দাম্পত্য
নারী এবং পুরুষের পারস্পরিক যৌনাকর্ষণের বিষয়ে অনেক বেশী সচেতন ধর্ম। ধর্ম যেহেতু সামাজিক স্থিরতার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক অনুশাসন তৈরি করে সুতরাং ধর্ম যৌনাচার বিধি তৈরি করে দিয়েছে, একই সাথে কিছুটা খোলা জানালাও তৈরি করেছে। ধর্ম নিয়মতান্ত্রিক ভাবে বহুগামীতার ক্ষেত্র তৈরি করেছিলো একটা সময়, উপমহাদেশের পৌরাণিক ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে রামায়ন মহাভারতের কথা বিবেচনা করলে দেখা যাবে সেখানেও এক একজন নৃপতি সাহসী পুরুষের একাধিক প্রনয়ী, স্ত্রী বিদ্যমান, তাদের ভেতরে মেয়েলী ক্ষমতার সংঘাত বিদ্যমান। প্রয়োজনে তারা মিত্রের বাসায় গিয়ে সুন্দরী দাসীর সাথেও শাররীক চাহিদা পুরণ করছে। তেমন যৌনতা বিষয়ক বাধ্যবাধকতা সেখানে নেই।
অতীতের প্রায় সকল ধর্মই বহুগামীতা, বিশেষত পুরুষের বহুগামীতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সে ধর্মই নারীর একনিষ্টতার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। বিয়ে একটা প্রথা মাত্র যে প্রথা নির্ধারণ করে দেয় কোন কোন নারীর প্রতি আসক্তি প্রকাশ করা সামাজিক ভাবে নিষিদ্ধ। সমাজ নির্ধারণ করে দিয়েছে একজন নারী যখন কোনো পুরুষের সম্পত্তিতে পরিণত হবে তখন অন্য সকল পুরুষ সে সামাজিক বন্ধনকে শ্রদ্ধা করবে, তার প্রতি কামনা কিংবা বাসনা প্রকাশ করবে না, সম্পদ হরণ এবং বিবাহিত নারীর সম্ভ্রম হরণ একই ধরণের অপরাধ বিবেচিত হয় সেইসব কৃষিজীবী সমাজে।
সে সমাজ থেকেই অনুশাসন তৈরি হয়েছে, সতীত্বের মহৎবোধ তৈরি হয়েছে, সেইসব প্রায় ৬ শতাব্দী আমাদের মানসিকতায় এক ধরণের নিশ্চিত অবস্থান তৈরি করেছে। অতিথির জন্য তোমার সেরা দ্রব্য এবং তোমার স্ত্রীকে দান করো, বাৎসায়নের এই অভিমত ৬ শত বছর আগেই মৃত, কেউ এখন প্রাণের বন্ধু বাসায় আসলে নিজের স্ত্রীকে তার বিছানায় পাঠাবে না। সম্মান প্রদর্শনের এই রীতি এখন মৃত।
আমাদের বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে পরকীয়াকে অধিকতর সম্মানের সাথে দেখা হয়েছে, পরবর্তী পর্যায়ে সেখানে আদিরসের প্রাবাল্য দেখা গেলেও আমাদের সমাজে পুরুষের বহুগামীতাকে প্রশংসনীয় দৃষ্টিতে প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে।
আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মহানায়কেরা অনেকেই রাঢ় বাড়ী গিয়ে ইয়ারবন্ধুদের নিয়ে ঠাট্টা করেছেন, বন্ধুতে বন্ধুতে রাঢ় নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়েছে, সংঘাত হয়েছে, রাঢ় ভাগানোর শোকে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে।
