ইউজার লগইন

কোথাও তাল কেটে গেছে

দুঃখ আর হতাশা ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, দীঘদিন তিক্তস্মৃতিচারণে বিষন্নতাই বাড়ে শুধু। আবার হাসছি, আড্ডা দিচ্ছি রোজকার মতো, সব ভুলে দিব্যি মেতে উঠেছি খুনসুটিতে, জীবন থেমে থাকে না, বিভিন্ন রকম অর্থনৈতিক ঝক্কি নিয়েই জীবনযাপন, পেটের দায়ে সদ্যোজাত সন্তান ফেলে মা দুয়ারে হানা দিলে বুঝি কংক্রীটের শহরটা নির্মম, এখানে ফিরে তাকাবার অবসর নেই।
তারপরও আমাদের উচ্ছলতা থেমে থাকে না, আত্মগ্লানি কোনো সমাধান নয়, রাষ্ট্রের যাবতীয় উদাসীনতার দায় কি আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে? অমানবিক সবকিছুই উপেক্ষাযোগ্য, সারসত্য বেঁচেবর্তে থাকা। তবু চোখের পানি চোখেই শুকিয়ে ফেলতে শিখি নিত্যদিন। মোচড় দিয়ে উঠা কষ্টবোধটুকু গিলে ফেলি, কতটুকু কর্তব্যসচেতন ছিলাম আদতে? সত্যি কি আমার সবটুকু সামর্থ্য দিতে পেরেছিলাম? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাই নি। গত এক সপ্তাহ অনেক রকম প্রমোদে মেতেছে মন, তবে এই পরাজিত বোধটা পিছু ছাড়ে নি। অবসর হলেই নিজের সাথে নিজের অমীমাংসিত এই লড়াই চলতে থাকে।

আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমাদের স্বপ্নে দিন বদলে দেওয়ার যাবতীয় আয়োজনও ছিলো। সেইসব কৈশোরের বিহ্বলতা, সেইসব স্বপ্নের রেণু উড়ে গেছে চোখের কোণ থেকে, মাঝবয়েসী হয়ে ওঠা শরীরকে ঠেলে নিয়ে যেতে হয়।বয়েসটা সুবিধার না। প্রথম যেদিন ন্যাশনাল হার্ট ইন্সটিটিউটের সামনের রাস্তায় অপেক্ষা করছিলাম, সেদিন শহরে কার্ফিউ, মিলিটারি ভ্যান, পুলিশের লাঠি পাশ কাঁটিয়ে গলি উপগলি সব পার করে কলেজ গেটের সামনে এসে নেমেছিলাম রিকশা থেকে, ২০০৭ সালের ২২শে আগস্ট , রাস্তা কাঁপিয়ে ছুটে যাচ্ছে বিডিআরের ট্রাক, প্রতিটি রাস্তায় পুলিশ আর আর্মির টহল, আর তার আগের দিন রাতেই অসুস্থ দাদাকে নিয়ে দাদি একা শহরটা চষে ফেলেছে। সেদিন মোবাইল বন্ধ ছিলো, হঠাৎ করেই সন্ধ্যা থেকেই মোবাইল বন্ধ করে দেওয়ার মাতলামি কেনো এসেছিলো মইন উ আহমেদ আর তার বদান্যতায় ক্ষমতাবান হয়ে উঠা ১১ উজবুকের মাথায় জানা যায় নি। মোবাইলটা চালু হতেই ছোটো বোনের ফোন পেয়ে কোনো রকমে রাস্তায় নেমে একটা রিকশা ঠিক করেই চলে এসেছিলাম। থমথমে শহরের রাস্তায় অসংখ্য মানুষ। তাদের সবাই উদভ্রান্ত, কেউই জানে না আসলে কি ঘটছে?

সিসিইউর সামনে সেদিনও আছড়ে কাঁদছিলো এক মা, কান্নার সুর একই রকম, সুরেলাক্রন্দন, বিলাপের ভেতরেও একটা সুর থাকে, মানুষ কর্কশ সুরে কাঁদে না, কান্নার ফাঁকে ফাঁকে জীবনের ইতিহাস বয়ান হয়। তোর বাপের কি হবে রে, তোরে দেখতে চাইছিলো বাবা রে আমার, কলম ও বাবা কলম তুই কই, তোমরা আমার যাদুরে খুঁজি আনি দাও, বাবা কলম ও বাবা কলম

