ধূসর গোধূলিঃ ৩২ - লড়াই
ধীরে ধীরে শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে শিউলি। দু’জনের ছোট্ট সংসারে ঝক্কি-ঝামেলা নেই বললেই চলে। দুপুরের পর একাকী ঘরে শিউলির অফুরন্ত অবসর যেন আর ফুরোতেই চায় না। সময় কাটানোর সঙ্গী রেডিও কিংবা বইও একসময় একঘেয়ে হয়ে যায়। তখন শুরু হয় নাহিদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। বেশীর ভাগ দিন সন্ধ্যা নাগাদ ঘরে ফেরে নাহিদ, টোনাটুনির ছোট্ট সংসার তখন হাসি গল্পে ভরে ওঠে। নাহিদের ফিরতে দেরী হলেই একা ঘরে অস্থির হয়ে ওঠে শিউলি। অজান্তেই ওর মনটা তখন চলে যায় শ্যামলপুরে। সবুজ শ্যামল গ্রামটা ওকে প্রায়ই হাতছানি দিয়ে ডাকে। বাবা-মার আদর, বকুল আর অয়নের খুনসুটি, আর বাড়ির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতির মধ্যেই ঘুরে বেড়িয়েই পার করে অলস সময়গুলো। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা সঙ্গী হলে বেঁচে যেত এই একাকীত্ব থেকে। ও প্রায়শঃই স্বপ্ন দেখে কচি দু’টি হাত, নরম তুলতুলে গাল, বড় বড় দু’টি চোখ আর খিলখিল হাসির ঝংকার। নাহিদ অনেকটাই চাপা স্বভাবের, নিজের চাওয়া পাওয়াগুলো কখনও প্রকাশ করে না, শিউলিই বং অস্থির হয়ে ওঠে।
শহরে ওদের পরিচিত মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। সবাই নাহিদের কলিগ। তাই অনাকাঙ্খিতভাবে কোন অতিথির আগমনও ঘটে না ওদের ঘরে। কলিগদের মধ্যে কালেভদ্রে আসা যাওয়া চলে। তবে, ছুটির দিনে দুজনে মিলে ঘুরতে বের হয় ওরা। ঘোরাফেরার জায়গা বলতে নদীর পাড়, পুরোনো রাজবাড়ি কিংবা কালে ভদ্রে সিনেমা দেখতে যাওয়া।
আজ খুব ভোরে উঠে পড়ল শিউলি, শহরে আসার পর এত ভোরে ঘুম ভাঙ্গে না ওর। পাশে ঘুমন্ত নাহিদের দিকে চোখ পড়তেই দুষ্টুমি চাপে মাথায়, একবার ভাবে কানে সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে দেয় ওর, তারপর দু’জনে মিলে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায়। পরক্ষনেই মত বদলে ফেলে। রোজ অফিসে যাবার তাড়া থাকায় সকাল সকাল উঠে পড়তে হয় বেচারাকে। কাল রাতে বলেছিল আজ দেরীতে অফিসে যাবে, একটু ঘুমাক। শিউলি ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দেখে শিশিরে ভেজা সবুজ ঘাসগুলো কেমন সতেজ হয়ে আছে। ভেজা মাঠে কিছুক্ষণ খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করে ফিরে আসে ঘরে। মনে পড়ে শ্যামলপুরে শীতের এই সময়টা চমৎকার কাটতো ওদের।
নাহিদ কিছু না বলেই অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেল। শিউলি ওর গমনপথের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, ও কি আজকের দিনটার কথা ভুলে গেল? মন খারাপ হয়ে গেল। শিউলি ঠিক করে নাহিদ ভুলে গেলে ও কিছু মনে করিয়ে দিবে না।
আজ অফিস থেকে একটু আগেভাগেই বের হয়ে এলো নাহিদ। রিকশা নিয়ে সোজা চলে আসে নতুন বাজার। দুপুরের পর এই সময়ে বাজরে লোকজনের ভিড় নেই তেমন একটা। শাড়ির দোকানগুলোতে ঘুরে কিছুক্ষণ, পছন্দমত একটা শাড়িও কিনে ফেলে। নীল রঙের, শিউলির পছন্দের রঙ। তারপর চতুরঙ্গে ছ’টার শোর দু’টো টিকিট কিনে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
গেট দিয়ে প্রবেশ করে নাহিদ দেখে শিউলির কোন সাড়াশব্দ নেই। ভেজানো দরজাটা একটু ফাঁকা করতেই দেখতে পায় খাটের উপরে শুয়ে আছে শিউলি। নাহিদ চুপি চুপি ভেজানো দরজাটা খুলে ঘরে ঢোকে, শিউলি টের পায়না। গায়ে অন্য কারো স্পর্শ পেতেই ধড়মড় করে উঠে বসে, অসময়ে নাহিদকে দেখে অবাক হয়।
-তুমি কখন এলে?
