ইউজার লগইন

রিপোষ্ট " শ্রীজাতের সঙ্গে কাতিউশার গল্প"

এবার চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিলো শ্রীজাতকে খুঁজে পাওয়া।

কবিতার মানচিত্র বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে, বাংলা কবিতায় যুগের হাওয়া হানা দিচ্ছে, অস্থির সময় আমাদের ভাবনাগুলোও বিক্ষিপ্ত দিন দিন, একটা কিছুতে দীর্ঘ সময় মনোনিবেশ কষ্টকর খুব। ব্যস্ত হাতে চ্যানেল বদলাতে বদলাতে আমাদের অবসর কেটে যায় আর সেইসব নির্লিপ্ত অবসরে শ্রীজাতের কবিতা চলে আসে,

আমাকে দ্যাখে টিভি
চোখ রাঙায়, চোখ নামায়,হাসে।

রাত বাড়লে, রোজ
আমার ঘরে দেয়াল থেকে ঝাঁপায় টিকটিকি

টিভিও তাকে কপাৎ ক'রে খায়

রিমোট হাতে সামনে বসে মুগ্ধ আমি দেখি
কীভাবে ঐ একরত্তি প্রানী
ডাইনো হয়ে যায়

অবশ্য শ্রীজাতের পাতে না উঠবারও সমুহ সম্ভবনা ছিলো, যদি ভুলে কয়েকটা পাতা উলটে যেতো, তবে শ্রীজাত আমার বগলে চেপে চট্টগ্রামে বন্ধুর বাসা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো না। আমি খুব বেশী মুগ্ধ হয়ে অন্তত কবিতার বই কিনি নি অনেক দিন, শুক্রবারের সন্ধ্যায় যখন পুরোনো বইয়ের খোঁজে আন্দারকিল্লায় যাবো মনে করলাম, তখনও জানতাম না আমার এই ভ্রমনের শেষে আমি শ্রীজাতকে বগলদাবা করে ঘরে ফিরবো।

নিতান্ত ঠাট্টায় যখন বন্ধুকে বললাম এ বার পহেলা বৈশাখের বন্ধে তোর বাসায় যেতে পারি যদি তুই টিকেট পাঠাস তখনও জানতাম না ও ঠিকই পরের দিন সকালে মোবাইলে টিকেট কেটে পাঠিয়ে দিবে, কষ্ট করে কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে টিকেট কাউন্টার থেকে নানান কসরত করে টিকেটটা হাতে পেলাম মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। তারপর রাতে ব্যাগ গুছিয়ে পিচ্চিকে নিয়ে সোজা চট্টগ্রামে, ডিসিহিলে বর্ষবরণ দেখবো। বন্ধুর বাসা থেকে হাঁটা পথ, শুধু একটা ট্রাফিক সিগন্যাল, সেটার সামনেই ডিসিহিল আর সেখানেই সকালটা কাটাবো। চট্টগ্রামের চারুকলার শিক্ষার্থীরা চমৎকার মুখোশ বানিয়েছে, সেই সব মুখোশের আড়ালে দৈনন্দিনের অপ্রাপ্তি আর হেরে যাওয়া মুখ লুকিয়ে সবাই উল্লসিত বর্ষবরণ করতে যাবে,

তবে নিতান্ত আলস্যে কিংবা অনভ্যাসেই সকালটা বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে কাটালাম, পরের দিন দুপুরটা পার্কি বীচে কাটিয়ে যখন ফিরলাম তখন সন্ধ্যে প্রায়। চট্টগ্রামে বই কিনবে কি, চট্টগ্রামের মানুষের এত পড়ার অভ্যাস নেই। বন্ধুর কথা কেড়ে নিয়ে বললাম সেটাই তো ভালো, যেহেতু পড়বার অভ্যাস নেই তাই ঢাকার মতো বই খুজতে গিয়ে না পাওয়ার সম্ভবনা কম।

