হাসপাতালে
আমরা জাতিগত ভাবেই নোংরা এটা বুঝা যায় সরকারী হাসপাতালগুলোতে গেলে,আমাদের সৈন্দর্য্যসচেতনতা, বিবেচনা ও পরিচ্ছন্নতা বোধের পরিমাণ শূণ্যের চেয়ে নীচে। সরকারী হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার মান হয়তো অন্যান্য সস্তা প্রাইভেট ক্লিনিকের তুলনায় ভালো, সেরা সেরা ডাক্তারেরা সেখানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন তবে যদি রোগী এবং তাদের স্বজনদের ভেতরে পরিচ্ছন্নতাবোধটুকু না থাকে তাহলে সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন।
ঢাকা শহরের অধিকাংশ হাসপাতাল আর ক্লিনিকের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তেমন সুষ্ঠু ব্যবস্থাও গড়ে উঠে নি, এসব নাগরিক পরিচ্ছন্নতা বোধ জন্মানোর জন্য আবার আমাদের এনজিওদের শরণাপন্ন হতে হয়। কোনো একদিন কোনো এক পরিবেশবাদি এনজিও এসে সভা সেমিনার করে বলবে আপনার আশে পাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখেন, আমরা নিয়মিত আসবো আপনাদের এলাকায়, দেখবো আপনারা ঠিক মতো ডাস্টবীনে ময়লা ফেলছেন কি না- সে সময়ে আমাদের ভেতরে পরিচ্ছন্ন থাকবার একটা বাতিক গড়ে উঠবে, এমন ২ বছরের পাইলট প্রজেক্ট শেষে এনজিও কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে আমরা পুনরায় নোংরামি শুরু করবো- এই ২ বছরের চর্চাটা এক দিনের ভেতরেই ভুলে যাবো, এই হলো আমাদের পরিচ্ছন্নতা বোধের পরিমাপ।
হাসপাতাল আমার খুব বেশী পছন্দের জায়গা না, বেসরকারী ক্লিনিকের ফিনাইল আর ডেটলের গন্ধে ভাড়ী হয়ে থাকা বাতাসে আমার দমবন্ধ লাগে আর সরকারী হাসপাতালের আবর্জনা আর পড়ে থাকা পঁচে যাওয়া পূঁজ, রক্ত, সিরিঞ্জ, ঔষধ, সব মিলিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পর থেকে একটা দমবদ্ধ ভাব হতে থাকে।
আজ গিয়েছিলাম জাহানারাকে দেখতে। লীনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করতে চাই না, সে যা করেছে সেটা অনেকে কল্পনায়ও করে না। মহিয়সী মহিলাকে শ্রদ্ধা। ডাক্তারের সাথে কথা হলো, ডাক্তার বললেন অবস্থা বেশী ভালো না, আবার খারাপও না, তাদের চেষ্টা থাকবে, আমরা অপারেশনের প্রস্তুতি নেই, সেটা দীর্ঘসূত্রী কোনো বিষয় হলে রোগী মারা যেতে পারে, হার্টের কাজ শুধু রক্তকে শরীরের বিভিন্ন অংশ সঞ্চালন করা নয়, বরং হার্টের দুটো অংশ ভিন্ন দুটি কাজ করে, ফুসফুস থেকে অক্সিজেন মেশানো রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে পরিচালিত করতে ধমনিতে যে চাপ প্রয়োজন হয় সেটার জোগান দেয় হৃদপিন্ড, আর শিরা থেকে রক্তটা টেনে নিয়ে শোধনের জন্য পাঠায়, তবে মাঝের ভাল্ভটুকু নষ্ট থাকায় এই অক্সিজেনসমৃদ্ধ এবং কার্বন ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ রক্ত মিশ্রিত হচ্ছে এবং শরীরে অক্সিজেনের টান পড়ছে।
এটুকুই রোগির সমস্যা এবং এটাই পরবর্তীতে শাররীক কার্যক্রম স্থবির করে দিতে পারে
