ঋকের স্কুল
১.
বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিশেষত ইলেকট্রনিক মিডিয়া অযথা নৃশংসতা প্রচার করে, ক্ষেত্রবিশেষে সেটার লাইভটেলিকাস্টও হয়। ২০০৯ এর ২৫শে ফেব্রুয়ারীর লাইভ টেলিকাস্টের প্রতিক্রিয়ায় অন্য সবার কি অবস্থা হয়েছিলো আমি জানি না, কিন্তু ঋকের ভেতরে ইউনিফর্ম ভীতি প্রবল হয়েছিলো। তখন রাস্তায় বন্দুক কাঁধে পুলিশ দেখলেও আমার টি-শার্টের নীচে মুখ লুকিয়ে রাখতো ও। পরবর্তী ২ বছরে ওর অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এখন পুলিশ দেখলে আর ভয়ে নীল হয়ে যায় না, টি শার্টের নীচেও লুকায় না।
ওকে দোষ দিয়েও আসলে লাভ নেই, ওভারপ্রোটেক্টিভ প্যারেন্টিং এর ঝামেলাটা সম্ভবত আমারই, জানালার গ্রীল বেয়ে উপরে ওঠা, বারান্দার গ্রীল ধরে ঝোলা কিংবা ছাদের কোণায় গিয়ে দাঁড়ানো, ওর জন্য সকল কিছুই নিষিদ্ধ করে রেখেছিলাম। অবশ্য ছাদের কোণাটা একেবারেই প্রয়োজনীয় নিষেধ ছিলো, আমরা এর আগে যে বাসায় ভাড়া থাকতাম তার ৪ তলার এক কোনা সম্পুর্ণই ফাঁকা, কোনো গ্রীল নেই, পা ফসকালেই সোজা ৩৫ ফুট নীচের দেয়ালে গিয়ে পরবে। ওর ছাদের নিরাপদ দৌড়ানোর সীমানা এখনও আছে, যদিও এ বাসার ছাদের রেলিং ৪ ফুট উঁচু, কিন্তু তারপরও নিষেধটা এখনও বলবত আছে।
সাগর -রুনি নিহত হওয়ার পর ৬ সপ্তাহ পার হয়ে গেলো, ঋকের স্কুলের গেটে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঝুলানো পোস্টারও নামানো হয়েছে, ইন্দিরা রোডের সামনেও যে পোস্টার আর ব্যানার ছিলো, সেটাও খুলে ফেলা হয়েছে, ১২ই মার্চের চলো চলো ঢাকা চলো পোস্টারের নীচে চাপা পরেছে সাগর-রুনির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি।
১১ই ফেব্রুয়ারী দুপুরে যখন আস্তে আস্তে গণমাধ্যমে এই হত্যাকান্ডের সংবাদ আসা শুরু করলো, সে সময় লিপি সাগরের ছবি দেখে বললো গতকালের পিকনিকে ও সাগরকে দেখেছে। আমি তেমন পাত্তা দেই নি, পরের দিন ঋককে স্কুলে নামিয়ে যখন সকালের পেপারটা খুললাম তখন জানলাম মেঘ ঋকের স্কুলেই নার্সারিতে পড়তো, এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতার বোধতো ছিলোই সেই সাথে বাংলাদেশী পুলিশদের অপেশাদারিত্বের ভাবনাও মাথায় ছিলো। ঋক পিকনিকে গিয়েছিলো শুক্রবার, শুক্রবার রাতেই ঘটনা ঘটেছে, পুলিশ অনেক রকম অনুমাণ করেছে, হয়তো উজবুকগুলো সকাল বেলাই স্কুলের গেটে গিয়ে বসে থাকবে, নইলে প্রিন্সিপালের রুমে গিয়ে বিভিন্ন রকম কথা-বার্তা বলবে।
বিডিআর পিলখানা ঘটনার পর ধীরে ধীরে দুই বছরে যতটুকু স্বাভাবিকতা এসেছিলো ঋকের সেটুকুও বোধ হয়ে এই ধাক্কায় চলে যাবে, এমন একটা আশংকা নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে ঋককে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তেমন ভয়ংকর কিছু ঘটে নি, ওদের স্কুলের এক ছাত্রের প্যারেন্টস মারা গেছে। অবশ্য তখনও বুঝি নি শৈশবের কল্পনার জোর। তারপরের দিন ওদের স্কুল থেকে সব শিক্ষক শিক্ষিকা গিয়েছিলো মেঘের বাসায় ওর সাথে দেখা করতে- ২১শে ফেব্রুয়ারী ওদে স্কুলেই শহীদ মিনার বানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে, সকাল বেলা ফুল কিনে সেখানে যাওয়ার পথে আমাকে রিকশায় বললো-
বাবা পাকিস্তানের সাথে তো আমাদের আর যুদ্ধ হবে না, তাই না বাবা।
আমি বললাম, না আর যুদ্ধ হবে না।
আর যুদ্ধতে তো ওর ছোটোদের মারবে না, শুধু প্যারেন্টসদের মারবে ঠিক না বাবা।
আমি বললাম না রে বাবা যুদ্ধ হবে না আর।
আর শহরে তো যুদ্ধ হবে না, যুদ্ধতো হবে গ্রামে, এখানে যারা আছে তাদের তো কিছু হবে না।
আমি অবশ্য কথার হাতা-মাথা কিছুই বুঝতে পারলাম না। ও স্কুলে এত মানুষের কাছে এত এত সংবেদ পাচ্ছে, কোনটার প্রতিক্রিয়ায় কি বলছে সেটা এখন বুঝে ওঠা কঠিন আমার জন্য। কিন্তু সেটার ধাক্কাটা কতটুকু তা বুঝলাম গত সপ্তাহে-
হঠাৎ করে ঋক এসে বললো বাবা অনেক দিন তো বাংলাদেশে থাকলাম, এইবার আমেরিকায় চলে যাবো। কবে নিয়ে যাবা আমাকে?