তারাই আবার ইউরোপিয় সাহিত্যের অনুসরণ করে রোমান্টিক উপন্যাস লিখেছেন, ইউরোপের রোমান্টিক যুগে মনোগ্যামি যে সময়ে প্রচারিত হচ্ছে সে সময়ের পরপরই ইংরেজদের কল্যানে এখানেও মনোগ্যামিকে প্রমোট করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু একেবারে সরাসরি সে পথে যান নি বঙ্কিম, তিনি প্রেমাকূলতা দেখিয়েছেন, কিন্তু একই সাথে পুরুত হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রেমের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন দাম্পত্যকে। প্রেমিকাকে ছেড়ে বিবাহিতা স্ত্রীকে গ্রহন করতে বাধ্য করেছেন নায়ককে।
রবীন্দ্রনাথ একগামীতাকে প্রমোট করেছেন, নৌকাডুবিতে তিনি স্বামী স্ত্রীর ভেতরে প্রণয় তৈরি করেছেন কিন্তু তারপরও তারা উভয়েই পরস্পরের প্রতি টান উপেক্ষা করে না দেখা স্ত্রী এবং না দেখা স্বামীর প্রতি প্রনয়াসক্ত হয়েছে, খুবই অস্বাভাবিক হলেও বরীন্দ্রনাথ বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
শরৎচন্দ্র দেবদাসে নতুন ধরণের একটা সম্পর্কের ধারণা তৈরি করেছেন, বিরহের ধারণা তৈরি করলেন, এখানে সবাই সবাইকে ভালোবাসে কিন্তু কেউ কারো কাছে আসে না, দেব ভালোবাসে যাকে সে অন্য একজনের বিবাহিত স্ত্রী, দেবকে ভালোবাসে একজন বাঈজী, সবাই প্রচন্ড প্রেম প্রকাশ করছে কিন্তু এই আবেগি ও প্রেমের উপস্থাপনের বাইরে এখানে প্রকাশ্য যৌনতার কারসাজি নেই।
মানিক সীমিত পরিসরে যৌনতাকে প্রাধন্য দিয়ে উপন্যাস লিখেছেন কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে যেসব লেখক মূলত আমাদের মানসিক গঠনটি তৈরি করেছেন তারা তাদের চরিত্রগুলোকে কামরহিত এক ধরণের বহ্মচারী সাধু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ কামরহিত প্রেম প্লেটনিক ভালোবাসা বলে ফেনা তুলে তুলে মূলত প্রেম ভালোবাসা এবং শরীরের ভেতরে বিশাল একটা দেয়াল তৈরি করে ফেলেছেন। আমরা এইসব মানুষদের ভাবনা অনুসরণ করে বড় হয়েছি, ফলে আমাদের কাছে সতীত্ব গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের কাছে পতিব্রতা নারী অধিকরত প্রিয়, আমাদের কাছে বিশ্বাস, আস্থা অনেক বেশী গুরুত্ব বহন করে, কিন্তু একটি সামাজিক চুক্তি কি একটি সুস্থ দাম্পত্য জীবনের নিশ্চয়তা দেয়?
দাম্পত্য জীবন মানে একটি সামাজিক চুক্তির দড়ি গলায় বেধি নিজেকে একটা খুটোর চারপাশে ঘুরতে বাধ্য করা নয়, এমন সম্পর্ক অনেকক্ষেত্রেই কোনো পরিণতির দিকে যায় না। প্রতিটি সঙ্গমের যদি আলাদা আলাদা নাম দেওয়া যায় তবে দেখা যাবে অনেক ক্ষেত্রেই দাম্পত্য সঙ্গম করুণানিশ্রিত সঙ্গম, নেহায়েত দাম্পত্য প্রয়োজনীয়তা পুরণের লক্ষ্যে সপ্তাহে মাসে নির্দিষ্ট একটি সময়ে নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য শাররীক ঘনিষ্ঠতা, উচ্ছ্বাস উন্মাদনা নেই, অনাগ্রহী নিতান্ত দায়সারা এইসব শাররিক ঘনিষ্ঠতা বরং আরও বেশী যন্ত্রনাদায়ক।
