সাম্প্রতিক পাঠানুভুতি
কম্পিউটার বিগড়ে গেলে ভুলে যাওয়া বই পড়ার অভ্যাস ফিরে আসে, যদিও গত বইমেলায় কেনা অনেক বইই পড়া হয়ে উঠে নি, তারপরও পল্টনের ফুটপাতে কিংবা আজিজের সুদৃশ্য তাকে সাজানো বই দেখি সময়-সুযোগ পেলে, পকেটে টাকা থাকলে কিনেও ফেলি, কিন্তু কম্পিউটার পাঠাভ্যাসে বাগড়া বাধায়। গত সপ্তাহে বেশ অনেক দিন ঠিকঠাক চলার পর হঠাৎ করেই কম্পুবাবাজী ফেল মারলেন, দীর্ঘদিন ধরে বুকমার্কে রকমারী অন লাইন বইয়ের বাগান সাজিয়েছিলাম, কোনো কোনোটার বেশ কিছু অংশ পড়াও হয়েছিলো, সেইসব বুকমার্কের অধিকাংশ বই আসলে কোনো না কোনো প্রয়োজনে পড়া শুরু হয়েছিলো, প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পর আর জ্ঞানতৃষ্ণায় ঝাপিয়ে পরি নি শেষ করতে, কম্পুবাবাজী বিগড়ে যাওয়ার পর এখন সেই স্মৃতিরোমন্থন করে কোনো লাভ নেই। আমি প্রতিদিনই আগের দিনের স্মৃতি ভুলে যাই
অনেক দিন ধরে একটা বিলাসী শখ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের প্রত্যাশায় পুষে রেখেছি, স্বাধীনতা আন্দোলনের দলিল পত্র আর এশিয়াটিক সোসাইটির তিন খন্ডের বাংলাদেশের ইতিহাস বইদুটো কিনবো, প্রথমটির ১৫ খন্ডের দাম ১৫ হাজার, কিন্তু সেখানে অসংখ্য লেখা আছে যেগুলো আলাদা আলাদা করে পাওয়ার উপায় নেই এখন। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর একদিন সেসবের সফট কপি তাদের ওয়েব সাইটে আপলোড করবে, রাষ্ট্রীয় খরচে পরিচালিত গবেষণা সংস্থার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জাতীয় সম্পদ এবং সকলের সমান অধিকার আছে এখানে। যদিও বণিক সভ্যতা মেনে নিবে না, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত গবেষণাপুস্তক আমপাবলিকের কেনার সামর্থ্য না থাকাটাই বরং অধিকতর কাম্য এখানে। আমপাবলিক নিজেরাই ইতিহাস পড়ে অভিজ্ঞ হয়ে গেলে রাজনৈতিক নোংরামির ইতিহাস চর্চায় বিস্তর ঝামেলা হবে। ৭ই মার্চের ভাষণের শেষে জয় পাকিস্তান বলা না বলা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক প্রতিবছর নতুন করে সম্প্রচারিত হবে, একই চর্বিত চর্বন সাজিয়ে উপস্থাপন করবেন আমাদের ভাড়াটে মেধাশূণ্য ইতিহাসবিদগণ, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ভুল ভাবে সংকলিত ইতিহাস টিকে থাকবে মাথা উঁচু করে। ৭ই মার্চের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটির সঠিক ভাষ্য কোনো ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই, পূর্বদেশ প্রকাশিত ভাষণটি মূল ভাষণের ট্রান্সক্রিপ্ট নয় বরং অনুলিখন। সেটাই মুনতাসির মামুন তার মুক্তিযুদ্ধ কোষে লিপিবদ্ধ করেছেন, সেই মুক্তিযুদ্ধকোষ ঘেঁটে অনলাইন ইতিহাসচর্চা করছে মানুষজন।
জয়বাংলা আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিলো টাঙ্গাইলের সাংসদের সম্পাদনায়, সেখানেও প্রকাশিত সংবাদে কিছু অতিরঞ্জন আছে, সামরিক প্রয়োজনে, যোদ্ধাদের মনোবল বলিষ্ঠ রাখতে কিছুটা অতিরঞ্জিত সংবাদ সম্প্রচারের প্রয়োজনটাও হয়তো তখন ছিলো, সেসব কিঞ্চিৎ অতিরঞ্জিত সংবাদ হয়তো ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক প্রয়োজন পুরণ করবে না। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও নিজেদের মতো সংবাদপত্রিকা প্রকাশ করেছিলো, তাদের সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন ও আস্ফালনের সাথে জয়বাংলার তফাতটুকু রাজনৈতিক আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।