অসহ্য লাগছিলো, তোর বাবাক লিয়ি আইছিলাম ওরে কলম এখন আমার নয়নের মনি কই গেলো। কই গেলি তুই বাবা কলম, তোর বাপ তোরে একবার দিখতি চাইছিলো।
এইসব মুহূর্তে কিছু বলবার থাকে না, মহিলার বয়েস খুব বেশী হলে ৩৫ হবে, তার শোকগ্রস্ত মুর্তি, তার আছড়ে ভেঙে ফেলা কাঁচের চুড়ি, তার এলেমেলো ছড়িয়ে থাকা শাড়ী আর এই অবিশ্রান্ত বিলাপের মাঝখানেই ধীরে বলেছিলাম, কই আছে জানেন?
ঐতো ঐ বাইরে গেলো চা আনতে, তারপরেই তো সব শেষ হয়ে গেলো, ও বাবা কলম, তোর বাপ তো তোরে একবার দেখতে চাইছিলো। আপনেরা যেমন করে পারেন আমার কলমকে খুঁজি আনি দেন।

বাইরে সািরেন বাজিয়ে ছুটে যাওয়া পুলিশের ভ্যান, লাঠি হাতে দাবড়ে বেড়ানো সব আর্মি জাওয়ান, তাদের কারো তেমন কিছু মনে হয় নি। উপরওয়ালার নির্দেশ মেনেই তারা চলছেন, সেখানে জীবিত কিংবা মৃতের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। হুকুমের গোলাম সবাই।

মামারা এসে পৌঁছেছিলো তারও ঘন্টাখানেক পর, সমস্ত রাস্তাই পুলিশ আর আর্মিকে অনুনয় করতে হয়েছে, তারাও রসিক, বলেছে যার হার্ট এটাক হয়েছে সেতো হাসপাতালেই আছে, আপনাদের যাওয়ার প্রয়োজন কি? কথাটা সত্যি, যে অসুস্থ সে হাসপাটালে পৌঁছেছে, সারা রাত ৩টা হাসপাতালের দরজা ধাক্কা দিয়ে রাত ৩টায় যে মানুষটা অর্ধেক শহর ডিঙিয়ে শ্যামলী পৌঁছেছে তার বিশ্রামের প্রয়োজন নেই, তার ক্ষুধা তৃষ্ণা বোধ নেই, তিনি এই বিপদের সময় পকেট ভর্তি করে সৈদি রিয়াল নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন, সেখানে বেহশতি ব্যবস্থা আছে, চাইলেই আঙ্গুর পেশতা ভেসে ভেসে মুখে চলে আসবে।

সবাই বয়োজোষ্ঠ্য, মন খুলে গালিও দেওয়া যায় না। ছোটো বোনটা প্রায় ৪ মাইল হেঁটে লাল হয়ে যখন হাসপাতালে পৌঁছালো তখনও জানি না আমি সম্পূর্ণ পথটা কিভাবে পাড়ি দিবো। হাসপাতালের নীচে একটা রিকশা থামলো, সেখান থেকে ইমার্জেন্সীতে ঢুকলো পঞ্চাশোর্ধ একজন, একটু দেখেন ডাক্তার, একটু দেখেন বাবাকে বাঁচানো যায় কি না?
শীর্ণ একটা মানুষ, তার কষ বেয়ে ফেনা পড়ছে, তার বুকে পাম্প করছে দুজন, কয়েকবার চেষ্টা করে তারা নিরাবেগ জানিয়ে দিলো আর সম্ভব না। ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দেওয়ার পর সেখানেই স্থানু বসে থাকলো মধ্যবয়সী তিন ভাই। আর কিছুই করার নাই ভাই, যা হওয়ার হয়েছে, চলো বাবাকে বাসায় নিয়ে যাই।

কিছু কিছু কান্না একেবারে বুকের ভেতরে ঘাঁই মারে।

হাসপাতালের ভেতরে সব নিয়ম ভেঙে ঢুকলো একটা প্রাইভেট কার, ইমার্জেন্সীর বয় ছুটে আসলো স্টেচার নিয়েই, আমাদের চেয়ে ছোটো একটা ছেলে, বয়েস ৩০, স্টেচারে পড়ে আছে, তার পাশে তার স্ত্রী, একটা মেয়ে বড়জোর ১ বছর, আর তার মা আর ভাই। আমার এক বন্ধুর ছোটো ভাইয়ের মতো দেখতে, কাঁপাকাঁপা হাতে বন্ধুর নাম্বার ডায়াল করি। এই বিপদজনক শহরে সবাই ঠিকঠাক আছে এটাই সবচেয়ে বড় সংবাদ।

