ইউজার লগইন

ঐতিহ্য

বিউটি বোর্ডিংএর আড্ডার টেবিলের শেষ চায়ের কাপটাও অনেক আগেই তুলে নিয়ে গেছে কেউ, অন্তত আমি যখন প্রথম বিউটি বোর্ডিং দেখি তার আগেই এখানকার লেখক আড্ডার ঐতিহ্য শেষ। ক্যাফে কর্নারের উল্টোপাশে বিউটি বোর্ডিং এর ছোটো জায়গায় অবহেলায় পরে থাকা কয়েকটা টেবিল আর প্লাস্টিকের চেয়ার একটি সত্য জানিয়ে গেলো পৃথিবীতে সবকিছুই প্লাস্টিকের মতো অবিনশ্বর নয়, সময়ের প্রয়োজনে সাহিত্যিক আড্ডাটা বাংলাবাজার থেকে দুরে সরে কিছুদিন শাহবাগের আজিজ মার্কেটে স্থিতু হয়ে এখন জায়গা পরিবর্তন করে কনকর্ড টাওয়ারের গ্যারেজে ঢুকে পরেছে। বিউটি বোর্ডিং এর মতো আজিজেরও সাহিত্যিক মৃত্যু ঘটেছে

দীর্ঘদিন একটানা নিজের মাণ বজায় রেখে সেবা দিয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানের একটা ঐতিহ্য তৈরি হয়, ব্রান্ড ভ্যালু তৈরি হয়, কাস্টমার ট্রাস্ট আর কনজুমার স্যাটিসফেকশন মিলেমিশে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি প্রতীকে পরিণত করে, হুইল কাপড় কাঁচার সাবানের বাজারটা দখল করার আগে যেমন কালো বল সাবান একটা ঐতিহ্য তৈরি করেছিলো, যুগের পরিবর্তনের ধারাটুকু বুঝতে ব্যর্থ হওয়ায় আর উপযুক্ত মার্কেটিং পলিসির অভাবে পুরোনো উপন্যাসের পাতায় শুধু বল সাবানের অস্তিত্ব টিকে আছে ।

পুরোনো ঢাকাকেও আমার তেমনই পরিত্যাক্ত ঐতিহ্যিক পরিসর মনে হয়। কিছুটা কতৃপক্ষের উদাসীনতা কিছুটা নাগরিক অস্থিরতা সব মিলে পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্য এখনও টিমটিমে ম্রিয়মান বাতির মতো জ্বলছে। তবু নতুন ঢাকার শেকড়বিহীন মানুষের চেয়ে এখানে জ্বলজ্বল করে জীবনের ছাপ। পরিবারগুলোর সংস্কৃতিতে গত ২৫ বছরে ভিসিআরে হিন্দি ছবি আর হালের ক্যাবল ব্যতিত অন্য কোনো পরিবর্তন আসে নি। পারিবারিক বন্ধন আর সর্দারের খোঁজ এখনও খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে।

হাসন রাজার আগমনের ১০০ বছর পরেও ঢাকার পরিস্থিতি বদলায় নি, শুধুমাত্র ফুলবাড়িয়া থেকে স্টেশনটা সরে গেছে কমলাপুরে, মৌজ-মাস্তি আর পতিতাগমনাগ্রহী মানুষেরা এখন শুধু ঢাকা শহরে এসব সেবার জন্য আসছে না, তারা প্লেনে চেপে দেশ বিদেশে যাচ্ছে, শহরের উপকণ্ঠে আর নিভৃতে গড়ে ওঠা রিসোর্ট আর হলিডে আউটলেটগুলোতে নিজের পছন্দনীয় জীবনযাপনের সুখ গ্রহন করছে।

একটা সময়ে বাঙালেরা জমিদারীর আয় নিয়ে যেতো কোলকাতায়, কৃষি উৎপাদন আর জমির খাজনার সবটুকু বাইজীবাড়ীতে উড়িয়ে দিয়ে ফিরে আসতো নিজের জমিদারিতে কিংবা সর্বশ্রান্ত হয়ে সেখানেই মাথা গুঁজে পরে থাকতো। জীবিকার সন্ধানেও কেউ কেউ কোলকাতা যেতো, ইংরজদের কল্যানে কোলকাতা কখনই ঠিক বস্তিতে রূপান্তরিত হয় নি, একটা স্থাপত্য ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, বিভিন্ন উদযাপনের উপলক্ষ্য ধারণ করে কোলকাতা নিজের সাংস্কৃতিক ব্যপ্তি বৃদ্ধি করেছে এবং ঐতিহ্য ও কৃষ্টির আধুনিকায়নের ফলে এখনও কোলকাতা তার অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছে।

