কঋ দিএ কেনা"
বাংলা বানান শিখবার পর অন্য যেকোনো উৎসাহী বাবার মতো আমিও নিয়মিত সহজ সহজ কিছু প্রচলিত বাংলা শব্দের বানান জিজ্ঞাসা করি ছেলেকে। শব্দ বাছাই করতে গিয়ে যেসব শব্দে যুক্তবর্ণ নেই সেসব শব্দকেই প্রাধান্য দেই বরাবরই। লেখ্য বাংলা ভাষা পৃথিবীর দুরহতম ভাষাগুলোর একটি, এখানে এক রামে রক্ষা নেই দোসর লক্ষণ নয় শুধু সাথে সুগ্রীব, বালী, হনুমাণ, জম্বুবানসহ সকল বানর প্রজাতিই উপস্থিত। অক্ষরগুলো পাশাপাশি সাজালেই হবে না, সেগুলোকে উচ্চারণ অনুযায়ী পাশাপাশি সাজাতে হবে, বর্ণ পরিবর্তিত হওয়ার উদাহরণ উপমহাদেশের ভাষাগুলোর ভেতরে সবচেয়ে বেশী, আর রয়েছে আরবি, অবস্থান ভেদে যেসব লেখ্য ভাষার অক্ষরগুলোর আকৃতি পরিবর্তিত হয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে -কার চিহ্ন, ফলা এবং যুক্ত বর্ণ। প্রতিটিই আলাদা আলাদা ভাবে অক্ষরের সাথে সংযুক্ত হয়।
যুক্তবর্ণ দেখলেই যেহেতু চিন্তিত হয়ে যায় ছেলে সুতরাং বানান দেখানোর সময়ও যুক্তবর্ণকে আলাদা ভাবে রাখি আর মনে মনে ভাবি মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী চমৎকার পরামর্শ দিয়েছিলেন বানান সংস্কারের, আফসোস আবেগী বাঙ্গালি সে সৎপরামর্শ শুনলো না বরং একুশের চেতনার বলে আমাদের উপরে লেখ্য বাংলার জটিল রীতি চাপিয়ে দিলো।
বাংলা একাডেমী ভাষাকে সরল করবার বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন, সেসবের অনেক কিছুই তারা পালন করেন না, আমি নিজে লেখার সময় নিজের মতো বানান তৈরি করে ফেলি( আমি তা করতেই পারি, বানান সংশোধন কিংবা শব্দ সংশোধক আর বানান সংশোধক হওয়ার আগ্রহ আমার কম) কিন্তু এরপরও আমি সচেতন যে আরবির মতো বাংলা শব্দের লিখিত রূপটাই সবটুকু নয় বরং বাংলা শব্দের ভেতরে আবেগও আছে, সেটা উচ্চারণের সাথে মিশে যায়। "আমি যাবো"- এই সাধারণ শব্দযুগলও উচ্চারণের তারতম্যের কারণে ভিন্ন ভিন্ন সংবেদ বহন করতে পারে যার সবটুকুই বিভিন্ন যতিচিহ্নের সাহায্যে প্রকাশ করা সম্ভব না।
ভাষাতাত্ত্বিকদের ধারণা ভাষার সামাজিক রুপটুকুতে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক ভাষা ব্যবহার ও ভাষার শব্দ নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রন করে, প্রভাবিত করে। এবং সম্পর্কের গভীরতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করে দেয় আমরা কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে শব্দকে উপস্থাপন করবো। ভাষা শুধুমাত্র কিছু লোকবোধ্য শব্দ সাজিয়ে উচ্চারণ করা না, বরং এখানে শব্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শব্দগুলো উপস্থাপন করা, শব্দ বাছাই, শব্দযোজন এসব বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়াসয় ভাষার বোধগম্যতাকে নিয়ন্ত্রন করে।