কর্তব্যরত নার্স ছুটে এসে অভিযোগ করলেন সহকর্মীদের কাছে- এভাবে করলে কিভাবে পরিস্কার রাখা সম্ভব, লোকজন ওষুধের প্যাকেট ফেলছে যেখানে সেখানে দলা পাকিয়ে, একজন রোগীর সাথে ন্যুনতম ১ জনএবং ক্ষেত্র বিশেষে ৩ থেকে ৪ জন উপস্থিত। তাদের খাওয়া, তাদের অপরিচ্ছন্নতা এবং তাদের আচরণ সবই হজম করতে হয় এ হাসপাতালকে। বাংলাদেশের ডাক্তারদের উপরে মানুষের ভরসা নেই, নার্সদের উপরেও ভরস নেই, হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপরে ভরসা নেই তাদের। সুতরাং রোগীর স্বজনদের ধারণা তারা উপস্থিত না থাকলে রোগীর ঠিক যত্ন হবে না। এবং হাসপাতালের নার্সরা হয়তো দায়িত্ব নিয়ে ঔষধ সেবন করাবেন ঘড়ির কাঁটা ধরে কিন্তু ঔষধ বদল হলে সেটা কিনতে যাবে কে? ডাক্তার ঔষধ লিখে দিয়ে চলে যাবেন এবং সেটা কাউকে না কাউকে সংগ্রহ করে আনতে হবে- চিকিৎসা ব্যবস্থাতে অনেক কিছুই করার অবকাশ রয়েছে এখনও। রোগী হাসপাতালে আরোগ্যের আশ্বাস নিয়ে আসে না, কোনো মতে বেঁচে গেলে ভবিষ্যতে এমুখো আর হবো না এসপার ওসপার একটা মরিয়া ভাব নিয়েই তারা হাসপাতালে আসে।
এইসব রোগীর স্বজনদের জন্য এমনিই অপরিচ্ছন্ন হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার মান নিম্নমুখী।
ধরা যাক ডাক্তার রাউন্ডে এসেছেন, তিনি সবাইকে ওয়ার্ডের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন, সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে, কিন্তু অপেক্ষা করবে কোথায়? কোনো বসবার বন্দোবস্ত নেই, হাসপাতাল তৈরির সময় এটা কারো ভাবনায় আসে নি রোগীর স্বজনদের অপেক্ষা করবার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। এমন কি হাসপাতালের ব্যবস্থাতে রোগীর স্বজনদের নির্ধারিত সাক্ষাতের সময়ের বাইরে হাসপাতালে অবস্থান করাও নিষিদ্ধ। যদি সবাই এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতো........
এক রোগীর স্বজন, বয়েস অনুর্ধ ২৩, পাশে বসে অভিযোগ করছে বসবার ব্যবস্থা নেই, অন্য একজন বড়লাটের ছোটো ছেলে, আদরের সন্তান, দোতালা থেকে নীচে নামবেন, লিফটের বোতাম চেপে অপেক্ষা করছেন, তিনি নীচে যাওয়ার বোতাম চাপলেন, তাতে লিফট আসলো না দেখে উপরে যাওয়া বোতাম চাপলেন, তারপর খরচোখে তাকিয়ে দেখলেন লিফটের দরজা , যেনো কেউ ষড়যন্ত্র করে তার এই অধঃপতনের সহজ বন্দোবস্তটুকু আটকে রেখেছে। তিনি সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন।
এক বৃদ্ধা এসেছেন রোগী নিয়ে, তার রোগিকে নিয়ে যেতে হবে পরীক্ষার জন্য, তিনি ব্যস্ত, লিফটের বোতাম চেপেছেন, লিফট আসছে না, অধৈর্য্য হয়ে তিনি লিফটের দরজায় আঘাত করছেন যেনো এ আঘাতেই লিফটের দরজা খুলে যাবে, কেউ ভেতর থেকে আটকে রেখেছে লিফটকে।
আমরা যে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম তার আসবার কথা ছিলো কখন তাও জানি না, তবে তিনি আসবার পর আমরা তার কাছে জানতে চাইবো রোগীর সাম্প্রতিক অবস্থা এমনটাই পরিকল্পনা আমাদের। আর তাকে জানাবো আপনারা রোগীকে অপরেশনের জন্য প্রস্তুত করবার প্রক্রিয়া শুরু করেন আমরা বাকিটা বন্দোবস্ত করছি।
