মাসব্যাপী কার্নিভাল ০৮
বইমেলা ক্রমশঃ লিফলেটনির্ভর হয়ে উঠছে, প্রতিদিনই বইমেলায় ঢুকবার সময় কেউ না কেউ একটা না একটা লিফলেট এগিয়ে দেয়, সেসব লিফলেটে কোনো না কোনো বইয়ের বিজ্ঞাপন থাকে, অধিকাংশ বইই আমি শেষ পর্যন্ত কিনতে যাই না কিন্তু আমার ধারণা কেউ না কেউ অবশ্যই কিনে এমন লিফলেটে লেখা বই।
একজন নতুন লেখকের জন্য প্রথম বইয়েই একটা আলোড়ন তৈরীর আগ্রহ থাকে, একবার বিতর্কিত কিংবা আলোড়িত হলে পরবর্তী আলোড়নের জন্য হলেও লেখকের বইয়ের প্রতি পাঠকের একটা আগ্রহ থাকবে, হুমায়ুন আজাদের নারী নিষিদ্ধ না হলে তার ৫৬ হাজার বর্গমাইল কিংবা শুভঙ্কর সম্পর্কিত সুসমাচার কিংবা পাকসারজমিন সারবাদ বইটি কি ততটা আলোড়িত হতো? একজন তসলিমা নাসরিন যদি অহেতুক ধর্মান্ধ পাগলামির শিকার হয়ে নির্বাসিত না হতো তাহলে কি তসলিমাকে কেউ চিনতো? তার পরিচিত গন্ডীর বাইরে এসে নির্বাচিত কলামের লেখিকা তসলিমা হয়তো ততটা আলোড়িত হতেন না যতটা আলোড়ন তাকে নিয়ে হয়েছে লজ্জা নিষিদ্ধ হওয়ার পর, এমন তালিকা হয়তো আরও দীর্ঘ করা যায় কিন্তু সারবস্তু হলো একটা আলোড়ন তৈরি না করলে নবীন লেখক পরিচিত হয়ে উঠবার জন্য যে পরিমাণ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেন, একজন লেখকের ততটা কষ্ট না করলেও চলে, সে কারণেই লেখকেরা এইসব বিজ্ঞাপণের অনুসারী হয়ে উঠেন।
একজন নতুন লেখকের জন্য প্রকাশক পাওয়া একটা ভীষণ কষ্টকর বিষয়, লেখার হাত যেমনই হোক না কেনো উপমহাদেশের ক্রিকেট টিমের মতো ঘন ঘন অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরিচিতদের ডেব্যু করানোর ক্ষেত্রে বাঙ্গালী প্রকাশকেরা সচারাচর আগ্রহী হয়ে উঠেন না। তস্যপুত্র, তস্যপুত্রপরিচিত এবং বন্ধুর বন্ধুর বন্ধুতার খাতিরে কেউ কেউ বই প্রকাশ করে থাকেন কিন্তু অধিকাংশ নতুন লেখকের ভবিষ্যত আসলে জীবনানন্দের মতোই যাকে প্রথম বইটি নিজের পয়সায় প্রকাশ করতে হয়েছিলো। এইসব যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে কিংবা সহকবিদের কবিতার বই ছাপাতে অনেক কবিই কবিতার লেখার পাশাপাশি প্রকাশনা সংস্থাও খুলেছিলেন, কবিদের ব্যবসাবুদ্ধির তেমন সুখ্যাতি নেই, সে কারণেই এইসব প্রকাশনা সংস্থা কয়েকটি বই প্রকাশ করেই হারিয়ে গিয়েছে।
নতুন লেখকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে শুদ্ধস্বর আর জাগৃতি, তারা অপরিচিত লেখকদের বই আগ্রহ নিয়ে ছাপায়, তবে কোনো কোনো প্রকাশক ও পরিবেশক আগ্রহ নিয়েই বই প্রকাশ করেন, অপরিচিত লেখকের বই প্রকাশের জন্য তাদের প্রকাশনা খরচটা সম্পূর্ণই বহন করতে হয়, সেই নতুন লেখক বইয়ের প্রকাশনা খরচ বহন করেন, পরবর্তীতে সেটার বিজ্ঞাপণ খরচও তাকে বহন করতে হয়, এক কলাম ইঞ্চি বিজ্ঞাপনের ব্যয় সাম্প্রতিক কালে ২০০০ টাকা, চার রঙা একটা লিফলেট ৫০০ কপি আর্ট পেপারে ছাপাতে খরচ ৬০০ টাকা, এমন কেউ যদি এসব করে বিখ্যাত হতে চান তাহলে তার বইয়ের প্রকাশনা খরচের বাইরে খরচ করতে হবে নিদেনপক্ষে ৫০০০ টাকা। সেই লিফলেট বিলি করবার জন্য দিনপ্রতি ১০০ টাকা দিয়ে একটা লোক রাখতে হবে, লেখক হওয়ার অনেক হ্যাপা।
