গণমাধ্যমে হত্যাকান্ডের উল্লাস
মানুষ কার্যকরণ খুঁজে, আমাদের সামাজিক অভ্যাসেই বিষয়টি প্রবিষ্ট। হাস্যকর, খেলো, একেবারে অহেতুক অপ্রয়োজনীয় ছল-ছুঁতোও আসলে আমাদের আচরণকে কোনো না কোনো গ্রহনযোগ্যতা প্রদানের প্রয়োজন পুরণ করে। অতীতসূত্র খুঁজে পাওয়ার প্রয়োজন নেই যদিও তবুও মানুষ কোনো না কোনো ভাবে বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যেখানে থমকে দাঁড়ায় সেখানে কল্পনার আশ্রয় গ্রহন করে। এই কল্পনাপ্রবন মানুষ বিষয়গুলোকে নিজের মতো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সত্যবিচ্যুত হয় কিংবা যা সে সত্য হিসেবে বিশ্বাস করে সেখানে তার কল্পনার বাস্তবতা এবং ঘটে যাওয়া বাস্তবতার ভেতরে কিছুটা ব্যবধান রয়ে যায়। এটাকে সচেতন স্মৃতিনির্মাণ বলা যায় না, বরং বলা যায় এক ধরণের সাচ্ছন্দ্যতার খোঁজ।
মানুষ ঋজু হয়ে দাঁড়ায় হয়তো, হয়তো ব্যক্তিগরিমাবোধও তৈরি হয় তাদের, কিন্তু অধিকাংশই মোটামুটি মানিয়ে নিয়ে চলতে চায়, তাদের কাছে সামষ্টিক প্রয়োজনীয়তাটুকু গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের অংশভূক্ত হয়ে থাকবার নিরাপত্তাবোধটুকুও সে ভীষণভাবেই চায়। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ভীষণরকমের কষ্টদায়ক এবং নির্মম ঘটনার সাথে কোনো না কোনো ভাবে আমি জড়িত। সে সংযোগ নেহায়েত আকস্মিক, মেঘ এবং আমার ছেলে একই স্কুলে পড়ে, একই সময়ে তারা স্কুলে যায়, স্কুল থেকে ফিরে আসে, যে পিকনিক থেকে ফিরে এসে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল মেঘ, আমার ছেলেওসে পিকনিক থেকে ফিরে এসে আমাকে অনেক গল্প শুনিয়েছে, শুনিয়েছে তার পরাজয়ের গল্পও।
আমাদের গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা কিংবা মানবিকতাবোধ নেই। কতটুকু শোভন, সভ্য এবং কতটুকু সমচীন এ বোধটুকু অধিকাংশ গণমাধ্যম কর্মীর ভেতরেই তৈরি হয় নি। কান্ডজ্ঞানের অভাবে স্বাভাবিকতা এবং অস্বাভাবিকতার ভেতরে তফাত করতে তারা অধিকাংশ সময়ই ব্যর্থ হয়। মেঘের সাথে আলোচনা –সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং আবেগস্পর্শী ভাষায় সেসব উপস্থাপন করা নেহায়েত অমানবিক। ক্ষতি তার যা হয়েছে সে ক্ষতিটুকুর ক্ষতিপুরণ হাজার বাক্য লিখেও পুর্ণ হবে না। ন্যায় বিচারের দাবীটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে এই শিশুকে এমন বাণিজ্যিকভাবে উপস্থাপন নেহায়েত ঘৃনিত আচরণ এ বিষয়টিও তাদের ভেতরে জন্মায় নি এখনও।
প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকান্ড বিষয়ে জল্পনা-কল্পনা প্রকাশিত হয়েছে, একই সাথে প্রকাশিত হয়েছে মেঘের সাক্ষাৎকার, মেঘের প্রথম দিনের প্রতিক্রিয়া এবং বর্তমানের প্রতিক্রিয়ার ভেতরে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রথম দিন পুলিশের সাথে কথা বলেছিলো মেঘ এবং তার পরিবার, আমাদের পুলিশদের মানসিকতা এবং মানবিকতা বিষয়ে খুব বেশী উঁচু ধারণা পোষণ করার মতো উদাহরণ যেহেতু নেই সুতরাং মেনে নিতেই হবে তারা যখন মেঘের সাথে আলোচনা করেছেন তখন তাদের অপেশাদার অমানবিক অবস্থান থেকেই আলোচনা করেছেন। সেখানে তারা বেশ কিছু প্রশ্ন করেছেন যা নার্সারী পড়ুয়া শিশুটিকে বিষয়গুলো পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছে।
সুতরাং পরবর্তী দিন যখন সাংবাদিকের সাথে তার সাক্ষাৎ হয় সে প্রশ্ন করেছিলো " আপনি কি পুলিশ?"
