জোৎস্না জড়ানো শিহরণ - ২
৪
প্রকৃতিও এখন পাল্টাতে শুরু করেছে উত্তর আমেরিকায়। সুরেশ এই শহরে থেকে এই অক্টোবরেও বর্ষা-বৃষ্টির স্বাদ পাচ্ছে। দেশে তো পেয়েছেই। দেশ থেকে ফেরার পর মাসখানেকের উপর হয়ে গেছে। ঠান্ডা বাড়ার বদলে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও হালকা-পাতলা বৃষ্টিরই দেখা পাচ্ছে। সময়-অসময় বলে এখন কিছু নেই। আকাশের গোমড়ামুখো হওয়া আর প্রেমিকার যখন-তখন মুখ কালো করা সমানুপাতিকভাবেই চলছে। তাই বলে সুরেশ যে বাস্তবিকই কোন প্রেমিকার সাহচর্যে আছে, তা ভেবে বসবেন না। সুরেশের মনের আকাশেও প্রেমিকার আনাগোনা চলছে। সুরেশের কল্পনায় তা শ্রাবণের মেঘের মতই। চাতক পাখির মত বৃষ্টির জন্য সে হাহাকার করছে।
দুপুর থেকে আকাশটা গুমোট বেঁধে আছে। বৃষ্টি হবে করেও হচ্ছে না। মেয়েটাকে পিয়ানো শিখতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল চৈতালীর। কিন্তু হঠাৎ করে পিয়ানো শিক্ষক অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে সে এখন মেয়েসহ বাসায় আছে। ছেলেটা তার ঘরে হয় সায়েন্স ফিকশান বই পড়ছে, নয় ভিডিও গেম খেলছে। কম্পিউটারে কিছুটা ঘাটাঘাটি শেষে অস্থিরতার কোন কমতি দেখা যাচ্ছিল না সুরেশের। উঠে গিয়ে চটপট প্যান্ট শার্ট পরিবর্তন করে চুলটাকে একটু পরিপাটি করে ঘর থেকে বেরুতে উদ্যত হলে চৈতালী জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাচ্ছো, এভাবে হুট-হাট করে?” সুরেশ তেমন কিছু না বলে, “এই দেখি” বলে বেরিয়ে পড়ে। চৈতালী বিরক্ত হয়, রাগও হয়। কী আর করে। মেয়ের দিকে মনোযোগ দেয়।
৫
গাড়িটাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে চালাতে থাকে সুরেশ। রোববারের ছুটির এই সময় রাস্তাঘাট একটু ফাঁকা মনে হয়। অন্য রোববারের চেয়ে একটু বেশি ফাঁকা। তাহলে কি মেঘের এই রঙ মানুষজনকে বাইরে বেরুতে অনুৎসাহিত করেছে? করতেই পারে। কিন্তু সুরেশকে তো স্বস্থি দিচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে ফিরেও মনের অস্থিরতা দূর হলো না। অথচ এই আকাশ কেন ছাই রঙে স্থির?
গাড়িকে আরো কিছুক্ষণ চালাতে চালাতে এক সময় অনুসূয়ামুখী হয়। জানে এদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দেয়া তার ঠিক হচ্ছে না। মনে হলো, অনুসূয়ার সাথে এক নজর কথা বলা হয়ে যাক। হয়তো ভাল লাগবে। হয়তো সে তার স্থিরতা খুঁজে পাবে। দেশ থেকে ফিরে এলে তার সেলফোনে অনুসূয়ার নাম্বার দেখেও কি জানি কলব্যাক করার ইচ্ছা হয়নি সুরেশের। ভাবলো, বাদ যাক্ এসব। এমন তো কত হয়। ফোন করেছে, সপ্তাহ দু'য়েকের উপর হয়ে গেছে। তার জন্য এত উৎসাহী হওয়া এই মূহুর্তে ঠিক হবে না। অথচ এখন মনে হচ্ছে, অনুসূয়ার সামনে তার দাঁড়ানো উচিত। হয়তো অনুসূয়া কোন মূল্যবান কিছু তাকে বলতে চাইছে। হয়তো দেশ থেকে ফিরে তখনই তাকে ফোন করা উচিত ছিল। হয়তো ভেবেছে আমি তার কথা শুনতে আগ্রহী নই। হয়তো অনুসূয়ার মনে কোন নীরব অভিমান কাজ করছে। আর ভাবতে পারে না সুরেশ। একবারে গাড়িটাকে অনুসূয়ার বাসার সামনে এনে থামায়।
