অবিলম্বে স্বাস্থ্যনীতি চাই
চতুর্মাত্রিক ব্লগে একজনের একটা পোস্ট দেখলাম
কোথায় আছি? কেন আছি? লিখেছেনঃ নিশুতিরাতের চিঠি (তারিখঃ ১২ মার্চ ২০১২, ৩:০৬ পূর্বাহ্ন)
থাকি ল্যাব এইডের পাশেই। কাল রাত সাড়ে বারোটার দিকে ল্যাব এই্ডের আশেপাশে বিশাল চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাইরে বের হয়ে গেলো আমার ভাই। নিচের দারোয়ানরা তাকে বাইরে যেতে দেয়নাই। কিন্তু দূর থেকেই ডা দেখলো আর ঘটনা যা শোনা গেলো তা ভয়াবহ। এক রোগীকে টাকা কম পড়ায় ভর্তি না করে বাইরে ফেলে রেখেছে দুই ঘন্টা। টাকা জোগাড়ের পরে ভর্তি করে ভুল চিকিৎসায় মৃতপ্রায় রোগীকে পাঠিয়ে দিলো সেন্ট্রাল হসপিটালে, সেখানে যাবার পরে রোগীকে মৃত ঘোষণা করে বলা হলো যে ভুল ডায়াগনসিস আর ভুল ইঞ্জেকশান দেয়া হয়েছে। রোগীর সন্তানেরা ক্ষোভে দুঃখে কয়েকটা ফুলের টব লাথি মেরে ভেংগে ফেলায় উপরতলার নির্দেশে হাসপাতালের সমস্ত স্টাফ মিলে চারজন মানুষকে পিটিয়ে রাস্তায় শুইয়ে দিলো, এর পরে ছেলে মেয়েগুলোকে প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে মিডিয়ার লোক ডেকে ভুয়া নাটক সাজিয়ে ওদের বিরুদ্ধে মূল্যবান সম্পত্তি ধ্বংসের অভিযোগ দিয়ে দিলো। এই ঘটনা তো খবরের কাগজেও আসবেনা। এক ফোঁটা দাম নাই আমাদের মানুষদের, আমাদের জীবনের। আমাদের এই ঘোড়ার ডিমের দেশের জন্য সরকার আর হর্তা-কর্তারা কি এতোই মূল্যবান? টাকা থাকলেই ক্ষমতা দেখাবে লোকজন। হাসপাতালের মতো জায়গা হয়েছে সহজে টাকা উপার্জনের মোক্ষম জায়গা। এ্রসব অনাচারের বিচার কে করবে? কবে করবে? আহত মানুষগুলোকে যে পুলিশে ধরে নিয়ে গেলো, তাদের বাবার মতো তাদের জীবনের নিরাপত্তাই বা কে দেবে? প্রমাণ ধ্বংসের জন্য ল্যাব এইডের চিকিৎসার কাগজগুলো তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। আমাদের মুক্ত করবে কে? মাঝে মাঝে মনে হয় চিৎকার করে বলি, চাইনা এই গণতন্ত্র, ষোল কোটি মানুষের গলার স্বরের চেয়ে কি এইসব শকুন হায়েনাদের গলা বেশি? পাকিস্তানী হায়েনাদের নিয়ে আমাদের মিটিং মিছিল, ঘৃণাবোধের সাথে যোগ হওয়া উচিত এইসব দেশী হায়েনাদের প্রতি ঘৃণাবোধও। আমার ক্ষমতা হয়তো বেশি নাই, তবে আর যাই হোব ল্যাব এইডে আর কোনদিন যাচ্ছিনা এইটুকু জানি।
আমাদেরও দায় কম না। আমরা এসব দেখি, নিরবে উপেক্ষা করে যাই, রোগীর চিকিৎসার সামর্থ্য নেই তাকে চিকিৎসা করবো না, এমন কোনো বাক্য সম্ভবত বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে উচ্চারণ করলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে বিষয়গুলো খুব স্বাভাবিক।
হাসপাতালের বাইরে চাটাইয়ে একজন প্রসুতি বিনা চিকিৎসায় পরে আছে, তার আশেপাশে ভীড় করে আছে অন্তত ১০জন, সে দৃশ্য উপেক্ষা করে আমিও চলে গেছি একদিন, ভেবেছি সেখানে ভীড় করে থাকা ১০ জনের একজন কিংবা দুজন সেই রোগীর স্বজন। নাগরিক নির্লিপ্ততা কিংবা নির্বিকারত্বে হয়তো উপেক্ষা করা কিংবা সান্তনার পরতবোলানে ভাবনার বাইরে অন্য কিছু শোভন হতো না। অন্য কেউ হয়তো দায়িত্ব নিবে আমার এখানে না জড়ালেও চলবে, এই নিরাপদ জীবনযাপনের লোভে সেদিন আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করি নি কে এই রোগীর স্বজন।
ল্যাব এইডের বিরুদ্ধে এর আগেও রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব পালনের অবহেলার অভিযোগ উঠেছে, সেখানে ওপেন হার্ট সার্জারি করা ১০জন পরিচিতের ভেতরে ৬ জনই পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে মৃত্যুবরণ করেছেন, ডাক্তার বলেছেন রোগীর রিকভারির সামর্থ্য ছিলো না।
দীর্ঘদিন সম্ভবত এদের পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারের এসি আর জানালা পরিস্কার করা হয় নি, পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে জীবন্ত জীবানুগুলো এইসব রোগীর মৃত্যুর জন্য দায়ী। বাংলাদেশে যারা বাধ্য হয়ে ওপেন হার্ট সার্জারী করে তাদের তেমন ক্ষমতা নেই, ট্যাকের জোর নেই, তারা পুলিশকেও জানায় নি, কিংবা হাসাপাতালের চিকিৎসা সেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানকারী কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই।