অবশ্য এরপর দিন মেঘ কোনো রকম ব্যক্তিবিচার না করেই তার গল্প জানিয়েছে সবাইকেই।
ঘটনা পরম্পরায় তার প্রাথমিক স্মৃতি এবং পুলিশী জেরার পরের স্মৃতিতে পার্থক্য আছে। একই সাথে আমার অনুমাণ আমাদের বয়স্কবিলাপও তার ভেতরে এক ধরণের প্রশ্নের এবং দায়িত্ববোধের জন্ম দিয়েছে। কোনো না কোনো ক্ষেত্র থেকে সে বুঝতে পেরেছে তার উপস্থিতিটুকু গুরুত্বপূর্ণ এবং তার বাবা-মায়ের অমানবিক মৃত্যু এড়ানোর ক্ষেত্রে তারও কিছু করনীয় ছিলো।
পুলিশের দায়িত্বপালন, সাংবাদিকদের কৌতুহল এবং গণমাধ্যমের প্রচারবাণিজ্যের কেন্দ্রে পিষ্ট হচ্ছে একটি শিশু। যেহেতু পেশাদারিত্ব এবং মানবিকতা এই গণমাধ্যমের কাছে আশা করা বৃথা। বরং এই মুহুর্তে তাদের আক্ষেপটুকুই লিখে রাখি। এ মুহূর্তে তাদের একটা আক্ষেপই কুরে কুরে খাচ্ছে, কেনো শিশুটা এই বর্বরতার ঘটমান চিত্রায়ন দেখতে পারে নি?
মেঘ যেভাবে উপস্থাপন করচে ঘটনাটিকে, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম, ঘুম থেকে উঠে দেখলাম বাবা-মায়ের মৃতদেহ, নানুকে ফোন করে জানালাম গল্পটির ভেতরে তেমন আবেগ নেই। বরং তার পরবর্তী উপস্থাপনটুকুতে বেশ নাটকীয়তা এসেছে, বলেছে সে দেখেছে একজন তার বাবাকে বেঁধে ফেললো, পরের দিন বলেছে একটা প্লেন এসে আমার বাবাকে মেরে ফেলবে, এইসব আবেগের বিপণন করছে সব পত্রিকাই। সম্পাদক বেশ দায়িত্বপূর্ণ আলোচনা করে একটা কলাম লিখেও একই বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছেন।
তবে এই ঘটনার ধারাবাহিকতায় সব মিলিয়ে মেঘ যখন একেবারে দৃশ্যের মাঝখানে নিজেকে স্থাপন করে বলছে দুজন তার বাবাকে বেধে ফেলে তখন এই আরোপিত স্মৃতি বিষয়টির সাথে তার দুর্বলতা-অসহায়ত্ব এবং তার অক্ষমতাজনিত অপরাধবোধটুকুও স্পষ্ট হয়ে যায়। তার ভেতরে নিজের দুর্বলতার অনুভবটুকু স্পষ্ট করে দেওয়ার সামগ্রীক দায়ভার মূলত তার নয় বরং এই আরোপিত সামাজিক দায়ভারটুকু তাকে বহন করতে হচ্ছে আমাদের বয়স্কদের অমানবিক আচরণ কিংবা প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতেই, সে হয়তো নিজের মানসিক আঘাতটুকু কাটিয়ে উঠে একদিন নিজেকে বুঝাতে সক্ষম হবে, কিন্তু এই অপরাধবোধ, যা আমরা সামষ্টিকভাবে চাপিয়ে দিলাম তার উপরে সে গুরুভার কি যে বহন করতে পারবে কখনও?
আজ হয়তো ততটা প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে না কিন্তু তাকে তার প্রয়োজনেই কাউন্সিলিং এ পাঠাতে হবে। দীর্ঘদিনের পুষে থাকা অপরাধবোধ, অসহায়ত্ব কিংবা অক্ষমতার চাপা প্রতিক্রিয়ায় একদিন সে সমস্ত পৃথিবীকে অভিসম্পাত দিবে, হয়তো সাম্ভাব্য অপরাধীর সন্ধানে কাটবে তার ভবিষ্যত জীবন, হয়তো ভীষণ রকম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠে একদিন সে প্রতিশোধস্পৃহায় যেকোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে। তার আগেই আমি তাকে জানাতে চাই
তুমি যা করেছে তাই অসম্ভব সাহসিকতার কাজ। বয়সানুপাতে তুমি যা করেছে সেটুকু অনেক বড় মানুষেরাও করতে পারে না। অনেক ধরণের অসম্ভব দুর্ঘটনা ঘটে যায় মানুষের জীবনে। অনেক ঘটনাই আসলে প্রতিকার অযোগ্য দুর্ঘটনা, সেসব দুর্ঘটনা কোনো রকম সাবধানতা ছাড়াই কোনো রকম প্রতিরোধ-প্রতিরক্ষা গ্রহনের আগেই ঘটে যায়।
তোমার জীবনে যা ঘটেছে সে দুর্ঘটনা অসম্ভব মর্মান্তিক কিন্তু সম্পূর্ণ বিষয়টিতে তোমার কিছু করণীয় ছিলো না। তোমার যতটুকু কর্তব্য ছিলো তা খুব চমৎকার পালন করেছে তো তুমি। পৃথিবীতে তোমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে অনেক ঘটনাই ঘটে যায়। সেসব দুঃখজনক হলেও মেনে নিতে হয়, কষ্টবোধটুকু নিজের ভেতরেই সাজিয়ে রাখতে হয়, পরিচর্যার প্রয়োজন নেই।





মেঘ পিচ্চিটা একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রমায় পড়তে যাইতেছে এইটা শিওর
শেষ পর্যন্ত তো গণমাধ্যম বইলা কিছু নাই...সবটাই ব্যবসা। বেশিরভগ পাঠক আর দর্শক রগরগে বর্ণনা পড়তে বা শুনতে চায়।
আসলেই তাই
মেঘের ছোট্ট জীবনটায় মেঘের কালো ছাড়া পড়লো।
মন্তব্য করুন