একই সাথে সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রচার করেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, তাদের অনুষ্ঠানের লিখিত ভাষ্যগুলো কয়েকটি ট্রাংকে ভরে জমা দেওয়া হয়েছিলো জাতীয় আর্কাইভে, সেইসব ট্রাংক হারিয়ে গিয়েছে, কিংবা নিখোঁজ, সেটা নিয়েও আমাদের ইতিহাসবিদদের দুশ্চিন্তা নেই। সুতরাং স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের আলাদা একটি গুরুত্ব আছেই, সেটা দুর্মূল্য কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্রন্থ।
সমস্ত দেশজুড়ে সকল নাগরিককে নিয়েই মুক্তিযুদ্ধের ব্যপ্তি ও বিস্তার, তাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বলবার আছে , প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো গল্প আছে, এইসব বিচ্ছিন্ন গল্পগুলো কখনও ইতিহাসের নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে নি, সেইসব ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণেরও প্রয়োজন আছে। কিন্তু যারা প্রবাসী সরকারের সাথে সংযুক্ত ছিলেন বিভিন্ন প্রকারে তাদের স্মৃতিকথার একটা গুরুত্ব আছে আমার কাছে।
গত কয়েক দিন বিভিন্ন ধাপে পড়ে শেষ করলাম এমন তিনজনের স্মৃতিকথা, প্রথম জন এ আর মল্লিক, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভুমিকার কিছুটা অংশ অবশ্য পড়েছিলাম আনিসুজ্জামানের আমার একাত্তর স্মৃতিচারণে। পড়লাম ইউপিএল এর আব্দুল মান্নানের স্মৃতিকথা একজন সাধারণ মানুষের জবানী, এবং আলী যাকেরের আত্মজীবনী।
আলী যাকেরের কৈশোর আর আমার কৈশোরের শেষাংশ কেটেছে একই মহল্লায়, যদিও মাঝের তিন দশকের ব্যবধানে সেই মহল্লার চেহারা বদলে গেছে, সীমান্ত খেলাঘর, মহিলা সমিতি আর ধুপখোলা মাঠে ইস্ট এন্ড ক্লাবে খেলে আড্ডা দিয়ে কাটানো এক দশক আমাকে অনেক আনন্দস্মৃতি দিয়েছে। আমি মাঠ, এর চারপাশের রাস্তা, কয়েকজন পুরোনো অধিবাসীদের চিনি, জানি এরা সবাই মিলে ৬২র দাঙ্গার সময় নিজ উদ্যোগেই দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং স্থানীয় হিন্দু নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলো। তাদের একজন হিসেবে ছিলেন আলী যাকের।
এই তিনজনের আত্মজীবনীর ভেতরে আলী যাকেরের আত্মজীবনি সবচেয়ে সুলিখিত, দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণে তিনি এক ধরণের পরিশীলিত উপস্থাপন ভঙ্গি রপ্ত করেছেন, যদিও তার আত্মজীবনীর কিছু অংশ আমার কাছে ভ্রান্ত মনে হয়েছে কিন্তু তার আত্মজীবনী পড়তে খারাপ লাগে নি।
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ বিভিন্ন ধরণের উপলব্ধিতাড়িত হন, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রতিবেদক হিসেবে আলী যাকের তার দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রতিবেদন লিখেছেন, ধারণ করেছেন, যথারীতি জমা দিয়েছেন উপযুক্ত কতৃপক্ষকে, মুক্তির গান ছায়াছবিতে যে যুবক-যুবতীদের গান গাইতে দেখা যায় এদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ছায়ানটের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ, স্বাধীনতা আন্দোলনে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করা, তাদের ভেতরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগানো এবং তাদের বিনোদনের মাধ্যমে এইসব শিল্পীরা নিজেদের অবদান রেখেছেন।
আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কিংবা আরও স্পষ্ট করে বললে বাঙালী জাতীয়তাবাদ যার উপরে ভিত্তি করে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালিত হলো সে ভিত্তি আর প্রেক্ষাপট গড়ে তুলেছিলো ছায়ানটের শিক্ষার্থীগণ। তারাই উৎসব উদযাপনে রবীন্দ্রচর্চা এবং বাঙালী সংস্কৃতি চর্চা করেছেন , সেসব উদযাপনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহন বেড়েছে, তারাই একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাতফেরীতে উৎসব এনেছেন, এই অবদানটুকু ঐতিহাসিক ভাবে মূল্যায়িত হয়েছে খুব কম।