আন্দারকিল্লা বন্ধ শুক্রবার। সুতরাং চেরাগ আলী মাজারের সামনে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকলাম, শ্রীজাতের এর আগের দুইটা পড়া কবিতার একটা ভালো লেগেছিলো, অন্যটা টানে নি, আর শ্রীজাতের বই কেনা উচিত হবে কি না এই নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বও ছিলো, তাই তাক থেকে বই নামিয়ে পূর্বের অভ্যাসেই একটা পাতা উলটে কবিতা পড়া ধরলাম, কবিতাগুলোর কোনো শিরোণাম নেই, কাতিউশার গল্পের প্রথম যে কবিতা পড়লাম সেটাই ভালো লাগলো বলে শ্রীজাতের বগল দাবা হওয়ার সম্ভবনাও বাড়লো

মা যখন কাদে,
আমি অন্য ঘরে বসে থাকি।
মায়ের কান্না'র শব্দ সাত সমুদ্র পার করে
পৌঁছায় আমার কাছে। শুনি।

মায়ের কান্নার গন্ধ হাজারটা মশলার ঝাঁঝ ফুঁড়ে
আছড়ায় আমার মুখে। শুঁকি ।

মায়ের কান্নার শপর্শ্ব রোদে মেলা জামা থেকে
টপটপ ঝরে পড়ে। ছুঁই।

শুনি, শুকি, ছুঁই .।.।.।

শুধু দরজা ফাঁক করে ভেঙে পড়া মা'র দিকে
তাকাতে পারি না।
ভয় হয় ।

মা যখন কাঁদে,
আমি অন্য ঘরে বসে থাকি।

তারপর আবারও পাতা উল্টাই কিছু না দেখেই, আর তখন ভবিতব্যের মতো শ্রীজাতের ঠিকানা হয় আমার বগল

এ মালিক, সে পরিচারিকা
মাঝরাতে পার করে স্ত্রী সন্তান সমাজ পরিখা

ওদের মিলন হলো বিছানার পাঁচ ফুট ওপরে
মিলিত শরীর দুটো শূণ্যে ভেসে থাকে, শূণ্যে ঘোরে

নীচে মেঝে। পৃথিবী। বাস্তব
এই প্রৌঢ় ফিরে গিয়ে আগুণ লাগাবে ঘরে
পুড়ে ছাই হয়ে যাবে সব

এখন, মিলন শেষে, সাইকেল চালাচ্ছে সে
মাঠ কামড়ে পড়ে আছে মরা জ্যোৎস্না । চাঁদের পদবি।

আহুতি আহুতি চাই
আহুতি আহুতি
মনে পড়ে স্যাক্রিফাইস, তারাকোভস্কির শেষ ছবি।

কবিতার ধরণ কি বদলেছে খুব, নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়। বাসা ফিরে কবিতার বই শেষ করে মনে হয় এসব কবিতা নয় শব্দের স্ন্যাপশট। একটা একটা করে শব্দ জুড়ে জুড়ে একটা ছবি, সে ছবির সাথে পরের ছবিটাও আলতোভাবে সংযুক্ত, আমাদের রোজকার জীবনযাপনের এক একটা স্ন্যাপশট পাশাপাশি সাজিয়ে দেওয়া দৃশ্যটার ভেতরে উপস্থাপনের অভিনবত্ব আছে, এইসব আলতোভাবে যুক্ত শব্দস্ন্যাপশটগুলোর আলাদা আলাদা চিত্রায়ন সম্ভব কিন্তু সেটা কি কবিতা হয়ে উঠতে পারতো, অসারবিস্তার শুধু কলেবর বাড়ায়, তাতে কবিতার মান বাড়ে না।

শমিত দা'র সাথে মাঝে মাঝেই কথা হয় ফেসবুকে, তাকে একদিন বললাম, শমিত দা এখন আর বড় কবিতা লেখার ধৈর্য্য পাই না, ১৪০ ক্যারেক্টারে কবিতা লিখি, মোবাইলের ম্যাসেজে এর বেশী সুযোগ দেয় না, বরং এই সীমিত চৌহদ্দিতে নিজের ভাবনা গছিয়ে দেওয়ার লড়াইটাই উপভোগ্য বেশী।

শমিত দা বললো আমার টুইটারে আসো, আমিও এখন ১৪০ ক্যারেক্টারে লিখছি, এর বেশী লিখতে ভালো লাগে না। আমি শমিত দার টুইটারে গিয়ে দেখি সেখানে আগে থেকেই শব্দসংকোচ আর শব্দ সংকোচন। তার নতুন আঁকা ছবি আর ফটোগ্রাফের কোলাজ দেখি, তারপর ভুলে যাই আসলেই এখন ভাবনা সংকোচনের দিনসমাগত। শ্রীজাত পুনরায় মনে করিয়ে দিলো, এভাবেই কবিতা এঁকে রাখতে হয়।

