এত টেনশন না দিলেও পারতো বাংলাদেশ দল
বিজয়ের উল্লাস চারপাশে, বাংলাদেশের বিজয়ে উচ্ছ্বসিত মানুষেরা আজ ঢাকা শহর কাপিয়ে ফেলছে আনন্দ উল্লাসে, প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়েই তারুণ্যের বাধ ভাঙা উল্লাস, মোটর সাইকেল, গাড়ী, খোলা পিক আপ ভ্যান, কিংবা খালি পায়ে মানুষ ছুটছে রাস্তায়, কোনো আওয়াজই এখন কর্কশ লাগছে না, সামান্য উপলক্ষ্য পেলে বাংলাদেশী তরুণদের এই লাগামছাড়া আনন্দ দেখে মনে হয় অতিসামান্যেই আমাদের তৃপ্তি আসে বলেই আমরা নিজেদের ক্ষমতাকে আরও বেশী পরিণত করতে ব্যর্থ হই।
আগামীকালের পত্রিকায় বাংলাদেশের বিজয় চিহ্নিত হবে প্রতিশোধ হিসেবে, ২০০৭ এর বিশ্বকাপের পরাজয় এবং টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপের পরাজয়ের পর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এই বিজয় আনন্দদায়ক কিন্তু আনন্দ উচ্ছ্বাস ভুলে এ ম্যাচের ভুলগুলোকে বিশ্লেষণ করলেই বাংলাদেশ দল ভালো করবে। আজকের খেলায় বাংলাদেশের প্রাপ্তি হতে পারে আত্মবিশ্বাস, এর বেশী কিছু পাওয়া হয় নি বাংলাদেশের। অতীতের মতোই আজকের খেলায়ও বাংলাদেশ দলের সবাই নিজেদের সেরাটা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাটিং ঃ সাকিবের টসভাগ্য সুপ্রসন্ন তবে বাংলাদেশ দল যে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে টসে জিতে ব্যাটিং করবার সিদ্ধান্ত নিবে এটা বিশ্বাস করতে পারি নি। গত ম্যাচের দলের সাথে আজকের দলের তফাত ছিলো রিয়াদের বদলে আশরাফুলের অন্তর্ভুক্তি, যদিও আমার নিজের ধারণা নাঈমের চেয়ে এই দলে রিয়াদের প্রয়োজন বেশী। আমি নাঈমের খেলায় সন্তুষ্ট না।
ইনিংসের প্রথম পাচ ওভার বাদ দিলে বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখা ছিলো জঘন্য অনুভুতি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসে এমন অপেশাদার ব্যাটিং নমুনা হিসেবে অগ্রহনযোগ্য, বা হাতি ব্যাটসম্যানের জন্য আউটসুইং হয়ে আসা ডানহাতি বোলারের বলে ইনসাইড এজে আউট হওয়ার সংকটের জন্য দায়ী ইমরুলের টেকনিক, ও শরীরের অনেক বাইরে থেকে খেলে, ব্যাট আর প্যাডের মাঝে এক হাত ফাকা, সে জায়গা দিয়ে বের হোয়ে যাওয়া বলে যখন কাভার ড্রাইভ করতে যায় কিংবা কাট করতে যায়, ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল স্ট্যাম্পে চলে আসা সময়ের ব্যাপার, গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে উঠা যেকোনো আউট সুইং বল স্ট্যাম্পে মেরে দেওয়ার সমুহ সম্ভবনা প্রতিদিনই তৈরি হয়, গত ম্যাচেও এটা হয়েছে, আজকেও ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে একটা চার হয়েছে, কিন্তু তার চমৎকার স্ট্যাম্পিং এর কৃতিত্ব সম্পূর্ণই উইকেট কিপারের প্রাপ্য,