লেখকের বন্ধু হওয়ার যন্ত্রনাও একই রকমের,লেখক বন্ধুদের অনুরোধে বই কিনতে গিয়ে তার লেখা বইয়ের সুস্থ বিশ্লেষণ সম্ভব হয় না, অতি অখাদ্য বইও ভদ্রতার খাতিরে হাতে নিয়ে অটোগ্রাফ নিয়ে কিনতে হয়। এসব ক্ষেত্রে লেখক বই মেল্র মাঠে বরশী হাতে ঘুরাঘুরি করেন, পরিচিত কাউকে দেখলে হাত বাড়িয়ে আহ্বান জানান, হাসিমুখে কথা বলে দক্ষ মাছুরের মতো তাকে নিয়ে যায় নিজ প্রকাশকের স্টলে, তারপর কায়দা করে সেখান থেকে নিজের প্রকাশিত বইটি বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে বলেন ‘ এইটা দেখ আমার বই, এই বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে’
খুব ভালো আনন্দিত হলাম এইসব কথা বলে লাভ নেই, পকেটে অনিচ্ছুক হাত ঢুকিয়ে বইটা কিনে ফেলতেই হয়, সেটা পরবর্তীতে পড়া হবে কি না সেটা ঠিক নেই, কিন্তু বই বিক্রী হলে প্রকাশক খুশী, লেখক খুশী, এবং একই সাথে বন্ধুর উপকার করতে পেরে আমিও খুশী, এভরিওয়ান ইজ হ্যাপি হিয়ার সো হোয়াই বদার ম্যান?
তবে সবাই এমন নির্জলা বেহায়া হয়ে উঠতে পারেন না, যারা বেহায়া হয়ে উঠতে পারেন না, তাদের জন্য বই মেলা বিভীষিকাময়, তারা ঢাকঢোলবাদ্যসহযোগে একদল জোকার নিয়ে বইমেলার মাঠ কাঁপিয়ে নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন দিতে পারবেন না, তারা লিফলেট ছাপিয়ে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও বই বিক্রী করবেন না, তারা বন্ধুদের হাত ধরে বই বিক্রী করতে পারবেন না, তাদের সাথে অধিকাংশ সাহিত্য পাতার সম্পাদকের সুসম্পর্ক নেই যে তাদের দিয়ে বইয়ের রিভিউ লিখিয়ে নিতে পারবেন, সমালোচনা, বিতর্ক তৈরি করতে পারবেন না, তাহলে তিনি কেন পাঠকের নজরে আসবেন? বইমেলার চরিত্রই এমন এখানে বই বাজিয়ে কেনার উপায় নেই
এসব ছাড়াই হয়ত অতীতে লেখক জন্মেছেন, নিজের লেখা নিজে প্রকাশ করেও সুধীজনের নজরে এসেছেন কিন্তু সেসব সত্য যুগের গল্প, এই কলিকালে এমন লেখক খুব কম যারা নিজের লেখার গুণে বিখ্যাত হয়েছেন, সাহিত্যবোদ্ধাদের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সেইসব বিরলপ্রজ লেখকেরা সব সময়ই জন্মান, তবে হাজারে লাখে জন্মান না, সে কারণেই এতসব প্রকাশকেরা বই ছাপানোর সময় ন্যুনতম পরিচিতি জানতে চান- আপনার লেখা কি কোনো দৈনিক পত্রিকার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে? আপনি কি বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন কোনো কারণে? আপনার কি ফেসবুক বন্ধুর সংখ্যা কয়েক হাজার? যদি তা না হয় তাহলেপ্রথম বই ছাপানোর আবদার নিয়া আসছেন কোন কামে, আপনেরে কে চেনে?