তাই
এখনও অটোয়। 'বাড়িতে ঢুকি নি।'
'তুমি পরে কোরো। 'আপনি কেমন '
' রাস্তায় আছি' 'রাতে কথা হবে। '

সেলফোনে কারা পেয়েছে আমাকে
তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই
অটোর আওয়াজ, ট্রামে ঘড়ঘড়
পুলিশের চোখ, মুড়ির গন্ধ

এক মুহুর্তে তাদের সঙ্গে
সিগন্যাল দিয়ে জোড়া কলকাতা

এখনও বাড়িতে ঢুকিনি যেহেতু
সেলফোনে যারা পেয়েছে আমাকে
তাদের সঙ্গে একজোট হয়ে
হাতে পায়ে ধরে কথাগুলো সব
রাতের দিকেই ঠেলে দিই .।.।.।।

বন্ধুর ঠাট্টা কিংবা বন্ধুকন্যার আহ্লাদী চোখ, ছেলের ক্লান্তি আর উচ্ছ্বাস সব গেঁথে রাখি রাতের বালিশে, আর ছেলে ঘুমানোর পর গেরস্ত হওয়ার প্রাণপন প্রচেষ্টায় ব্যস্ত বন্ধুর সাথে শেষ রাতের আলাপনে চলে আসে বুদ্ধিমত্তা, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আমরা লোড শেডিং এ বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা খুঁজি, আদতে বুদ্ধিমত্তা কি

পরপর ধারাবাহিক ভাবে কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করতে পারা নিম্নস্তরের প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তার ক্ররত্রিম পরিমাপ, তবে সেখান থেকেই চলে আসে ভাবনাটা, এমন ধারাবাহিক কিছু নির্দেশনার স্মৃতি ব্যবহার করে নতুন কোনো পরিস্থিতিতে নতুন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারাটা বুদ্ধিমত্তা, অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা, কিন্তু সেখানেই আটকে থাকে আলোচনা, মূলত লক্ষ্যটা সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া, কেউ যদি পঞ্চাশধাপ পেরিয়ে কষ্টে সৃষ্টে একটা সমস্যার সমাধান করে সে বেশী বুদ্ধিমান না কি যে একই সমস্যা মাত্র পাঁচ ধাপে সম্পন্ন করলো সে বেশী বুদ্ধিমান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা কি আমাদের বুদ্ধিমান চিহ্নিত করে না কি এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিই বুদ্ধিমত্তার অংশ, আমরা জানি না, আলোচনা হয়তো আরও ঘুরতে পারতো ভাবনার অলিগলিতে, কিন্তু সারা দিনের ক্লান্তি এসে বাগড়া দেয় আর আমি শেষ বারের মতো পাতা উলটে কাতিউশার গল্প পড়ি

উল্কা পড়ে যেসব জায়গায়
গরম বাড়ে, অনেক বড় বড়
গর্ত হয়ে যায়

চমকে ওঠে গবেষণার দিন
দু মাস পর পরিধি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে থাকে
প্যাকেট , ক্যান, বোতল, ন্যাপকিন

পাপড়ি ম্যালে ' প্রহিবিটেড জোন'
হিসেব থেকে বোঝা যায় না ঠিক কে পতন ঘটিয়েছিল
অভিমান না মধ্যাকর্ষণ

উল্কা পড়ে যেসব জায়গায়,
আস্তে আস্তে নাগরদোলা, রেস্টুরেন্ট বসে,
ক্লাউন করে খায়

কার্নিভাল কামড়ে ধরে মাটি
উইক এন্ডে আমরা যাই
টিকেট কেটে গর্তে নেমে হাঁটি

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


শ্রীজাতের কবিতার সাথে পরিচিত হলাম।
লেখা অনবদ্য-যেমনটা রাসেলের লেখা হয় আর কি!

তানবীরা's picture


কবিতা মাথার ওপর দিয়ে গেছে Big smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.