আমি আর কি বলবো, বললাম ঠিক আছে তাহলে আমরা সামনের বছর চলে যাবো, এখন তো তোমার স্কুল, স্কুল শেষ হোক তারপরে যাই।
আমার তো জুন মাসেই সিনিয়ার কেজি শেষ হয়ে যাবে, তাহলে তখন চলে যাবো?
কোনমতে ভুজুংভাজুং দিয়ে সামলানো গেলো কিন্তু অনেক জিজ্ঞাসা করেও জানা গেলো না হঠাৎ করে কেনো তার স্কুলের উপরে এত বিরাগ? স্কুলে ও যথেষ্ট বুলিড হচ্ছে, ওর চেয়ে লম্বায় বড়- শক্তিতে দড়ো ছেলেরা ওকে ধাক্কা দিচ্ছে, মেয়েরা দোলনা থেকে ফেলে দিচ্ছে, ওর ফ্যাঁ ফ্যাঁ করে স্কুলের মাঠে দৌড়াচ্ছে, ওভারফ্রেন্ডলী ঋক অযথা দৌড়ানোর বাইরে খুবভালো ফ্রেন্ড তৈরি করতে পারে নি। কিন্তু তারপরও সে স্কুলে যেতে পছন্দ করতো, কিন্তু হঠাৎ কি হলো সেটাই বুঝতে পারলাম না।
২.
ঋক কথা বলা শিখেছে অনেক দেরিতে, দুই বছর হয়ে যাওয়ার পর ও নিয়মিত কথা বলা শুরু করেছে, স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওর ভাষা আর স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর ওর ভাষার ব্যবহারে বেশ তফাত , ওর পরিবেশ-প্রতিবেশ সব জায়গা থেকেই তথ্য-উচ্চারণ ভঙ্গি এবং অন্যান্য আচরনীয়-অনাচরনীয় বিষয়াসয় গ্রহন করছে, যখন ও কথা বলা শুরু করলো, তারপর থেকে ও খুব কম সময়ই কোনো কিছুর আব্দার করেছে। অবশ্য আব্দারের সীমানা চাটনি-আচার- বেলুনের বাইরে যায় নি।
রাতে ঘুমানোর আগে আগে কিংবা বিকেল বেলা যখন আড্ডা দিতে যেতাম তখন সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ওকে বলতাম তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসতে হবে?
ও বেশীর ভাগ দিনই কোনো কিছু আনতে বলতো না, তবে কোনো কোনো দিন অবশ্য বলতো বাবা এটা নিয়ে আসবা। অঢেল টাকা পয়সা কখনও ছিলো না, মাসের শেষের দিকে হলে ওকে বলতাম বিষয়টা আমার মাথায় থাকলো, আমি সামনের মাসে এটা নিয়ে আসবো।
মাথায় রাখবা কিন্তু, বুঝলা। এর বাইরে অবশ্য অন্য কোনো বক্তব্য ওর থাকতো না।
পরে কখনও হয়তো বলতো তোমাকে যে বলছিলাম ঐটা তোমার মাথায় আছে?
মনে থাকতো না, ও আবার মনে করিয়ে দিয়ে বলতো এটা কিন্তু অবশ্যই মাথায় রাখবা।
কয়েক দিন আগে বৃষ্টির পানি জমলো ছাদে, আমরা বৃষ্টির পানি দেখতে গেলাম। ঋক বললো, তাহলে তো আমরা এইখানে নৌকা চালাতে পারি, আমাদের তাহলে ইনস্টুমেন্ট কিনতে হবে, নৌকা বানাতে কি কি লাগবে মনে আছে?
