মুক্তিযুদ্ধের সাদা কালো ইতিহাস রচনার প্রেক্ষাপট ও পরিণতি শেষ পর্ব
অতিকথনের ও অপ্রয়োজনীয় কথনের ভারে পর্যুদস্ত পূর্বের লেখাটার প্রয়োজনীয়তা হয়তো ছিলো না, আমি সরাসরিই মুক্তিযুদ্ধের সাদাকালো ইতিহাস রচনার পরিণতিতে আলোচনা শুরু করতে পারতাম। কিন্তু সে সময়ের বিশাল রাজনৈতিক জটিলতার সামান্য অংশও তাতে উঠে আসতো না। আমি যে খুব বেশী অভিজ্ঞ এ বিষয়ে এমন দাবী করাটাও অন্যায় হবে, কিন্তু যখন লেখাটা শুরু করেছিলাম তখন আমার আলোচনার আমার নিজের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণের উপরে ভিত্তি করেই আলোচনাটার বিস্তার করবো এমন ধারণা আমার ছিলো। প্রেক্ষাপটটা নির্দিষ্ট ছিলো কিন্তু অতিসাধারণ অনুভুতি কিংবা অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রান্তিকীকরণের বিষয়টি তাতে পরিস্কার বলা যেতো না। মুক্তিযুদ্ধের লড়াইটা মূলত ছিলো অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে ধনভিত্তিক সমতার লড়াই যা একই সাথে মানুষের আত্মমর্যাদা এবং অস্তিত্বের স্বীকৃতির লড়াইও ছিলো। "মুক্তিযুদ্ধ ছিলো শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মরিয়া লড়াই" এই বাক্যটা তাতে পরিপূর্ণ মাহত্ব্য পেতো না। প্রতিটা শ্রেণীর মানুশের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের আলাদা আলাদা প্রত্যাশা এবং সে লক্ষ্যে তাদের জীবন সমর্পনের বাস্তবতা বুঝতে হলে অন্তত মুক্তিযুদ্ধের সামাজিক প্রেক্ষাপটটা বিশ্লেষণ করা জরুরী ছিলো। সেটা সম্ভব হয় নি, কিংবা বাংলাদেশে আতিউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলোচনা এবং নিজের উপলব্ধির প্রেক্ষিতে সে সামাজিক প্রেক্ষাপট নির্মাণের প্রচেষ্টা করলেও সেটা নিয়ে বাড়তি কোনো কাজ হয় নি।
আমাদের ইতিহাস প্রকল্পগুলো প্রবলভাবেই জাতীয়তাবাদী, সংশয় কিংবা আপত্তিকর অংশগুলো মুছে দেওয়ার তীব্র তাগিদ আছে এইসব জাতীয়তাবাদী প্রকল্পে, মুক্তযুদ্ধ শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের প্রবল প্রতিরোধ এটা অস্বীকার করবার একটা লুকানো প্রচেষ্টা আছে সেখানে। এভাবেই প্রশাসন পরিচালনায় অদক্ষ সরকার জাতীয়তাবাদের মাদকে নিজের জনগণের অপ্রাপ্তিগুলোকে লুকিয়ে রাখে কিংবা জনগণকে নিজের অপ্রাপ্তি ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে উদ্বুদ্ধ করে। সে কারণেই শোষণ ও বঞ্চনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও ৯০ পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটেও বঞ্চনা এবং অসমতার বিরুদ্ধে তেমন প্রবল সামাজিক বিদ্রোহ সম্ভব হয় নি বাংলাদেশে।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক আন্দোলন এবং এনজিওভিত্তিক উন্নয়নের বিভিন্ন মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছিলো বাংলাদেশে। আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেদের উত্থান সম্ভবপর করতে হলে প্রয়োজনে সীমিত দারিদ্র ও দুর্দশা মেনে নিয়েই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে হবে, নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে হলেও, একেবারে বিরূপ পরিস্থিতির সাথে লড়াই করেই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করতে হবে। সীমিত দুর্ভোগ শেষে সমতার আলোকিত সরণী হাত ছানি দিয়ে ডাকছে সবাইকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে, সেটা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণার এক সপ্তাহ আগেই সেটা বিবেচনা করতে ভুট্টোর কাছে পাঠানো হয়, পাঠানো হয় চীনের রাষ্ট্রপতির কাছেও। তাদের অনুমোদনের প্রয়োজন না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বীকৃতির সম্মতি দিয়ে চীন কিংবা পাকিস্তানকে চটাতে চায় নি। উপমহাদেশে নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থে তারা ভারতের সীমান্তবর্তী দুটো দেশের কাউকেই চটাতে আগ্রহী ছিলো না।