সবাই এমন না, যেমন শুদ্ধস্বরের টুটুল ভাই, তিনি যেকেউ হাতে পান্ডুলিপি নিয়ে গেলেই বই ছাপাতে রাজী হয়ে যান, সে কারণে হয়তো প্রকাশনী সংস্থা হিসেবে তার কলেবর বেড়েছে কিন্তু তিনি কতগুলো ভালো মানের বই ছাপাতে পেরেছেন? আমি জানি না আসলেই, তার প্রকাশিত কয়েকটি বই ভবিষ্যতে কিনবার আগ্রহ আছে কিন্তু এই বইমেলায় সেখান থেকে কোনো বই কিনবো না আমি।
জনাব কাসেম বিন আবু বকর বেশ অনেকগুলো বই প্রকাশ করেছেন, তিনি লেখক, সম্পাদক এবং আমি জানি না আর কি কি বিশেষণে তাকে অবহিত করা যায়? তার বইয়ের বুরখা পরা ধর্মভীরু পর্দানশীন মেয়েদের প্রেমের আবেগও তীব্র, তাদের প্রেমের উপন্যাস পাঠক আগ্রহ নিয়ে কেনে, অন্তরালবাসিনীদের বিষয়ে কিংবা পর্দার আড়ালের যেকোনো বিষয়েই আমাদের আগ্রহ বেশী, এই বইমেলায় তার পুত্র সয়ফুল্লাহ বিন কাসেমরও অনেকগুলো বই দেখলাম, তারা বই লেখাকে পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিনত করেছেন। .
কুলবৃত্তি অনুসরণে আমাদের সাংস্কৃতি ঐতিহ্যের বাইরে বের হয়ে আসা মনে হয় না সম্ভব, একদা আমাদের চাষার ছেলে চাষা, বামুনের ছেলে বামুন হওয়ার ঐতিহ্য ছিলো, পালের ছেলে পাল হবে, রাখালের ছেলে রাখাল হবে, ইংরেজ আসবার পর সেই রীতিতে পরিবর্তন এসেছে এমনটা বলা যায় না। আমাদের ডাক্তারের পূত্র কন্যাদের কেউ না কেউ ডাক্তার হয়, ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়, লেখকের ছেলে লেখক হয়, কবির ছেলে হয় কবি। । । রাজনীতিবিদের ছেলে রাজনীতিবিদ হয়, সাংসদের ছেলে হয় সাংসদ, সন্ত্রাসীর রাজনৈতিক হয়ে উঠবার বাইরে তেমন পারিবারিক পেশা পরিবর্তনের নজির নেই।
লেখক পরিবারের সবাই কোনো না কোনো ভাবে লিখতে থাকেন, কাজী আনোয়ার হোসেনের ভাই ভাইস্তা বোন আব্বা সবাই লিখতেন, সেটাই তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য, সৈয়দ মুজবতা আলীর ভাই ভাইস্তা নাতি সবাই লিখেন, আহসান হাবীবের ছেলেরা লিখেন, জসিমুদ্দীনের জামাই লিখেন, আবু রুশদের পরিবারের সবাই লিখেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটো ভাই লিখেন, তার পূত্রও শুনেছি লিখছে।
আমাদের রাজনীতির মতো প্রকাশনা শিল্পও পারিবারিক হয়ে যাচ্ছে, কবি কবিপত্নী কবিতা লিখছেন, আশা রাখি যদি ভবিষ্যতে আমি লেখক হয়ে উঠতে পারি বাল ছাল যাই লেখুক না কেনো আমার ছেলের জন্য প্রকাশক পাওয়ার সমস্যা হবে না। আমরা পারিবারিক এন্টারপ্রাইজে বিশ্বাসী, সে কারণেই নায়কের ছেলে ভবিষ্যতের নায়ক, লেখকের ছেলে ভবিষ্যতের লেখক, এই কুলবৃত্তি ছেড়ে কেউ বের হতে পারছে না,।





সবার মত আমিও পড়ে না লিখে চলে যাচ্ছিলাম! মনে প্রশ্ন জাগলো কমেন্টারের (!) পুত্রও কি একদিন কমেন্টার হবে!
কাশেম বিন আবু বকরের পোলার কাহিনীটা জানা ছিলো না!
ব্লগে লেখালেখি করা যাদের বই বের হয়েছে তাদের বই কেমন বিক্রি হচ্ছে ?