হঠাৎ করে গাড়ি থামার শব্দ শুনে দোতলা ঘরের পর্দা সরিয়ে অনুসূয়া বাইরে তাকায়। সুরেশকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে অবাক হয়। অনুসূয়া অনলাইনে দাবা খেলায় মগ্ন ছিল। এখন এটাই তার প্রিয় সময় কাটানো। প্রদীপ বাইরে থাকলে যা হয়। মেয়েটাও বেশ ঘুমুচ্ছে তার ঘরে শুয়ে। গত কিছুদিন ক্লাস এ্যাসাইমেন্ট জমা দিতে রাত জেগে স্বাতীকে পড়াশুনা নিয়ে থাকতে হয়েছে। গত দু'দিন তো ঘরে ফিরেনি। ল্যাবেই কাটিয়েছে। সকাল বেলা বাসায় এসে নেয়ে-খেয়ে জিরিয়ে এখন তো গভীর ঘুমে জোরালোভাবে ঢুকে পড়েছে। মেয়ের ঘরের দরজা আস্তে খুলে অনুসূয়া দেখেছিল কিছুক্ষণ আগে, এখনো মেয়ে জেগে আছে কি না। জরুরী কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েকে ঘুমাতে দেখে আর জাগাতে ইচ্ছে হলো না। এত গভীর ঘুম থেকে কি কাউকে জাগানো যায়?
নীচে এসে দরজা খুলে দেয় অনুসূয়া। সুরেশ কেমন আগ্রহ নিয়ে তাকায় অনুসূয়ার দিকে। অনুসূয়াও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সুরেশের দিকে। কিছু একটা কি বলতে চায় সুরেশ? এমনভাবে তাকিয়ে আছে কেন? বুঝে না সে একেবারে। তারপর কিছু না বুঝে বলে ভিতরে আসুন।
সুরেশ ভিতরে এসে বসলে অনুসূয়া জিজ্ঞেস করে, “কখন এলেন দেশ থেকে?” “সে তো দু'সপ্তাহ হয়ে গেলো।” সুযোগ পেয়ে সুরেশ বলে ফেলে, “দুঃখিত, আপনি যে আমাকে ফোন করেছিলেন তা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু আসার পর অফিসের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে, দেবো দেবো করে আপনাকে আর কল দেয়া হয়নি। আমি খুবই লজ্জিত সে কারণে।”
- আরে না, না। ওটাতো আমি এমনি দিয়েছিলাম। আসলে কি জানেন? সেদিন আপনার সাথে জ্যোৎস্না উপভোগ করার পর ভাবলাম, আপনাকে একটা ফোন দিয়ে দেখি কেমন আছেন। কিন্তু আপনি যে দেশে গেছেন ভাবীদের নিয়ে আসতে, সেটা একদমই মনে ছিল না। এ নিয়ে আপনার লজ্জিত বা বিব্রত হবার কিছু নেই। তা কেমন যাচ্ছে এখন বলুন।
- এই তো অফিস, সংসারধর্ম - সব চালিয়ে যাচ্ছি একসাথে।
- তা ভাবীকে তো নিয়ে আসতে পারতেন। আলাপ করা যেতো।
- তা যেতো। কিন্তু আমি একটু অন্যখানে গিয়েছিলাম। তা আসার পথে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম বলে ভাবছি আপনার এদিক থেকে ঘুরে যাই।
- ভাল করেছেন। অনেকদিন তো আর দেখা হচ্ছিল না। আমিও চাইছিলাম যদি আপনার সাথে কিছু আলাপ করা যেতো, তবে বুঝতাম, আমার মন-প্রাণ অন্যকোন দিকে ছুটে যাচ্ছে কি না তা বোঝা যেত।
সুরেশ একটু নড়ে উঠে। সে কারণেই তো তারও এখানে ছুটে আসা। মনকে কিছুদিন আটকিয়ে রেখে সবকিছু কেমন যেন অবোধ্য হয়ে উঠছিলো। নিজেকে আর নিজের মধ্যে মনে হচ্ছিল না। অনুসূয়া বলতে শুরু করে।
তুমি করে বললে বোধ হয়, কিছুটা অন্তরের স্পর্শ মেলে। আমি কি তুমি করে বলতে পারি আপনাকে?
