ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ ৩০ - অনন্ত যাত্রা

sadpainting.jpg

দু’দিন ধরে মাদ্রাসায় ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা তেমন একটা নেই। আজ মাত্র তিনজন ছাত্র ছিল। খুব তাড়াতাড়ি পড়ানো শেষ হয়ে গেলে মঈনুদ্দীন মৌলভী গায়ে শাল জড়িয়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো। তার কপালে চিন্তার রেখা। মফিজ মিয়ার বাড়ির রাস্তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। দীঘির পাড়ের ছোট্ট কুড়েঘরটিতে এ মুহুর্তে কোন সারাশব্দ নেই। মৌলভিসাব মনে মনে ভাবে বিভা কি ফিরেছে? ফিরলেও এত সকালে তো জানা যাবে না। প্রভার আত্মহত্যা মফিজ মিয়াকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে বেশ। গ্রামে এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ কানাঘুষা চলছে, সবাই এই মৃত্যুর জন্য তাকেই দায়ী করেছে। অসহায় ভাতিজিকে তাড়ানোর জন্য তড়িঘড়ি করে বিচারকাজ শেষ করে কচি মেয়েটার উপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষই তা ভালভাবে নেয়নি। উপরন্তু একদিন যেতে না যেতেই তাদের ভিটে থেকে উৎখাত করার জন্য তোড়জোড় তাকে আরও বেকায়দায় ফেলে দেয়। গ্রামের এই অংশে একমাত্র মৌলভী হিসেবে তার নিজেরও একটা সুনাম ছিল, এখন তাতে ভাটা পড়েছে বেশ। সে এই মূহুর্তে সাত্তার মাষ্টার আর তাঁর সাথের লোকজনের কথাই চিন্তা করছে বেশী। কাল সারাদিন কলাবতী বাজারের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল প্রভার বিচার আর আত্মহত্যা, তার সাথে এখন যোগ হল বিভার অন্তর্ধান। তার ভয় একসময় বিচারের দোষে মৌলভী হিসেবে তার দিকেও লোকে আঙ্গুল তুলতে পারে। মফিজ মিয়া নিজেও এই ঘটনার জন্য বেশ চিন্তায় আছে। তবুও এখন একমাত্র ভরসা মফিজ মিয়াই। দেখা যাক সে কিভাবে ব্যাপারটা সামাল দেয়। সে ধীরে ধীরে মফিজ মিয়ার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

বাড়িতে ঢুকে দেখে মফিজ মিয়া বাহিরে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। সে ঘরের সামনের বারান্দায় উঠে বসে। মফিজ মিয়া জিজ্ঞেস করে,
-কি খবর?
-মিয়াভাই, অবস্থা তো সুবিধার মনে অইতাছে না! আইজ মাদ্রাসায় পোলাপাইন আহেনাই তেমন, হুনলাম গ্রামের মানুষ আমগো বিরুদ্ধে খ্যাইপা আছে
-আমিও তাই ভাবতাছি, ঐ ছেমড়ি যে আবার গলায় দড়ি দিয়া বইবো হেইডা তো ভাবি নাই! বিভা কি ফিরা আইছে?
-কইতে পারলাম না, এদিগে আহনের সময় তো কোন সারাশব্দ পাইলাম না!
-এহন কিছু করনের দরকার নাই, কিছুদিন চুপচাপ থাকেন।

ফেরার পথে বিভার ঘরের কাছে এসে মৌলভীসাব দেখে বাড়িটা একেবারে নীরব। কুঁড়েঘরটির দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে- আপাতত কিছুদিন এই ভিটায় আসার স্বপ্ন বাদ দিতে হবে তাকে। এখনই এই বাড়িতে তার আসাটাকে লোকজন ভাল চোখে দেখবে না। আরও সময় নিতে হবে। সে ব্যবস্থা পেয়ারা বেগমই করবে। এখন তার কিছুই করনীয় নেই। তার অংশ সে সফলভাবেই সম্পন্ন করেছে, পরবর্তী দৃশ্যপট ঠিক করার দায়িত্ব মফিজ মিয়ার। সাত্তার মাষ্টার আর তার লোকদের সামাল দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে মফিজ মিয়া। সে এখন দর্শক মাত্র।