আয়ারল্যান্ডের বোলিং ছিলো পেশাদারিত্বের নিদর্শন, সীমিত সামর্থে যতটুকু করা সম্ভব তার সবটুকুই করেছে মুনি আর বোথা, উইকেটের উপরে বল ফেলে ব্যাটসম্যানকে আটকে রাখা, স্লো উইকেটেও প্রভাব ফেলবার মতো দক্ষ সীমার নেই আয়ারল্যান্ডের কিন্তু তাদের মিডিয়াম এবং স্লো মিডিয়াম পেসারেরা নিজেদের পেশাদারিত্বের পরীক্ষা দিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে। জুনায়েদের অপেশাদারের মতো রান নিতে গিয়ে আউট হয়ে যাওয়া, তামিমের চমৎকার ক্যাচ আয়ারল্যান্ড দলের উজ্জীবিত ফিলডিং এবং শাররীক সক্ষমতা প্রদর্শনী ছিলো।
তবে বাংলাদেশ দলের ব্যররথতার ষোল কলা পূর্ণ করেছে সাকিব, তার আঊট কোনো ভাবেই গ্রহনযোগ্য না, তাকে নিজের ব্যাটিংকে আরও উন্নত করতে হবে। মুশফিকুর রহমান আর রকিবুলের দায়িত্বশীল ইনিংসটা বাদ দিলে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং এ গর্ব করবার মতো কিছু নেই, এই জুটির সমাপ্তি হয়েছে মুশফিকুরের ভুলে। অহেতুক রানের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করবার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। মুশফিকুরের এই ভুলের জন্য ওর অর্ধেক ম্যাচ ফি জরিমানা করা উচিত। জুনায়েদের ৭৫ শতাংশ ম্যাচ ফি কেটে নেওয়া উচিত জরিমানাস্বরূপ, আর সাকিবের ৮৫ শতাংশ ম্যাচ ফি জরিমানা হওয়া উচিত আউট হওয়ার ধরণের কারণে, মুশফিকুরের পর নামলো আশরাফুল, প্রতিভা নয় টেকনিক আর মানসিকতার সমস্যা ওর। ব্যাটিং এ দায়িত্বহীনতার জন্য ওর ১০০ শতাংশ ম্যাচ ফি কেটে নেওয়া উচিত।
১৫৯ রানে রকিবুল আউট হওয়ার পরও বাংলাদেশ ২০৫ করেছে রাজ্জাকের কল্যানে। তবে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের এই দুর্বলতার জন্য দায়ী গেম প্লানিং, একটা লক্ষ্য নির্ধারণ কওরে রানের পাহাড়ে আয়ারল্যান্ডকে চাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হোয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ দলের লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিলো কোনো রকমে ধরে খেলে আড়াইশো রান অতিক্রম করা। সে জন্য বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং লাইন আপে রকিবুলের অবস্থান হওয়া উচিত ছিলো চার , এর পর আশারাফুল, তারপর সাকিব, মুশফিকুর, কিন্তু দলের থিংক ট্যাঙ্ক সম্ভবত এসব ভাবছিলো না।
বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং দেখে বিমর্ষ এবং মর্মাহত আমি যখন রাস্তায় নামলাম, তখনও মেজাজটা খিচড়ে ছিলো। কমিটমেন্টের অভাব নয় বরং মানসিকতার দুর্বলতা চোখে লেগেছিলো। এমন দায়িত্বজ্ঞানবিহীন ব্যাটিং এর প্রদর্শনী আশা করি নি বাংলাদেশের কাছে। আয়ারল্যান্ড বোলিং করেছে খুব ভালো এমন বলা যাবে না কিন্তু অকন্ডিশনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবার মত পেশাদারিত্ব অর্জন করেছে তারা। পটারফিল্ড তার বোলারদের চমৎকার ব্যবহার করেছেন, ডকরেল চমৎকার মাপা লেংথে বল করেছে এবং বাংলাদেশের স্পীনারদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে তার উদাহরণ।
