আমাদের বিজ্ঞাপনগুলো
বিপণনের একটা বড় অংশ ভোক্তার আস্থা নির্মাণ, কোম্পানী গুডউইল, ব্রান্ড কিংবা নির্ভরতা নির্মাণে সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন নির্মাতা সংস্থা, তবে বিপণন ব্যবস্থার প্রধান নির্বাহী এবং তার অধস্তন কর্মকর্তারা ভোক্তা মানসিকতা যাচাই করেন প্রতিনিয়ত, ভোক্তার চাহিদা এবং ভোক্তার অনাস্থার জায়গাগুলো যথাযথ চিহ্নিত করে তারা নিজেদের বিজ্ঞাপনে প্রতিদন্ডীদের অনাস্থার জায়গা চিহ্নিত করে নিজেদের পণ্যের মাহত্ম্য তুলে ধরেন এবং এভাবেই বিজ্ঞাপন আমাদের চারপাশে একটা কল্পজগত নির্মাণ করতে সমর্থ হয়।
গৌরীকে গৌরী প্রদান:
গৌরবর্ণ নারী আর শ্যামবর্ন পুরুষ আদর্শ জুটি এমন একটা বিশ্বাস আমাদের সামাজিক মন:স্তত্ত্বে কিভাবে প্রবিষ্ট হয়েছে তা নির্ধারণ করতে হয়তো কোনো সমাজ বিজ্ঞানীর একমুহূর্ত সময় লাগবে না কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের ভেতরে এই ধারণা বেশ ভালোভাবেই আছে।
পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নারী ও পুরুষের কাঙ্খিত পুরুষ এবং কাঙ্খিত নারীর বিভিন্ন উপাদানের বর্ননায় গায়ের রং, উচ্চতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, মানসিকতা এবং অন্যান্য মানবীয় গুণাবলীর বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সেসব আলাদা আলাদা করে কেউ জমিয়ে রেখেছে তবে আমার দুর্বল স্মৃতিতে তার কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। মেয়েরা ছেলেদের সেন্স অফ হিউমার পছন্দ করে কিন্তু সেন্স ওফ হিউমারের মাত্রাটা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত, বন্ধুকে ভাঁড় হিসেবে দেখলেও স্বামীকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং আত্মমর্যাদাপূর্ণ মানুষ হিসেবে চায় মেয়েরা, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েরা কোন এক সময় পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলো। সারাক্ষণ হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারা ছেলেদের অগভীর মনে হয় তাদের কাছে। তাদের প্রতি মেয়েদের অনাস্থা জন্মায়, সুতরাং কৌতুক বুঝে হাসতে পারা মানুষ এবং কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারা মানুষদের ভেতরে যারা কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তাদের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে গররাজী মেয়েরা।
ছেলেদের অধিকাংশই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়েদের জীবনসঙ্গী হিসেবে চাইলেও তাদের অনেকের গৌরীআসক্তি রয়েছে, তারা উজ্জ্বল বর্ণের মেয়েদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চায়। জীবনসঙ্গী ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবেন না কি গৃহকর্মে মনোনিবেশ করবেন এটা নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়ও মনে করেছেন ছেলেরা।
মেয়েদের লম্বা, শ্যামলা ছেলেদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ আর ছেলেদের উজ্জল গাত্র বর্ণের মেয়েদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ এটা একমাত্র বাস্তবতা নয়, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণের সাথে মেয়েদের ব্যক্তিত্ব ও নিজেকে উপস্থাপন করার কৌশলও ছেলেদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছিলো কিন্তু উপমহাদেশে যখন ফেয়ার এন্ড লাভলীর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতে শুরু করলো তখন উজ্জ্বল গাত্রবর্ণের মেয়েদের প্রতি ছেলেদের বাড়তি কামনাটুকুই উঠে আসলো বিজ্ঞাপনে।
মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, ফেয়ার এন্ড লাভলীর ১০টা টিউব কিনে বাসায় নিয়ে যাও, ৪ থেকে ৮ সপ্তাহে নজরকাড়া সৈন্দর্য্যে পুরুষের চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। এমন অশালীন বিজ্ঞাপণ নিয়ে কোনো বক্তব্য কিংবা প্রতিবাদ আসে নি নজরে , ধীরে ধীরে জেন্ডার ইক্যুয়ালিটির সবক পাঠ করেছে বাংলাদেশ, নারীকে বিয়ের পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে একটা ইন্টেলেকচ্যুয়াল বাধা তৈরি হয়েছে সম্ভবত, সুতরাং এখন ফেয়ার এন্ড লাভলীর বিজ্ঞাপণে নারীর সাফল্যের সংবাদ, নারীর দিন বদলের সংবেদ দিয়ে যায়, সেখানেও অশালীন ভাবে সৈন্দর্য্য বিশেষত নারীর উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ তার সাফল্যের চাবিকাঠি এটাই তুলে ধরা হচ্ছে, নারীর অন্যতম যোগ্যতা তার গায়ের চামড়ার রঙ বিষয়টার ভেতরে যে পরিমাণ বর্ণবাদী মানসিকতা প্রকট সেটা আমরা প্রতিনিয়ত হজম করছি, মেয়েদের সপ্রতিভতা, ছেলেদের সপ্রতিভতা সবই চামড়ার রঙে আটকে পড়ে আছে, সুদর্শন, সুদর্শনা, সুবেশী সবই চামড়ার রঙে। তোমরার চামড়ার রঙ উজ্জ্বল তুমি সফল, এভাবে এ দেশের আদিবাসী দ্রাবিড়দের সাফল্যের কক্ষপথ থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো অসভ্যতা করছেন আমাদের নামী দামী বিজ্ঞাপন নির্মাতাগণ, তারা আবার সভামঞ্চে গিয়ে নারী অধিকারের সবক শেখান, বলেন নারী নির্যাতন বিরোধী কথামালা, তারাই বলেন নারীর ব্যক্তিত্ব বিকশিত হতে দাও, তাদের সামর্থ্যের উপরে আস্থা রাখো এবং দুপুরে আর সন্ধ্যায় অফিস আরো কয়েক ডজন কর্মচারী নিয়ে বিজ্ঞাপণের নকশা আঁকেন, কিভাবে গায়ের রঙ আর সাফল্যের মিশেল দিতে হবে।
প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপনে মানুষের আস্থা নির্মাণ করছেন তারা। আস্থার মূল্য অনেক বেশী। ম্যাগী স্যুপ, ম্যাগী নুডলস, হরলিকস, ওভালটিন কিডস, স্বাস্থ্যবান সুস্থ সমর্থ ছেলেমেয়েরা ভিটামিন ডি খেয়ে স্যূর্য্যের বুকে ঝাপিয়ে পড়বে। অথচ এইসব বিজ্ঞাপণের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠে নি, উপমহাদেশে যেকোনো ভাবেই মানুষকে বিজ্ঞানের কথা বলে ঠকানো যায়, কিন্তু একই পণ্যের বিজ্ঞাপন যখন ব্রিটেনে প্রচারিত হলো তখন মিথ্যা তথ্য প্রচারের দায়ে নেসলেকে জরিমাণা করা হলো কয়েকলক্ষ পাউন্ড। নেসলে নাকে খত দিয়ে জানালো আসলে এই পণ্যের বাজার উপমহাদেশ, ব্রিটেনের পণ্যে তারা এইসব জিনিষ মেশায় না।
আমরা চাষাভুষো আবাদীর জাত, আমাদের কালোকুচ্ছিত শরীরে পুষ্টির জোগান দিবে নেসলের ম্যাগী স্যুপ, ম্যাগী নুডলস খেয়ে দু মিনিটে বাচ্চা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে ধাইধাই করে, ঠিকমতো খাওয়া হলো না সমস্যা নেই, হরলিকস গিলিয়ে দিলেই হবে, শরীরে যেসব পুষ্টি ঢুকলো না সেসব ঢুকে পরবে সুরসুর করে।
টিভিতে অষ্টপ্রহর বিজ্ঞাপন দেখছে বাচ্চা,বাচ্চার বাপ মা, সুন্দর সুন্দর স্বাস্থ্যবান বাচ্চারা খেলছে, লাফাচ্ছে, তাদের সুবেশী সুদর্শনা মায়েরা হাতে পণ্যের মোড়ক নিয়ে বলছে এটা খেয়েই আমার ছেলের এই অবস্থা, খোঁজ নিলে দেখা যাবে এইসব বিজ্ঞাপণের বাবা আর মা এখনও অবিবাহিত ,নিঃসন্তান, অন্য কোনো প্রদর্শনঅযোগ্য নারীপুরুষের স্বাস্থ্যবান বাচ্চাকে অডিশন দিয়ে বাছাই করে এর তার ছেলে বলে চালিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু আস্থাটা জন্মাচ্ছে ঠিকই, বাংলাদেশে নয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই নেসলের কয়েক হাজার পণ্য বিক্রী হয়, নেসলে মান নিয়ন্ত্রনে কারচুপি করছে এমন নাও হতে পারে, বাংলাদেশে নেসলের যেসব প্রডাক্ট বিক্রী হয় সেসব প্যাকেট করা হয় এখানেই, সেসব কারখানা স্বাস্থ্যসম্মত না কি নোংরা সেসব নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় না। তবে কনটেইনার ভর্তি গুড়া দুধ নিয়ে আসবার সময় তলানীর নোংরা দুধগুলোও কোনো না কোনো কৌটায় ঢুকে বাজারে যায়, সেসব দুধ খেয়ে হয়তো কোনো না কোনো বাচ্চা অসুস্থ হয়, হাজারে, লাখে, একজন অসুস্থ হয় এইসব কারণে কিন্তু আস্থার বদৌলতে তারা কেউই নেসলেকে দোষারোপ করে না।