আমরা ভেতরের কড়িডোরে অপেক্ষা করবার সময় একজন রোগীর স্বজন আসলেন, ভারিক্কি চেহারা, গুরুগম্ভীর মানুষ, তিনি এসেই একদলা থুতু ফেললেন করিডোরে, তার পেছনে দাঁড়ানো গার্ড কিংবা সামনে দিয়ে যাওয়া নার্স কেউই কিছু মনে করলেন না। তারা এসব নোংরামিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। তাও আমাদের ধন্য হতে হবে যে তিনি ঠিক করিডোরের মাঝখানে থুতু ফেলেল নি বরং ফেলেছেন করিডোরের পাশের দেয়াল ঘেঁষে।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের পাশে কিংবা এস্টোরিয়ায় কোনো একদিন বিকালে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম সাইড ওয়াকের দেয়াল ঘেঁষে বেশ পুরু পানের পিক। আড়াআড়ি ছড়িয়ে পড়েছে, চলতি পথে যাওয়া কোনো ব্যস্ত বাঙ্গালী পিচিক করে পিক ফেলেছেন, তার গতি দেয়ালের বাধা, আর পিকের তারল্য সব মিলে একটা বিমূর্ত আড়াআড়ি দায় রয়ে গেছে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে, আরও একটু সামনে এগিয়ে দেখলাম পোষ্ট অফিস, সেখানের সামনে কিছু সোডার বোতল, আর পানের পিক, আমি অবশেষে বাঙ্গালী পরিবেশ খুঁজে পেয়ে আনন্দিত হয়েছিলাম। তাই যখন একটি বাঙ্গালী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর অপরিচ্ছন্নতার দায়ে একটি বাঙ্গালী সংগঠনকে ১০ হাজার ডলার জরিমাণা করেছিলো স্কুল কতৃপক্ষ সেটাতে অবাক হই নি। আমাদের জাতীয় স্বভাবের ভেতরেই এই অপরিচ্ছন্নতা ঢুকে আছে, আমরা বরং পরিচ্ছন্ন জায়গায় থাকলে নিজেই অসস্তিতে ভুগবো।
আমাদের কায়িক শ্রমে অনীহা, আমাদের অপরিচ্ছন্ন থাকবার বাতিক, আমাদের স্বাস্থ্যসচেতনতার নীচু মান এবং আমাদের নিয়মিত চেকআপের অনীহা, সব মিলিয়ে আমাদের রোগীরা যকহন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তার অবস্থা তখন মাঝারি পর্যায়ে খারাপ, আর অনেকগুলো অসুখের প্রাথমিক উপসর্গ শুরু হয় জ্বর দিয়ে, সেসব জ্বরের নিদান প্যারাসিটামল, বেক্সিমকো, স্কয়ার, এক্সায়েফ, সকল কোম্পানির এইসব ঔষধ বাজারে প্রচুর চলে। এভাবে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে যখন সেটা ক্রণিক ব্যধিতে পরিণত হবে তখন আমরা হাসপাতাল ডাক্তার ১০০০ পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হবো। অহেতুকচিকিৎসা খরচ বাড়াবো। কিন্তু নিজেদের সংশোধন করে একটু স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে আগ্রহী হবো না।
ডাক্তার আলোচনা শেষে জানালেন, তারা রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন, কিন্তু রোগী অপারেশনের জন্য প্রস্তুত কি না তা জানা যাবে এনজিওগ্রাম করলে, সেটা করবার জন্য হাসপাতালের নির্ধারিত দিন হলো ২৭শে জুলাই, সে দিন যে যন্ত্রে করা হবে এনজিওগ্রাম সেটা নষ্ট, সুতরাং আমাদের ৩১শে জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, সেদিন যে যন্ত্র ব্যবহার করা হবে তা ঠিক আছে।