বাংলাদেশের বোলিং এ কোনো চমক ছিলো না, স্পীন নির্ভর পীচে খেলছে বাংলাদেশ, সেখানে দলের বোলিং লাইন আপে স্পীনারের সংখ্যা তিন, সাকিব রাজ্জাক আর নাঈম, পেসার দুইজন, শফিউল আর রুবেল। নাঈমের ব্যাটিং কিংবা বোলিং সাধারণ মানের, জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার মতো বোলিং করে নি সে আজ। প্রচুর বাজে বল করেছে, প্রতি ওভারেই অন্তত দুইটা বাজে শর্ট পিচ বল করেছে, একই সাথে লাইনে বল রাখতে না পারার অক্ষমতা দেখে মনে হয়েছে, স্পট বোলিং দক্ষতার বাংলাদেশ এখনও আরব আমিরাতের সাথে তুলনীয়।
স্টপ গ্যাপ বোলার হিসেবে আশরাফুলের বোলিং নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। স্পীনারের অভাবটুকু শুধু পুরণ করেছে ও এমনটা বললে ভুল হবে, বরং শেষ ওভারটা বাদ দিলে আশরাফুল আজ বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বোলার ছিলো। আর হোয়াইটকে যে বলে বোল্ড করলো আশরাফুল সেটা দিনের অন্যতম একটা সেরা বল। ব্যাট হাতে ব্যর্থতা পুষিয়ে দিয়েছে সম্পূর্ণ এমন বলবো না, তবে তার উপরে যে দায়িত্ব ছিলো সেটা সম্পূর্ণ পালন করতে পেরেছে বোলার আশরাফুল।
৮ ওভারে ২৮ রান দিয়ে দুই উইকেট পাওয়া বোলিং কার্ড দেখলে মনে হবে সাকিব খুব ভালো বল করেছে কিন্তু আজ সাকিব তেমন ভালো বল কওরে নি, তার উপর আশরাফুলের সাথে তার দুরত্ব স্পষ্ট বুঝা গেছে আজকের খেলায়, জাতীয় দলে ইর্ষা কিংবা রাজনীতির সুযোগ নেই, উৎপল শুভ্রের কল্যানে লাইম লাইটে আসা আশরাফুল বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং লাইন আপে একটা বোঝা হোয়ে আছে সেটা স্বীকার করেই বলছি, দলের সবাইকে সমানভাবে দেখতে না পারলে দলকে উজ্জীবিত করা কঠিন। সাকিব অন্তত আশরাফুলএর সাথে যে ব্যবহার করেছে তাতে দলকে উজ্জীবিত রাখা কঠিন।
শফিউলকে নিয়ে আমার উচ্ছ্বাসের কমতি নেই, আজ তৃতীয় স্পেলে বল করতে আসবার পর তার বোলিং দেখে মুগ্ধ হয়েছি, এবং শেষ ৬ ওভারে ১১ রানে ৪ ঊইকেট নেওয়ায় তার বোলিং বিশ্লেষণ দাড়িয়েছে ৮ ওভার ২১ রান ৪ উইকেট, কিন্তু এই বোলিং কার্ডও বলবে না কিভাবে এয়ারসুইং করেছে ওর বল, আর বোথাকে যে বলে আউট করলো সেটা দিনের সেরা একটা বল। সমস্যা হলো এত চমৎকার বল করবার পরও আমার মনে হয়েছে ওর বলের উপরে নিয়ন্ত্রণ এখনও চরম নয়, আরও উন্নতি করবার প্রয়োজন আছে, উইকেটের দু দিকেই বল মুভমেন্ট করবার ক্ষমতার সাথে যদি সঠিক স্পটিং এর দক্ষতা থাকতো তাহলে শেষের দুই ওভারে একটি ওয়াইড আর একটি বাই চার হতো না।
তামিম যে ক্যাচটি ধরেছে সেটা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেরা ক্যাচ। তবে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ আমার চোখে শফিউল,
পার্ফর্মেন্স মার্কিংঃ
ইমরুল কায়েসঃ ১০ এ ২
তামিম ইকবালঃ ১০ এ ৪
জুনায়েদঃ ১০ এ ৩
মুশফিকঃ ১০ এ ৫
সাকিবঃ ১০ এ ৪
আশরাফুল ঃ ১০ এ ৩
রকিবুলঃ ১০ এ ৫
রাজ্জাকঃ ১০ এ ৪
শফিউলঃ ১ ০ এ ৬
রুবেলঃ ১০ এ ৩ [ বোলিং এর জন্য না বরং ফিল্ডিং এ অহেতু্ক পরিশ্রম করে রান বাচানোর বদলে রান বাড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে]