মুক্তির গানের বেনু এখন প্রবাসী, তিনি এখনও হয়তো ঘরোয়া পর্যায়ে তার শিল্পচর্চা অব্যহত রেখেছেন, লন্ডন প্রবাসী টেলিভিশন চ্যানেল হয়তো এবার তার উপরে প্রতিবেদন করবে, কিংবা তাকে ভুলেই যাবে। কিছু কিছু সাধারণ মানুষের অসামান্য অবদান জানতে হলেও এইসব আত্মজীবনী পাঠ করা প্রয়োজন।
আত্মজীবনিগুলোতে বিভিন্ন রকম ইঙ্গিত আছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব, দলীয় কোন্দল, বিকৃত সমালোচনা, কুৎসা রটনা, সবই বিদ্যমান ছিলো, প্রবাসী সরকারের ভেতরেও এমনতর নোংরামি চলেছে, সেসব নোংরামির ভেতর দিয়েই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন অব্যহত ছিলো। স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত হয় নি, আলী যাকেরের অভিমত আমাদের সাংস্কৃতিক মুক্তি আন্দোলন মুখথুবড়ে পরাটাই এর অন্যতম কারণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা অগ্রাহ্য করে এমন সুশীল আকাশচারী মন্তব্য হয়তো ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করে কিন্তু সেটা একমাত্র কারণ নয়। মুক্তিযুদ্ধ দখলের রাজনীতিতে নাম লেখানো অসংখ্য মানুষের স্বার্থান্ধ কুকুর লড়াইয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া স্বাধীনতার চেতনার লাশ নিয়ে কামড়া-কামড়ি এখনও অব্যহত আছে।
সেই লাশের উপর নৃত্য করছে ৭ই মার্চের জয় পাকিস্তান-জয় বাংলা বিতর্ক, সেই লাশের উপর নাচছে ২৫শে মার্চ আর ২৭শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা বিতর্ক, সেই লাশটাই পরে গিয়ে ভেসে উঠছে ১৬ই ডিসেম্বর, কেনো ওসমানী ছিলেন না। সেই লাশের গন্ধ লুকিয়ে কেউ বলছে আত্মসমর্পনের দলিলে তিনজনের সাক্ষর আছে, এদের একজন বাংলাদেশী, একজন মুক্তিযোদ্ধা আবু ওসমান তার স্মৃতিচারণমূলক ঐতিহাসিক গ্রন্থে আত্মসমর্পনের দলিলের স্ক্যান কপি দিয়ে প্রমাণ করেছেন সাক্ষর আছে দুটো। এইসব অপপ্রচার আর প্রচারে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠছে অনেকের, তারা লাফিয়ে ঝাপিয়ে বিলাপ করে তাদের দেশপ্রেম প্রকাশ করছে, আমি মাছের বাজারে ঢুকে মাছির লাথি খাচ্ছি।





শেষের কথাগুলো এত বেশী নির্মম আর এত বেশী সত্যি
শেষের কথাগুলোই.........
এমন লেখা অফলাইনে পড়া এবং কোনো অনুভূতি না জানানো ঘোরতর অন্যায়।
সিম্পলি বেস্ট।
আলী যাকের এর আত্মজীবনী পড়বো। এবার কিনেছি, পড়া হয় নি এখনো। এ আর মল্লিক নিয়ে আপনার আগ্রহ বরাবর দারুণ লাগে।
ডঃ এ আর মল্লিক বা ডঃ আজিজুর রহমান মল্লিক ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা সচিব, ভারতে বাংলাদেশের প্রথম হাইকমিশনার এবং বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী। ইতিহাসের অধ্যাপক এই বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য।
আরেকটি তথ্য হয়তো অনেকেই জানেন না, অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী তাঁর মেয়ে জামাই ।
বিষয়টা অবাক করার মতো, মানে যাদের আমরা বিজ্ঞ, নির্ভরশীল, আলোকবর্তিকা ভাবছি তারা মাত্র কয়েকটা পরিবারের সদস্য- রসুনের গোড়ায় যারা নেই তারা আমজনতা-
যারা বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছে তারাও দেখা যায় এইসব মানুষদের পরিচিত-পরিচিতা। মহিলা পরিষদের মুক্তিযুদ্ধদিনের স্মৃতি পড়ছি, সেখানেও একই বিষয়, ওর মামাতো ভাই অমুক সচিব, চাচাতো ভাই বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, নইলে স্বামী- দুলাভাই সাংসদ-
পুরো বিষয়টাই একেবারে তারকাময়।
ঠিক। একদম ঠিক। এনাদের পরিবারের সবার তালিকা লতায় পাতায় এক।
আলী যাকেরের বইটা কেন যে এবারের মেলায় কেনা হল না, বুঝতেছি না। সাধারণ লোকের কাহিনী পড়ে খানিকটা হতাস হয়েছিলাম।
মন্তব্য করুন