জানতে চাইলাম রোগীর অবস্থা, বললেন এ রোগতো এক দিনে হয় নি, গত ১০ ১২ বছর ধরে এই সমস্যাটা পুষছেন রোগী। অবশ্য এটা বুঝবার কথা না তেমন ভাবে, হাঁফ ধরে যাওয়া, একটু দুর্বল লাগা এসব অনুভুতি কোনো গৃহীনি কখনও আমলে এনেছেন এমন দেখা যায় নি বাংলাদেশে। তারা এসব কথা বললে বরং গেরস্ত হামলে আসবেন, গৃহিনীদের এমন দুর্বল লাগা, হাফিয়ে যাওয়ার অধিকার নেই।
বললেন আপনারা চেষ্টা করছেন শুনেছি, সেটা তো দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, আশা করা যায় ততদিন রোগী ঠিক থাকবে, আবার নাও থাকতে পার, কিছুই বলা যায় না। আমরা আশাহত নই, আমরা বলেছি আপনারা আপনাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখেন আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাই, কিছু একটা হবে। এত কাছে এসে পরাজয় স্বীকার করা ঠিক না।





মেসবাহ ভাইয়ের সাথে কথা বললাম এনজিওগ্রাম করতে ১৫০০০ টাকা লাগবে। ভালব এর ব্যবস্থা হয়ে গেলে বাইরে থেকে করে ফেলা যেত।
জাহানারা সুস্থ হয়ে উঠুন, সময়মতো যেন সব ব্যবস্থা হয়ে যায়...
পুরো লেখাতে বিভিন্ন বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণের সূক্ষতাকে সাধুবাদ না জানিয়ে পারছি না।
জাহানারার সুস্থতার জন্য দোয়া করছি।
আশা করি প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান ইতিমধ্যে হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতাবোধের দিক দিয়ে আমরা মনে হয় অনেকটাই পেছনে।
হাসপাতাল ও রোগ নিয়ে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের জন্য ধন্যবাদ।
হতাশার কিছু নাই। সমাজে এখনও সব পেশার কিছু কিছু ভাল মানুষ আছেন। আমরা আশাবাদী।
আমাদের জাতীয় প্রায় সব প্রতিষ্টান নষ্ট হতে বসেছে। চরম দলীয়করনের জন্য চরম অযোগ্য লোক গুলো জাতীয় প্রায় সব প্রতিষ্টান নষ্ট করে দিচ্ছে।
জাতীয় প্রতিষ্টান গুলোর 'হেড/প্রধান' সারা বছরেও তার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্টান একবার ঘুরে দেখেন কিনা আমার সন্দেহ হয়! প্রতিষ্টানের কোথায় কোথায় ওয়াসরুম/বাথরুম আছে তা তিনি বলতেই পারবেন না!
আর পরিস্কার! এটা আবার কি!
বড়ই বিচিত্র!
রোগীনির অবস্থা অবনতির দিকে, এখন পর্যন্ত যোগাড় হয়নি পর্যাপ্ত অর্থ কিঙবা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন। হাতপাতালের অনুন্নত পারিবেশে থেকে তিনি আরো খারাপের পথে অগ্রসর হচ্ছেন, কষ্টে বুকটা ভেঙে যাচ্ছে- মাঝে মাঝে নিজেকে বড় অসহায় লাগে!
কত টাকা সংস্থান হয়েছে বা ঘাটতি কতটুকু একটু জানতে পারি কি?
আমি সামান্য কিছু টুটুল ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছিলাম, আরেকটু চেষ্টা করে দেখতে পারি। যাই পারি তাই লাভ।
সরাসরি জিজ্ঞাসা করায় আশা করি কিছু মনে করবেন না।
পর্যবেক্ষণ ঠিকাছে।
এত কাছে এসে পরাজয় স্বীকার করা ঠিক না
মন্তব্য করুন