কিন্তু তারা এর ভেতরেই বেসামরিক পর্যায়ে সহায়তা প্রদান অব্যহত রেখেছিলো। শেখ মুজিব প্রত্যাবর্তনের পর পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের স্বীকৃতির দেন দরবার শুরু করেন। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ মার্কিন সহযোগিতার স্পষ্ট বিপক্ষে থাকলেও তাকে মেনে নিতে হয় ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সহযোগিতার প্রস্তাব। তাকে মার্কিন সহযোগিতার প্রস্তাবেও সমতিজ্ঞাপন করতে হয়। এদেশের প্রশাসণিক ক্ষেত্র থেকে সাম্যবাদী চেতনা অপসারণের উদ্যোগটা পরবর্তীতে প্রকাশ্য হয়ে উঠে।
মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলো দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষ, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগীদের অত্যাচারের নখর লেগেছিলো সবার গায়েই, মুজিবনগর সরকার ৬ই ডিসেম্বরের মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানের সহযোগীদের বিচারের বিষয়ে প্রশাসণিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করলেও স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগীদের বিচারের দাবিতে শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে প্রথম অনশন অনুষ্ঠিত হয়, এ অনশনে অংশগ্রহন করেন বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যগণ।
বুদ্ধিজীবীগন সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোতে উপরের সারির মানুষজন। তাদের সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণী মহলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক যোগাযোগ বিদ্যমান। যারা পরবর্তীতে ইতিহাস রচনা করেছেন তাদের অনেকের সাথেই এদের বক্তিগত যোগাযোগ ছিলো। এইসব বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ কিংবা নির্বাচিত হত্যা আমাদের স্বাধীন দেশের জন্য বেশ বড় একটা আঘাত হলেও ক্রমশ এদের আত্মত্যাগ কিংবা এদের স্মরণের উৎসব অন্যসব প্রান্তিক মানুষদের আত্মবলীদানকে ম্রিয়মান করে ফেলে। আমাদের বুদ্ধিজীবী হত্যা উপলক্ষে একটি বিশেষ দিবসের উপস্থিতি থাকলেও ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যুকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আলাদা কোনো রাষ্ট্রীয় শোক দিবস নেই। আমাদের দৈনিক পত্রকাগুলো গত ৪০ বছর ধরেই ১৪ই ডিসেম্বর বিভিন্ন ক্রোড়পত্র প্রকাশ, এইসব বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার চেয়ে মানববন্ধন, শোকর্যালী করলেও অন্য সকল হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে তাদের পত্রিকায় তারা সামান্য অংশই বরাদ্দ থাকে।
নিহত বুদ্ধিজীবী সামাজিক এলিটগণ মুক্তিযুদ্ধে নিহত সকল শহীদদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন এই দীর্ঘ অভ্যাসে। তাদের কারণে হয়তো অন্য সব নিহত এবং অত্যাচারিত ব্যক্তিদের ইতিহাসও প্রান্তিক হয়ে উঠেছে দিন দিন। তাদের পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণে কিংবা স্মৃতিচর্বনে আমরা অন্য সকল নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্দশা জানতে পারি না। প্রতিবছর মার্চ মাসে আর ডিসেম্বরে অন্য সকল প্রান্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্দশা সংবাদপত্রের ভেতরের পাতায় এক কলামতিন ইঞ্চিতে জানানো হয়।