ছোটো বোন কোনো এক সময় ওকে বললো তাহলে ছাদের মধ্যে স্পীডবোট চালাতে হবে, ঐটা জোরে গিয়ে ছাদের দেয়ালে ধাক্কা লাগবে, অনেক মজা হবে ।
ঋক এতে রাজী না, বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ করছে, হঠাৎ দেখলাম ও কানের নীচে আঙ্গুলের টোকা দিচ্ছে- ঐটা আমি মাথা থেকে ফেলে দিলাম।
ছাদের উপরে স্পীডবোট চালানোর আইডিয়া আঙ্গুলের টোকায় ফেলে দেওয়ার ভঙ্গিটা চমৎকার লাগলো।
৩. বাসায় এখন তিন তিন জন শিক্ষক, এর মধ্যে ঋক ঘরেই একটা স্কুল খুলে বসে আছে। আমাদের বাসার প্রতিটা ঘরের দরজায় নেমপ্লেট ঝুলছে কোনোটা নার্সারির ক্লাশরুম, কোনোটা সিনিয়ার কেজি, কোনোটা ক্লাশ টু। খুব চিন্তিত প্রিন্সিপাল ঋক বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, কাউকে প্রমোশন দিয়ে উপরের ক্লাশে দিচ্ছে, এর মধ্যে আমার কাজিনের আসবার সংবাদে ভীষণ উৎফুল্ল ঋক, আমাকে বললো আমাদের স্কুলের তো ইউনিফর্ম বানাতে হবে। স্কুলের স্টুডেন্ট বেড়ে গেলো। আরএকজন বাড়লেই তো আমরা ইউনিফর্ম বানাবো।
ইউনিফর্ম সাদা শার্ট, এ্যাশ স্কার্ট আর কালো টাই। কাজিন আসবার সংবাদে উৎফুল্ল ঋক দাদাকে গিয়ে বললো, ওরা তো স্কুলে আসতেছে না, ওরা তো ফেল করবে। আমি তো ওদের ক্লাশ টেস্টের কোশ্চেন করে ফেললাম। ওরা তো পাশ করতে পারবে না। মনে আছে তোমার? ওরা কবে আসবে?
এর ভেতরে একদিন ওকে বাড়তি জ্ঞান দিতে গিয়ে বললাম শুনো ইংরেজীতে ভাওয়েল আর বাংলার স্বরবর্ণ উচ্চারণ করতে গেলে তোমার কখনও মুখ বন্ধ করতে হবে না, এইজন্য এইগুলোকে স্বর:বর্ণ বলে। যেমন ধরো এ- ই- আই- ও- ইউ।
তারপর স্বরবর্ণ উচ্চারণ করে দেখালাম, 'অ', 'আ'।'ই' 'ঈ''উ'' ঊ, এ' ঐ ও ঔ। এইসব উচ্চারণ করার সময় তোমার ঠোঁট বন্ধ না করলেও হয়, কিন্তু ব্যাঞ্জন বর্ণ বলার সময় তোমাকে ঠোঁট বন্ধ করতে হবে। যেমন ধরো "ক"/
এতটা না করলেও হতো অবশ্য- দেখলাম ও আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করার বদলে একই সাথে সবগুলো উচ্চারণের চেষ্টা করছে। ঠোঁট বন্ধ না হওয়ার বিষয়টা কেমন করে যেনো ওর কাছে ঠোঁটের আকৃতি বদল না হওয়াতে অনুদিত হয়েছে, সুতরাং ঠোঁট গোল করেই ও সব স্বরবর্ণ উচ্চারণের চেষ্টা করতেছে, একই সাথে উচ্চারণ বিকৃতিও হচ্ছে।
এইআইওইউ করার সময় ওকে জিজ্ঞাসা করা হলো আচ্ছা বাবু বলো তো এইগুলোকে কি বলে?
এইগুলো হলো ভাওয়েল।
ইংরেজি এলফ্যাবেটে অন্য যে অক্ষরগুলো আছে ওগুলোকে তাহলে কি বলে?
ঐগুলা হলো আনভাওয়েল। ঋকের ত্বরিত জবাব।





পিচ্চিপাচ্চাগুলোর কান্ড কারখানা আমার সবসময়েই ইন্টারেস্টিং লাগে
-জোশ।
বাসায় স্কুল বানানোটাও জোশ।
ঋক তো দেখি মহা পন্ডিত। আপনার লেখাটা পড়তেই এত মজা লাগলো, তাহলে বাসা ওর কর্মকান্ড দেখতে তো আপনাদের ভীষণ ভালো লাগে।
ঋকের গল্প পড়তে বেশ লাগলো।
শুরুটা বেশ ভাবিয়ে তোলার মত, শেষ টা মজার।
লেখার ধরন টা ভাল লাগলো।
ঋকের স্কুল বানান বাসায় ... ঋহানকে ভর্তি কৈরা দিমু সেই স্কুলে
ঋক'কে অনেক ভাল্লাগছে, যতবারই দেখেছি আমার সাথে ওর ভালো গেছে। আর ওর কথাবার্তা শুনতে দারুন লাগ্লো
ঋকের গল্প পড়তে বেশ লাগলো।
মন্তব্য করুন