এক একটা দিন বড় বেরঙীন
হয়তো একটি মুহূর্তের স্কেচ এসব কিছুই, সে মুহূর্তে সবাই পরবাসী, গৃহের অন্তরালে, পলাতক জীবনযাপনে সবাই কোনো না কোনো পক্ষ বাছাইয়ের লড়াইয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন, প্রতেকের ভেতরেই বিভিন্ন রকমের সংশয় ছিলো, কিন্তু দেয়ালে ঠেকে যাওয়া পিঠ আর সামনে আগুণ, দেয়াল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া কিংবা আগুণে ঝাপিয়ে পড়ার এই ভাবনার দ্বৈরথে অনেকেই আগপাশ বিবেচনা না করেই আগুণে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। আমি সে সময়ের পরের প্রজন্ম, আমার যাবতীয় রসদ আত্মজীবনির পাতা থেকে খুঁজে নেওয়া, এর সাথে ১৪ আনা কল্পনা মিশিয়ে একটি সময়ের ভাবনা লিখছি সে সময় আমার অপরিচিত এবং আমার বেড়ে ওঠা শৈশবের সাথে যে সময়ের কোনো মিলমিশ নেই।
------------------------------------------------------------------------------------------------------
-------------------------------------------------------------------------------------------------------
মা তাড়াতাড়ি নাস্তা দাও আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে, নুরূন নাহার শাড়ীর আঁচলে সেফটিপিন লাগাতে লাগাতে তাড়া দিলো।
রুনু তোর কি আজকে যাইতেই হবে? না গেলে হয় না? দেশের এমন পরিস্থিতি এর ভিতরে তোর কাজে না গেলে কি ক্ষতি হয়ে যাবে?
যা বুঝো না সেইটা নিয়া কথা না বললেই কি না, মা? দেশের পরিস্থিতি খারাপ বলেই তো আরও বেশী বেশী যাইতে হবে, না গেলে দেখবা আর্মি আসছে বাসায়। ওরা তো সবাইকে নোটিশ পাঠাইছে, যারা যারা আসতেছে না তাদের কোর্ট মার্শাল হচ্ছে, পরিবারের লোকজন ধরে আনতেছে। এইসব বুঝেও তুমি যা করো না মা। দাও, তাড়াতাড়ি নাস্তা দাও।
তুই একাই তো কাজ করিস, পৃথিবীতে তো আর কেউ কোন কাজ করতেছে না। শহরে মানুষ নাই, দুপুরে কাক ডাকে না আর আসছে আমার কাজকরনেওয়ালী। তোর কোন বান্ধবীটা এখন ঢাকায় আছে খোঁজ নিয়া দ্যাখ? প্রতিদিন এই টেনশন আর ভালো লাগে না আমার।
মা ওরা আর আমরা তো এক না মা। আমাদের পরিস্থিতি আলাদা। আব্বা যদি সুস্থ থাকতো তাহলে তো এত চিন্তা করা লাগতো না।
মা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন আয়তুল কুরসী পড়তে পড়তে যাইস মা। আর আসার পথে ওষুধ আনিস মনে করে।
মা দরজাটা লাগায় দাও, আমি সন্ধ্যার আগেই চলে আসবো।
এই শুন, শিরিন কি আজকে পরীক্ষা দিতে যাবে?
তোমার কি মাথা খারাপ মা? ওরা লিফলেট দিছে পরীক্ষার হলে বোমা ফাটাবে আর তুমি পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাবা ওকে। এইবার পরীক্ষা না দিলে কি হবে ওর?