একই ভাবে প্রকৃত যোদ্ধারা নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের নায়ক হয়ে উঠেন সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ। তাদের ঘিরেই চলে পিঠ চাপরানির উৎসব। তারা তাদের সীমিত লোকবল নিয়েও প্রায় ২ লক্ষ সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং আদর্শের প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠা ব্যক্তিদের কৃতিত্ব ছিনতাই করে নিয়ে যান। তাদের কারো কারো নাম এখনও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় উঠে আসে নি। সরকার মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় গঠন করে, পাকিস্তানী ব্যবসায়ীদের ফেলে যাওয়া সকল সম্পদ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের অধিভুক্ত করেও এইসব মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্দশা এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থা লাঘব করতে পারেন নি।
সামাজিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষেরা সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস আত্মস্যাৎ করে তাদের জাতীয়তাবাদী সবক শিখিয়েছেন, নিজের জীবনের চেয়ে দেশ বড়, দেশের প্রয়োজন সবার আগেই, আমার পাতে ভাত থাকুক আর নাই থাকুক দেশের অধিকাংশ মানুষের পাতে যেনো ভাতের সুবাস থাকে এই আদর্শে বিশ্বাসী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা কৃচ্ছতার জীবন মেনে নিয়েছেন।
প্রান্তিক হয়ে উঠা মুক্তিযোদ্ধারা এভাবেই ইতিহাসের পাতার ফুটনোটে নিজের উপস্থিতি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তাদের নাম কিংবা নামবিহীন উপস্থিতি বিগশট মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে। সেখানে মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে ১০ পাতা বরাদ্দ থাকে, জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার বিতর্কে বরাদ্দ থাকে ৫০ পাতা আর এক কোম্পানী সৈন নিয়ে যুদ্ধে যাওয়া সেনাপতির স্মৃতিচারণে থাকে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম, যাদের স্মৃতি এবং আত্মত্যাগ এইসব বিগশটদের স্মৃতিতে আঁচর কেটেছে।
সুতরাং আমাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাগণ এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাস থেকে পেছনে সরে যান, তাদের অবদান আবছা হয়ে আসে।
অন্য দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আগ্রাসনকে নৈতিক ভাবে সমর্থন জানানো মানুষদের ভেতরে বাঙ্গালী যেসব ব্যবসায়ী ছিলেন, গ্রামের মোড়ল আর জোতদার যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সাদরে বরণ করেছেন, সেবা শ্রুষুষা করেছেন, এবং প্রাণভয়ে দেশত্যাগকারী হিন্দু প্রতিবেশীদের সম্পত্তি জবর দখল করেছেন এবং এখনও যারা এভাবেই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুত্বের চাপ প্রদান করে তাদের সম্পত্তি জবর দখল করছেন তাদের এই ভুমিকা তেমন আলোচিত হয় না ইতিহাসে। এটা একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা পরিত্যাক্ত সম্পত্তি দখল করেছিলো গ্রামের সুবিধালোভী কতিপয় এলিট, তাদের কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন, কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, অর্থনৈতিক লোভের প্রশ্নে তাদের সমঝোতামূলক মানসিকতা তাদের দেশপ্রেমকে আচ্ছন্ন করেছে। তাদের কাছে দেশ ও প্রতিবেশীর তুলনায় বড় হয়ে উঠেছিলো নিজেদের সম্পদলিপ্সা। এইসব ঘৃনিত ব্যক্তিদের কথা ইতিহাসে উঠে আসে নি, কিংবা যারা স্বাধীনতা বিরোধি ছিলো কিংবা যারা এখনও শোষন ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ গঠনের প্রধানতম বাধা তাদের শ্রেণীচরিত্র বিশ্লেষণ করে তেমন বড় মাপের লেখা প্রায় অনুপস্থিত, অন্তত আমার চোখে পড়ে নি।