- অবশ্যই। আমি খুব খুশি হবো তাহলে।
অনেক অস্থিরতার পর সুরেশের অন্তরটা এখন প্রাণের আনন্দ-সৌরভ খুঁজে পায়। অনুসূয়া বলতে থাকে। একটা কথা আপনাকে আমি বলতে চেয়েছিলাম। জানি না আপনি কিভাবে নেবেন। তবুও শুনুন একটু দীর্ঘ মনোযোগ দিয়ে।
আমি দিন দু'য়েক আগে ইয়াহু গেমসের অনলাইনে দাবা খেলছিলাম। অন্য এন্ডে একটা ৩২ বছরের মেয়ে খেলার পাশাপাশি আমার সাথে গল্প জুড়ে দিলো। অবশ্য নামটা এমন ছিল যে, প্রথমে আমিই জানতে চেয়েছিলাম তার সেক্সটা কি? মেয়ে জানানোর পর সেও জানতে চাইলো আমার সেক্স কি? আমাকে ফিমেল জেনে দেখি ধীরে ধীরে সে আমার সাথে আলাপের মাত্রা বাড়াতে থাকলো। আর খেলার প্রতি মনোযোগ দেখি তার কমছে, যদিও সে একেবারে খারাপ খেলছিল না, খেলা চালিয়ে যাবার মতই। তারপর সে জানতে চাইলো, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে কি না। বললাম, আমি বিবাহিতা। এক মেয়ে আছে আমার। সে বললো, বাহ্ চমৎকার! এবার জানতে চাইলো, আমার স্বামী এখন বাসায় কি না। উত্তরে জানালাম, সে তো এখন বাসায় নেই। অফিসের কাজে অন্য শহরে আছে। এই শুনে বলে, তাই না কি? তাহলে তো এ সময়গুলোতে বন্ধু-বান্ধবের সাথে কাটাতে পারো খুব। আমি তাকে বললাম, আমার খুব একটা বন্ধু নেই। আমার তেমন কেউ বন্ধু হয় না। মেয়েটার এবারের প্রশ্ন: “আচ্ছা, তোমার বয়স্ক কত, কিছু মনে না করলে আমি জানতে পারি কি?” বললাম আটত্রিশ, আর কিছুদিন হলে ঊনচল্লিশে গিয়ে পড়বো। এবার দেখি সে আরেকটু উৎসাহিত হলো, এবং বললো, “জানো আমার এক গার্ল ফ্রেন্ড ছিল বছর দু'য়েক আগে। তখন তার বয়স ছিল একচল্লিশ বছর। চমৎকার এক মহিলা ছিল সে। তার স্বামীকে আর ভাল লাগছিল না বলে ডিভোর্স করে দেয়। খুব ভাল জব ছিল তার এবং স্বাধীনভাবে চলছিল সে। তার সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ ভালভাবে কেটেছিল। তাকে এখনো আমি মিস্ করি।” মেয়েটার শেষ কথাটা কেমন জানি শোনাল, তবুও সে কি ধরণের সম্পর্কের কথা বলছে, তা আঁচ করতে পারছিলাম। বললাম, “দেখো এই ধরণের সম্পর্কের প্রতি আমার তেমন কোন উৎসাহ নেই।” আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সে লিখলো, “তুমি তো সব সময় জীবনটাকে একভাবে দেখে যাচ্ছো। তোমার কি কখনো মনে হয় না, জীবনটাকে এই গতানুগতিকতার বাইরে অন্যভাবে একটু দেখি। মেয়েটা বলেই চললো, “বিষয়টা পুরো তোমার উপরে। যদি তুমি ফিল করে থাকো, তবে একবার ট্রাই করেই দেখো না! তুমি ইচ্ছে হলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারো। আমার ই-মেইলটা রেখে গেলাম। উঠছি এখন। তোমার সাথে পরিচয় হয়ে ভাল লাগলো। ও হ্যাঁ, তুমি তো প্রায়ই বোধ হয়, একাই থাকো। এটা তো সুবিধেই।”