কোনো সরকারই তেমন উদ্যোগী হয়ে একটা সর্বজনস্বীকৃত স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করেন নি, এখানে গলিতে- মহল্লার গ্যারেজে গড়ে ওঠা হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স পেতে কি কি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে এবং কারা এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন এমন কোনো সরকারী বডি এখানে তৈরি হয় নি। কারা কি যোগ্যতায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন সেটাও পর্যবেক্ষণ করা জরুরী।
সংবাদপত্রে পড়লাম কম্যুনিটি ক্লিনিকের দারোয়ান ডাক্তারের কাজ করছে, ডাক্তার থাকেন বড় শহরে, তিনিই রোগী দেখেন, ঔষধ দেন, এমন অদক্ষ মানুষজন দিয়ে ক্লিনিক চলছে, ল্যাব এইডের কথা আলাদা, সেখানে আবার সপ্তাহে একদিন দুই দিন ভারতীয় চিকিৎসক এসে চিকিৎসা সেবা দেন।
কিন্তু হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার মান বিষয়ে তেমন কোনো সনদ দেওয়া প্রতিষ্ঠান আমার চোখে পরে নি। পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের ছাড়পত্র নেই, বর্জ্য ব্যববস্থাপনার তেমন সুবন্দোবস্ত নেই এমন অনেকগুলো ক্লিনিকই ঢাকা শহরে আছে, ইউনাইটেড হাসপাতালেরও একই অবস্থা, কিন্তু এসব নিয়ে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই, সংগতিহীন মানুষজন যারা নিতান্ত বাধ্য হয়ে এসব জায়গায় যাচ্ছেন স্বাস্থ্য সেবা নিতে তারা নিজেরাও জানেন না তাদের আদতে কি কি সেবা পাওয়ার অধিকার আছে এখানে।
নিদেনপক্ষে সকল রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে, সরকারী-বেসরকারী হাসপাতাল-ক্লিনিকে যে রোগীই আসুন না কেনো ডাক্তারের প্রথম কাজ কবে তাকে যথোপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া, তার পকেট ঘেঁটে তার ম্যানিব্যাগের পয়সা গোনার কাজটা অন্য কেউ করবে, তার দায়িত্ব জীবন বাঁচানো তিনি সেটা বাঁচাতেই অধিক মনোযোগী হবেন।
একটা হাসপাতালে প্রতিদিন অন্তত হাজার খানেক স্যাম্পল ঔষধ মুফতে আসে, হাসপাতালের ডাক্তাররা যদি একটা রোগীকে বিনা ফিসে দেখেন তার পরের দিন সকালে নাস্তার টেবিলে বাটার কিংবা জ্যামএর টান পরবে না আমি জানি। তারা স্বচ্ছল, তারা অবশ্য কেউ কেউ নিজের এলাকায় গিয়ে একদিন দাতব্য চিকিৎসা করেন, এলাকার মানুষ দেখে বাহবা দেয়, বড় ঘরের পোলা এইটা, কিন্তু এই মানুষটাই ক্লিনিকের দরজার সামনে পরে লাশ হলেও সে রোগীর দিকে তাকান না, হাসপাতালের দারোয়ানদের এবং যারা ইনফর্মেশন সেন্টারে বসেন তাদের দুর্ব্যবহারের কথা বাদই দিলাম। সংসারের যাবতীয় অশান্তিতে তেতোমুখে বিরক্ত হয়ে বসে থাকা এইসব ইনফর্মেশন সেন্টারের লোকজনদের চেহারা দেখলে, তাদের কথা শুনলে প্রথমে আমার ওদের কানের নীচে কষে একটা চটকানা দিতে ইচ্ছা করে, কিন্তু আমি সাধারণত এমন আচরণ করি না। দীর্ঘদিন ছেলেকে নিয়ে ঘুরার ফলে আগের মতো সহজে খিস্তিও আসে না,
তাই নিপাট ভালোমানুষের মতো ব্লগে লিখি, দাবী জানাই, আমাদের একটা স্বাস্থনীতি প্রয়োজন, আমাদের প্রতিটা রোগীই যেনো চিকিৎসা পান এটা নিশ্চিত করাটা জরুরী, ভুল চিকিৎসায় কিংবা চিকিৎসকের অবহেলায় যদি কোনো রোগীর মৃত্যু হয়, সে রোগীর স্বজনদের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হবে চিকিৎসককে, যদি তার অবহেলা প্রমাণিত হয়, গুরুতর অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে, এমন বিধান সম্বলিত একটা নীতিমালা বররমান প্রেক্ষিতে একান্ত প্রয়োজন।
শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা এবং নিরাপত্তা সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সকল মানুষের কল্যানে, তাদের কল্যানে নিয়োজিত না থাকলে এদের প্রত্যেকেরই বেশ বড় অংকের জরিমাণার বিধান রাখা বাঞ্ছনীয়। একটু নাগরিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, প্রতিদিন বাংলাদেশী হিসেবে লজ্জিত হতে হতে এখন মাটির সাথে লেগে আছে মাথা।





দুটো লিঙ্ক রেখে গেলামঃ
ডাক্তাররা অমানুষ, গরিবের রক্তচোষা: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান
ডাক্তাররা অমানুষ! গরিবের রক্তচোষা! - এ বি এম আব্দুল্লাহ
~
দেশে ডাক্তারি করতে হলে বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন লাগে। কয়টা ভারতীয় ডাক্তারের রেজিস্ট্রেশন আছে ? রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চিকিৎসা করা আইনত দন্ডনীয়।
ল্যাব এইড কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণের এহেন প্রদর্শন আর কতো?