নাঈম ১০ এ ৪
সার্বিক হিসেবে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং পার্ফরমেন্সের জন্য বাংলাদেশ পাবে ১০০ তে ৪৫
বোলিং এবং ফিল্ডিং এ ১০০ তে ৭৫
সমর্থক হিসেবে একটা কথাঃ ম্যাচটা জিততে এত ঘাম ঝরাতে হতো না, অযথাই এই পরিশ্রম এবং মানসিক অসস্তির ঘটনাটা ঘটতো না যদি বাংলাদেশ দল আয়ারল্যান্ডের মতো পেশাদারী মানসিকতা অর্জন করতো। আশরাফুল নয় বরং বাংলাদেশের সার্বিক পার্ফরমেন্সের বিষয় নিয়ে আমার মূল্যায়ন প্রতিভা নয় আধুনিক যুগের খেলায় সর্বোচ্চ সাফল্য পেতে গুরুত্বপূর্ন হলো টেকনিক্যালী সাউন্ড হয়ে ওঠা, পরিশ্রমী মনোযোগী খেলোয়ার, পেশাদারী খেলোয়ার দেশকে বিজয়ী করতে পারে প্রতিভাবানদের পৃষ্টপোষকতার কারণেই আমাদের খেলোয়ারদের জয়ের ধারাবাহিকতা নেই।





বিশ্লেষণ ভালো লেগেছে। অন্যধরণের মূল্যায়ণ। এভাবে নম্বর প্রদানের বিষয়টা অভিনব বৈকি।
আপনার ফর্মেটে আমি নিজের মূল্যায়ণ জুড়ে দিলাম ।
ইমরুল কায়েসঃ ১০ এ ১
তামিম ইকবালঃ ১০ এ ৭
জুনায়েদঃ ১০ এ ৩
মুশফিকঃ ১০ এ ৬
সাকিবঃ ১০ এ ৩
আশরাফুল ঃ ১০ এ ৫
রকিবুলঃ ১০ এ ৫
রাজ্জাকঃ ১০ এ ৪
শফিউলঃ ১০ এ ১০
রুবেলঃ ১০ এ ২
নাঈম ১০ এ ৫
অসাধারণ বোলিং এর জন্য শফিউল যাদের ম্যাচ ফি কাটলেন তাদেরগুলো পেয়ে যাক। আশরাফুল ব্যাটিং এর সময় খুব নার্ভাস ছিলো। ভুয়া ব্যাটিং করে আউট হবার জন্য ওর কান মলা প্রাপ্য। সাকিব বেকুবের মত আউট হয়েছে, ওরে একটা ঝাড়ি।
সার্বিক হিসেবে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং নৈপূন্যের জন্য বাংলাদেশ পাবে ১০০ তে ৩৩ (মানে টেনেটুনে পাশ)
বোলিং এবং ফিল্ডিং এ ১০০ তে ৯৫
বিশ্লেষণ চমৎকার লাগলো! ব্যাটিং-এ আমি এদেরকে পাস-মার্কস দিতেও রাজি নই! ফালতু লেগেছে এই অগোছালো স্টুপিড-টাইপ ব্যাটিং। তবে সব মিলিয়ে বোলিং-ফিল্ডিং-এ লেটার মার্কস দেয়া যায়।
এত টেনশন ছিলো বলেই ম্যাচ জেতার পর এমন বাধভাঙা উচ্ছ্বাস। এই ম্যাচ তো আমাদের এমনিতেই জেতার কথা! এবং 'এমনিতেই' জিতে গেলে এমন উচ্ছ্বাস দেখা যেত না বোধ হয়!
কমেন্ট অভ দ্যা ডে
আমরা বন্ধুতে একজন বিশ্লষক ছিলেন। তিনি যতদুর মনে পড়ে এসে বলেছিলেন খেলা গুলো বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু এখনো তার দেখা মিলে নাই। আপনার বিশ্লেষণ ভাল লাগল।
আমি এখনো আশরাফুলের পক্ষে
আমিও , তবে সে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে
মাথায় ঘিলু বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকলে আশুর মাথায় কিছুর ব্যবস্থা করা যেতো, টেকনিকটাও এই বিষয়ে কি শেখানো যাবে ?
ক্রিকেটে খারাপ দিন আসতেই পারে, ব্যাটিং'এর জন্য গতকাল একটা খারাপ দিন ছিলো, এর বেশী কিছুনা
টাকাপয়সা কাইটা রাখা'টা অন্যায় হইয়া যাইতো ...
এই ক্রিকেটার'দের জন্যই আমরা যা একটু উদ্বেলিত হই, বর্তমান বাংলাদেেশ আর সবকিছুই'তো আমাদের জন্য একরাশ হতাশা উপহার দেয়, তাই যে কোনো পরিস্থিতিতেই এদের'কে আমি কিছু কইতে রাজি না
মন্তব্য করুন