যারা এই উত্তেজনা কিংবা আনন্দ পাচ্ছেন না তারা এইসব উত্তেজনার জন্য অন্য কারো সাথে সম্পর্কিত হচ্ছেন। সামাজিক বাধ্যবাধকতায় তারা নিজের বিবাহিত সঙ্গীর সাথে কিছু সময়ের জন্য শাররীক ঘনিষ্ঠতা শেষে অন্য কাউকে কামনা করছেন কিংবা সেই ঘনিষ্ঠতার মাঝামাঝি সময়েই অন্য কাউকে কল্পনা করে নিজের প্রত্যাশা পুরণ করছেন। এটাও তো এক ধরণের অসুস্থতা।
এহেন বাধ্যবাধকতার চেয়ে ভালো বিচ্ছেদ, কিন্তু অনেক সময়ই বিভিন্ন সামাজিক কারণে বিচ্ছেদও সম্ভব হয় না। পরস্পরের প্রতি আকর্ষণবিহীন দাম্পত্য সামাজিক চাপে অব্যহত থাকে, এই মানসিক যাতনার ভেতর দিয়ে যাওয়া এবং নিজেকে যৌননিরত রাখার বদলে তারা অন্য সম্পর্কে জড়াচ্ছে, সেই সম্পর্ক সামাজিক কারণে মেনে নিতে অনাগ্রহী সঙ্গী মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছে। যদি পরিস্থিতি এমন হয় তাহলে উভয়েই উভয়ের কাছে পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেকের প্রায়োরিটি এবং ফ্যান্টাসি উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
যাদের প্রেম এবং শাররীক আকর্ষণ অটুট তারা তো অন্য কোনো নারী কিংবা পুরুষের শরণাপন্ন হচ্ছে না, তাদের জন্য বিশ্বাস আস্থা এইসব শব্দ কিংবা সামাজিক চুক্তি অর্থহীন, তারা পরস্পরের প্রতি অনুরক্ততায় নিজেদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত রাখবেন।
সংকট মূলত তাদের নিয়েই যারা পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন না, তাদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক বাধাটা এক ধরণের দেয়াল, তারা একই সাথে অনুতপ্ত এবং উত্তেজিত, অপরাধবোধ এবং পরিতৃপ্তির সাথে লড়াই করছেন। তাদের ঘাড় থেকে জোয়ালটা নামানোর কথা বলছি। সেটা যদি আদিম সমাজে প্রত্যাবর্তন হয় তাহলে তো বিষয়টা বিপদজনক।
একটা সমস্যা হলো কোনো রকম অনুশাসন না থাকলে সবাই বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত হবে, যারা পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত তারা আর বিশ্বস্ত থাকবে না এই ভীতিটুকু সামাজিক অনুশাসনের গুরুত্বকে অনুধাবন করার প্রতিক্রিয়া। সবার মানসিক গঠন এক না, কাউকে হাজার পুরুষের ভেতরে ছেড়ে দিলেও সে অন্য কোনো পুরুষের প্রতি আসক্ত হবে না, অনেক নারীর ভেতরে থাকলেও সবার প্রতি যৌণাকর্ষণ বোধ করবে না এমন মানুষও আছে।
কোনো রকম বাধ্যবাধকতাবিহীন লিভ টুগেদারেও অনেকে ২৫ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন, কোটি টাকা খরচ করে বিয়ে করে কেউ ৩ মাস সংসার করতে ব্যর্থ হয়েছে, দরজা খোলা থাকলেই যে সবাই অন্য বাড়ী যাবে এমন না, যদি প্রেম থাকে, টান থাকে সবাই নিজের ঘরেই ফিরে আসবে।