আমার বাসার সামনে বসে থাকা বৃদ্ধ মহিলা কথা বলতে পারেন না, কিন্তু এরপরও তার সাথে বোধগম্য ভাব বিনিময় সম্ভব হয়ে যায়, সেটা তার শরীরি ভাষা উপস্থাপনের দক্ষতায়। কিংবা চেনা চিহ্নের সাহায্য নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতায় আমরা সরাসরি বুঝতে পারি তিনি বলছেন। হয়তো এভাবে ইশারা ইঙ্গিতে কথা বললে খানিকটা ভুল বুঝাবুঝির সম্ভবনা থাকে কিন্তু এরপরও গত কয়েক বারের আলাপনে কোনো বড় ধরণের সামাজিক ভুল ঘটে যায় নি। কিন্তু যারা ভাষাটা শিখছে সদ্য, এখনও শব্দ ভান্ডারে অর্থবোধক শব্দ তেমন জমা হয় নি, তাদের সাথে আলাপচারিতা আরও বেশী উপকারী।
ছেলের সাথে কথোপকথনে ভাষা শিক্ষা পর্যায়ে মানুষ ভাষা নিয়ে কিভাবে ভাবে সেটার একটা সরল পাঠ হয়ে যাচ্ছে আমার। সীমিত শব্দভান্ডার দিয়ে নিজের চাহিদা বুঝানোর বিভিন্ন রকম পন্থা যদিও তাকে নিয়মিত উদ্ভাবন করতে হয় কিন্তু এভাবেই তাকে শিখতে হবে।
সে এখন যেহেতু বানান করতে শিখেছে সুতরাং তাকে মাছ, ভাত, ডাল, কবুতর, পায়রা, টিয়া, কাঠ ঠোকড়া এমন যুক্তবর্ণ বিহীন শব্দ বানান করতে বলাই যায়। এমনই এক সময়ে আমি বললাম বাবু গাড়ী বানান করো দেখি-
গ আ-কার গা আর ঋ গাঋ। বাড়ী বানান করো দেখি, ব আ-কার বা ড এ শূণ্য ড় হ্রস্ব ই বাড়ি ।
আমি চমকে উঠলাম, বাবা গাড়ী বানান গ আ-কার ড এ শূণ্য ড় দীর্ঘ ঈ কার গাড়ী।
ছেলে আমাকে সোজা বললো বোকার মতো হইছে এইটা। গাঋ ঠিক আছে। ঐটাই তো হয়, তুমি বোকা না কি? গ আ কার ঋ গাঋ। উচ্চারণ বিবেচনা করলে এ বানান ভুল সেটা কেউ বলবে না। বাংলা একাডেমী হওয়ার আগে এমন কি মিশনারীরা একটা নির্দিষ্ট তরিকা উদ্ভাবনের আগে এভাবেই নিজস্ব উপায়ে লিখতেন চারণ করিবা, কিন্তু শিক্ষিত( স্বল্প) হওয়ার পরে আমাদের একটা কাঠামোগত ধারণা তৈরি হয়েছে, শব্দের উচ্চারণ যথেষ্ট নয় বরং সেটার উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও একটা শূঁচিবাই তৈরি হয়েছে আমাদের, সুতরাং এইসব নিজস্ব উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি "নিএ, গিএ, খেএ" বানানগুলোতে আঁতকে উঠছি কিন্তু উচ্চারণটুকু বিবেচনায় আনলে "নিয়ে, গিয়ে, খেয়ে"র সাথে "নিএ, গিএ, খেএ" র কোনো তফাত নেই।
ঠিক এ সময়েই মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর কথা মনে পড়লো , মনে পড়লো আমাদের ভাষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের নিজস্ব সংস্কার। তিনি বাংলা বানান সংশোধনের কিছু পরিকল্পিত উপায় হিসেবে রোমান অক্ষরের মতো অক্ষরগুলোকে পাশাপাশি সাজানোর বিকল্প পন্থা পেশ করেছিলেন, বলেছিলেন- কথা বানানটিকে যদি সরল করে "কথআ" লেখা হয় তাহলে আমাদের প্রজন্ম হয়তো কিছুটা কষ্টে থাকবে কিন্তু খুব দ্রুতই এতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া যাবে। আর যদি আমাদের এভাবে বাংলা লিখতে আপত্তি থাকে তাহলে আমরা বিকল্প হিসেবে শব্দের শেষে কার চিহ্নগুলো উপস্থাপন করতে পারি, হিন্দিতে যেমন রয়েছে, সেখানে কার চিহ্নগুলো সব অক্ষরের ডান পাশে বসে। হয়তো আমাদের পরিচিত "ি", "ৈ" 'ৌ"গুলোর ধাঁচ বদলাতে হবে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটা বাংলা ভাষাকে আরও বৈজ্ঞানিক ও সহজ করে তুলবে।
