মুক্তিযুদ্ধের সাদা কালো ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপট ও পরিণতি প্রথম পর্ব
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস এখনও প্রবল জাতীয়তাবাদী উচ্চ্বাসেই লেখা হচ্ছে, সেসব লেখায় স্মৃতিচারণে ঘটনা বিশ্লেষণেও জাতীয়তাবাদী মানসিকতার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়, একদল বামনাকৃতির মানব, একজন দুইজন মহামানব এবং মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন দানবের রূপরেখা তৈরীর এই জাতীয়তাবাদী প্রকল্প কেনো জনপ্রিয় সেটা আমার জানা নেই। হয়তো অতিজাতীয়তাবাদী উৎসাহে লেখা সাদা কালোর ইতিহাস সহজপাচ্য, সহজবোধ্য, সহজেই বিপণনযোগ্য এবং অধিকাংশ সময়েই সেটা সরল এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াবিহীন। হয়তো এই ইতিহাস রাজনৈতিক ব্যবহারের যুৎসই উপাদান, হয়তো এভাবে জাতীয়তাবাদী আবেগ তৈরির রাজনীতিতে সাদা কালো ইতিহাস গ্রন্থগুলো ব্যবহার উপযোগী এবং সেটা গ্রহন করতে তেমন পরিশ্রম করতে হয় না লেখককে কিংবা পাঠককে।
পূর্ব বাংলার স্বাধীকার আন্দোলন সামাজিক বাস্তবতার নিরিখেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিলো, কেন্দ্রের ক্রমাগত শোষণ এবং উন্নয়ন অবহেলার সাথে সামাজিক মর্যাদাহীনতার বোধও প্রকট হয়ে উঠেছিলো পূর্ব বাংলায়। যেকোনো ঔপনিবেশিক কাঠামোতে উপনিবেশের জনগণ অন্ত্যজ হয়ে উঠে, তারা একই ডোমিনিয়নের অংশ হয়েও দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে পরিচিত হয়, রাষ্ট্র ক্ষমতাকাঠামো উপনিবেশের নাগরিকদের যোগ্যতার পরিপূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করতে অনীহা প্রকাশ করে, সমাজের প্রতিটা অংশের মানুষই ঔপনিবেশিকতার বোধের সাথে পরিচিত হতে থাকে, বিক্ষুব্ধ হতে থাকে, উপনিবেশের একজন হিসেবে তাদের ভেতরে যে ঐক্যবোধ জন্মায় সেটা বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা ছিলো। সে কারণেই স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছিলো পূর্ব বাংলার মানুষ।
সোহাগ আর প্রত্যাখ্যানের রাজনীতিঃ
অসমতার উপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যেকোনো ব্যবস্থাতেই বাহিরের হস্তক্ষেপ থাকে, যারা এই অসমতা চাপিয়ে দিতে চাইছেন তারা নিজের খেয়ালখুশী মতো ব্যক্তিদের প্রতি প্রসন্ন হয়ে উঠেন এবং সামান্য কারণেই তাদের প্রতি বিরূপ হয়ে যান। তাদের প্রসন্নতাকামী উপনিবেশের বিভিন্ন ব্যক্তির ভেতরের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সংঘাত তাদের জন্য উপাদেয় বিনোদন হয়তো। তবে একই সাথে সেটা উপনিবেশের অসন্তোষ সীমিত রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে। রাজানুকল্য লাভের জন্য মরীয়া এবং পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আইয়ুব খানের আনুকল্য লাভের জন্য মরীয়া বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক নেতাদের ভেতরের সংঘাতে মুজিব বাঙালী জাতীয়তাবাদের পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রবল রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠেন। ছয় দফা এবং বাংলার স্বাধিকার মতাদর্শী হিসেবে তার রাজনৈতিক উত্থানে হয়তো আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রভাব ছিলো কিন্তু তার পরও ব্যক্তি মুজিবের ক্যারিশমা কিংবা গ্রহনযোগ্যতাকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে এমন কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠে নি বাংলাদেশে। তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং তার দক্ষতা তার রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে তার দক্ষতা তাকে নির্ভরশীল রাজনৈতিক সহযোগী করলেও একক নেতা হিসেবে তার উত্থান নিশ্চিত করে নি। জাতীয় চার নেতার নিজস্ব ক্যাবিনেট বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে মুজিবের উত্থানকে সম্ভবপর করেছিলো।