স্বাস্থ্যনীতি যদি প্রণীতও হয়, দেখা যাইবো সেইটারেও এক্সপ্লয়েট করা হইতেছে মিনিমাম কিছু সম্মানীর বিনিময়ে
স্বাস্থ্যনীতি যদি প্রণীতও হয়, দেখা যাইবো সেইটারেও এক্সপ্লয়েট করা হইতেছে মিনিমাম কিছু সম্মানীর বিনিময়ে
ল্যাব এইডের এই আকাম অনেক দিন থেকেই চলতেছে...
সহ্যের একটা লিমিট থাকা দরকার...
একটা মানববন্ধন করা প্রয়োজন ... মানুষের দৃষ্টি আকর্ষনের দরকার আছে...
কী বলব ? একসময় ল্যাবএইডে কাজ করতাম। এরকম অনেক কিছু দেখতে এবং সামলাতে হয়েছে আমাকে। এ নিয়ে ম্যানেজমেন্টের সাথে বিভিন্ন সময়ে কথাও বলেছি। লাভ বেশি কিছু হয়নি। কিছুদিন সতর্ক থেকেছে। আবার কদিন বাদেই যেই লাউ, সেই কদু। একসময়তো নিজের বিবেকের কাছে দায় এড়াতে না পেরে ল্যাবএইড ছেড়ে দিয়েছি। আমার অভিজ্ঞতায় শুধু বলব- ল্যাবএইডের সব ঠিক থাকলেও একটাই বড় সমস্যা.... সিস্টেম লস... । এ ব্যাপারে কেউ কাউরে কেয়ার করেনা। খারাপ লোকদের হাতে ল্যাবএইডের প্রশাসন। ভালো লোকগুলো কোনঠাসা হয়ে আছে। ২/১ টি হারামজাদা কর্মকর্তার কারনে মালিকপক্ষও প্রায়ই মিস গাইডেড হয়...। এইসব চাটুকারদের কবল থেকে মুক্তি নাই। অবশ্য মুক্তি চায়ওনা ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষ...
আক্ষেপ...ক্রোধ...রাগ..ক্ষোভ...দুঃখ...বড় জোড় আক্রোশ...আমরা সাধারন মানুষ শুধুমাত্র এ গুলোই প্রকাশ করতে পারি। কিন্তু এ সমস্ত অব্যবস্থার সমাধান কি? কে দেবে সমাধান? সরকার? বিরোধী দল? রাজনীতিবিদ? সুশীল সমাজ? .......হায় আমার দেশ...আমরা বড়ই অভাগা। ।।
এসবের বিরুদ্ধে আমাদের মত সাধারণ মানুষেরই সোচ্চার হওয়া দরকার। সেবা দেওয়ার নামে এরা আসলে ব্যবসাই বুঝে শুধু।
ঢাবির অধ্যাপক ও সংগীতজ্ঞ মৃদুল কান্তি চক্রবর্তীকে মাত্র একহাজার টাকার জন্য ভর্তি করেনি ল্যাবএইড। টাকা জোগাড়ে দেরি হওয়ায় হাসপাতালে গিয়েও বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছেন তিনি! সেটা নিয়ে তো কতো কাহিনীই হলো। ৫০ লাখ টাকা 'ক্ষতিপূরণ' দিয়ে পরিবারের সাথে মীমাংসা, হাইকোর্টের রুল জারি, ছাত্রদের বিক্ষোভ - কোনোকিছুতেই ল্যাবএইডের এতটুকু চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটেনি। এসব দেখাশোনার কেউ নেই, কোনোদিন থাকবে না। দেশটা চলবে উদ্ভট উটের পিঠে, চিরকাল!
ল্যাব এইডের মতো ক্লিনিক মনে হয় বিশ্বে একটাই। অন্য কোনো সভ্য দেশ হলে এর সবার থাকতো শ্রীঘরে।
মন্তব্য করুন