ব্লগ দিবস বিষয়ে
বাংলা ব্লগ দিবস উদযাপনের রাজনীতিতে একটা প্রাথমিক ধারণা ছিলো ব্লগিং বিষয়ে আম-জনতার উৎসাহ বাড়ানো, ব্লগের বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিতি করিয়ে দেওয়া। ব্লগারদের আড্ডা ব্যতীত সেমিনার ঘরে উদযাপিত ব্লগ দিবসে সাধারণ মানুষের নগন্য উপস্থিতিতে সে লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত হয় সেটা বিবেচনা করে দেখতে হবে।
যদি বাংলা ব্লগ বিষয়ে সাধারণকে উৎসাহী করতে হয় তবে সেমিনার রুমের আবদ্ধতা থেকে ব্লগি দিবসকে বিচ্যুত করতে হবে। বইমেলাকে প্রাধান্য দিয়ে ১লা ফেব্রুয়ারী ব্লগ দিবস উদযাপন না করে বইমেলার প্রথম সপ্তাহে সেটাকে উদযাপন করতে হবে।
সেমিনার, গণমাধ্যমের রথি-মহারথীদের শুভেচ্ছাবানী আর কেক কাটাকাটি বাদ দিয়ে ব্লগকে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে বরং বই মেলা চত্ত্বরকেই ব্যবহার করা যায়।
বাংলা একাডেমীর সামনের রাস্তাটায় যেখানে মানুষ বসে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয় সেখানে কোনো একদিন বিকেলে বর্নীল ব্লগ দিবসের উদযাপন করা যায়, ব্লগাররা মাশাল্লাহ লেখক হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছেন বিপূল পরিমানে, প্রকাশকেরা বই ছাপাচ্ছেন, প্রতিটা ব্লগ তাদের সংকলন প্রকাশ করছে, বইমেলার পেছনের চিপায় আমার প্রকাশনীর একটা স্টলও আছে, ব্লগি দিবসের দিন দুইটা বড় ব্যানারে ব্লগার লেখক ও ব্লগ সংকলনের বিভিন্ন প্রচ্ছদ সাজিয়ে সেটার আশেপাশে লেখক ব্লগার, প্রকাশক ব্লগার এবং অন্যান্য আম ব্লগারেরা এক দিন উচ্ছ্বাস করলেন। ব্লগ এবং ব্লগের লেখকদের পরিচিতি দুইই বাড়লো।
সাধারণের আগ্রহও তৈরি হলো। লেখকেরা বুক ফুলিয়ে, মুখ লুকিয়ে অটোগ্রাফ দিলেন, বইয়ের ব্যবসাও বাড়লো। নিছক রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির বদলে অর্থনৈতিক এই প্রক্রিয়ায় অনেক উচ্চমন্য ব্যক্তিদের ব্লগ দিবসের অনীহাও দূর হবে এভাবে। তারা সকলেই নিজের লাভ বিবেচনা করে এখানে সামিল হবেন। ব্লগের অন্তঃবিরোধ এতে দূর হবে আশা করা যায়।





উদযাপনের জন্য দিবস নির্ধারণ প্রক্রিয়া কে ঠিক করে? ইতিহাস নাকি ক্ষমতার দাপট? ব্লগ দিবস নিয়া বহুদিন যাবত-ই বিবিধ ক্যাচাল দেখতেছি, কিন্তু এই ক্যাচালে ক্ষমতার বিরোধ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে নাই।
যদি প্রচার আর আয়োজনের সুবিধার্থে ব্লগ দিবস আয়োজিত হয় তাইলে কি সেইটা স্মরণীয় কোনো দিবস হয়? আমি যদ্দূর বুঝি কোনো উপলক্ষ্যরে স্মরণীয় করতেই দিবসের হিসাব নিকাশ। পয়লা ফেব্রুয়ারি ব্লগ দিবস ক্যানো এই বিষয়টা যৌক্তিকভাবে কখনোই বুইঝা উঠতে পারি নাই।
ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলারে প্রতিষ্ঠিত করা গেছিলো বইলা বাংলাভাষায় ব্লগ প্রতিষ্ঠার দিবস হিসাবে পয়লা ফেব্রুয়ারিরে বাছতে হইবো? সামহোয়্যার ইন ব্লগের কৌশলী সিদ্ধান্ত ১৯ ডিসেম্বররে বরং আমার কিছুটা যৌক্তিক লাগে। এখন এই আয়োজন সেমিনারে হইবো নাকি পথে পথে হইবো সেই প্রচার বা আয়োজন কৌশল ভিন্ন বিষয়।
বাংলা ব্লগিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রাকালরে ব্লগদিবস হিসাবে না মানতে পারার মানসিকতাটা আমি কোনোদিন বুঝতে পারি নাই। সামহোয়্যার ইন ব্লগ কর্তৃপক্ষের বর্তমান আচরণ, তাদের কর্পোরেইট হইতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত এই বিষয় কি বাংলা ব্লগ প্ল্যাটফর্ম তৈরীর স্মৃতির সাথে কোনোভাবে কন্ট্রাডিক্ট করে? উদ্ভট সব ট্যাগিং দিয়া বাস্তবিক ক্ষমতা প্রদর্শনের নজীর ছাড়া আর কিছু হয় নাই গতো কয়েকবছরে...