এরকম এক অবস্থায় পড়লে অনুভূতিটা যে কী রকম হয়, আমি তা দিব্যি বুঝতে পারছি। সুরেশকে বলে অনুসূয়া। “তোমার ধারণা কি বলতো?” অনুসূয়ার এরকম প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় সুরেশ। তার ভাবনাকে নাড়া দেয়। অনুসূয়া যে এমন কিছু শোনাবে, সে একেবারে আশা করেনি। এই বিদেশ বিঁভূইয়ে শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্য পরিবেশে থেকে এমন একটা ভাবনা এক বাঙ্গালী ললনার মাঝে প্রবেশ করবে, এতদিন এ তার কল্পনা বহির্ভূতই ছিল। কিন্তু এ ধরণের বোধ বা চিন্তা কারো মাঝে এসে গেলে সেটাকে অসংলগ্ন বা অবাস্তব বলা যায় না। সুরেশের নিজের ভেতরের যন্ত্রণাটা আবার দেখা দেয়। সে চেপে ধরার চেষ্টা করে, যে অস্থির যন্ত্রণা তাকে তাড়িত করে অনুসূয়ার কূলে এনে ফেলেছে। কিন্তু নদীর ঢেউ পাড়ে যে আছড়ে পড়ছে। সুরেশকে নদী মুখীন হতে দেয়া তো দূরের কথা, ভিড়তেই দিচ্ছে না পাড়ে। বেদনা বিদীর্ণ সুরেশ কী বলবে ভেবে উঠতে পারে না। নিজেকে চেপে রেখে কোনক্রমে বলে ফেলে, “আচ্ছা, এ ভাবনাটা কি নারীর জন্য স্বাস্থ্যকর? বা সুখকর কিছু?”
- স্বাস্থ্যকর বা সুখকর কিনা, এর কিছুই জানিনা। তবে একটা কৌতূহল জাগে। কীসের তৃপ্তি বা স্বাদ এতে। এমন একটা অজানা বোধ মনকে নাড়া দিতেই থাকে।
- হুম, দেখো। এই যে, আমিও তোমাকে তুমি করে বলে ফেললাম। তাছাড়া তুমি বোধ হয়, আমার চাইতে কিছুটা ছোটই হবে। আমাকে যদি এসব কথা বলা হয়, তবে আমার ঘৃণায় বমি আসবে। এতদিন এদের এদেশে থেকেও এসবে আমার রুচি-বিকৃতিই ঘটে। সোজা চিন্তা করতেই আমি ভালবাসি, যা সহজ, স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক। এসব বিকৃত বোধ কিভাবে যে মানুষের মাঝে জন্মে, আমি একেবারেই ভেবে পাই না।
- ঠিক, তোমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঠিকই আছো তুমি। কিন্তু এই যে, এদের কাছে এসব অদ্ভূত আজব ব্যাপারগুলো কী নিদারুণ উত্তেজনা বয়ে নিয়ে আসছে, আমি তো ভেবে পাই না। এই তো ধরো কিছুদিন আগে, আমি দেরী করে অফিসে যাচ্ছিলাম। অফিসে আমি ট্রেনে করেই যাই, তা বোধ হয় জানো। কী করবো, ডাউন টাউনে পার্কিং ভাড়া যে এতো বেশি, তাতে সাবওয়ে ভাড়া দিয়ে যাওয়াটা অনেক সস্তা। বেশিরভাগ অফিস যাত্রী তো তাই করছে। আর আমার এই ট্রেনে করে জনসমুদ্রে মিশে অফিসে যাওয়াটা বেশ পছন্দ। সকালে কী রকম ভীড়-ভাট্টা, তাতে আসতে যেতে কতরকমের মানুষকেই তো চোখে পড়ে। এদেরকে বিভিন্ন ভাবে দেখে মনে একটু চেতনা জাগে, এইতো আছি, আমিও বেঁচে আছি এরই মধ্যে। এই জনসমুদ্রের এমন কর্ম তৎপর ছোটাছুটি না দেখলে মনে হয়, অনেক আগেই মরে যেতাম। যাক্ - যে কথা বলছিলাম। সেদিন একজোড়া তরুণীকে দেখলাম ট্রেনে পাশাপাশি বসে যাচ্ছে। একটা আরেকটার হাতের তালু এবং তার উল্টোদিকটা নিজ হাতে অনবরত মোলায়েম ঘষে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝে কিছুটা আঁচ করলাম। আমি বসার জায়গা না পেয়ে তাদের কাছেই দাঁড়িয়েছিলাম। অনেকটা কৌতূহলে অন্যদিকে তাকিয়ে কান পেতে তাদের কথা শুনছিলাম। একজন অন্যজনকে বলছে, “রাতটা আমার বেশ ভাল কেটেছে। আমি উপভোগ করেছি।” তাদের ভাব সাব দেখে বোঝা যায়, গতরাতটা তারা একসাথেই কাটিয়েছে। কথাবার্তায় এও বুঝলাম, তারা নবপরিচিতা। নব প্রেমের এক গদগদ ভাব তরুণীটার মধ্যে যে তার সঙ্গিনীকে এই কথাগুলো বলছে। মেয়েটা চমৎকার সুন্দরী বটে। একটা তরুণের মাথাটা ঘুরিয়ে দিতে খুবই যথেষ্ট। কিন্তু কী এক চমৎকার পরিতৃপ্তি নিয়ে সে তার তরুণী পার্টনারের হাতে হাত রেখে তা ঘষেই চলেছে। সত্যি কথা বলতে কী, যে তরুণীটার হাত সে ঘষে দিচ্ছিল, তাকে দেখতে কিন্তু আমার কিছুটা ছেলে ছেলে লাগছিল – মেয়ের অবয়বে যেন ছেলে একটা। চুলটাও সেভাবে কাটা। শুনেছি, এসব যুগলের মাঝে একজন সবসময় ছেলের রোলই প্লে করে।
সুরেশ কথা শেষ হতে না দিয়ে বলে ফেলে, “সত্যিই কি তুমি এসবে আকৃষ্ট? কথা বলার মাঝে সুরেশের উত্তেজনা বা অসহিষ্ণুতা কিছুটা টের পাওয়া যায়।
- আমি আকৃষ্ট কী না, তা এখনো বুঝে উঠতে পারছি না। কিন্তু এদের সম্পর্কের মাঝে কী ধরণের কেমিষ্ট্রি কাজ করে, তা কিন্তু আমাকে ভীষণ ভাবায়। বলতে পারো, আমাদের মনুষ্য গোত্রেরই একটা ছোট অংশ কেন এতে এভাবে ডুবে থাকে, তাই আমি তন্ময়ভাবে অবলোকন করি, আমাকে ভাবায়, উপলব্ধির চেষ্টা করি।
- “তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি” বলে অনুসূয়া বলতে থাকে, হয়তো শুনে চমকাবে। আমি যখন কলেজে উঠলাম, আমাদের ক্লাসে নারিতা নামে একটা মেয়ে কলেজ শুরুর মাস চারেক পরে ভর্তি হলো। তার বাবার বদলীর চাকরি। তাই কলেজ শুরুর মাস কয়েক পর, বাবার বদলীর কারণে তাকে এ কলেজে ভর্তি হতে হয়েছে। এমন ইনোসেন্ট টাইপের মেয়ে আমার আর কখনো চোখে পড়েনি। মজার ব্যাপার হলো, তাকে দেখলেই কেমন একটা আকর্ষণ আমার মধ্যে কাজ করতো। আমার ভাল লাগতো, শিহরিত হতাম। তাই ক্লাসে সুযোগ পেলেই তার পাশে এসে বসতাম। কিন্তু সে ছিল সবসময় নির্বিকার। আমার সান্নিধ্য, আমার অনুভূতিটা সে ধরতে পারতো বলে মনে হতো না। আর কোন মেয়ে নয়, তার প্রতিই আমার এই অনুভূতিটা হতো এবং তার প্রতি আমার সম্মোহনী ভাব ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। একদিন হলো কি? দু'ক্লাসের মাঝের ব্রেকে তাকে বাথরুমে যেতে দেখলাম। তার প্রতি আমার সম্মোহিত ভাবটা সেদিন বোধ হয়, একটু বেশিই ছিল। গত দু'দিন আমরা পাশাপাশি বসে ছিলাম কি না! এর প্রথম দিন সে ক্লাসে একটু দেরীতে আসাতে চট করে, আমার পাশে বেঞ্চের ফাঁকা জায়গাতে বসে গেলো। আমার মনে হলো, সেও বুঝি আমার দিকে ঝুঁকছে। পরের দিন আগে-ভাগে এসে উৎসাহিত হয়ে, আমি তার পাশে বসে গেলাম। যেদিনের ঘটনা বলছি, সেই তৃতীয় দিনেও আমি তাই করলাম। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম এই তিনটা দিন। আগের দু'দিন বাসায় গেলেও এই ঘোরটাই আমার মাঝে লেগেছিল। নারিতাকে সেদিন বাথরুমে যেতে দেখে আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। বাথরুমে ঢুকেই আমি তার দিকে সম্মোহিতের মতো মুগ্ধভাবে তাকিয়ে আছি। ভাবলাম, সেও যদি সেভাব নিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে নেয়। ওমা, তার বদলে দেখলাম, সে কেমন এক অদ্ভূত ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকালো, যেন অবাক হয়ে আমার তার দিকে তাকিয়ে থাকার অর্থ জিজ্ঞেস করছে। এতে আমি লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। এরপর আমি তার কাছাকাছি যেতে লজ্জা পেয়েছি। একটা সত্য কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হচ্ছে, যতবারই আমি তার পাশে এসেছি, পাশাপাশি বসেছি, ততবারই আমার মাঝে এক শির শিরে বোধ বা শিহরণ তৈরি হয়েছে। জানি না, তা কিসের আলামত ছিল।
দীর্ঘক্ষণ একমনে শুনতে শুনতে সুরেশ এবার একটু নড়ে চড়ে হাস্যরসে তীর্যক হয়ে উঠে। ভেতরের কষ্টটাকে যে সামাল দেয়া যাচ্ছে না। কষ্ট চেপে রেখেই বলে, “আচ্ছা, তুমি কি তাহলে তখন ছেলের ভূমিকাই ছিলে, না কি নারিতাকে সে ভূমিকায় দেখার তোমার ইচ্ছে হয়েছিল?”
“দেখো তখন ছোট ছিলাম”, সরাসরি উত্তর না দিয়ে অনুসূয়া শুধু বলে, “প্রশ্নটা তুমি ভালই করেছো। এতদিন পরে এতটুকুই বলতে পারি, তার সাথে সাথে থাকাটাই তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা দু'জন মেয়ে, এটা যতটুকু মাথায় কাজ করেছে, তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে, তাকে ভালবাসতে পারা, তার প্রেমে পড়া। যে শিহরণ খেলছিল, মনে শরীরে, তাকে তণু-মন-প্রাণে আরো মিশিয়ে দেয়া। বুঁদ হয়ে থাকা - সেই শিহরণ আনন্দে। কিছু কি বুঝতে পারছো?” সুরেশের দিকে এবার সরাসরি তাকায় অনুসূয়া।
সুরেশ আর কথা খুঁজে পায় না। কীসের টানে যে সে সোফায় লেপ্টে থাকে। একবার মনে হয় উঠে চলে যায়। আরেকবার মনে হয়, সোফায় আটকে থাকি। এই দোমনা অবস্থায় সোফাতেই নির্বোধের মত লেগে থাকাটাই স্থির হয়। জীবনের সে অনেক কিছুই দেখেছে। এভাবে অনুসূয়ার কাছে ছুটে এসে প্রেমের পরিবর্তে এমন কিছু মিলবে, তা তার কল্পনার বাইরে। ভেবে ছিল, তার সাথে কথা বলে মনের অস্থিরতার একটা স্থিরতা লাভ হবে, একটা সুস্থির গতি পাবে। এখন সে চিন্তাই অবান্তর মনে হচ্ছে। মনটাও ভেতরে ভেতরে গুঁতো খেয়ে খেয়ে অভিমানে বড় এক পাথরে রুপান্তরিত হয়েছে। এর উপর বসে অর্থহীন, বিমূঢ়, দূর দিগন্ত দেখা যায়, স্পর্শ করা মোটেও সম্ভব না।





চলুক
ধন্যবাদ সাথে আছেন বলে।
চলুক...
চলছে। সাথে আছেন, ভাল লাগছে।
খুব ভাল হয়েছে। উচিত হয়েছে
শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ধন্যবাদ।
চলুক।
হুঁ, চলছে।
আপনি তো চমৎকার লেখেন! পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম
প্রথম পর্বের চেয়েও এই পর্ব বেশি ভালো লেগেছে
শেষ হোক। একসাথে পড়ে বলব।
আপ্নে আছেন কেমন?আজকাল দেখাই যায় না?
আছিরে ভাই বেঁচে বর্তে। এই তো নতুন গল্প লেখা হলে ছুটে আসি।
অপেক্ষায় আছি। সাথে থাকুন। ভাল থাকুন।
মন্তব্য করুন