বাঙ্গালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দর্শণ
গতকাল বিকেল থেকে একটা চিন্তাই মাথায় ঘুরছিলো কিভাবে আবেদনটুকু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া যায়। বাংলাদেশের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঠিকানা জানে পোষ্ট অফিসের কর্মচারীগণ। প্রধানমন্ত্রী বরাবর যেকোনো চিঠিই তারা পৌঁছে দিবে পুরানা এয়ারপোর্টের পাশে তার কার্যালয়ে তবে শুধু আবেদনপত্র পৌঁছে দিলেই কাজ হয়ে যাবে এমনটা আশা করা অনুচিত, প্রেক্ষাপট এমনই যে সেটা স্বহস্তে জমা দিয়ে রেফারেন্স নাম্বার আর এক্সেপ্টেন্স নাম্বারটাও নিয়ে আসা লাগবে।
গতকাল রাতে লেখা পোষ্টে নুশেরার মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঠিকানাটা পেলাম, আমি আশা করেছিলেন তেজগাঁও বাদ দিলেও এই অফিসের কোনো শাখা-প্রশাখা হয়তো অন্য কোথাও থাকবে, সেখানে গিয়ে অনুনয় করলে হয়তো রেফারেন্স নাম্বারটুকু নিয়ে আসা যাবে।
গতকাল রাতে ফেসবুকে সরকারী কর্মচারী এক বন্ধুকে ঠিকানা জানানোর আব্দার ধরলাম, সে বললো আব্দুল গনি রোডে হয়তো একটা শাখা আছে- ত্রান অধিদপ্তরের একটা শাখা আছে আব্দুল গনি রোডে, সেটা প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা একটি দপ্তর তবে আবেদনপত্রটা সেখানে পৌঁছে দিলে হবে না, সেটার কার্যপ্রণালী ভিন্ন।
সকালে পিয়াল ভাইকে ফোন দিয়ে বললাম আপনি একটা ব্যবস্থা করে দেন। পিয়াল ভাই আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় চেনালেন তবে সে কার্যালয়ে প্রবেশের বিষয়ে কোনো সহায়তা পাওয়া গেলো না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বেশ বড় একটা এলাকা জুড়ে নাখাল পাড়ার পাশে অবস্থিত, সামনে বিশাল একটা মাঠ, দুরে যে ভবনটা দেখা যায় সেটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সামনে ছাঁটা লন আর ফুলের বাগান আর চারপাশের দেয়ালের অন্য পাশের জগতটা অচেনা।
পৃথিবী এগিয়ে গিয়েছে অনেক, খোদ হোয়াইট হাউজে প্রতি দিনই দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন, তবে বাংলাদেশের মতো গরীব দেশে গুপ্ত হত্যার বিশাল ইতিহাস রয়েছে, এত সহজে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা বাসভবন কিংবা রাষ্ট্রপতির বাসভবনে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। একশত একটা ঝামেলা হয়তো থাকবে যার অধিকাংশই অপ্রয়োজনীয়।
প্রথম অসস্তির বিষয়টা হলো আমি আম জনতা একজন সোজা গেটের সামনে দিয়ে বলতে পারি না আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই, আমি তাকে সালাম দিয়েছি। ক্ষমতা এবং হায়ার্কি বিবেচনায় তিনি আমাকে এত্তেলা দিতে পারেন তবে আমি তাকে এত্তেলা দেওয়ার অধিকারী নই। সুতরাং গেটে কর্তব্যরত এসএসএফের সাথে বিস্তারিত বলে সাক্ষাৎকারের অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে। আমার সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি বিশেষ এলার্জী সুতরাং সেটা করা সম্ভবপর হবে না।
এক বন্ধুকে ফোন দিলাম, আমার প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের ঠিকানা দরকার, সে তখন মিটিং এ ব্যস্ত, মিটিং শেষ করে জানালো আমাদের এক বন্ধু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করছে। তার ফোন নাম্বারও দিলো। আমি উৎসাহ নিয়ে তাকে ফোন করলাম, যথারীতি ফোনে পাওয়া গেলো না তাকে।