ঢাকা তেমন পরিকল্পত ভাবে গড়ে উঠতে পারে নি, ইংরেজরা কখনই খুব বেশী গুরুত্ব দিয়ে ঢাকাকে বিচার করে নি, লালবাগ কেল্লা আর স্বল্পকালীন মুঘল রাজধানী হওয়ার সুবাদে এখানে রমনা এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় যে স্থাপত্য ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিলো সেটার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে নি। লালবাগের কেল্লা থেকে বুড়িগঙ্গ দিয়ে পূব বরাবর আসতে আসতে নদীর উপকূলে বেশকিছু মুঘল স্থাপনা তৈরি হলেও পরবর্তীতে শরীকি ঝামেলায় কিংবা লাম্পট্য আর অবহেলায় সেসব ধ্বংস হয়েছে। যতটুকু পোড়োবাড়ী হয়ে টিকে ছিলো, যেসব স্থাপনাকে ঢাকাবাসী ঐতিহ্য কিংবা পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করতে অনুরোধ করেছিলো , হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে সেসব ভবন ও ঐতিহ্যিক নিদর্শন ভেঙে ফেলছে ডেভলপার, ঢাকা শহর ঐতিহ্যিক সনদগুলো গুড়িয়ে দিয়ে নতুন কোনো ঐতিহ্য নির্মাণ করতে চাইছে।

ঐতিহ্যে পরিণত হওয়ার মতো সুপ্রাচীন তেমন কিছুই নেই নতুন ঢাকায়, কতিপয় উঁচু টাওয়ার আর শপিং মল হয়তো কোনো একদিন ঐতিহ্য হয়ে যেতে পারে কিন্তু নতুন ঢাকা তেমন বন্ধনে বাঁধে নি কাউকেই। নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানের সামনের জায়গাটা একটা সময় শেকড়বিহীন মানুষদের আড্ডার কেন্দ্রস্থল ছিলো। এখানে পুরোনো ঢাকার কেউই আড্ডা দিতে আসতো না, তাদের আড্ডাটা মহল্লার ছোটো হোটেল আর বাসার সামনের চত্ত্বর থেকে শপিং মলের টাইলস বসানো মেঝেতে উঠে আসে নি।

সাম্প্রতিক সময়ের উত্তর-দক্ষিণে বিভাজিত ঢাকা নগরীর দিকে তাকালে বলা যায় ঢাকা উত্তরে কোনো সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নেই, তেমন সুষম সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ঠ্য নেই ঢাকা উত্তরের মানুষদের। এদের একাংশ একদা ঢাকা দক্ষিণে বসবাস করতেন, সেখানের কোনো জায়গার আদিনিবাস ছেড়ে তারা অধিকতর প্রশস্ত পরিসরে জীবনযাপন করতে এখানে এসেছেন, আর নইলে হঠাৎ করে পয়সা হয়ে যাওয়া উৎকট রূচির প্রথম পর্যায়ের ধনী, যাদের ধন ভোগের অনভ্যস্ততা তাদের আচরণে তেমন পরিবর্তন আনতে পারে নি। তাদের একাংশ নিজের ধনের প্রদর্শণী করতে চেয়েছে এবং সাংস্কৃতিক গভীরতাবিহীন ধনপ্রদর্শণী বেশ্যার দেহপ্রদর্শণীর চেয়ের জঘন্য অনুভুতি বয়ে নিয়ে আসে। সেটা অধিকাংশ সময়েই অশোভন অসামঞ্জস্যতাপূর্ণ হয়ে যায়।

কয় প্রজন্ম একাধারে একই বসতভিটায় বসে একই রকম জীবনযাপন করলে সেখানে ঐতিহ্যের পুরু পরত পরে যায় আমার জানা নেই, তবে পুরোনো ঢাকার কবুতর, সংক্রান্তি, মোরগ লড়াই আর খাদ্য সংস্কৃতির সমতুল্য কোনো ঐতিহ্য সম্ভবত তৈরি হয় নি অন্য কোনো অঞ্চলে।

