ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ ২৯ - মুক্তির স্বাদ

dhusor godhuli-29_0.jpg

চাচা-চাচী চলে গেলে ঘরের সামনের উঠানে কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে বিভা। তারপর ঘুরে পিছনে তাকিয়ে দেখে জ্বর শরীর নিয়ে প্রভা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। মেয়েকে ধরে বিছানায় শুইয়ে দেয়। অনেক যত্নে সাজিয়ে তোলা কুড়েঘরটির দিকে তাকায় আর ভাবে খুব তাড়াতাড়িই ছেড়ে যেতে হবে এই আশ্রয়টুকুও। ঘরের প্রতিটা কোণে কোণে জমানো হাজারো স্মৃতিরা ভিড় করে মনে। অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় এই নির্জন ঘরের নিভৃত প্রান্তে কাঁদে দুটি অসহায় প্রাণ। কেউ জানে না তাদের মনে কি ঝড় বয়ে যায়। কোথায় যাবে? কে তাদের আশ্রয় দেবে?
-আমার লাইগা তোমার অনেক কষ্ট, তাই না মা? প্রভার কন্ঠ শুনে ঘোর কাটে বিভার
-নারে মা, তোর কি দোষ? সবই আমার ভাগ্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে বিভা।
-আমি মইরা গেলেই ভাল হইত, তোমার এত কষ্ট হইত না
-তুই মইরা গ্যালে আমি কারে নিয়া বাচুম? তুই একটু ভাল অইলে আমরা উজানিচরে চইলা যামু
-হেইহানে গিয়া কি অইবো মা? আমগো লাইগা সব জায়গাই সমান
বিভা কোন উত্তর দিতে পারে না। ও জানে প্রভা ঠিক কথাই বলেছে। উজানিচরেও ওদের পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই।
দুই দিন কাজে যেতে না পারায় ঘরে খাবারের জোগান শূন্যের কোঠায়। বিভা দু’চোখে অন্ধকার দেখে। মেয়েটার জ্বর, ওকে একা ফেলে কোথাও যেতে পারে না। দুপুরে পারু আসে খাবার নিয়ে। পারুকে জড়িয়ে ধরে ঢুকরে কেঁদে ওঠে বিভা,
-আমি কি পাপ করছি কও তো পারুবু? আমারে ক্যান এত শাস্তি পাইতে অইবো? মাইয়াডারে লইয়া কই যামু?
-চিন্তা করিস না, সব ঠিক হইয়া যাইব। আগে প্রভা সুস্থ হউক।
-ঘরে খাওন নাই, মাইয়াডারে যে ডাক্তার দেহামু একটা পয়সাও নাই, কি যে করুম বুঝতাছি না।
-রাইতের খাওনের চিন্তা করিস না, আমি দিয়া যামুনে। তয় বইন আমার হাতও এক্কেরে খালি, নইলে তোরে কিছু টাকা দিতে পারতাম।
-তুমি আর কত করবা? তোমার নিজেরও তো টানাটানির সংসার। পারুবু, তুমি বিহালে একটু প্রভার কাছে থাকবা? আমি দেহি মাষ্টার চাচীর কাছ থাইকা কিছু টাকা ধার আনতে পারি কি না, পরে কাম কইরা শোধ দিমুনে
-ঠিক আছে, বিহালে আমি আইসা ওর কাছে থাকুমনে

বিভাকে সালমা বেগমের সাথে কথা বলতে দেখে এগিয়ে আসে সাত্তার মাষ্টার। প্রভার খোঁজ খবর নেয়, সান্ত্বনা দেয়। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে বিভা, দু’চোখ টলমল করে ওঠে। তারপর কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে,
-চাচা, বাবায় একবার কইছিলো আমার নামডা আপনে রাখছিলেন। আমার নামের অর্থ নাকি সূর্য্যের আলো। সুর্য্যের আলোয় তো চোখ ধাধাইয়া যায়, তয় আমার জীবনে এত আন্ধার ক্যান চাচা?
মাষ্টার এই কথার কোন উত্তর খুঁজে পায়না। কি উত্তর দিবে সে? কি করে বোঝাবে ও আসলে শিকার হয়েছে সামাজিক অবক্ষয় আর লোভী কিছু মানুষের প্রতিহিংসার। এর শিকড় আরও গভীরে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌছে গেছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে তাঁরা স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলো, এত বছর পর এখন মনে হচ্ছে তা আজও অধরা রয়ে গেছে। যতদিন হায়েনারূপী এইসব মানুষগুলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারবে, ততদিন প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার সুফল পাওয়া যাবে না।
অনেকক্ষণ পর মাষ্টার বলে- তুই চিন্তা করিস না, যদি তোর চাচা ঐহানে থাকতে না দেয় তয় আমার ভিটাবাড়িতে তোরে ঘর তুইলা দিমু। যতদিন খুশি ওইহানে থাহিস। মাষ্টারসাব কিছু টাকা বিভার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে- নে, এই টাকাটা দিয়া তোর মাইয়াডারে ডাক্তার দেখা। বিভা কিছু না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। মাষ্টারের পাশে দাঁড়ানো অয়ন টাকাটা নিয়ে ওর আঁচলে বেঁধে দেয়। মাষ্টার বলে- যা বাড়ি যা, মাইয়াডার দেখাশোনা কর।