-অনেকক্ষণ। নাহিদের চোখেমুখে রহস্যময় হাসি।
ড্রেসিং টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই শিউলি দেখে নতুন কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট। মনে মনে ভাবে, কি ভুল ভেবেছিল ওকে! নাহিদ ঠিকই মনে রেখেছে আজ ওদের বিবাহ বার্ষিকী।
-অনেকক্ষণ ধরে এসেছ, তো আমাকে তোলোনি কেন?
-দেখছিলাম ঘুমালে তোমাকে কেমন লাগে
-আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় মনে হয় দ্যাখনি কেনদিন, তাই চোরের মত লুকিয়ে দেখতে হবে?
-উহু, চোরের মত নয়, ডাকাতের মত। নাহিদ দু’হাতে জড়িয়ে ধরে শিউলিকে।
শিউলি হাসতে হাসতে বলে-এই ভাল হবে না কিন্তু। সময় নেই অসময় নেই আবদার! মুখে যতটা অভিযোগের সুর বাঁধা দেওয়াতে জোর ততটা নয়, বরং সেখানে পরিলক্ষিত হয় প্রচ্ছন্ন অনুমতি, হয়তো এটাই নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের ভাষা।
বড়ভাই হারু মেম্বরের কথামত ইদানীং মজনু নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে গ্রামের সকল শ্রেণির মানুষের সাথে মেলামেশা শুরু করে। যদিও গ্রামবাসীর কাছে হারু মেম্বরের পরিবারের স্বরূপ অজানা নয়, আর মজনুকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবারও কিছু নেই। তবুও আগামীদিনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেষ্টার ত্রুটি করেনা।
বাদল আর খালেক মেম্বারের চোখে মজনুর এই নতুন রূপ চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দেয়। আসছে নির্বাচনে খালেক মেম্বার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরে নেয় মজনুকেই, তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় পথের কাঁটা দূর করার উপায় খুঁজতে থাকে। নদীর পাড়ের স-মিলে এই মূহুর্তে খালেক মেম্বার আর বাদল ছাড়া আর কেউ নেই। স-মিলেরর পাশেই ছোট্ট ঘরটায় আলোচনায় ব্যস্ত দুজনে। বাদলের উদ্দেশ্যে খালেক মেম্বার বলে,
-মজনুর ভাবসাব তো সুবিধার মনে অইতাছে না, কি কস?
-হ ভাইসাব, ইদানীং অয় আমারে এড়াইয়া চলতাছে। দেহা অইলে দুই একটা কতা কইয়া অন্যদিগে চইলা যায়। হুনতাছি, মানুষের লগে ভোটে খাড়ানো নিয়া আলাপ আলোচনা করে, লোকজনরে দলে ভিড়াইবার চেষ্টা করে।
-ওর ভাইয়ের কু-কীর্তি তো সব মানুষেই জানে, তবুও ওর সম্বন্ধে মানুষের কি ধারনা তা জানার চেষ্টা কর। আমগোও মাঠে নামতে অইব। য্যামনেই হউক খোনকারগো আমগো লগে ভিড়াইতে অইব, বলে ওঠে খালেক মেম্বার।
- খোনকারগো লইয়া তুমি চিন্তা কইরো না, গাজীরা অগো পুরানা দুশমন, ওরা আমগো লগেই থাকবো। বাদল জবাব দেয়
-তবুও, তুই মজনুর লগে ছায়ার মতন লাইগা থাকবি, অরে য্যামনেই হউক ফিল্ড থেইক্যা সরাইতে অইব, খালেক মেম্বারের চোখে মুখে অন্যরকম অভিব্যক্তি।
-কি করবার চাও? জানতে চায় বাদল
-হেইডা আমি সময়মত তোরে কইমু
-তুমি কও তো আমিই অরে ছাইজ কইরা দেই
-এহনি কিছু করনের দরকার নাই, সময় অইলে আমি তোরে কমু।
-ঠিক আছে, তুমি যেমনে কইবা তেমনিই অইবো
-আমি একটা বিষয় ভাবতাছি। তুই ওর লগে এহন কোন খারাপ ব্যবহার করবি না, সবাই যেন বুঝতে পারে ওর লগে তোর খুব ভাল সম্পর্ক। আইচ্ছা ক্লাবের ঐ অনুষ্ঠানডা কবে অইবো?
-মঙ্গলবারে। ক্যান?
-তুই ওইদিন ওর লগে ছায়ার মতন লাইগা থাকবি, চোক্ষের আড়াল করবি না। আর চেষ্টা করবি অরে অন্য সবার থেইক্যা আলাদা রাখনের। বাকিডা আমি তোরে পরে কমু।
-আচ্ছা ঠিক আছে, বলে দুজনে স-মিল থেকে বের হয়ে বাজারের দিকে এগিয়ে চলে।
চলবে....
আগের পর্বগুলো দেখতে চাইলে - ধূসর গোধূলিঃ ৩১ - নতুন দিনের ডাক - এ ক্লিকান





মন্তব্য করুন