তার অফিসের নাম্বার খুঁজে পেলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তালিকা থেকে, সে নাম্বারে ফোন দেওয়ার পরও দেখলাম কেউ ধরছে না ফোন, লাঞ্চ টাইমে অফিসের টেবিলে না থাকাটা তেমন দোষের নয়। দুপুরে ভাত খেয়ে মনে হলো একটা চেষ্টা করে দেখি-
আমাকে অবাক করে দিয়ে কেউ একজন ফোনটা ধরলো, আমিও বেশ অসস্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। এবং নিশ্চিত হলাম আমার বন্ধুই ফোন ধরেছে। তাকে জানালাম আমার প্রয়োজনের কথা- সে বললো আমি চাইলে যেকোনো দিনই তার অফিসে যেতে পারি- আমি বললাম আমার খুব জরুরী দরকার- প্রতিটা মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ- তখন ঘড়িতে পৌনে চারটা। বললো আমি ৫টা পর্যন্ত আছি অফিসে তুমি আসতে পারলে চলে আসো। আমি বললাম কোনো সমস্যা নেই আমি আসছি- ও জানালো আমার জন্য গেট পাসের বন্দোবস্ত করে রাখবে, গেটে গিয়ে নাম বললেই হবে।
আমিও বাসা থেকে বের হয়ে টুটুলের অফিস পর্যন্ত সিএনজি নিলাম, টুটুলের কাছ থেকে আবেদনপত্রটা নিয়ে সিএনজিচালককে বললাম সোজা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দাঁড়াবে।
সিএনজি চালক রসিক মানুষ তিনি সোজা গেটের সামনে চলে গেলেন, আমি বললাম ভাই আপনি এখানেই থামেন, মনে হয় না সিএনজি নিয়ে ভিতরে ঢোকা যাবে। সিএনজি চালক বললো যদি সুযোগ হয় তাহলে তো আমি সিএনজি নিয়েই ভেতরে ঢুকবো কোনো দিন, আপনি চাইলেই হবে।
গার্ড আমার হ্যাংলা পাতলা দাড়িবিহীন শরীর দেখে তেমন চিন্তিত হয় নি। আমিও রোববার বিকালের ভ্রমনার্থীর মতো বললাম আমার একটা গেট পাস থাকবার কথা ওটা কোথায় পাবো?
পাশের অফিসে গেলাম, অফিসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন জুইতের না। সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা- আপনার আগ্নেয়াস্ত্র এখানে জমা দিন। সেখানকার লোককে বললাম পাসের কথা- আমার নামে কোনো পাস নেই, তবে নাম ঠিকানা মিলিয়ে হাতে একটা পাস ধরিয়ে দিলো- সেটা গ্রীন এবং সাদা জোনের জন্য প্রযোজ্য।
আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম অবশেষে, হাতে সাহায্যের আবেদন আর মনে ফুর্তি। এত দিন বাস থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের মাঠ দেখে মনে হতো সেখানে ফুটবল খেলতে ভালো লাগবে, তবে মাঠটা ফুটবল খেলার অনুপযোগী। অনেকগুলো ঝর্ণা লাগানো সেখানে, আর সেসব পাইপে বাড়ি লেগে পায়ের আঙ্গুল খুলে যাওয়ার সমুহ সম্ভবনা রয়েছে। সম্ভবত সেটাই গ্রীন জোন, আর তার সামনে প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়। সেখানে আরও এক দফা চেকিং হলো, তেমন কড়া চেকিং না, যদি প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ নিয়ে কেউ ঢুকে যায় তবে তাদের সামর্থ্য নেই সেটা বুঝবে। সেখানেই বন্ধুর অফিসের রুম নাম্বার জিজ্ঞাসা করলাম , এসএসএফ আমার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বললো ভেতরে যান এমনিই খুঁজে পাবেন ।
ভেতরটা ধুমপানমুক্ত এলাকা- সেটা বড় করে লেখা আছে ,তবে প্রবেশ করলেই সিগারেটের গন্ধ আসলো নাকে- এই নিয়ম তদারকি করবার কেউ নেই। বন্ধুর অফিসও খুঁজে পেলাম, শুধু বন্ধুর দেখা নেই। আমি এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখি। সেখানে মহুয়া গাছ আর বাতাবি লেবু গাছ। আর অসংখ্য আম গাছ, তার পেছনে অন্য একটা বাসা দেখা যাচ্ছে, তবে মনে হয় পেছন দিকেও একই রকম নিরাপত্তা প্রহরীর বসবাস থাকবে।
