ইউজার লগইন

আবারও এলেমেলো

ইন টু দ্যা ওয়াইল্ড ছবির ভবঘুরে নায়কের জন্য কিংবা তার এমন নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য কিছুটা কষ্টবোধ ছিলো, জীবনের অপচয় মনে হতে পারে বিষয়টাকে, কিন্তু সে নিজেই এই জীবনযাপনের ধারা বেছে নিয়েছিলো। সে চাইলেই অন্য রকম একটা জীবন যাপন করতে পারতো, তার নিজের আগ্রহেই সে নিজের মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছে, সে নেশাসক্ত ছিলো না, কিংবা অন্য কোনো ভাবনার ব্যধি তার ছিলো না, কিন্তু তারপরও সে এমন ঠান্ডা কষ্টকর মৃত্যুর পথটা নিজেই বেছে নিয়েছিলো।

ভ্যাগাবন্ডের নায়িকাও এমন জীবন বেছে নিয়েছে, সব কিছুকে স্বেচ্ছায় উপেক্ষা করে যাওয়া জীবন, নিজের মতো বাঁচতে চাওয়া এই জীবনে সে কোথাও স্থিতু হয় না, হয়তো দীর্ঘ পথ ভ্রমণে ক্লান্ত মেয়েটা একটা সময় আশ্রয় চায়, কিন্তু সম্পুর্ণ ছবিটাতেই মেয়েটা নিজের পার্থিব অস্তিত্ব এবং পার্থিব প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেছে, অস্বীকার করেছে, পরিচালিকা নারী এবং তার নারীবাদী হিসেবে একটা সামান্য পরিচিতি থাকলেও ছবিটাতে নারীবাদী তেমন কোনো বক্তব্য নেই, জীবনঘনিষ্ট ছবি হয়তো না এটা মানে তেমন তথাকথিত আর্ট ফিল্ম ক্যাটাগরির ছবি এটা হয়তো না, ছবিতে আলাদা করে হলেও একটা বক্তব্য আছে, সামান্য বক্তব্য, কিন্তু সেটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়

সমাজের নির্ধারিত কিছু নিয়ম আছে, দীর্ঘ দিনের চর্চায় সেটা প্রতিষ্ঠিত এবং সেটাকে প্রশ্ন করা সম্ভব না, প্রশ্নাতীত এইসব বিনিময় প্রথা, এখানেই তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে, জীবনের আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই, কোনো উপলক্ষ্য নেই, তোমাকে কিছু হয়ে উঠতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু তোমার সমাজকে কোনো না কোনোভাবে সমঝে চলতে হবে, এমন কি যে অরণ্যে মাত্র একজন মানুষ তার স্মৃতির ভেতরেও সমাজ লুকিয়ে আছে, লুকিয়ে আছে সামাজিক বিধিনিষেধের দেয়ালগুলো, সেসব মানুষ নিজের অস্তিত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে,

যদি কেউ কিছু হয়ে উঠতে না চায়, তার নিজের জীবন এভাবেই নষ্ট করতে চায় সমাজ তাকে অন্যটা করতে বাধ্য করে না, সমাজকে উপেক্ষা করবার প্রতিক্রিয়ায় সমাজও তাকে উপেক্ষা করে, ভুলে যায় তার অস্তিত্ব,

