প্রমিত বাংলা ব্যকরণ আর ভাষিক আগ্রাসন বিষয়ে কয়েক প্যারাগ্রাফ
উচ্চারণকে চিহ্নে ধারণ করতে চাওয়া কিংবা শব্দের ভেতরে অনেকগুলো আলাদা উচ্চারণকে শনাক্ত করে সেসব আলাদা আলাদা উচ্চারণকে চিহ্নে ধারণ করা ভাষাবিকৃতি কিংবা ভাষার বিচ্যুতি রোধে অনেক বেশী কার্যকর হয়ে উঠেছিলো, ছাপাখানার আবিস্কার সেসব চিহ্নকে এক ধরণের স্থিরতা এনে দিয়েছে। বর্তমানের কম্পিউটার যুগে সেসব চিহ্নে নানা ধরণের শৈল্পিকতা এবং বাক্যের গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন ফর্মায় সেসব সংবদ্ধ উচ্চারণচিহ্নকে সাজানোর সুবিধাটুকু এসেছে। কিন্তু যখন কোনো উচ্চারণের কোনো চিহ্নই ছিলো না তখন ভাষা কিভাবে প্রবাহিত হয়েছে ভবিষ্যতে?
ভাষিক আগ্রাসন পৃথিবীর ইতিহাসে সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়, বিভিন্ন প্রাযুক্তিক আবিস্কার ভাষা আগ্রাসনকে এক ধরণের স্থবিরতা এনে দিয়েছে এটুকু বলাই যায়। ভাষাকে চিহ্নিত করার আগেই মানুষ ভাষিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে, সামরিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক দক্ষতায় ভাষাকে দখল করেছে বলশালী গোত্র, ঠিকমতো ভাষাকে বুঝে উঠবার আগেই ভাষা বেদখল হয়ে যাওয়ার ইতিহাসও দেখেছে পৃথিবী।
দিগ্বিজয়ী যোদ্ধাদের ঘোড়ার খুরের শব্দের সাথে তাদের মুখের ভাষাও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরেছে, তারাই নিজেদের মুখের ভাষাকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে, একই সাথে ক্ষীণ হলেও পরাজিত মানুষের মুখের ভাষাও বিশ্বে ছড়িয়ে পরেছে। তাদের ম্রিয়মাণ কণ্ঠস্বর, তাদের আত্মগোপন করে থাকবার প্রবনতা কিংবা তাদের গোত্রাহংকার তাদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সঙ্কুচিত রেখেছিলো। এইসব ক্ষীণকণ্ঠ উদ্বাস্তু রাজ্যহারা মানুষের কাফেলা বিজয়ী সৈন্যদলের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে আত্মগোপন করেছে দুর্গম অঞ্চলে।
বিজয়ীর দর্প কখনও ভাষাকে পবিত্রতা শৃঙ্খল পরায় নি সম্ভবত কিন্তু পরাজিত মানুষেরা নিজেদের ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধতা করেছে ভাষার উপরে পবিত্রতা আরোপ করে। এক ধরণের পবিত্রতা আরোপিত হয়েছে শব্দে, উচ্চারণে, এমন কি যখন উচ্চারণ, শব্দ ধ্বনির চিত্রায়ন চিহ্নায়ন শুরু হলো বিভিন্ন পর্যায়ে এইসব বিষয়েও পবিত্রতা আরোপ করা হয়েছে।
চিহ্ন, শব্দ পবিত্রতা এইসব বিষয় আরও বেশী বৈচিত্র পেয়েছে মানুষের ভাষার ব্যবহার প্রসারিত হওয়ায়। অস্ত্রের জোরে ভাষা দখলের পর ভাষার মৃত্যুর চেয়ে স্বাভাবিক প্রবনতা হলো ভাষার বিবর্তন। দীর্ঘ দিন দীর্ঘ একটি ভৌগলিক পরিসরে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাসরত মানুষ ভিন্ন ভিন্ন সুরে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়েছে, সেসব ভাষা ধীরে ধীরে ভিন্ন একটি ভাষায় পরিণত হয়েছে। সব ভাষার ভেতরেই এক ধরণের আঞ্চলিক উচ্চারণ রীতি এভাবেই গড়ে ওঠে। ভাষার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ মুলত ভাষার সন্ধি রক্ষা করে যায়, এরা মধ্যপন্থী মানুষ। এই মধ্যপন্থী মানুষের ভৌগলিক বিস্তৃতি কতটুকু তা নির্ভর করে বসতির দুর্গমতার উপরে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা প্রবল হওয়ায় সেসব জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিঅবিকৃত থেকেছে দীর্ঘদিন। এদের অনেকেই সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছে এমন কি ভাষার চিহ্নায়ন হওয়ার আগেই যদি এরা দুর্গম পরিবেশে আত্মগোপন করে থাকে তাহলে ভাষার চিহ্নায়নের প্রয়োজন তারা অনুভব করে নি। তাদের কথ্য ভাষা থাকলেও তারা ভাষার লিখিত রূপ আবিস্কার করতেই পারে নি অদ্যাবধি।
ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যেমন ঘটেছে তেমন ভাবেই বিভিন্ন সময়ে ভাষিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও লড়াই করেছে মানুষ। স্থানীয় সংস্কৃতির শক্তি সামর্থ্য নির্ধারণ করেছে এই অব্যহত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রক্রিয়ায় কোনো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠি কিভাবে প্রভাবিত হবে? বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে এইসব আগ্রাসন প্রতিহত করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে চিন্তাশীল মানুষেরা। যেসব ভাষার লিখিত রূপ বিদ্যমান, বর্তমানের যুগে ভাষিক আগ্রাসনে ভাষা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াটা নেহায়েত বড় মাপের দুর্ঘটনা হিসেবেই পরিচিত হতে পারে।
এই প্রাগৌতিসাহিক চলমান সাংস্কৃতিক-ভাষিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে আমাদের ভাষা আন্দোলন কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিলো? আমাদের ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার আগেই ইউরোপে ভাষিক আগ্রাসণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দার্শণিক লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলো। সে লড়াইয়ে বিজয়ী এবং পরাজিত হওয়ার ইতিহাসও মাধ্যযুগ দেখেছে। তবে আমাদের ভাষা আন্দোলনের এক ধরণের অনন্যতা আছে। সাংস্কৃতিক শেকড়, ভাষার পবিত্রতা ইত্যকার হ্যানত্যান যা প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারীর গৎবাধা উচ্চারণ, সেসবের কারণে নয় বরং নেহায়েত অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তারা আন্দোলনমুখর হয়েছিলো।
আমাদের ভাষিক আগ্রাসন প্রতিরোধ আমাদের রুটি-রুজির লোভলালসা উদ্ভুত বিক্ষোভ, যেখানে অংশগ্রহন করেছিলো প্রধানত ছাত্রগণ, যারা ভবিষ্যত কেরানীগিরির ক্ষেত্র হিসেবে কিংবা অন্যতম নিয়োগকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ন মনে করেছিলো। রাষ্ট্রই বাঙালী শিক্ষিত যুবকের অন্যতম নিয়োগকর্তা এটা ঔপনিবেশিক সময় থেকেই প্রতিষ্ঠিত। বাঙালী বালক শিশুশিক্ষার পাতা থেকে একটাই মন্ত্র জপে যদি জুটে যায় একটি সরকারী চাকুরি। এই কেরানীগিরির লড়াইয়ে শিক্ষিত ছাত্রসমাজ পিছিয়ে পরবে যদি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রের এই বিমাতাসূলভ মনোভাব বাঙালী শিক্ষিতের পছন্দ হয় নি। তারা প্রতিবাদ জানিয়েছে। চাকুরি নিয়োগ পরীক্ষার বৈষম্য তৈরি করবে এই নীতি এই বলে আন্দোলনে দাবি দাওয়া তুলেছে, এমন কি ২১শে ফেব্রুয়ারী বিকেল ৩টায় মিছিলে গুলিবর্ষিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই কেরানীগিরির অধিকার নিয়েই মূলত যাবতীয় মিছিল সমাবেশ। পরবর্তীতে এমন নেহায়েত পেটের আন্দোলনে এক ধরণের বিমূর্ততা নিয়ে এসেছেন সাহিত্যিক সমাজ, তারা একে মহত্ব দিয়েছেন।
আমাদের ভাষার প্রতি মোহটা নেহায়েত অর্থনৈতিক বলেই স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও আমরা রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বাংলা প্রচলন করতে পারি নি। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে ফটাফট ইংরেজী বলতে পারাটা এক ধরণের যোগ্যতা চিহ্নিত হয়েছে। শুদ্ধ বাংলা বলতে লিখতে পারাটা যেহেতু চাকুরি নিয়োগের কোনো শর্ত হয় তাই বাঙালী শিক্ষিত মানুষেরা বাংলা শিখেন নি। তাদের ভেতরে সে বোধও তৈরি হয় নি। কিন্তু ইংরেজী জানাটা এক ধরণের অর্থনৈতিক পরিবরতনের অনুঘটক হয়ে উঠায় মানুষ ইংরেজী শিখেছে আদাজল খেয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে সেটার বিস্ফোরণ ঘটেছে।
