মাসব্যাপী কার্ণিভাল ০৪
যে ছেলেটা বইয়ের বোঝা নিয়ে যাচ্ছে দোকানে তার পিঠে লেখা ' বই হোক নিত্য সঙ্গী', জনপ্রিয় প্রকাশনীর জনপ্রিয় লেখকের প্রথম মুদ্রনের বোঝা বয়ে সে যাচ্ছে বইমেলা চত্ত্বরের পাশ দিয়ে, বয়েস খুব বেশী হলে ১০ থেকে ১২, পরনের প্যান্টে ময়লা, সোহওয়ার্দি উদ্যানের গাছের পাতা, ময়লা প্লাস্টিক আর কাগজ টোকাতে হয়তো ও, বই মেলার সামনের রাস্তায় ওর বন্ধুরা সবাই কোন না কোন ধান্দায় ঘুরছে, সেও এই বইমেলায় সামিল হয়েছে, রিকশা বই নামিয়ে দেয় দোয়েল চত্ত্বর আর রাজু ভাস্কর্যের কাছে, সেখান থেকে বই বয়ে আনবার ঝক্কি সামলাবে কে, ২০টাকা খরচ করলেই ওরা কেউ না কেউ বইয়ের বোঝা বয়ে দিয়ে যাবে দোকানঅবধি, নুর হোসেন বুকে আর পিঠে গণতন্ত্র মুক্তিপাক শ্লোগান লিখে বিখ্যাত হয়েছিলো, এ ছেলের তেমন রাজভাগ্য নেই, তার বুকের সামনে তবুও বই কিনুন আর পিঠে বই হোক নিত্য সঙ্গী শ্লোগান লেখা থাকলেও এই বাজারে বইয়ের বদলে তার নিত্যসঙ্গী কাগজ আর ময়লা টোকানোর ঝোলা, তবুও সে কোন না কোন ভাবে সংযুক্ত এই উৎসবে, আমাদের গৌরবের বইমেলা।
বই মেলা চত্ত্বর থেকে কাউকে জোর করে হটিয়ে দেওয়ার নিয়ম নেই, বইপ্রেমী এবং ভীড় প্রেমী যেকেউ যতটা ইচ্ছা সময় বই মেলা চত্ত্বরে কাটাতে পারে, ভীড়ের ঝামেলা এড়াতে অবশ্য কতৃপক্ষ ডিজিটাল পদক্ষেপ নিয়েছে, তারা প্রতিদিনই নিয়ম করে বইমেলা থিম সং প্রচার করে
অমর একুশে গ্রন্থ মেলা, লেখক পাঠকের মিলন মেলা, প্রাণের মেলা...... গরন্থ মেলা। যেকোনো অনুষ্ঠানেরই একটা সূচনা সংগীত কিংবা একটা বৈশিষ্ঠ্যসূচক জাতীয় সংগীত থাকবার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে কি না সেটা কে নির্ধারণ করে দিবে? টেস্ট ক্রিকেটের অঙ্গনে পা রাখবার সময় শুভ্রদেব আর শাকিলা জাফর টেস্ট ক্রিকেটের থিম সং গেয়েছিলেন। ক্রিকেট ক্রিকেট, শুভ্রদেবের নাকিসুরের গানটার সুর এখনও কিঞ্চিৎ মনে আছে, আমি নিশ্চিত এই বই মেলার অতি জঘন্য থিম সংটাও অনেক দিন মনে থাকবে, জুতার কালি দিয়ে নেশা করবার মতো বদখত অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে যায় কখনও কখনও।
বই মেলার সময়টুকুতেই মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাচেলর স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের দোকানগুলোর জমজমাট ভাবটা থাকে, বছরের অন্য যেকোনো দিনই সেখানে বলতে গেলে তেমন ভীড় থাকে না, কিন্তু বই মেলার সময় এলেই সেখানেই আড্ডা দেন ধুমপায়ী অধুমপায়ী সকল লেখক কবি প্রাবন্ধিক আর সমালোচক। তাদের বেশভুষা দেখে নিশ্চিত হলাম নায়ক হওয়ার চেয়ে লেখক হওয়া সুবিধাজনক, লেখকও প্রতিনিয়ত অভিনয় করেন কিন্তু এই অভিনয় করবার জন্য তাদের বাড়তি কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। লেখক হওয়ার জন্য স্মার্ট হতে হয় না, পরিপাটি পোশাক না পড়লেও চলে, হাল ফ্যাশানের খবরাখবর কিংবা নিজের অভ্যস্ত