শব্দ করে ৯টা বাজলো শহরে, রাস্তায় কয়েকটা রিকশা থেমে আছে, সব দোকানের ঝাঁপও এখনও খুলে নি, আর একটু আগালেই ডিআইটি রোড, কাঁচাবাজারেও লোকজন নেই। শহরটা প্রায় মৃত। এপ্রিলের প্রায় শূণ্য শহর এখন তবুও অনেক জীবন্ত, যেসব পরিবার চলে গিয়েছিলো তাদের বাসাঘর শূণ্য করে, সেসব বাসায় এখন পুরুষের ফিরে আসছে, আওয়ামীসমর্থক হিসেবে পরিচিত অনেক বাসাই শান্তি কমিটির লোকজন দখল করেছে। অনেক বাসার সামনে আগাছা জন্মেছে, ফলন্ত গাছগুলো ফলের ভারে অতিষ্ট, অন্য সময় মহল্লার ছেলেরা দুপুর হলেই হানা দিতো এসব বাসায়, এখন কেউ নেই, কিছু নেই।
দুপুর হলে রাস্তার কোনে রিকশা রেখে রিকশাওয়ালা ঝিমায়, শহরটাও ঝিমাতে থাকে, শুধু মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ কোথাও বোমা ফাটে আর আর্মির টহল জীপের আওয়াজে সরগরম হয়ে ওঠে শহর। ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ সন্ধ্যা নামলেই ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে অন্ধকারে, আলোও জ্বালাতে ভয় পায়।
বড় রাস্তায় দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই স্টেট সার্ভিসের বাস চলে আসলো, অফিস টাইমেও বাসে মাত্র কয়েকজন, মহিলা সীটের দিকে না গিয়ে সামনের একটা সীটেই বসে পড়লো ও।
ঘড়িতে ৪টা বাজবার পর নুরুন নাহার ব্যাগ গুছিয়ে গেলেন ম্যানেজারের ঘরে, আনিস ভাই আজ তাহলে আসি, মনে হয় না আজ আর কেউ আসবে। আব্বার ওষুধও কিনতে হবে, সন্ধ্যা হয়ে গেলে আর কোনো দোকান খোলা পাবো না।
ক্যাপ্টেন জামশেদ তোমার কথা জিজ্ঞাসা করছিলো বুঝলে, ও তোমার সাথে ডিনার করতে চায়। আমি অবশ্য ওকে ঠেকিয়ে রেখেছি নানা কথা বলে। আজ কি তোমার অনেক তাড়া?
না অনেক তাড়া নেই, কিন্তু আব্বার ওষুধ কিনতে হবে, আর বাজারও করতে হবে।
আমি তোমাকে পৌঁছে দিবো, আমার বাসায় চলো আগে?
কেনো আনিস ভাই?
জানোই তো তোমার ভাবী গ্রামের বাসায় চলে গেছে, এই বয়েসে শরীরের একটা চাহিদা তো আছে।
এতটা স্পষ্ট করে, এতটা কদর্য ভাষায় কেউ এমন প্রস্তাব দিতে পারে এমন ধারণা ছিলো না ওর। একটা বাজে গালি ঠোঁটের কোণে এসে আটকে যায়
যা বলবে একটু বুঝে বলবে, ঘরে তোমার একটা ছোটো বোন আছে, আর আর্মিরা তো এইখানে বৌ নিয়া আসে নাই, ওদেরও এইসব চাহিদা আছে, আমি ঠেকিয়ে রেখেছি নানা কথা বলে, আমি কিন্তু তোমার বাসা চিনি।
প্রস্তাবটা ততটা নিরীহ নয়, বরং হুমকির মতো শোনায়।
তোমাকে কি বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবো?