বিকাল থেকেই প্রভার মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে বিভা। কেমন যেন অন্যমনস্ক। সারাক্ষণই কি যেন ভাবে, সহসা কোন কথার উত্তর দেয় না। সন্ধ্যার পর থেকেই প্রভার জ্বর অনেকটা কমে আসে। রাতে তেমন একটা খায়নি ও। পারুবু’র দেয়া খাবার অনেকটাই বেচে গেছে। প্রভাকে গুম মেরে থাকতে দেখে বিভা প্রশ্ন করে,
-কি রে মা, তুই এরকম চুপ করে আছস ক্যান? খারাপ লাগছে?
-না এমনিই, উত্তর দেয় প্রভা। কিছুক্ষণ পর বলে, এক সপ্তা পর তুমি কই গিয়া থাকবা মা?
-হেই কতা এহনই ভাবার দরকার নাই, তুই আগে ভালো হ
-নানায় তো কইলো এক সপ্তার মধ্যে এইহান থেইক্যা চইলা যাইতে অইব। আমি না থাকলে তোমার চিন্তাডা অনেক কইমা যাইত মা।
-তুই এইগুলান কি কইতাছস প্রভা? তুই না থাকলে আমি কি নিয়া বাচুম? তুই ভালো অইলে আমরা এইহান থেইক্যা চইলা যামু। এহন একটু ঘুমা।
-হ, লও আমরা ঘুমাইয়া পড়ি।
ধীরে ধীরে রাত গভীর হয়। বিভার চোখে ঘুম আসেনা। অন্ধকার ঘরে অশুভ ভাবনাগুলো কেবলই ভিড় করে ওর মনের কোণে। চোখের সামনে কিছু কুৎসিত মুখ বার বার ভেসে ওঠে। কচি মেয়েটা এই বয়সেই কি নির্মম অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সময়টা পার করছে। লজ্জা, ঘৃনায় কেমন কুকড়ে আছে। সেই সাথে দারিদ্রতার চরম নিষ্পেষণে পিষ্ট হয়ে জীবন চলার পথটা আরও দুর্বিসহ হয়ে উঠছে ক্রমশ। ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে যায় বিভার। পাশে তাকিয়ে দেখে প্রভা নেই। ঘর থেকে বের হয়ে আশে পাশে খুঁজে কোথাও না পেয়ে প্রভার নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। কোন সাড়া পাওয়া যায় না। বিভার চিৎকার শুনে ছুটে আসে পারু। দুজনে মিলে দিঘীর পাড়, বাগানের আশেপাশে খুঁজে বেড়ায়। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে একসময় ঘরের পিছন দিকের বাগানে চলে আসে পারু। বাগান থেকে ঘরের দিকে হেলে পড়া জাম গাছটার কাছে আসতেই চমকে ওঠে ও। বিভাকে ডাকার শক্তিও যেন লোপ পায়। হঠাৎ পারুর দিকে চোখ পড়ে বিভার, ওকে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেদিকে ছুটে যায়। গাছটির কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়, নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস হয়না। চোখের সামনে একমাত্র মেয়ের নিষ্প্রাণ ঝুলন্ত দেহ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

জ্ঞান ফিরে এলে দেখে ওর ছোট্ট আঙিনা লোকে লোকারণ্য। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্ববল বিভা অসহায়ভাবে চেয়ে চেয়ে দেখে তার একমাত্র অবলম্বনটির প্রাণহীন দেহ সবাই মিলে গাছ থেকে নামিয়ে মাটিতে শুইয়ে রেখেছে। এতটা কাল অপরিসীম কষ্ট করে যাকে বুকে আগলে রেখেছিল আজ নিজের চোখের সামনে তাকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বুকের ভিতর তোলপাড় হয়, বুকটা কেবলই ফাঁকা হয়ে যায়।

প্রচন্ড কষ্ট বুকে চেপে মেয়েকে শেষ বিদায় দেয়। তার এই কষ্টের ভাগ নিতে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না। বুকের ভিতর জমাট বাধা কষ্টগুলো আজ এই কঠিন সময়ের আবর্তে ঘুণে ধরা সমাজের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে। মেয়েকে বিদায় দিয়ে বিভা যেন পাথর হয়ে যায়। চারিদিকে নানান কথা, আলোচনা, গুঞ্জন- কোন কিছুই যেন ওকে আর স্পর্শ করে না। ঘরের দাওয়ায় সেই যে চুপ চাপ বসে থাকে আর ওঠে না । সন্ধ্যার পর পারু এসে দেখে বিভা ঘরে নেই। দুপুরে দিয়ে যাওয়া খাবারগুলো তেমনি পড়ে আছে। আশে পাশে কোথাও বিভাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

চলবে....

পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) –

০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ আজ গাশ্বীর রাত ২২• ধূসর গোধূলিঃ তারুণ্যের জয়গান
২৩• ধূসর গোধূলিঃ জলে ভাসা জীবন ২৪• ধূসর গোধূলিঃ সমীকরণ
২৫• ধূসর গোধূলিঃ মুক্তনগর ২৬• ধূসর গোধূলিঃ মেলা
২৭• ধূসর গোধূলিঃ আর্তনাদ ২৮• ধূসর গোধূলিঃ দোররা

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


পড়ছি নিয়মিতই!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।