সামাজিক এলিটগণই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন, গ্রামীন সমাজ কাঠামোতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারাই, তাদের রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সে কারণে তারাও এইসব অর্থগৃন্ধু মানুষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহনে তাদের স্পষ্ট অনীহা বিদ্যমান। তারা পারিবারিক সুত্রে, বৈবাহিক সূত্রে রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী মানুষদের স্বজন হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে পরস্বলুণ্ঠনের অভিযোগ থাকলেও সেসব প্রতিকারে কোনো বিচার অনুষ্ঠিত হয় নি।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তাঞ্চল নয় কিন্তু স্থানীয় জনগণ সরকারী কমকর্তার উৎসাহে কিংবা নিজের উদ্দীপনায় যেসব সমবায় মডেল তৈরি করেছিলেন সেখানে গ্রামের কিংবা ইউনিয়নের সবারই অংশগ্রহনের সুবিধা ছিলো, তবে ভুমিহীন মানুষদের ভেতরে ক্ষমতা গ্রহনের সংকোচ সব সময়ই ছিলো, সে কারণেই সমিতির প্রধানের পদ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও কোনো ভুমিহীন নিজউদ্যোগে কখনই নেতৃত্ব দাবী করেন নি, গ্রামের সামাজিক কাঠামোর বিন্যাসের মতো সামাজিক ক্ষমতার পদটি অবিতর্কিত ভাবেই জোতদার কিংবা এলিটের প্রাপ্য ছিলো।
সেসব প্রতিষ্ঠানের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো সীমিত ভাবে সফল হলেও অধিকাংশ সফল মডেলই ব্যর্থ হয়েছিলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে। সমাজতান্ত্রিক বঞ্চনামুক্ত মুজিববাদী রাষ্ট্র গঠনের সময়ে এইসব উন্নয়ন মডেলের ক্ষমতা হাতবদল হয় এবং ধীরে ধীরে সেসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। কখনও পরিকল্পনার অদক্ষতায়, কখনও পরিচালনার অদক্ষতায়, কখনও সেই অপমৃত্যুর কারণ ছিলো অর্থনৈতিক সহযোগিতার অভাব কখনও সেটা ছিলো ঐক্যের অভাব।
জাতীয়তাবাদের ঘোড়া তীব্র দাপটে ছুটে গেলেও এইসব প্রান্তিক মানুষ যাদের অধিকাংশই রাজধানীর গল্প শুনেছে কখনও রাজধানীর মানুষ দেখে নি, তাদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন আসে নি। রাষ্ট্র দরিদ্রদের উদরপূর্তির উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলেও তাদের দেশপ্রেম গিলিয়ে তাদের মাথাভর্তি করবার উদ্যোগ নিতে পিছ পা হয় নি। সামাজিক এলিটগণের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অবস্থান মুছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা কিন্তু তারা এ পদক্ষেপ গ্রহনে ব্যর্থ হয়েছেন কিংবা এ ব্যবস্থাকেই মেনে নিয়েছেন এবং বলিষ্ঠ করেছেন। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো টিকিয়ে রাখতে যেমন এদের সহযোগিতা প্রয়োজন, তেমন ভাবেই অনির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা কাঠামো টিকিয়ে রাখতেও এদের প্রত্যক্ষ সমর্থন প্রয়োজন ছিলো তাদের।
মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো , এখানে স্পষ্ট একটা শত্রু চিহ্নিত ছিলো, পাকিস্তান সেনাবাহিনী, হানাদার হার্মাদ বাহিনী ছিলো, কিন্তু তাদের সাথে সহযোগিতা করেছিলো এ দেশের কতিপয় মানুষ, তাদের একাংশ সামাজিক এলিট কিন্তু এদের জাতীয়তাবাদের স্বার্থে ভিলেন চিহ্নিত করা যাবে না, সুতরাং রাজাকার বাহিনী হয়ে উঠলো প্রধানতম প্রতিপক্ষ। তুই রাজাকার শ্লোগানটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শ্লোগানে পরিণত হয়েছে এতদিনে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গঠনের প্রেরণা, রাষ্ট্র নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধর্মের ব্যবহার করবে না কিন্তু ধর্মপালনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও করবে না। কিন্তু ধর্মের আফিম সাম্যবাদী সমাজের বিরুদ্ধবাদীতার অন্যতম অনুসঙ্গ, সুতরাং রাষ্ট্রের সুন্নতে খাতনা প্রয়োজন, প্রকাশ্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে গ্রামের ওয়াজে প্রচার হলো আওয়ামি লীগ সরকার ইসলামবিরোধী সরকার, এ সরকার হাজার হাজার মাওলানা আর আলেমকে হত্যা করেছে, এমন অসন্তোষ দানা বেধেছে এবং আওয়ামী লীগের ডানপন্থী অংশ নিজেদের ধর্মীয় আনতি স্পষ্ট করে তুলেছে। বামধারার নেতাদের নির্বাসনে গিয়েছেন, শেখ মুজিবকে শাসনতান্ত্রিক সংশোধন, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে অনুরোধ করায় তাদের বক্তব্যের গ্রহনযোগ্যতা কমেছে।
বুদ্ধিজীবী হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকা আল বদর এবং তারই প্রেক্ষিতে জামায়তে ইস্লামী এবং রাজাকার বাহিনী আমাদের স্বাধীনতার প্রধানতম বিরোধী শক্তি হয়ে উঠলো। আমার নিজের মাঝে মাঝে মনে হয় এই বন্দোবস্ত এলিটিস্ট, মানে একদল এলিটকে ক্ষমতাকাঠামোতে টিকিয়ে রাখতে আরেকদল এলিটকে হত্যার সহযোগিতা এবং হত্যা করবার অভিযোগে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকেই একমাত্র স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করবার প্রক্রিয়াটি এলিটিস্ট প্রক্রিয়া।
আমাদের স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী মানুষের কমতি নেই, যারাই সকল মানুষের সমানাধিকার, শোষন ও বঞ্চনাবিহীন এবং অর্থনৈতিক সমতার ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রকাঠামোকে সমর্থন করেন না মোটা দাগে তারা সবাই স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী। যারা এমন অসাম্য টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর, বিভিন্ন টটকা দিয়ে যারা কোনো মতে অসাম্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিকে সামান্য পরিবর্তন করে ধনী ও গরীবের বাড়তে থাকা ব্যবধানটিকে আরও বৃদ্ধি পেতে দিতে আগ্রহী তারা সবাই স্বাধীনতাবিরোধী, এরাও পক্ষান্তরে নির্যাতনপ্রবন এবং আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রহরী এবং তহশিলদার। তাদের এই অসাম্য টিকিয়ের রাখতেই আরও বেশী জাতীয়তাবাদী শ্লোগান প্রয়োজন হয়।
আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী গ্রামীন এলিটদের স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী অবস্থান এবং তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করতে চেয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যে স্বাধীনতা ইতিহাস চর্চিত হয় সেখানের স্বাধীনতার প্রকৃত শত্রুদের চেহারা ম্রিয়মান হতে থাকে, অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং সামাজিক ক্ষমতার লড়াই ভুলে গিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের চোয়ালে দাড়ি জন্মায়, আমাদের সাদাকালো ইতিহাসের পাতায় জামায়াতে ইসলামীই একমাত্র স্বাধীনতাবিরোধী চক্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
আমরা অন্তর্জালে তারই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছি হয়তো। আমাদের সাদাকালো ইতিহাস রচনা প্রকল্প আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অনিয়মকে প্রতিশোধস্পৃহা হিসেবে দেখে সেসবকে অস্বীকার করতে চায়, আমাদের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস প্রকল্প এভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের মানসিকতায় ঋদ্ধ হয়, তারা নিজেদের কৃত অপরাধ স্বীকার করতে অনাগ্রহী, একাত্তরের কিছু বিচ্ছিন্ন মৃত্যুর ঘটনায় তারা শোক প্রকাশের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিতে অনাগ্রহী, তাদের মতো আমরাও একই রকম ভাবেই নিজের হীনতা লুকাতে বদ্ধপরিকর। আমরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে অনাগ্রহী হয়েও অন্যদের অপরাধের স্বীকারোক্তি চাই জোর গলায়, কেনো আমার তা জানা নেই।





জামাতীরা তাহলে প্রকৃত শত্রু নয়?