দিবস পালন বিষয়ে অনাগ্রহ থাকনে অতীতে এই ক্যাচালে কখনোই পার্টিসিপেট করি নাই, কিন্তু আমরা বন্ধু ব্লগেও এই বিষয়ে লেখা দেখার পর মনে হইলো এই ক্যাচাল এখন আর কেবল দুইটা ব্লগের পাইওনিয়ার হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় সীমাবদ্ধ নাই...এই ক্যাচাল আরো বহুদিকেই ছড়ানের সম্ভাবনা দেখা দিতেছে; তাই ব্লগ দিবস পালন বিষয়ে নিজের মতামত জানাইয়া গেলাম।
ভাস্কর দা ব্লগ দিবস নিয়া যখন প্রাথমিক আলোচনা কিংবা ক্যাঁচাল শুরু হইলো তখন আমার জিজ্ঞাসা ছিলো এই দিবসের ভীড়ে ভারাক্রান্ত বাঙালী জাতীয় জীবনে নতুন একটা দিবসের প্রয়োজনীয়তা কি। আমি জানলাম এইটার মাধ্যমে ব্লগিং সম্পর্কে সাধারণের আগ্রহ বৃদ্ধি পাইবো। গত ৩ বছর ৬টা ব্লগ দিবস উদযাপনের পরও বিষয়টা তেমন ঘটলো না। সাধারণের প্রাথমিক উচ্ছ্বাস যতটা আমার প্রকাশনীর স্টলের সামনে ছিলো, সেটা এই বছর কতটুকু থাকবে আমি জানি না, গত বছর উচ্ছ্বাসটায় ভাটা পরেছিলো।
বিষয়টা দাপট আর প্রতিষ্ঠাকামীতা বলা যেতে পারে, দিবসের প্রয়োজন অস্তিত্ব জানান দেওয়ার, এখানে দখলের লড়াইটাও স্পষ্ট থাকবে। সেই দখলের লড়াইটা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হলে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। এটা তেমন একটা বিকল্প অনুসন্ধান, যেখানে সকলের ব্যাগেই লভ্যাংশ ঢুকে যাওয়ার একটা সীমিত সম্ভবনা বিরাজমান।
ব্যানার নিয়া দুই দিবসের লড়াইয়ে চ্যাপ্টা হওয়ার চেয়ে এমন কোনো বিকল্প ব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহনটুকু আরও বেশী আনন্দময় হওয়ার কথা।
ওরা করেছে তাই আমরাও করবো, ব্যপারটা এরকমই দাঁড়িয়ে গেছে।
শৈলির এক ঘোষনায় দেখলাম "আমরা বন্ধু" ব্লগও নাকি ১ লা ফেব্রুয়ারীর ব্লগ দিবসে জড়িত। কিন্তু কোথায় তো এরকমটি দেখলাম না।
আর যদি আগ্রহ বৃদ্ধি পায় তাতে কার কি লাভ হবে? বেশি লোকে ব্লগিং করলে ব্লগ বা সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে? দিবস করে ব্লগার তথা ভাল লেখক বানানো যাবে? যার ভিতরে লেখা বা ভাব কুটে মরবে, সে নিজেই লেখার মাধ্যক খুজে নিবে যেমন অতীতে অনেকে নিয়েছে।
আগ্রহ বৃদ্ধি পেলে সবার হয়তো একই রকম অনুভুতি হবে না,
যারা ব্লগের মালিকপক্ষ কিংবা যারা ব্লগসেবা দিতে আগ্রহী তাদের কাছে ব্লগের পরিচিতি বৃদ্ধি পাওয়া মানে সাইটের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, ট্রাফিক বৃদ্ধি, জনপ্রিয়তা, বিজ্ঞাপন বাবদ প্রাপ্ত আয়ের বাড়-বাড়ন্ত অবস্থা।
আমার কাছে বেশ কয়েকটি কারণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, প্রথমত মত প্রকাশের ধারণ এবং ভঙ্গিটা বদলাবে। ব্লগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশ করে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন তর্কে অবতীর্ণ হয়ে একদল মানুষের ভাবনার জগত বিবর্তিত হবে।
অনেক ধরণের প্রয়োজনীয় ব্লগসাইটের কথা আমি বিভিন্ন সময় বলেছি, পরস্পরের নোংরা আন্ডারওয়্যার মেলে ধরবার প্রদর্শণী আর চর দখলের মতো দিবস দখলের ধকলে সেসব কাজে উদ্যমী কাউকে পাওয়া যায় নি। বিজ্ঞান বিষয়ক একটা ভাল বাংলা ব্লগসাইট , শিক্ষা বিষয়ক একটি ভালো বাংলা ওয়েবসাইট প্রয়োজন। অনেক মানুষ হলে সেসব কাজের দিকে নজর দেওয়ার মতো স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া যাবে।
রাজনৈতিক মতাদর্শে সহনশীলতা, বিতর্কিত বিষয় নিয়ে ভাবতে এক ধরণের অভ্যস্ততা তৈরি হবে।
আমাদের এখানে এখনও নিম্নবিত্ত মানুষ ঠিক সেভাবে তাদের বক্তব্য প্রকাশ করছে না। ব্লগ ধারণার বিস্তারে তারা এই ধারার সাথে সংযুক্ত হবে।
ভাল কিছু হয়েছে কীনা জানি না, তবে ক্যাচাল বাড়ছে এইটুকু দেখতাছি।
ব্লগ দিবস-টিবস না করলেই ভাল।
দিবস কনসেপ্টটা-ই বিরক্তিকর।
মন্তব্য করুন