কেউ কেউ নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই অনেক কিছুই কল্পনা করে নেয়, ভেবে নেয় তার যা কাজ সেটাই সমাজের সবচেয়ে বড় উপকারে আসে, নিজের সেবা কিংবা কাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা এবং সে কাজের সামাজিক স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ বলেই এখন মুদির দোকানদারের তুলনায় ব্যাংকের কেরানী অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক জীব যদিও জীবনযাপনের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কিংবা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একজন মুদি দোকানদারের উপযোগিতা বেশী, তার সেবাপ্রদানের বিস্তৃতি বেশী, কিন্তু তার এই সেবার মূল্যায়ন তেমন নয় কারণ সেটা খুব সহজেই পাওয়া যায়, দীর্ঘ দিন পরিশ্রম করে এমএবিএ করে এমবিএ করে, বেশ বড় একটা পরীক্ষা আর সিলেকশন প্রক্রিয়া পার হবে হাজার পয়ত্রিশ কামানো ব্যাংকের কেরানীর চেয়ে মুদির দোকানীর মাস শেষে উপার্জন হয়তো বেশী কিন্তু সেটার সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা তেমন নেই।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা আমাদের কেরানীগিরির ধারণায় স্বাধীন পেশার তুলনায় এইসব কেরানীগিরি অধিকতর শ্লাঘার বিষয় বিবেচিত হয়েছে এবং সেটা হওয়ার জন্য একটা সামাজিক প্রণোদনাও আছে।

রাস্তার ঝাড়দার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সবাই কোনো না কোনো ভাবে তার নিজের জায়গায় দাড়িয়ে কোনো না কোনো সেবা প্রদান করছে, সমাজ তাদের বিভিন্ন ভাবে যাচাই করে সত্য কিন্তু সমাজ মেনে নেয় তাদের এই সেবার সামাজিক গুরুত্ব আছে। সমাজে তাদের অস্তিত্ব উপলব্ধি করা যায়।

এদের বাইরে আছে একদল ভবঘুরে, যাদের নিজের জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই, যদিও জীবনের কোনো একটা লক্ষ্য থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এরপরও পরবর্তী দিনটা বেঁচে থাকবার জন্য হলেও একটা উপলক্ষ্য লাগে, সে উপলক্ষ্য কিংবা লক্ষ্যপ্রণোদিত জীবনযাপনের তোয়াক্কা না করে জীবন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া ভবঘুরে যে কোনো কাজ করতে অনিচ্ছুক কিংবা যার তেমন দীর্ঘ মেয়াদী কোনো কাজ করতে ভালো লাগে না, কিংবা অলস কিংবা নেশাসক্ত এবং কাজ করতে অক্ষম, সমাজ এইসব মানুষদের দায়িত্ব নেয় না, এবং সমাজের উপরে এমন কোনো মানবিক চাপ নেই যে সমাজ এদের নিজের সেবা প্রদানী কর্মকান্ডের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবে।

তারা নিজের মতো বেঁচে থাকে, সে বেঁচে থাকার গৌরব নেই কিংবা আমরা যেসব সামাজিক স্বীকৃতির জন্য হন্যে হয়ে থাকি তেমন সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা গৌরব নেই এতে। যদিও বাংলাদেশে কিংবা উপমহাদেশে এখনও এইসব অলস অকর্মন্য মানুষের লৌকিক চাহিদা আছে, তাদের আধ্যাতিক চাহিদাও প্রবল সুতরাং এখানে যে মানুষটা কোনো কাজ না করেও ঘুরছে তাকে খাওয়ানো পরানোর মানুষের অভাব নেই, তার পেছনে হাঁটবার মতো মানুষের অভাব নেই, সবাই ধারণা করে কোন না কোনো ভাবে সে কোনো গভীর সত্যের সন্ধান পেয়েছে, সে সত্য খুঁজে পেতে তার আশে পাশে সামাজিক মানুষ নিজের মনোস্কামনা পুরণের স্বপ্ন নিয়ে হাঁটতে থাকে।

ভ্যাগাবন্ডের প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়েছে ফ্রান্সে, ইন টু দ্যা ওয়াইল্ডের সম্পূর্ণ গল্পটিই যুক্তরাষ্ট্রের গল্প, সেসব সমাজ অনেক আগেই এই আধ্যাত্মিক ভাবালুতা ত্যাগ করে যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, সে কারণে সেখানের প্রেক্ষাপটে দেখা এই ছবিতে উপস্থাপিত ভাবনাগুলোর ভেতরে আলাদা কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়।