অবশেষে বন্ধুর দেখা পেলাম। তার সাথে পুরোনো দিনের আলোচনা হলো। প্রায় ১০ বছর পর তার সাথে দেখা হলো এবার। অনেক চেনা মানুষের খোঁজ শেষ করে বললাম আমার খুব জরুরী ভিত্তিতে এটা জমা দেওয়া দরকার। অফিসের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি একজন আবেদনপত্রটি নিয়ে জমা দিয়ে আসলেন। একটু পরেই সেটার রিসিট পেলাম, ১৮ই জুলাই ২০১০ আবেদনপত্রটি গৃহীত হয়েছে। এর বাইরে অন্য কিছু পেলাম না। আশা করেছিলেম কোনো টিকেট দিবে কিন্তু তা যখন পেলাম না তখন সে আশা না করাই ভালো।
ঘড়িতে তখন ৫টা ৫। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নয় শুধু যেকোনো রাজনৈতিক নেতা বিশেষত নির্বাচিত এমপি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী চাইলেই রাজনৈতিক বিবেচনায় লোক নিয়োগ দিতে পারেন, এসব নিয়োগের অধিকাংশই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। তাদের ক্ষমতা সরকারী প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের মতো তবে তাদের নিয়োগটা অস্থায়ী। আমার পাশের টেবিলে বসে থাকা সুশ্রী ভদ্রলোকটিও এমনই একজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারী, তিনি ঠিক ৫টায় অফিস ত্যাগ করলেন। আমিও বাসা চলে আসবো ভাবছিলাম। হাতে পাওয়া পাসটিতে লেখা গ্রিন জোন এবং হোয়াইট জোনের মাজেজা জিজ্ঞাসা করলাম বন্ধুকে। সে জানালো প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনটি জোন আছে, গ্রীন জোন, হোয়াইট জোন আর রেড জোন। হোয়াইট জোন হলো সামনের ময়দানটুকু, আর গ্রীন জোন হলো সরকারী কার্যালয়ের সাদা ভবনটুকু আর রেড জোন হলো প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কার্যালয়, সেখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর।
প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব দপ্তর আর এই কার্যালয়ের মাঝখানে একটা গাছের বেষ্টনী আছে, লতানো গাছের বেষ্টনী। সেটার সামনে একটা উঁচু মঞ্চ, সেখানে দুটো হার্ট আর মাঝে একটু হলুদ ফুলের কেয়ারী। মালির প্রেমময়তা বুঝলাম, হয়তো এরশাদ এখানে বসেই বলেছিলো মেয়েরা আমাকে চায়, আমি তো তাদের না করতে পারি না,
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের বাগানের গোলাপগুলো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে, অনেক কলিই বিধ্বস্ত, সম্ভবত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় এমনটা ঘটেছে। বলা যায় না পৃথিবীতে অনেক আশ্চর্য ঘটনাই ঘটে।





অন্যরকম অভিজ্ঞতা
বিরাট অভিজ্ঞতা।
বিরাট কামেলিয় চোখে দেখা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভিতরটা...
বিয়াপক মজা পাইলাম। এই কার্যালয়ে বছরে অন্তত ২/৩ বার আমার যাওয়া হয়...
দারুণ একটি রাসেলীয় লেখা পড়লাম
জনতার সংগ্রাম চলবে.....
ব্যাপক দেখি।
কয়েকটা ছবি দিলে জাক্কাস হইত!
(আমি গেলে মোবাইল দিয়ে ফটে তুলতাম)
আরে , এইটা দিয়েই একটা সিনেমা বানানো যায় - প্রধানমন্ত্রীর অফিস দর্শন - The philosophy
রাসেলের স্মরনীয় দিনের খাতায় আরো একটি দিন যোগ হলো। ব্যাপক শুভকামনা, পরের বার যেনো খোদ প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত হয় সে দোয়া অগ্রীম রাখলাম
মন্তব্য করুন