আমি উদ্বিগ্ন হই, আমার ছেলে বেড়ে উঠছে, বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন রংচং বাহারী জিনিষে তার যে পরিমাণ আগ্রহ তার সিকিভাগও আমাদের নির্ধারিত ডায়েটে নেই, আমরা সেখানেই আপোষ করি, বিশেষত বাংলাদেশ বলেই, এখানে ভোক্তা অধিকার পরিস্থিতি বলতে তেমন কিছু জন্মে নি বলেই আতংকিত হই, প্রতিনিয়ত যেকোন জিনিষ কিনে বাসায় নিয়ে যাওয়ার সময় একতা খচখচানি নিয়ে বাসায় ফিরি। আমি জানি আমার বাচ্চার কি হবে সেটা নিয়ে প্রশাসনের কোনো উদ্বেগ নেই, আমি ছেলের অসুখে রাত জেগে কাটালেও আমাকে পরের দি ঠিকই কামলা দিতে যেতে হবে, আমার ছেলের ডাক্তার খরচ বাড়তে থাকলেও রাষ্ট্র আমাকে দুইটা ফুটা পয়সা দিবে না, সুতরাং আমাকেই নিজের সন্তানের স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।
অন্য অনেক মায়ের সাথেও মাঝে মাঝেই এইসব সাংসারিক আলোচনা হয়, তারাও একি রকম আশংকার ভেতর দিয়ে কাটালেও ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের ভক্তি অটুট, আরে এইটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এরা কি যা তা জিনিষ দিবে। আমিও বলি এটা আসলে প্রোডাক্তের গুন না, প্রোডাক্টের দামের সাথে তারা আমাদের বিশ্বাসের দামও গুণে নিচ্ছে, সে আস্থাটুকু অর্জন করতে ব্যর্থ বলে আমাদের দেশে এমন কোনো পণ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে না। আমাদের নিজেদের দুর্নীতিগ্রস্ততা যে এখানে কর্মরত যেকোনো প্রতিষ্ঠানকেই আক্রান্ত করতে পারে এই বিশ্বাসটুকু তাদের নেই।
এখানেও ঘুরে ফিরে চলে আসে চামড়ার রং্যের প্রসঙ্গ, সাদা চামড়ার মানুষেরা এইসব দুই নাম্বারী করবে না বিশ্বাসটুকু সাদারা অর্জন করেছে তাদের চরিত্রগুণে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম তাদের দীর্ঘ দিনের আইন মান্যতা, এটা তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সরকারের সার্বক্ষণিক তদারকিতে জন্মেছে, বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটে নি কারণ আমাদের নিজস্ব প্রশাসনের প্রতি আমাদের অনাস্থা, স্বাধীনতা আমাদের মানসিক দুর্নীতিগ্রস্ততা, স্বজনপ্রীতি আর রাজনৈতিক আদর্শ বিবেচনায় স্বেচ্ছাচারের সার্টিফিকেট দিয়েছে, সেখানে দায়িত্বশীলতা জন্মে নি, আমাদের ভোক্তা অধিকার আইন, আমাদের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ববোধগুলো কাগজে কলমে থাকলেও সেসব তদারকিতে নিয়োজিত না থেকে আমাদের প্রশাসণিক কর্মচারীরা ্নিজেদের পকেট ভরতে ব্যস্ত থাকেন, আমার কিনে আনা ন্যুডলসের প্যাকেটে শ্যাওলা জন্মালেও ক্ষতি নেই, শ্যাওলা পুষ্টিকর, খেলে হয়তো ছেলে আমার দিনে দুই ইঞ্চি লম্বা হয়ে যেতেও পারে।





আমার ছেলে তো টিভিতে যা দেখায় সবই বিশ্বাস করে। এমনকি কার্টুনে যা যা দেখানো হয় তাও। বিজ্ঞাপনগুলো দেখে দেখে সে যে ফর্সা আর তার বোন কালো এটাও সে বোঝে এবং বলে।
বিজ্ঞাপনের দশা বিশ্ব জুড়েই এই। আমি মাঝে মাঝে ডাচ বিজ্ঞাপন দেখে সেটাকে মনে মনে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ট্র্যান্সলেট করে ভাবি, আমরা আসলে মেধাতে ইউরোপের থেকে পিছে না। এদিকের গুলো বরং আরো গরু। এদিকের টেকনোলোজি, ক্যাম কোয়ালিটি, মেকাপ - গেটাপ হয়তো ভালো কিন্তু বক্তব্য আরোই কমাক্কল। তবে হ্যা, পন্য বেঁচার জন্যে যা করার, যা বলার তাই বলবে এবং করবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠি
এর চাইতে আর কি বলার থাকতে পারে...
নোয়াখালী যাত্রা নিয়ে একটা কালচারাল পোস্ট দিয়েন
মন্তব্য করুন