বেলা পড়ে এলে বাবার সাথে বইয়ের দোকানে আসে অয়ন। গতকাল থেকেই মনটা ভাল নেই সাত্তার মাষ্টারের। তাঁর চোখের সামনেই এতবড় একটা অনাচার ঘটে গেল, সে কিছুই করতে পারলো না। গ্রামের মানুষ মফিজের উপর ক্ষেপে আছে ঠিকই কিন্তু মাষ্টার জানে এতে তার কিছুই হবে না। একসময় সবাই ভুলে যাবে সবকিছু। কিন্তু মাষ্টার ভুলতে পারছে না কিছুই, সেদিন বিকেলে বিভার কথাগুলো বার বার বিদ্ধ করছে তাকে। গ্রামে এতমানুষ থাকতে সে এই অসহায় মেয়েটিকে বাঁচাতে পারলো না!
দূর থেকে হামিদ, সাঈদ আর কাজেমকে এগিয়ে আসতে দেখে অয়নকে দোকানে বসিয়ে রেখে সামনের খোলা জায়গায় এসে বসে মাষ্টার। একটু পরই জগানন্দ এসে হাজির হয়। সবাই গ্রামের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। হামিদ শেখ বলে ওঠে,
-এইগুলার বিরুদ্ধে আরেকটা যুদ্ধ করতে অইব দেখছি!
-তুমি ঠিকই কইছ, কিছু একটা করা জরুরী অইয়া পড়ছে। দিন দিন অগো অনেক বাড় বাড়তাছে। ওইগুলার পোলাপানগুলাও একেটা হাড়ে হারামি। এতদিন আমগো চুপ কইরা থাকনডা ঠিক অয়নাই, সাঈদ খান বলে ওঠে।
-কি করবা? সাত্তার মাষ্টার বলে
কাজেম মাঝি বলে, আমি একটা বিষয় চিন্তা করতাছি।
-কি? খুইলা কও, বলে ওঠে হামিদ শেখ
-চেয়ারম্যান পদে তো আমগো সাঈদ খাড়াইবো, মেম্বার পদে আতিকরে খাড়া করাইয়া দিলে ক্যামন অয়?
-আতিক কি রাজী অইবো?
-প্রথমে রাজী অইবো না, তয় আমরা জোর করলে না করতে পারবো না। খরচ না হয় আমরা সবাই মিইলা চালাইমু। ওর লাইগা বেশী খাটতে অইবো না।
জগানন্দ বলে- ব্যপারডা মন্দ হয় না। একমাত্র শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আরিফ ভাইরে গ্রামের সবাই খুব ভালবাসে আর তাঁর ছেলে হিসেবে আতিকের বেশ সুনাম আছে সারা গ্রামে। খালেইক্যা আর মজনু ওর লগে ফাইট দিয়া পারবো না।
-ঠিক আছে, এহনি ব্যাপারডা ফাঁস করার দরকার নাই। আগে আতিকের লগে আলাপ কইরা দেহি, বলে ওঠে হামিদ শেখ
আলোচনার এক ফাঁকে নদীর পড়ের দিক থেকে সোরগোল শুনে ঐদিকে ফিরে তাকায় সবাই। বাজার থেকে প্রায় দু’শ গজ দূরে নদীর পাড়ের রাস্তায় একটি জটলা চোখে পড়ছে। ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে ওটা। আরও কিছুটা কাছাকাছি আসতেই উঠে দাঁড়ায় সবাই। এই জায়গাটা রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে হওয়ায় এখান থেকে অনেককিছুই পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। হঠাৎ মাষ্টারসাব দেখতে পান নদীর পাড়ের সরু রাস্তা ধরে একটা ভ্যানগাড়ী বাজারের দিকে এগিয়ে আসছে। সাথে দু’জন পুলিশ কনস্টেবল আর পিছন পিছন আসছে বিভিন্ন বয়সী মানুষের একটা দল। মানুষের হৈ চৈ শুনে মাষ্টারসাব উঠে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ান। ভ্যানটা আরেকটু কাছে আসতেই তিনি দেখতে পান ভ্যানের উপরে চাটাই দিয়ে মোড়ানো একটা মৃতদেহ। ভ্যানটি বাজারে ঢুকতেই উৎসুক লোকের একটা ভিড় জমে যায়। দক্ষিণ পাড়ার করিম লস্কর জিজ্ঞেস করে-
-ও মিয়ারা, কেডা মারা গেল ?
-বে-ওয়ারিশ লাশ, দুই মাইল দূরে নদীর চরে পইড়া আছিলো, লোকজনের কাছে খবর পাইয়া নিয়া আইলাম। কনস্টেবলদের একজন উত্তর দেয়।
-পুরুষ না মেয়েছেলে?
-মেয়েছেলে।
-কোন গ্রামের, চেনা যায় নাই?
-চেহারা চেনার উপায় নাই
-আহারে!

বইয়ের দোকানের সামনে দিয়ে ভ্যানটি যাওয়ার সময় কৌতুহলবশত অয়ন ছুটে এসে বাবার হাত ধরে দাঁড়ায়। চাটাই দিয়ে মোড়ানো থাকায় লাশটা ভালমত দেখা যাচ্ছিল না। ভ্যানটা বড় রাস্তার দিকে মোড় ঘুরবার সময় কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে যায়। আচমকাই চাটাইয়ের ফাঁক গলে বের হয়ে থাকা শাড়ির আঁচলের প্রান্তে মাষ্টারসাবের চোখ আটকে যায়। তিনি দেখতে পান চাটাইয়ের একপাশ দিয়ে বের হয়ে আসা আঁচলের শেষ প্রান্তটিতে একটি গিট দেয়া! হঠাৎ অয়ন হাত দিয়ে ইশারা করে কিছু বলতে গেলে মাষ্টারসাব ওকে থামিয়ে দেন। চারিদিক থেকে উৎসাহী মানুষের ভিড়ে ভ্যানটা আবার ঢাকা পড়ে গেলে মাষ্টারসাব ওখানেই থমকে দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকক্ষণ। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে আসে, মানুষের ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে ভ্যান গাড়ীটি এগিয়ে যেতে থাকে বড় রাস্তার দিকে।

চলবে....

আগের পর্বগুলো দেখতে চাইলে - ধূসর গোধূলিঃ ২৯ - মুক্তির স্বাদ - এ ক্লিকান

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


পড়ছি

আহসান হাবীব's picture


চলুক বন্ধু, অনব্দ্য,গোছালো তোমার মতই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।