ইন টু দ্যা ওয়াইল্ডে ছেলেটার এমন নিস্পৃহ জীবনযাপনের পশ্চাতপট দেখানোর একটা সচেতন প্রয়াস ছিলো, সীমিত অর্থে এটাকে একটা বিদ্রোহ হিসেবেও দেখানো হয়েছে , ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তান হিসেবে শৈশবের অবহেলা কিংবা অনাদরের প্রেক্ষিতে সে এমন ভাবে সকল কিছুই উপেক্ষা করে নিজের মত বাঁচতে চায়, ভ্যাগাবন্ড সে রাস্তায় যায় নি, এখানে মেয়েটার অতীত নেই, কোন না কোন অদৃশ্য কারণে সে নিজেকে জীবন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং সম্পূর্ণ ছবিটা সেখানেই ঘুরপাক খায়, যদিও শেষের দিক মেয়েটার ভেতরে একটা স্থিতু জীবনের প্রত্যাশা কিংবা আগ্রহ তৈরি হয় কিন্তু তার ভেতরে সে প্রত্যাশা পুরণের কোনো পরিশ্রম চোখে পড়ে না, সে নিজের মতো অকালমৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় ধীরে ধীরে।

সহযোগিতার সকল হাত উপেক্ষা করে যাওয়া মানুষটা কেনো এমন করলো তার কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না বলেই ছবিটার পেছনের রাজনৈতিক বক্তব্যটাই একমাত্র উপস্থাপনযোগ্য বক্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তোমাকে কোনো না কোনো ভাবে সমাজের উপকারে আসতে হবে, তুমি টয়লেট পরিস্কার করো কিংবা রাজার মোসাহেব হও যা কিছু একটা করো কিন্তু প্রচলিত সামাজিক বিধিনিষেধকে মেনে নাও, অম্য রাস্তাগুলো নিশ্চিত একাকী মৃত্যুর রাস্তা।

এখানে এখনও তেমন ভাবে এমন ভবঘুরে বিস্ফোরন হয় নি, খুব কম মানুষই এমন কিছু করতে অভ্যস্ত কিংবা ততটা সাহসী, কিন্তু যান্ত্রিক দেশগুলোতে এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, এটা তাদের জন্য একটা সংকট, সমস্যা, দক্ষ জনগোষ্ঠির চাহিদা পুরণে তার অনুন্নত দেশগুলো থেকে লটারীর মাধ্যমে মানুষ নিচ্ছে, তাদের দিয়ে নিজের অর্থনীতির প্রয়োজনীয় কর্মীবাহিনীর চাহিদা পুরণ করছে, হয়তো জনকল্যানমুখী রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেই বলে তাদের সবার উপযুক্ত শিক্ষার বন্দোবস্ত নেই কিন্তু ন্যুনতম শিক্ষার চাহিদাটুকু পুরণে কোনো গাফিলতি তাদের নেই, এরপরও বেশ বড় একদল মানুষ নিজেকে নেশার হাতে সমর্পন করছে কিংবা প্রচলিত সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে বিস্তৃত পার্কের আবর্জনা খুটে খাচ্ছে, তাদের এমন জীবনযাপনের প্রয়োজনীতা নিয়ে কেউ কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে মনে হয় না। এদের সামাজিক বিচ্যুতি কিংবা সমাজবিমুখতার কোনো মন:স্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কিংবা কার্যকরণ কি কেউ খুঁজে বের করেছে।

এ প্রবনতা যান্ত্রিক রাষ্ট্রে যতটা প্রবল এখানে ততটা নয় বলেই হয়তো চোখে লাগে না তেমন ভাবে, কিন্তু এখানেও সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষেরা বসবাস করে, তারা আমাদের আশেপাশে থাকে কিন্তু তাদের সাথে সমাজের কিংবা অন্য কারো যোগাযোগ সীমিত, তারা এভাবে নিজেকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে না কিন্তু ক্রমশ: একাকী মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

