এতবড় ঘটনা ঘটাইয়া চোখে ঘুম আহে ক্যামনে? একটু শরমও করে না? আমরা হইলে গলাটিইপা মাইরা ফালাইতাম। পেয়ারা বেগম ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে
-চাচী ঘুমাই নাই, রাইতে মাইয়াডার অনেক জ্বর আছিল, সারা রাইত মাথায় পানি দিয়া আর গা মোছাইয়া পার করছি।
-আর নাঁকি কান্দন করতে অইব না, তোমরা তাড়াতাড়ি পথ দ্যাহো, তোমগো লাইগা আমরা গ্রামে মুখ দেহাইতে পারুম না, মাইনসে নানান কতা হুনাইব।
বিভা ছুটে গিয়ে চাচার পায়ে লুটিয়ে পড়ে- চাচাজান, আমারে তাড়াইয়া দিয়েন না, এই মাইয়াডারে লইয়া কই যাইয়া দাড়ামু?
-দ্যাহো, তুমি ভাইয়ের মাইয়া বইলা থাকতে দিছিলাম কিন্তু আমগো তো সমাজে বাস করতে অইবো, পাঁচজন মানুষ লইয়া চলতে অইবো। তোমাদের কারণে তো মানুষরে মুখ দেহাইতে পারুম না। তোমারে কিছু টাকা দিমুনে, মাইয়ারে লইয়া অন্য কোথাও গিয়া থাকো।
-চাচাজান, মাইয়াডার জ্বর এখনো ভাল হয় নাই, ওরে নিয়া আমি কই যামু?
-তোমার মাইয়া ভাল হইলে যাইও। এক সপ্তার মধ্যে নিশ্চয় ভাল অইয়া যাইবো, তহন চইলা যাইও।

চলবে....

পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) –

০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে
০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ আজ গাশ্বীর রাত ২২• ধূসর গোধূলিঃ তারুণ্যের জয়গান
২৩• ধূসর গোধূলিঃ জলে ভাসা জীবন ২৪• ধূসর গোধূলিঃ সমীকরণ
২৫• ধূসর গোধূলিঃ মুক্তনগর ২৬• ধূসর গোধূলিঃ মেলা
২৭• ধূসর গোধূলিঃ আর্তনাদ

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জাকির's picture


সামাজিক গ্রামীন বাস্তবতা !

আহসান হাবীব's picture


চলুক, সমাজের এই কুলসতা আজও অনেক জায়গায় বিদ্যমান। Shock

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।