জীবনযাপন কোনোটাই বিসর্জন দিতে হয় না তাদের। তারা দিব্যি ভীড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে সুরুত সুরুত করে চা বিড়ি সাটাতে পারেন, তাদের অতিপরিচিত মানুষদের বাইরে অধিকাংশ মানুষই তাদের চেনেন না কিংবা তাদের এই অপকর্মের কোনো খবর রাখেন না। বইয়ের ফ্ল্যাপে নিজেদের ছবি ঝুলানোর আগে লেখকদের জীবন আরও ভালো ছিলো, কুমড়োপটাশ কিংবা ব্রাড পিট যেকেউই আপনার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারবে এবং আপনি ঘুনাক্ষরের সন্দেহ করতে পারবেন না তিনি আপনাকে দেখছেন, মাপছেন এবং সম্ভবত ভবিষ্যতের কোনো গল্পে আপনার মুদ্রাদোষ আর শরীর ভঙ্গীর বিবরণ জুড়ে দেবেন এমন একজনের সাথে যার নাম আপনার পরিচিত চৌহদ্দির কারো সাথেই মিলবে না। অন্তত বই মেলার এই সময়টাতে সচেতন থাকবেন, সবাই সাবজেক্ট খুঁজতে বইমেলায় ঘুরছে।
সপরিবারে বই মেলা যাওয়ার একটা সংকট হলো স্বাধীনতা কমে যায়, অন্তত নিজের মতো হাত পা ছড়িয়ে যেদিক ইচ্ছা চলে যাওয়া কিংবা অন্য যেকোনো অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। সে কারণেই ইচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় যাদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেসব স্টলের খবরাখবর নিতে পারলাম না। আজকে ভেবেছিলাম আওয়ামী শিল্পগোষ্ঠি, শেখ রাসেল, শেখ কামালের নাম বেচে যারা স্টল বরাদ্দ নিয়েছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাগুলো দেখবো, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ আর কমল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির প্রকাশনার ভেতরের তফাতটুকু বুঝতে পারলে আরও ভালো লাগবে আমার। তবে সে সুযোগ হয় নি, ছাত্র রাজনীতির একটা সুবিধা হলো আবাসিক হলে সীট বরাদ্দ পেতে তেমন ধকল পোহাতে হয় না। এবং এ সুবিধাটুকু নিতেই অনেকে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পরে, এরাই রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবেই এইসব স্টলে বসে বসে মাছি মারে, তাদের নিজের কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই, তাদের এই কয়েকটা বছর কিংবা জীবনে যতদিন এটুকু ব্যবহার করে অর্থউপার্জনের সুবিধা থাকবে ঠিক ততদিনই তারা রাজনৈতিক সমর্থনের ছাতা মেলে রাখবেন।
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস প্রতি ৫ বছর পরপরই বদলে যায়, একটা স্থির জাতীয় ইতিহাস নেই আমাদের, গত জোট সরকারের সময় জাসাসে অন্তর্ভুক্তি একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় বিষয় ছিলো , সেই জাসাসের বাংলাদেশি মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী মানুষেরা নিয়মিত জিয়াস্তুতি প্রকাশ করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন, শেয়ালের মতো সমস্বরে রা দিয়ে জিয়া বন্দনা করেছেন, তারাই আওয়ামী দুঃশাসনের ইতিহাস