তার আর দরকার হবে না, আমি ঠিকই চলে যেতে পারবো।
ঠিক আছে , যাও তাহলে।
মুখের উপরে দরজা লাগিয়ে দিলো আনিস।
নুরুন নাহার শক্ত মুখে ঔষধ কিনে বাসায় পৌঁছালো যখন তখন সন্ধ্যাতারা জ্বলছে আকাশে।
----------------------------------------------------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------------------------------------------------
তুলসী তলায় দাঁড়িয়ে সূর্যপ্রণাম করতে করতেই অজিত গুহ ঠিক করলেন আজ আর কলেজে যাবেন না, এমনিতেই কলেজে ছাত্র আসছে না, সকাল বেলা হাজিরাখাতায় সই করে টিচার্স রুমে গালগল্প করে কাটানো, আর দুপুর হলে বাসায় ফিরে আসা, এই অকর্মন্য জীবন আর ভালো লাগে না তার।
এমনিতেই টিচার্স রুমের আড্ডা তার ভালো লাগে না, আর ইদানিং তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, বাংলার মান্নান স্যার আসছেন না এপ্রিলের শুরু থেকেই, ইতিহাসের মূয়ীদও আসছে না। এই দুইজনের সাথেই যা কথা বলা যেতো, একজন অন্য জনের নামে কুৎসা গাওয়ার বাইরে ইদানিং টিচার্সরুমে অন্য কিছুই হয় না। হেড ক্লার্ক সাহেব সকাল হলেই ইত্তেফাক পেপারটা চোখের উপর মেলে বসে থাকেন, মর্নিং সান আর সংগ্রামের খবর নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। কাফিরদের ষড়যন্ত্র আর পাকিস্তানীদের বীরত্বের সংবাদ পড়তেও ভালো না তার।
না গেলে আর কি হবে, টিচার্স রুমে সিদ্দিক সাহেব বলবেন পৌরনীতির কাদেরকে, বলছিলাম না এই মালাউনটাও ভারতের সাপোর্টার, আপনি তো বিশ্বাস গেলেন না। ওরা সবাই একই রকম। এই দেশে খায় আর ঐ দেশে বাসা বানায়। এই হারামিগুলার জন্য আমাদের এই অবস্থা। এখন রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারি না, সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। পাকিস্তান হওয়ার সময়ই সব কয়টাকে লাত্থি মেরে ভারতে পাঠায়া দিলে ভালো হইতো। তাহলে আর এই ঝামেলা হইতো না, এত মানুষ মরতো না।
পাক-মোটরের সামনে যখন বোমা ফাটলো তখন দুপুর ৩টা। একটা গ্রেনেড আর কয়েকটা গুলি, চেকপোস্টের অর্ধেকটা উধাও, রাস্তায় ছড়িয়ে আছে চারজন পাকিস্তানি সৈন্যের লাশ, হতচকিত লোকগুলো সম্বিত ফিরে পাওয়ার আগেই ইস্কাটন হয়ে সিদ্ধেশ্বরীর দিকে পালিয়ে গেলো ওরা। সাইরেন আর বুটের শব্দ ধাওয়া করলো ওদের।
মালিবাগ চৌধুরী পাড়া থেকে ১২ জন মেম্বার নিয়ে পাক-মোটরে আসলেন আহমেদ। উত্তেজিত মেজরকে বললেন আমরা ব্যবস্থা নিবো, আপনারা শুধু সাথে থাকবেন, সব গাদ্দারদের বাসা আমরা চিনি।
গুলি ছুড়ে, খিস্তি করতে করতে দুই জীপ আর্মি আর ১২ জন শান্তিকমিটির সদস্য যখন সিদ্ধেশ্বরীতে ঢুকলো অজিত গুহ কোন রকমে দরজায় তালা আটকে পালিয়ে গেলেন। দরজায় তালা লাগিয়ে অনেকেই চলে গিয়েছে, বন্ধ দরজা দেখলে আর কেউ ঢুকতে চায় না, অজিত কলেজে গেলেও বাইরে তালা লাগিয়ে যায়, আশেপাশের সবাই চলে গেলেও অজিত যায় নি এলাকা ছেড়ে। বন্ধ দরজার ভেতরে তার মা আর ছোটো দুই বোন।
এইটা একটা মালাউনের বাসা, এই শালারাই ঐসব লোকদের আশ্রয় দিচ্ছে। কয়েকটা লাথি মারার পরও যখন দরজা ভাঙলো না, বাসাটাতে আগুণ জ্বালিয়ে দিলো ওরা। সন্ধ্যার আগেই আগুণ নিভে গেলো, অজিত যখন ফিরলো তখন বাসার কাঠামোটাই শুধু আছে, তুলসী গাছটাও আগুণের আঁচে মরে গেছে,
আমি জাত দিয়া আর কি করবো? আমি জাত দিয়া আর কি করবো? অজিত কার্ফ্যুর ভেতরেই রাস্তায় নামলেন।





হুমমম! ভােলা সাবেজক্ট । চলতে থাকুক। এই অংশটা ভালো লাগলো।
কেমন ছাড়া ছাড়া লাগলো। চিত্রগুলোর ভেতর যোগসুত্র দাঁড় করাতে কষ্ট হইতেছে...