সম্পর্ক টিকা থাকাতে তার ধরণ বা কমিটমেন্টের ধরণ দায়ী কিনা এই বিতর্কটা একটু পুরানা মনে হয় আমার কাছে। পৃথিবীর তাবৎ পুরুষশাসিত সমাজে বিবিধ রকমের চর্চা আছে। সেইসব চর্চাগুলির কোনোটারই শতভাগ নিশ্চয়তা আছে এইরম কোনো উদাহরণ আমার জানা নাই।
আবার বিচ্ছেদ মানেই পরাজয় অর্থাৎ বিচ্ছেদ ঘটলেই সেইটা খুব খারাপ পরিণতি এমন ভাবনারে যুক্তিসঙ্গত লাগে না আমার কাছে। বিচ্ছেদের বিবেচনাটা কি এবং কেনো, তার উপর আসলে অনেককিছু নির্ভর করে। পশ্চিমা সমাজে একটা কথা বেশ প্রচলিত মনে হয়, "আওয়ার রিলেশনশীপ ইজন্ট ওয়ার্কিং!" এইটারে আমি রিজেক্ট করতে পারি না। কেবল বলতে পারি পুঁজি আর পুরুষ শাসিত সমাজে প্রত্যেক মানুষই অনেক ইন্ডিভিজ্যুয়াল হইয়া উঠে। ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজমের সাথে অস্থিরতার যোগাযোগ থাকে। সামাজিক মূল্যবোধ যেমনে কালেক্টিভ প্রসেসে গইড়া ওঠে তাতে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অস্থিরতার চাইতে নিশ্চয়তাই থাকে বেশি। কিন্তু ব্যক্তি যখন একা হয় তার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের সংখ্যাও বাইড়া যায়। সে যেহেতু নিজেকে একক আর স্বাধীন ভাবতে চায় কিন্তু যেহেতু সে আবার তার জীবন ধারণের ক্ষেত্রে সমষ্টির সাথে ভীষণভাবেই যুক্ত, সেহেতু তার মধ্যে টানাপোড়েনটাও বেশ প্রেডিক্টেবল একটা কনসিক্যুয়েন্স। যেই মানুষ এই টানাপোড়েনরেও মায়রে বাপ বইলা তোয়াক্কা না করতে পারে, তারে আমার লাল সালাম। পশ্চিমাদের "নট ওয়র্কিং টাইপ" ফ্রেইজে পৌছানোর বিশ্লেষণ বা বিচার পদ্ধতিরে আমার এই কারণে অস্থিরতার প্রকাশ মনে হয় অনেক সময়। তবে আমি "ওয়র্ক" না করার উপলব্ধিরে নাকচ করতেছি না। সিদ্ধান্তে পৌছানোর তাৎক্ষণিকতা নিয়া সন্দেহ করতেছি কেবল।
তবে কালেক্টিভ প্রসেসে অনেকেরই আপত্তি থাকতে পারে। আমার নিজের বক্তব্য হইলো কালেক্টিভ প্রসেসটা কে বা কারা নিয়ন্ত্রণ করতেছে, সেই প্রশ্নটা অনেক জরুরী এই ধরনের সিন্থেসিসে পৌছানের কৌশল হিসাবে। পুঁজি আর পুরুষ শাসন থাকলে যেমন ঘটতেছে আর তার প্রতিক্রিয়ায় যেইসব আইন নির্ধারিত হইতেছে সেইখানে পুঁজি আর পৌরুষের প্রভাব বলয় কাজ করে। আদিতম পরিবার ব্যবস্থায়ও এইরকম ছিলো এখনো তেমনই আছে। নারী সবসময়েই উপেক্ষিত। তাই প্রচলিত পরিবার প্রথাগুলি পুরুষরে অনেক সুবিধা দেয়। নারীর জন্য রাষ্ট্র বা সমাজ যেই পুরুষসুলভ উদারতা দেখায় সেইখানেও পুঁজি আর পৌরুষের বিবেচনাই প্রধান থাকে। কিন্তু পুঁজি কিম্বা পৌরুষরে যদি এই নিয়ন্ত্রণ থেইকা সরাইয়া রাখা যায় তাইলে একটা ইউনিফায়েড কালেক্টিভ কনক্লুশানে পৌছানোর রাস্তা খুলতে পারে বইলা মনে করতেছি...
অনেকেই স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচার শব্দ দুটো গুলিয়ে ফেলেন
মন্তব্য করুন