প্রথম বই আলোড়ন তোলা, তসলিমার লজ্জা... এসবের কাতারে হুমায়ুন আজাদ কি থাকতে পারে? নারী তো তাঁর প্রথম বই না। নারী প্রকাশিত হবার অনেক আগে থেকেই তিনি পাঠক মহলে জনপ্রিয় এবং আলোড়িত।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমার [৭৩]ই বেশ আলোড়িত বই ছিলো, এরপর লাল নীল দীপাবলি [৭৬], ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না [৮৫], কতো নদী সরোবরে [৮৭], আব্বুকে মনে পড়ে [৮৯], জলপাই রঙের অন্ধকার [৯২], প্রবচনগুচ্ছ [৯২] সবগুলোই যথেষ্ট পরিমাণ আলোড়িত বই।
নারী প্রকাশিত হয় ৯২ সালে, এর অনেক আগেই হুমায়ুন আজাদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক আলোচিত ও আলোড়িত নাম। অথচ আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে নারী লিখেই তিনি বিখ্যাত হয়েছেন [আমার বুঝতে ভুল হলে দুঃখিত]। আর এজন্যই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, সবকিছু ভেঙে পড়ে, পাক সার জমিন সাদ বাদ এগুলো বাজারে চলেছে। তাই কী?
ঠিক পরিসংখ্যান হাতে নাই, কিন্তু আমার ধারণা এই বইগুলোর চেয়ে লাল নীল দীপাবলির বিক্রির সংখ্যা বেশি।
অ।ট। ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর ভাষা বিষয়ক বইগুলো পাইছেন? মওলা ব্রাদার্সে একটা পাত্তা লাগান। সেখানে পাইবেন।
হুমায়ুন আজাদের লাল নীল দীপাবলি, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না ভালো বই, বাংলা ভাষা নিয়ে এমন চমৎকার গ্রন্থ রচিত হয়েছে খুব কম। অলৌকিক স্টীমার ভালো কাব্য হতে পারে কিন্তু অলৌকিক স্টীমার নিজ নামে কিংবা কাব্যগুণে ২৫ বছর পরও আধুনিক হয়ে থাকতে পারতো না,
আব্বুকে মনে পরে পড়ি নি, কিন্তু ৫৬ হাজার বর্গমাইল, সব কিছু ভেঙে পড়ে কিংবা তার পরবর্তি উপন্যাসগুলো ঠিক উপন্যাসপদবাচ্য হতে পারে না। এটা আমার নিজস্ব অভিমত, আবেগ দিয়ে বললে হয়তো আমি বলতাম অন্য কথা, তবে হুমায়ুন আজাদ নিজের উপন্যাস নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন সে বক্তব্যে আমার আস্থা কম। । তিনি বলেছিলেন বাংলা ভাষায় তিনিই উপন্যাস লিখেছেন এবং আমার মনে হয় পিতৃস্নেহান্ধ উক্তি এটা।
নারীর সমালোচিত হওয়া তার লেখক ক্ষমতার কোন পরিবর্তন আনে নি, তিনি যেমন লিখতেন তার চেয়ে ভালো লিখেছেন তাও না, সেটা কোন পরিবর্তন আনে নি, তার নিজের সমন্ধ উচ্চ ধারণাটুকু আমি নিজে মেনে নেই না, আমার কাছে সেটা ওভার রেটেড মনে হয়।
আমি আসলে বলতে চাচ্ছিলাম যে লেখক বা চিন্তাবিদ হিসেবে নারী প্রকাশিত হবার অনেক আগে থেকেই হুমায়ুন আজাদ আলোচিত ও আলোড়িত। নারীর অবদান বিশেষ মাত্রায় নাই
ব্যক্তিগতভাবে তাঁর উপন্যাস আমার খুব বেশি পছন্দ না। তাঁকে আমি আজীবন পছন্দ করে যাবো ছোটদের জন্য লেখা বইগুলোর জন্যই। আব্বুকে মনে পড়ে, বুক পকেটে জোনাক পোকা, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, লাল নীল দীপাবলি, কতো নদী সরোবরে... এতো সুন্দর সুন্দর বই... অসাধারণ। এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশে সেরা।
এই জন্যই তো প্রধানমন্ত্রীর ছেলে প্রধানমন্ত্রী হয় ।
এই জন্যই তো প্রধানমন্ত্রীর ছেলে প্রধানমন্ত্রী হয় ।
রাজ্জাকের ছেলে বাপ্পারাজ হয়
মন্তব্য করুন