ঘুরে ফিরে পুনরায় বিউটি বোর্ডিং এ ফিরে যাই, এখানে একটা সময় আড্ডা দিয়েছেন সৈয়দ হক, শামসুর রাহমান, বেলাল চৌধুরি, ইমদাদুল হক মিলন, আবুল হাসান, শহীদ কাদরী। বিউটি বোর্ডিং এর চায়ের টেবিলেই হয়তো এদের অনেক কবিতার জন্ম হয়েছে, অনেক বইয়ের পান্ডুলিপি এখানেই প্রুফ রিড শেষে চলে গেছে ছাপাখানায়, কিন্তু এদের অধিকাংশই এখানকার জীবনকে নিয়ে তেমন বিশদ কিছু লেখেন নি, স্মৃতিকথায় আসলেও উপন্যাসের মূল চরিত্র হিসেবে বিউটি বোর্ডিং স্থান করে নিতে পারে নি, সমসাময়িক কবি সাহিত্যিকদের জীবন নিয়ে ইংরেজীতে- ফ্রেঞ্চে, স্প্যানিশে অনেক ধরণের উপন্যাস লেখা হলেও ঢাকা শহরে এমন কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের জীবন নিয়ে আলাদা করে উপন্যাস লেখার ঐতিহ্যও তৈরি হয় নি।

জার্নাল নয় বরং উপন্যাসের ভঙ্গিতে অকপট লিখে যাওয়া শিল্পী জীবনের বিস্তারিত বর্ণিল বিবরণ পশ্চিমাদের বিব্রত করে না, তাদের আড়ালের লোভটুকু কম হয়তো, কিন্তু বাংলাদেশে একধরণের স্বাত্ত্বিকতা প্রচারের প্রয়োজন হয়ে যায়, সেখানে কবি-সাহিত্যিক-সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই মুণি-ঋষি- উদাসীন দার্শণিক, এই সাত্ত্বিকতার মোহ তাদের নিজেকে আড়াল করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তেমনই তারা অন্যের জীবনকেও আড়াল করে রেখেছেন।

এক তসলিমা নাসরিন হয়তো তার আত্মজীবনির ভাঁজে এদের কারো কারো তসলিমাকেন্দ্রীক জীবনযাপনের বর্ণনা তুলে এনে দেখিয়েছেন এদের জীবন নিয়েও উপন্যাস লেখা যেতো, অকপট উপন্যাসে এদের যে ভাবগম্ভীর স্বাত্ত্বিক ভঙ্গী সে সাত্ত্বিক ভঙ্গিটুকু টিকে থাকতো না। মুখোশের আড়ালে এদের জীবনযাপনে অনেক ধরণের উদ্দামতা ছিলো, তবে নিজের আভ্যন্তরীণ সংকটে তারা তাদের নিজের জীবনযাপন প্রণালী কিংবা সৃষ্টিশীলতাকে সমাজবিরোধী কার্যক্রম ধরে নিয়ে আত্ম অপরাধবোধে ভুগে তেমন তীব্র আত্ম অনুসন্ধানী মাস্টারপীসের জন্ম দিতে পারে নি। সমাজের বদলে এক ধরণের কল্পিত প্রেমনগর গড়ে তারা সেখানেই নায়ক নায়িকাদের নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণ করে গেলেন, অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েও হাসান আজিজুল হল মূলত নিরন্ন মানুষের শুকনো সঙ্গমদৃশ্যের বাইরে তেমন সাহসী উপন্যাসের জন্ম দিতে পারলেন না।

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জ্যোতি's picture


আপনার লেখাগুলো পড়ে মুগ্ধ হতেই হয়।

তানবীরা's picture


ভাল লেগেছে

লীনা দিলরুবা's picture


বিউটি বোর্ডিং নিয়ে অনেক আগ্রহ। লেখা ভাল লাগল।

জোনাকি's picture


আজ যে প্রজা কাল সে রাজা।
লেখা ভালো লাগছে।

বিষাক্ত মানুষ's picture


বিউটি বোর্ডিং এ আমার জীবনের সবচেয়ে মজার বেগুন ভাজি খাইছিলাম Cool
আমি জেবীন আর শান্ত খাইছিলাম ... লালদা খাওয়াইছিলো Party

রাসেল's picture


হেলাল ভাইয়ের সাথে আলাদা বুঝাপরা করতে হবে, সে লুক ভালো না,

জেবীন's picture


বিউটি বোর্ডিং-এ লাল'দা না নিলে যাওয়াই হতো না! সেদিন তো ওইখানে ছবি প্রদর্শনীর কারনে সাজসাজ করা ছিলো, নরমালি কেমন হয় কে জানে। তবে ক্যান্টিনটার খারাপ পরিবেশনা ভালো লাগছে। বেগুনভাজি'র কথা বিমার সাথে একমত। এত্তো মজার বেগুনভাজি খাইনি আর। সাধারন্ত জানি বেশি তেলে বেগুনভাজি হয়, কিন্তু একদমই অল্পতেলে বড়ো তাওয়ায় রাধুনীলোকটা কি দারুন করে রান্না করেই খেতে দিলো! Smile

জেবীন's picture


খাবার পরিবেশনা দেখি খারাপ হইয়া গেল!! কেম্নে? Shock

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


লেকহা ভালো লাগলো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.