লিখেছেন, দুঃশাসনের ৫ বছর ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পুস্তকটি সরকারী লাইব্রেবী কিনেছে কয়েকশত কপি, তবে আওয়ামী লীগ যে কারণে নির্বাচনে পর্যুদস্ত হয়েছিলো, সীমাহীন সন্ত্রাস আর দুর্নীতি, সেই আচরণের পূনারাবৃত্তি হলে যে ইতিহাসের পুনারাবৃত্তি হবে এই সত্যটুকু তারা ভুলে ছিলেন, সুতরাং ২০০৭ সালে জোট সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ।
ক্রস ফায়ার ক্রসফায়ার করে গলা ফাটিয়ে ফেললেও ক্রস ফায়ারের তান্ডব বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই, সন্ত্রাসে পর্যুদস্ত আওয়ামী লীগের তৃনমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলো, তারা গঠনমূলক রাজনীতি বাদ দিয়ে বই মেলায় অন্তত ১৫টা স্টল বরাদ্দ নিয়ে বসে আছে, সেখানে বিভিন্ন প্রকাশনীর বই কর্জ করে এনেছেন তারা, এবং বইমেলা উদ্বোধনের পর থেকেই প্রতি ৩ ঘন্টা পর পর বইমেলা নীতিমালা পাঠ করছেন ঘোষকবৃন্দ - বইমেলায় অবশ্যই নিজপ্রকাশনীর পুস্তক বিক্রি করতে হবে, অন্য কোনো প্রকাশনীর পুস্তক বিক্রয় করা চলবে না, মহাপরিদর্শক যখন বইমেলায় প্রবেশ করেন তখন বঙ্গবন্ধু পরিবারের নাম দেখে সসম্মানে সম্ভ্রমবশত মাথা নীচু করে প্রবেশ করেন ,তিনি দেখেও দেখেন না এই রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ পাওয়া স্টলগুলোর অধিকাংশেরই বইমেলায় অংশগ্রহনের যোগ্যতা নেই কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রী আর এমপির চাপে তাদের স্টল বরাদ্দ দিতে হয়েছে। স্টল বরাদ্দ পেয়েছে এফএম মেথড, যারা বাঙ্গালীকে ইংরেজীতে হাসতে কাশতে শেখাতে চায়, তাদের মূল প্রকাশনা ইংরেজী শিখবার গাইড বই, এফএম মেথডের চেয়ে বেশী গাইড বুক প্রকাশ করে সাইফুরস, কিন্তু তাদের কেনো যেনো স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় নি।
উন্মাদের স্টল বরাদ্দ হয়েছে মূল বইমেলা চত্ত্বরের বাইরে, সোহওয়ার্দি উদ্যানের দেয়ালঘেঁষেই, কতৃপক্ষ সুবিবেচক, তারা নিশ্চিতই জানেন উন্মাদদের অবস্থান সবসময়ই বইমেলার বাইরে হওয়া বাঞ্ছনীয়।





লেখা আরো জমেছে। লেখার শেষে এমন টুইষ্ট আসতে থাকুক।
- আপনিতো রোজ অনেকেরেই সাবজেক্ট বানাইতেছেন
একটা প্রস্তাব দেই যদি বিবেচনায় নেন, সামনের বইমেলায় এই কার্ণিভাল সিরিজটাকে নিয়ে একটা বই বের করেন।
খুব বেশী ভালো লাগতেছে কার্ণিভাল সিরিজ পড়তে।
চলতে থাকুক নিয়মিত ।
আমি ২০০৬ এর বইমেলায় তারেক জিয়ার মেয়ে জামিমার সম্বন্ধে একটা বই দেখেছিলাম বিএনপির ষ্টলে। খুবই আফশোস হয়েছিল, এতো বয়স হয়ে গেলো
না হলাম বনলতা,
না কইলো কেউ কথা
জিয়া পরিবারে জন্মাইলেতো কতো বই লেখা হইয়া যাইতো, চেহারা দেখা ছাড়াই
আফশুস আর আফশুস
পড়ছি! চলতে থাকুক
শাকিলা গাইছিল, ক্রিকেটস ক্রিকেটস ...
রায়হান ভাই শাকিলা জাফরের ডাইহার্ড ফ্যান
আজ একটা চান্স নিতে পারি।
রাত ৮ টার পর। খোলা থাকবে তো!
চলুক
মন্তব্য করুন