এসব বানান সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব কিছু সংকট থাকবেই, আমাদের পরিচিত চিহ্নগুলো হারিয়ে গেলে আমরা অসহায় বোধ করবো, যদিও আদিতে "য়", ং, :, ঁ, কোনোটিই বাংলা বর্ণমালার অংশ ছিলো না কিন্তু এরপরও আমরা গত ২০০ বছরের চর্চায় সেটা ভুলে গিয়েছি, এখন আমাদের ভাষিক জীবনে, লেখ্যভাষায় এই বর্ণগুলোর সাথে বাংলার নাড়ীর টান খুঁজে পাই আমরা। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বাংলা বর্ণমালার সংস্কার দাবি করেছিলেন, এমন বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেছেন ভাষাতাত্ত্বিকেরা, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন বাঙ্গালীর জীবনে শ,স,ষ নেই শুধুমাত্র একটি "শ" রয়েছে, চাপাই নবাবগঞ্জের লোকেরা দ্বিমত করবেন, তাদের জীবনে "স" বেশ প্রকট ভাবেই বিদ্যমান।
এসব সংস্কারের বাইরে আসলে নতুন কিছু কি আছে যে কারণে আমাদের অনেকগুলো বানানজনিত দুর্ঘটনায় পতিত হতে হবে। সমোচ্চারিত শব্দ বাংলা ভাষায় কতগুলো? এক "হরি" র ৫টি অর্থ রয়েছে, সেটা বাদ দিলে "বারি", বাড়ি, বাড়ী, নারী, নাড়ি, নাড়ি( নাড়াচাড়া অর্থে) এর বাইরে মনে পড়ছে না, হয়তো আরও খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু আমি যদি লিখি "কঋ দিএ কেনা" সেটা কি "কড়ি দিয়ে কেনা" শব্দের সংবেদ বয়ে আনবে?





আনবে মনে হয়। সহমত জানাতে চাচ্ছি।
রাসেল ভাই শুভ সকাল।
চমতকার একটা লেখা দিয়েছেন।
তবে আমার মত বুইড়া মানুষের বিষয়টা একটু মানতে কষ্ট হচ্ছে। বাঙ্গালিদের সব সংষ্কার তো উঠেই যাচ্ছেরে ভাই! বাংলাভাষার ক্ষেত্রে না হ্য় একটু থাকলই। তবে এই ভাষার কঠিন যুক্তবর্ণ গুলো তুলে দিয়ে কিছুটা সহজ করা যায়। তাতে আমার কোন আপত্তি নেই।
যাই হোক সম্য় নাই। দেখি ফিরে এসে ঝগড়াটা চালিয়ে নিতে পারি কিনা
ততক্ষণ ভালো থাকুন।
বানানরীতি নিয়ে এই ব্যাপারটা অনেক পুরোনো। আমি যদি বলি আপনার রীতি মানি না, বলবেন, গোঁড়া। আবার যদি বলি, অবশ্যই নতুন রীতি তো আসলে চমৎকার, বলবেন, বাংলা বানানকে নির্যাতন। দু্টোই ঠিক।
যদি বানানরীতি নিয়ে পরীক্ষা না করি, তাহলে নতুন কিছু আসবে না, যেমন এখনকার প্রচলিত বাংলা বানান পরীক্ষার ফসল, তেমনি নতুন কিছু আনতে হলে সেটাকে পরীক্ষার মাঝ দিয়েই যেতে হবে।
তবে, একেবারে হুলুস্থূল পর্যায়ে পরিবর্তন না এনে কিছু পরীক্ষামূলক পরিবর্তন আনা যায়।
আর, আমার ব্যক্তিগত অভিমত, বাংলা বানানের এইরকম নব্য রূপান্তরে ব্লগগুলার একটা বড় প্রভাব আছে।
জটিল ব্যাপার। বাংলা বানানে আমি চূড়ান্ত রকমের দুর্বল। দুর্বলতা বিভ্রান্তিতে পড়ে যায় যখন একই শব্দের বিভিন্ন বানান পাই। মুক্ত বয়ানের সাথে সহমত জানিয়ে একটা জানা গল্প বলে যাই...." একবার আচার্য সুনীতি কুমার, রবীন্দ্রনাথের নিকট একখানি পত্রবাণ করিলেন এই বলিয়া, 'গুরু দেব, ভাবিতেছি "গরু" বানানে ওকার(গোরু) লাগাইবো। আপনার মতামত পাইলে বাধিত হই।'
উত্তরে গুরুদেব লেখিলেন, ' ওকার লাগাইলে যদি গরু পরিমাণে দুধ বেশি দেয়, তবে তাহাতে দ্বিমতের কারণ দেখিনা....'।"
জটিল বিষয়। বাতিঘরের মন্দব্য পইড়াও মজা পাইলাম।
মতামত নেই তবে সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছুই পরিবর্তন হবে, আর সেটা হবেই।
মন্তব্য করুন