তার কোনো বিকল্প না থাকায় মুজিবকে বাধ্য হয়েই আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আইয়ুব সরকার। পরবর্তীতে ইয়াহিয়া খানও মুজিবকে পূর্ব বাংলার একক নেতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ৭০ এর নির্বাচনে ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো, পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে ডানপন্থী দলগুলোকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিলেও নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় প্রতিহত করা সম্ভব হয় নি। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাক্তন জেনারেলগন অভিযোগ করেছেন ভাসানী নির্বাচনে অংশগ্রহনের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে আড়াই কোটি টাকা দাবী করেছিলেন, সে দাবী পুরণ না হওয়ায় তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহন করা থেকে বিরত থাকেন।
মার্চের মাঝামাঝি আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহন করেন, বিশেষত প্রাদেশিক সভায় আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই পশ্চিম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের মৌখিক কিংবা আনুষ্ঠানিক নির্দেশ ব্যতিরকেই মুজিব প্রাদেশিক শাসনক্ষমতা গ্রহন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মুজিবকে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, না কি করবেন না এটা নিয়ে সংশয় থাকলেও আওয়ামী লীগ ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনার ফলাফল তাদের অনুকূলে আসবে এমন আশাই করছিলো, এখানেই একটা দ্বিধা তৈরি হয় আমার। বাংলাদেশের পাকিস্তানী কমিশনড সেনা কর্মকর্তাদের ভুমিকা বিষয়ে এই দ্বিধার কারণ,২৫শে মার্চ সন্ধ্যার সময়ই ঢাকা শহরের লোকজন ঞ্জেনে যায় আক্রমন অবশ্যম্ভাবী। তাদের পাকিস্তানী সেনাদের প্রতিহত করতে হবে। তারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে সন্ধ্যা থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড তৈরিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখলেও সেনা কর্মকর্তাগণ প্রায় অনবগত ছিলেন এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি তাদের অগোচরেই সম্পন্ন হয়েছে, তাদের অপ্রস্তুতির ভাষ্য পড়লে এমনটাই মনে হয়।
মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপরঃ
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই এটা নিশ্চিত হয়ে যায় বাঙালী পিছু হটবে না, তারা জীবন দিয়ে হলেও স্বাধীকারের লড়াই লড়বে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্যই বিভিন্ন স্থানে তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন অনেক ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দিয়েছিলো স্থানীয় ক্ষমতা বিবেচনা করে, তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে ৩রা জানুয়ারী শেখ মুজিব কোরান হাতে শপথ গ্রহন করিয়ে ছয় দফার সপক্ষে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করেন।
মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষ ছিলো এটা সে সময় যেমন সত্য ছিলো আজও তেমনই সত্য। বিভিন্ন আর্থ সামাজিক পটভুমি থেকে উঠে আসা মানুষেরা কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে বাধ্য হয়েছিলো, কেউ স্বীয় অস্তিত্বের প্রয়োজনেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো। প্রত্যেকের স্বাধীনতার ভাবনা ছিলো আলাদা। প্রতিটা শ্রেণীর মানুষই স্বাধীনতা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পোষণ করেছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ধারণা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের প্রমোশন এবং তাদের সামাজিক ক্ষমতার প্রতপক্ষ হিসেবে উর্দুভাষী কোনো কর্মকর্তাই থাকবে না। তারাই নিজেদের মতো প্রশাসন পরিচালনা করতে পারবেন।
একজন বাঙালী ব্যবসায়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পৃষ্টপোষকতা করেছেন কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে তার কোনো পশ্চিমা ব্যবসায়িক প্রতিদন্ডী থাকবে না।
একজন নিম্নবি বিশ্বাস করেছে এই স্বাধীনতা আসলে যেহেতু সম্পদ পাচার হবে না সুতরাং তার জীবন ও জীবিকা নিশ্চিততর হবে, তার প্রত্যাশিত স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে স্বাধীনতা।