যাদৃচ্ছিক ক্লিকের মতো বিষয়, শুধু নুরুন নাহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে করলেও হতো, কিন্তু অজিত গুহের অনুভবটাও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু নুরুন নাহারের অংশটুকু আলাদা করে নিলেই হবে, একই দিনে অজিত গুহের অভিজ্ঞতা হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ না। আমি যদি এডিট করে দুটো আলাদা করে ফেলি তাহলে ততটা খাপছাড়া মনে হবে না, সম্ভবত। সেটা করে দিচ্ছি তারপর মন্তব্য করো।
ওইভাবে ভাগ কইরেন না রাসেল ভাই। তাইলে মিক্সড সৌন্দর্যটা নস্ট হইয়া যাইবো। নুরুন নাহার বা অজিত গুহ এঁদের এইভাবে মিক্সড প্রেজেন্টেশনটাই তো আসল মজা। আমি শুধু নুরুন নাহার বা অজিত গুহের ঘটনা গুলার লিংক করার লাইগা ঠিক মত ভিজুয়ালাইজ করতে পারতেছি না।
যাউকগা এক রকম হইছে আর কি।
আস্তে ধীরে সংশোধন করলেও হবে।
রাসেল ভাই, আপনারে ও দেখছি আমার মতো '৭১ এ পাইছে ! আপনার সব লেখাতে '৭১ আসে ঘুরে ঘুরে । আমারো প্রায় ! ক'টা গল্প লিখেছিলাম, পড়ে বন্ধুদের কেউ কেউ বলে মিঃ '৭১ । আমি বলি কি--তা বলুক বন্ধুরা । এক অর্থে আমার জন্মইতো '৭১ এ ।
আপনার লেখাতে আমার নিজের চিন্তার মিল খুঁজে পাই প্রায় । এ লেখাটিও খুব ভালো লেগেছে । তবে মনে হয়েছে কোথাও যেন একটু ফাঁক থেকে গেছে , " শেষ হয়ে নাহি হল শেষ " । হয়তো আপনি ইচ্ছে করেই করেছেন ।কিছু মনে করবেননা --অকপটেই বল্লাম । ধন্যবাদ !
এখনও অনেক কিছুই অনির্ধারিত, এক একটা দৃশ্য এক একটা সময়ে মনে আসছে, লিখছি, সম্পূর্ণতা আসবে এমনটা আশাও করি না, সব মিলিয়ে একটা চিত্রনাট্য দাঁড়াবে কোনো এক সময়, রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর বাইরে গিয়ে এক ধরণের চিত্রনাট্য তৈরি হবে হয়তো। সেখানে বিভিন্ন রকম সংযোজন বিয়োজনের সুযোগ থাকবে, এই ধারায় মনে হয় ৪টা লেখা আছে, সবগুলোই একটার সাথে অন্যটা সংযুক্ত। সেখানে এক একটা মুহূর্ত ধরবার চেষ্টা আছে- আপনার কোনো কোনো দৃশ্য মুহুর্ত অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে, সেখানে কি ধরণের বিষয়াদি সন্নিবেশ করতে হবে সেটাও আপনাকেই মন্তব্য আকারে দিতে হবে।
চলুক রাসেল ভাই ...
পড়ছি
চলুক...
মন্তব্য করুন