প্রশ্নটা অমীমাংসিত থেকে গেলো, আমাদের অস্তিত্বের কোনো উপলক্ষ্য কি আদৌ আছে না কি এই সামাজিক প্রয়োজন এবং দায়মেটানোর সম্পর্কগুলো সামাজিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবেই গুরুত্বপূর্ন, কেনো মানুষ নিজের অস্তিত্বের যথার্থতা খুঁজবে, কোথায় খুঁজবে এবং সে প্রশ্নের গ্রহনযোগ্য উত্তর কি, সমাজের বিশাল রেলগাড়ীর চাকা হয়ে সারাজীবন নিজেকে বিভিন্ন দিকে চলে যেতে দেখার বাইরে আসলে আমাদের নিজেদের বলে কি আছে এখানে। এই সামাজিক সম্পর্কগুলো আমাদের কি দেয়?

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আহমাদ মোস্তফা কামাল's picture


না নেই। এ প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই। কোনো কোনো মানুষ কেন এমন জীবন বেছে নেয়, কেন প্রচলিত জীবন-ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বোঝা মুশকিল। হয়তো প্রচলিত জীবন-যাপন, সামাজিক আচার-ব্যবস্থা, আয়োজন-প্রয়োজনের প্রতি তার এক ধরনের অনাস্থা আছে, কিংবা হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে - জীবনের কোনো সদর্থক লক্ষ্য খুঁজে না পাবার কারণেও - এমনটি হতে পারে।... জীবন শেষ পর্যন্ত একটা ফাঁদের মতোই।মিলান কুণ্ডেরা কথিত ফাঁদের দেখা পায় হয়তো তারা--

‘Life is a trap we’ve always known; we are born without having asked to be, locked in a body we never chose, and destined to die’ (আমরা সবসময়ই জেনে এসেছি, জীবন একটা ফাঁদ। আমরা আদৌ জন্মাতে চাই কী না সেটি জিজ্ঞেস না করেই আমাদের জন্ম দেয়া হয়েছে, আমাদেরকে এমন এক দেহে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে যেটি আমরা নিজেরা বেছে নিইনি; অথচ জন্মেই আমরা দেখেছি - আমাদের জন্য অবধারিত হয়ে আছে মৃত্যু!)

(কথাটা মিলান কুন্ডেরার, ভাবানুবাদ করলাম আর কি!)

জীবনটা শেষ পর্যন্ত একটা ফাঁদ-ই।

ভালো লাগলো লেখাটা, তাই অনেক কথা বলা হলো...

রাসেল's picture


সব কিছুর কোনো না কোনো গভীর তাৎপর্য আছে, সব কিছুর কোনো না কোনো ব্যাখ্যা আছে আমাদের এই প্রতিষ্ঠিত ধারণাটা আদৌ কোনো কাজের না। আমরা এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত যদিও কিন্তু কোনো কিছুর কোনো অর্থ থাকবার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই আদতেই।

অন্য কোনো জীবের সাথে আমাদের কোনো তফাত নেই, আমরা নিজেদের আত্মতৃপ্তির প্রয়োজনে এইসব সংজ্ঞা আর বিভ্রম তৈরি করে রেখেছি চারপাশে, অন্য কোনো জীবের সাথে নিজেদের পার্থক্য নির্ধারণে আমাদের এমন প্রচেষ্টার কোনো প্রয়োজন ছিলো না হয়তো, কিন্তু আমাদের দীর্ঘ দিন এমনভাবেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে,

আমরা যেকোনো জীবের মতো একেবারেই সাধারণ

we eat we shit we live we lie we fuck we die other than accepting this reality we prefer to ran in that ignominious oblivion

তানবীরা's picture


সামাজিক সম্পর্কগুলো আমাদেরকে আসলে সেভাবে কিছু দেয় না, বাড়তি কিছু খরচা ছাড়া Sad

অতিথি's picture


ভাল্লাগছে লেখাটা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.