একই সাথে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা আন্দোলন বিরোধীদেরও উত্থান ঘটে। এদের একাংশ যুদ্ধচলাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক লুণ্ঠন করেছেন, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্য এবং তাদের সহযোগীদের সাথে তিনিও প্রবল উৎসাহেই প্রতিবেশীর বাসা লুণ্ঠন করেছেন। যুদ্ধ মানুষের ভেতরের পশুটার লাগাম খুলে ফেলে এবং তাদের পশুতে পরিণত করে, সুতরাং যারা ছয় দফার ভিত্তিতে স্বাধীকারের রাজনৈতিক সংগ্রাম করছিলো তাদের কেউ কেউ এবং তাদের কোনো কোনো নেতা কর্মীও একই রকম ভাবে লুণ্ঠনে জড়িয়ে পড়েছিলো।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক সহযোগিতা করেছিলো ৭০ এর নির্বাচনে পরাজিত রাজনৈতিক দলগূলোর সদস্যরা। তারাও একই রকম ভাবে লুণ্ঠনে লিপ্ত হয়েছিলো, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অনুকরণে তাদের অনুসরণ করে তারাও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যদের মতো হিন্দু নিধনে অংশগ্রহন করেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করতে উদ্যোগী হয়ে উঠেন, তারাই মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অভিযোগে যেকোনো সময়ে যেকোনো নিরীহ মানুষের উপরে অত্যাচার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ইতিহাস দখল আর কৃতিত্ব ছিনতাইয়ের লড়াইটা প্রকট হয়ে উঠে, স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন সময়ে তাজউদ্দীন বিরোধী দলের প্রধানতম অভিযোগ ছিলো এই সরকার ক্রমাগত কম্যুনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী মানুষের কব্জায় চলে যাচ্ছে। বামপন্থী এই ভাবধারাকে ঠেকাতেই ডানপন্থী রাজনৈতিকদের একটা দল তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করে। ভারতের উদ্যোগে এবং সোভিয়েত রাশিয়ার প্রভাবে যখন সর্বদলীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো তখন ডানপন্থীদের নেতা কিংবা তখনও পর্যন্ত ডানপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী সীমিত যে কয়জন রাজনীতিবিদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রত্যাশা করছিলেন এবং যারা কোলকাতার মার্কিন কনস্যুলারকে ক্রমাগত জানাচ্ছিলেন তাজউদ্দীনের সরোকার ক্রমশ বামঘেষা হয়ে যাচ্ছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত তারা মুজিব প্রত্যাবর্তনের পরে বলিষ্ঠ হতে থাকেন।
একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব ছিনতাই করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা, তারাই নিজেদের বিভিন্ন সাহসিকতার পদকে ভুষিত করেন এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে পাকিস্তান কমিশনড সৈন্য এবং মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের ভেতরে দ্বন্দ্বটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা কিংবা শোষণ ও বঞ্চনামুক্তি সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার পিছু হটতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন না করা বামপন্থী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী বাম রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দেশে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বসে পড়েছিলো, দেশের অনেক অঞ্চলই দুর্গম ছিলো, সে সুযোগেই বেশ কিছু মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়। বামপন্থীদের নিজস্ব সমাজতান্ত্রিকতা চর্চার ক্ষেত্র হয়ে উঠে সেইসব মুক্তাঞ্চল। তারা সেখানে স্থানীয় প্রশাসনও তৈরি করতে সক্ষম হন। তবে রাষ্ট্রের পুলিশবাহিনী এবং আন শৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীদের সাথে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যহত থাকে।
যারা তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক মুক্তাঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন তাদের ভেতরে সাম্যবাদের বানী কতটুকু প্রসারিত হয়েছিলো এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ থাকলেও নিজেদের প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা ঢাকতে অধিকাংশ উপনিবেশপরবর্তী সরকার প্রবল জাতীয়তাবাদী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয় এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিমত উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। তাদের অনুকরণেই তাদের অনুগত বুদ্ধিজীবীগণ জাতীয়তাবাদী শ্লোগানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন এবং এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সাদা কালো ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপটটা তৈরি হতে শুরু করে।





মন্তব্য করুন