উপরের মহিলার কান্না থেমেছে, লাশটাও সিসিইউ থেকে বের করে সাদা কাপড় মুড়ে রাখা হয়েছে হাসপাতালের সামনের বারান্দায়, কলমকে খুঁজে পাওয়া গেছে অবশেষে, সে কাফনের একটা কোণা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, মহিলা ডাক্তারকে ডেকে বলছে আপনি লাশের কাগজ দেন, ওকে নিয়ে মানিকগঞ্জ যাই।

আমি বাইরের রাস্তা দেখি, যানবাহনবিহীন একটা রাস্তায় কিভাবে নামবে মানুষ, শহরে কার্ফ্যু, মিলিটারি ভ্যান, সবারই পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে ঘুরতে হবে, মহামান্য সামরিক বাহিনী প্রধানের নির্দেশ- তিনি আপাতত এই ভূখন্ডের সর্বময় কর্তা, তিনিই ইশ্বর, তার দেবদুতের দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরের প্রধান সড়কে।

আমি রাস্তায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ দেকতে দেখতে চললাম বাসার পথে।
তারপর থেকে আর এই দিকেই আসা হয় নি, দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক কাল শেষে হাসিনার আমল দেখলাম, কোনো প্রয়োজন হয় নি শহরের এ মাথায় আসবার। সেদিন সকালে সেলিনার ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে পুনরায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম সিসিইউর সামনে। দেবদুতের মতো লীনা এসে হাজির না হলে হয়তো আমি তেমন ভাবেই অন্য আরেক শোকার্ত মায়ের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতাম।

শহরে কার্ফ্যু নেই, মুহূর্তেই আত্মীয় স_বজনের ভীড় জমে গেলো, সামান্য বারান্দা জুড়ে স্বজনদের মিছিল, মোবাইল কানে, চোখে কান্না, সবাইকে খবর দেওয়া হয়েছে ঠিক মতো? মৃত্যুর শোকেও সামাজিকতার দায় আছে। গুরুত্বপূর্ণ সবাইকে খবর না দিলে কেউ কেউ অভিমান করবেন,তাই সবাইকে নিয়ম মেনে খবর দেওয়া।

প্রতিটা মৃত্যুই একই রকম অর্থহীন অনুভুতির জন্ম দেয়, এরপর আর কিছুই করার নেই, চাওয়ার নেই, পাওয়ার নেই, শুধু স্থানু দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের বিলাপের মুখোমুখি।

তারপর থেকেই আমি জানি আজ কাল পরশু আমার সেলিনার সাথে দেখা হবেই, নিয়মিতই দেখা হবে, জীবিকার প্রয়োজনে আমাকে তার মুখোমুখি হতে হবে, কিছুই ঠিক নেই, তারপরও সবকিছুই ঠিকঠাক আছে ভানটা করে যেতে হবে।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


এই লেখাটা পড়ে আর কিছুতেই মন বসলো না আজ।

সাহাদাত উদরাজী's picture


রাষ্ট্রের যাবতীয় উদাসীনতার দায় আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে।

টুটুল's picture


সরি Sad

লীনা দিলরুবা's picture


-----------------

মেসবাহ য়াযাদ's picture


!!!!!!!!!!!!!!!!!

শওকত মাসুম's picture


Sad
কি আর বলবো।

মুকুল's picture


সেটাই

আহসান উদ্দিন's picture


প্রতিদিনই ভাবি দেশের আজ এই অবস্থা তো কি হয়েছে হয়তো সামনের দিনগুলো ভাল হবে, মূল্যবোধগুলো মানুষ আবার ফিরে পেতে শিখবে কিন্তু এই ভাবনার শেষ কি আর কখনো হবেনা? আশাইতো এখন আমাদের একমাত্র সম্বল, তাই সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় বেচে থাকি।

নরাধম's picture


আপনি কি ডটু রাসেল?

অনেকদিন পর ব্লগে এসে এই লেখাটা পড়লাম। মন খারাপ হয়ে গেল। তবুও আমরা অপেক্ষায় থাকি ভাল কিছু হওয়ার, জীবনটা শুধুই অপেক্ষা।

ফেসবুকে শেয়ার করলাম।

১০

মুক্ত বয়ান's picture


মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। Sad Sad

১১

মাহবুব সুমন's picture


Sad

১২

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


 

 

মন  খারাপ করা ।

 

আপনাকে  নিয়মিত এখানে পেতে চাই ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.