আমি এই প্রশ্নের আশংকাই করতেছিলাম। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জামায়াত আমার বিবেচনায় মূল শত্রু না, যদি এখনও ধনী গরীব আয়বৈষম্য নিরসন, শোষণ এবং বঞ্চনামুক্ত সমাজ গঠনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং যদি সেটা আগামী ৫ বছরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে তবে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কিংবা ইসলামি শাসনতন্ত্রজাতীয় বাখোয়াজীর অস্তিত্ব থাকবে না।
গত ৪ দশকে আয়বৈষম্য রোধে তেমন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয় নি, আমাদের রাষ্ট্র যেহেতু মৌলিক এই নীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে সুতরাং সেখানে বঞ্চনাবোধ এবং অনিশ্চয়তাকে পূঁজি করে এমন রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার ও প্রসার সম্ভব হয়েছে।
এটা দুঃখজনক যে শেখ মুজিব নিহত হয়েছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, তবে তিনি যেভাবে আগাচ্ছিলেন তাতে তিনি বেচে থাকলে ইনশাল্লাহ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির শেকলটা খুলে দিতেন, বাকশাল ব্যর্থ হলে তসবি হাতে আল্লা বিল্লা করার বাইরে তার হাতে ভিন্ন কোনো সুযোগ ছিলো না, বাকশালের সাফল্যের ক্ষেত্রে আমার আশাবাদ এখনও শূণ্যের কোঠায়, যদিও সেটায় অনেক গাল ভরা প্রতিশ্রুতি ছিলো, কিন্তু সেটা ইমপ্লিমেন্ট করবার মতো সচেতন এবং নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক কর্মী কিংবা নেতা আওয়ামী লীগে ছিলো না এবং এখনও নেই,
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াত কি স্বাধীনতার শত্রু ছিলো? সেটার উত্তর হবে হ্যা, কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরাই এদের উত্থানের সুযোগ তৈরি করেছি এবং এদের পৃষ্ঠপোষকতাও করছি আমরা, বৃহতার্থে আমাদের ভূল অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রনৈতিক নীতি জামায়াত কিংবা ইসলামপন্থী দলগুলোর উত্থান সম্ভবপর করেছে।
আর সাম্যবাদী হয়ে উঠবার পেছনে প্রধানতম বাধা ছিলো আওয়ামী লীগের ডানপন্থী অংশটা যারা তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব মেনে নিতে অনাগ্রহী ছিলেন, তাদের ডানপন্থা, তাদের একটু ইসলামপসন্দ হয়ে উঠা কিংবা তাদের ইসলামের দিকে ঝুকে থাকার ইতিহাস নিয়ে যদি আমার কোনো উপসংহারে আসতে হয় তাহলে আমি বলবো বাংলাদেশী মুসলীম জাতীয়তাবাদের শেকড় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই আমাদের ভেতরে গেড়ে বসে আছে।
নিজের ঘরের ভেতরের শত্রু খুজে না পেয়ে অযথা রাস্তায় গিয়ে দাড়ি টুপির ভেতরে গ্রেনেড খুজাটা হাস্যকর।
মূল বা প্রকৃত তো এক হলো না। আবার শত্রু শত্রুই, তার আবার প্রকারভেদ কী? কেউ বেশি কামরায় আর কেউ কম?