যদি বাংলা ভাষা শুদ্ধ করে বলতে ও লিখতে পারার জন্য জনপ্রতি ১০০০ টাকা ধার্য করা হয় তাহলে কোচিং করে, আবৃত্তি কোর্স করে বাঙালী শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা শিখতে ঝাপিয়ে পরবে। আদালতের এত হাঙ্গামা করতে হবে না। ভুল উচ্চারণে বাংলা বললে ১ টাকা হারে জরিমাণা করলেও এই ফল লাভ করা যাবে না। দেখা যাবে যে এই উচ্চারণদারোগা নির্ধারিত হয়েছে সেই ঘুষটুষ নিয়ে বড় দালান হাঁকিয়ে ফেলেছে।
ভাষা ব্যবহারে নানা বৈচিত্র আছে, শব্দ উচ্চারণে আঞ্চলিকতা, ভাষা ব্যবহারের বৈচিত্র এইসব মেনে নিয়েই ব্যকরণবদ্ধ হয় ভাষা। ভাষাকে শৃঙ্খল পরানো নয় ব্যকরণের কাজ ভাষার ভেতরে শৃঙ্খলা উদঘাটন করা, ভাষার সম্ভবনা এবং সীমাবদ্ধতা খতিয়ে দেখবার জন্য একটি ভাষাকে দীর্ঘদিন চর্চিত হতে হয়, সেই ভাষা চর্চার কাজটি করেন সাহিত্যিকেরা। তারা লোকবুলির ভেতর থেকে বিভিন্ন সন্নিবেশনে ভাষার সম্ভবনাগুলো উদঘাটন করেন, এদের ভাষা ব্যবহারকে প্রামাণ্য মেনেই পরবর্তীতে ভাষার ভেতরের শৃঙ্খলা খুঁজে বের করেন ভবিষ্যতে ভাষাবিদগণ।
আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো দিক থেকে ঘটা শুরু করেছে, সাহিত্যিক সম্ভবনাধারী প্রাকৃত কিংবা লোকসাহিত্য নিয়ে তেমন যাচাই বাছাই ঘটে নি, রাজদরবারে রাজানুকল্যে গড়ে ওঠা সাহিত্যিক বিষয়াদির রূপ-রস- সাধারণের কণ্ঠে প্রবেশের আগেই এখানে ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়েছে।
যারা এখানে উপনিবেশ স্থাপন করেছেন তাদের গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস ছিলো, তাদের অভিজ্ঞতা কিংবা ভাষার ভেতরে শৃঙ্খলা খুঁজবার তাগিদ ছিলো, নেহায়েত ধর্মপ্রচারের দায়ে কিংবা নিজের ধর্ম সম্প্রচারের দায়ে তারা সহজ তরিকায় বাংলা ভাষা/লোকভাষা শিখতে চেয়েছেন।
তারা যাদের গুরু মেনেছেন তাদের সাহিত্যিক সম্ভবনা থাকলেও হয়তো ততটা যোগ্যতা ছিলো না, এমন কি পরমুখে ঝাল খাওয়ার বিষয় এখানে ঘটতে পারে, বাংলা সাহিত্য কিংবা বাংলা ভাষাভাষিদের নিজস্ব প্রয়োজনে বাংলা ব্যকরণ তৈরি হয় নি, বরং ধর্মপ্রচারকদের আগ্রহে এক ধরণের সহজ বাংলা ভাষা পাঠ ব্যকরণ নামে প্রচলিত হয়েছে।
সে কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপনের পর, শাসন এবং শোষণের প্রয়োজন মিটিয়েছে ভাষা, সংস্কৃতের সাথে মৌলিক ব্যবধান থাকলেও সংস্কৃতের শৃঙ্খল বেধেছে এ ভাষাকে, ভাষাও ঔপনিবেশিক প্রয়োজন শোষিৎ হয়েছে, সীমিত জীবনশক্তিতে এরপরো ভাষার বিকাশ ঘটেছে। এক রবিন্দ্রনাথ, এক বঙ্কিমচন্দ্র, এক মধুসুধন, এক বিহারীলাল যেসব সম্ভবনা দেখিয়েছেন, প্রমথ চৌধুরী সংস্কৃত অনুসারী নদীয়া শান্তিপুরী আঞ্চলিক ভাষার সংশোধিত রুপ থেকে বিচ্যুত হয়ে যে ভাষায় লেখা শুরু করলেন সেটা পরবর্তীতে অনুসরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানেও তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
তারাও চেষ্টা করেছেন বাংলা ব্যকরণ রচনায়, অবশেষে বাংলা একাডেমী সে কাজ সমাপ্ত করেছে, মাত্র তিন বছরের গবেষণায় তারা প্রকাশ করেছেন প্রমিত ভাষার ব্যকরণ, একটি ভাষার ব্যকরণ তৈরি করতে কেউ কেউ অর্ধেক জীবন লাগিয়ে দিলেও বাংলা ব্যকরণ মাত্র তিন বছরে সমাপ্ত করে ফেলা এক ধরণের দক্ষতা কিন্তু আমার অনুমাণ এটাও আদতে সংস্কৃতের আদলে গড়ে ওঠা এক ধরণের ভাষার নিগড়, শিক্ষিত মানুষ ধাতু আর লিঙ্গ নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া ভুলতে পারে নি।





...শেষ দিকে কেমন খাপছাড়া লাগলো
~
তাও ঠিক, ওটাকে পরিবর্তন করতে হতো,
দুটো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিত নিয়ে লেখা, একটা সংযোগ রেখা তৈরি করবার পরিশ্রমটুকু এড়াতে চেয়েছিলাম, কিন্তু উপস্থাপনের পার্থক্যটুকু রয়েই গেলো।
এদিকটা কোনদিনই ভাবিনি
দারুন একটা লেখা উপহার দিলেন
মন্তব্য করুন