আয় বৈষম্য বা উন্নয়ন নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা তাত্ব্কি আলোচনা করা যায়। কিন্তু যারা বাংলাদেশ মানলোই না, তাদের ছোট শত্রু ভাবার মতো নিস্পৃহতা আমার নেই।
বাকশাল নিয়ে আমারও কোনো সন্দেহ নেই। আর বাকশাল জিনিষটা কী সেটাই তো পরিস্কার না। সেসময় বাকশালের মূল নীতি নিয়ে কোনো লিখিত কিছু ছিল না। বঙ্গবন্ধুর কিছু অলিখিত বক্তৃতা ছাড়া এ নিয়ে আর কিছু তো নেই।
বাংলাদেশ মানলো না বিষয়টা কখন আসলো? বাংলাদেশে জামায়াত কি নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড কোনো রাজনৈতিক দল নয়? একটা দেশের অস্তিত্ব না মেনেই তারা এখানে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে আর সরকার তাদের রাজনীতির সুবিধা দিচ্ছে, যদি তাই হয় তাহলে সরকার একটা আব্দুল আবাল।
১৯৭১ এ জামায়াত বাংলাদেশের অস্তিত্ব মানে নাই এইটা সত্য কথা ,
সেইটাতো একটা পর্যায় পর্যন্ত গ্রামীণ পাওয়ার এলিটরাও মানে নাই,
সরকার কিংবা প্রশাসন তাদের দরজায় গিয়া তাদের সম্মতি চাইয়া আনছে, রাজনৈতিক দল এই কাজ করছে সেইটা আপত্তিকর কিছু হয় নাই, কিন্তু জামায়াতের অপরাধটা বড় হইয়া উঠছে কোন কারণে?
গ্রামীণ পাওয়ার এলিটদের স্থানীয় ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা সম্মান করে, তাদের জোতদারি ক্ষমতা কিংবা স্থানীয় জনগণের উপর তাদের প্রভাব বিবেচনা করে এই সম্পূর্ণ বিষয়টাকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা বিষয়টা কি অনৈতিক পদক্ষেপ ছিলো না আপনের মতে?
ধরেন জামায়াতে ৩০হাজার কর্মী কিংবা রাজাকার বাহিনীর সম্পূর্ণটা গণনায় আনলে হয়তো ৫০ হাজার আর ধরেন একই সাথে এই রকম ১০ হাজার পাওয়ার এলিট যারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাইরে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ভাবতে পারে নাই, এখন আমি পাওয়ার এলিটদের অস্তিত্ব ভুলে যাচ্ছি কেনো?
আমি কাউকেই ভুলছি না। কিন্তু পাওয়ার এলিটদের কথা বলতে গিয়ে আমি জামাতিদের অপরাধ কম করার পক্ষপাতি নই।
আপনি তাহলে বলছেন যে, জামাতিরা একনও বাঙলাদেশ মানে?
কেউই জামাতিদের অপরাধ কম করবার পক্ষপাতি না, কথা হইলো শুধুমাত্র একক ভাবেই জামাতকেই অভিযুক্ত করবার সংস্কৃতিটাকে আমি নিন্দনীয় বলছি।
জামায়াতই একমাত্র দোষী এবং রাষ্ট্রবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী এ অবস্থান নেওয়াটা বোকামি, কিন্তু অবস্থা এমনই যে আমাদের একপাক্ষিক সাদাকালো ইতিহাস রচনা প্রকল্পে বিষয়টা সে ধারাই অগ্রসর হচ্ছে
পড়লাম
মন্তব্য করুন