কবিতার আস্তাবল -০১
এখন মনে নেই কোথায়, কোন কবির জবানীতে পড়েছিলাম কবিতা লেখা প্রাত্যকৃত্যের মতো নৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত করতে হয়, কবিতা হোক কিংবা না হোক নিয়ম করে প্রতিদিন স্কুলের হোমটাস্ক করার মতো কবিতা লিখতে বসতে হয়- এভাবে অভ্যস্ত হওয়ার পর দিব্যি কবিতা আসবে, আসতেই হবে। একটা সময় হোক কিংবা না হোক নিয়ম করে কবিতা লিখতে বসতাম, বিভিন্ন শব্দের আঁকিবুকি খেলতাম ডায়েরীর পাতায়। দৈনন্দিন জীবনে তেমন আশ্চর্যজনক কিছু ঘটতো না, সেই একই রকম জীবনযাপনের ফাঁকেফোঁকরে হয়তো হঠাৎ কারো প্রতি সামান্য প্রেমবোধ জাগ্রত হতো- কখনও অভিমান হতো, কখনও তীব্র আনন্দ- ক্ষুব্ধ হতাম, উচ্ছ্বসিত হতাম। ডায়েরীর পাতা সেসব অনুভবকে ধারণ করতো কোনো কোনো দিন, তবে অধিকাংশ ম্যারম্যারে দিনে নিছক শব্দজব্দ খেলবার মতো কবিতা লেখার প্রচেষ্টা-অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকতাম।
কবিতা বিষয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা কখনও হয়ে উঠে নি আমার, খুব সীমিত কয়েকজন কবির কবিতা পড়া হয়েছে- হয়তো এদের কারো কারো কবিতা বারবার পড়া হয়েছে। সম্ভবত মহাদেব সাহার কবিতা দিয়েই কবিতা পড়ার সূচনা, আহসান হাবীব, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, হাসান হাফিজ, হেলাল হাফিজ কিঞ্চিৎ রফিক আজাদ আর দাউদ হায়দারের নিষিদ্ধ কবিতার বইয়ের বাইরে তেমন কিছুই পড়া হয় নি তখন।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে পড়া হয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- আবুল হাসান। তাদের কবিতা ভালো লাগতো- বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠবার পরে দেখলাম সহপাঠীদের বেশ কয়েকজন কবিতা লিখে, তাদের কল্যানে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আবিদ আজাদ এবং বিভিন্ন কবির খুচরো কবিতা পড়া হয়েছে। তাদের সাথে মাঝে মাঝে কবিতা নিয়ে আলাপ হয়েছে, কারো কারো কবিতায় সম্পাদনার কাঁচিও চালিয়েছি- তবে মারুফের বাসায় অবসরে পড়া জয় গোস্বামীর মতো ধাক্কা অন্য কেউ দিতে পারে নি।
কবি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক, সম্ভবত পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন তার কোনো লেখায়- কিংবা শক্তি- মনে পরে না, তবে কবিতা কবিতা হয়ে উঠবার সবচেয়ে বড় অনুভবটুকু প্রথমেই জন্মায় কবির পাঠে- কবিতার ভিন্ন ভিন্ন পাঠের সম্ভবনা সবসময়ই থাকে কিন্তু কবিতা হয়ে উঠলে সেসব ভিন্ন ভিন্ন পাঠ আদতে অর্থহীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পর্যায়ে প্রায় দ্বিধাবিভক্ত অবস্থায় এক বন্ধু ছন্দপরিক্রমা উপহার দিলো জন্মদিনে আর জন্মদিনের সন্ধ্যায় টেনি দা'র জবানি উল্লেখ করে অন্য এক বন্ধু বললো কবিরা গরমে ঘামতে ঘামতে বর্ষা সংখ্যর কবিতা লিখে।
কবিতা লেখা, ছিঁড়ে ফেলা, বারংবার সংশোধনের পর্যায়ে পড়া শুরু হলো জীবনানন্দ, পরবর্তীতে নীরোদচন্দ্র আর আহসান হাবীবের বাইরে কবিতা পড়া হলো না আমার। আমি রবীন্দ্র সমগ্র হাতে নিয়েও গদ্যছন্দে লেখা কবিতাগুলো বাদ দিলে অন্য কবিতা তেমন পড়ি নি, গীতনাট্য আর গীতাঞ্জলী পড়েছি।
তবে গত ১২ বছরে তেমন কবিতা লিখি নি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাথে আমার কবি জীবনের অনানুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটেছে। যখন কবিতা লিখতাম তখন বেশ কয়েকবার কবিতার পান্ডুলিপি করেছি, কবিতার বইয়ের ভূমিকা লিখেছি অন্তত ৩ বার, পুরোনো ডায়েরীর কোথাও না কোথাও কবিতার ঋণস্বীকার আর অনুপ্রেরণার সংবাদও আছে।
দুই বছর আগে বেশ কিছু অনুকবিতা লিখেছিলাম, তখন অক্টোবরের পাগলামিতে মনে হয়েছিলো ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা কবিতা লিখে একটা কবিতার বই বের করে ফেলতে হবে- সে উন্মাদনা কমে যেতেও সময় লাগে নি, নভেম্বরের মাঝামাঝি এসে সে উন্মাদনা কাটিয়ে উঠলাম, ভেবে দেখলাম বাংলাদেশে অসংখ্য লেখকের প্রথম বইটাই কবিতার। কবি হিসেবে নিজের লেখকসত্ত্বাকে আবিস্কারের কোনো মোহ হয়তো আছে, আমি ভেবে চিন্তে দেখলাম আমার কবি হওয়ার তেমন কোনো তাগিদ নেই , কবি হিসেবে আমি পরিচিত হতে চাই না।
প্রায় নিয়মিত অভ্যাসে এ খাতার কবিতা অন্য খাতায় টুকে রাখা, অন্য কোনো সাদা পাতায় দুইচার লাইন কবিতা লেখার বদভ্যাস কাটিয়ে উঠেছি- আজ হঠাৎ করে দেখলাম একটা খাতায় বেশ কিছু কবিতা টুকে রাখা আছে- কিঞ্চিৎ ভুমিকার অংশে দেখলাম ২০০১, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসবার বছর- এসব কবিতা যে দীর্ঘ সময় পছন্দের তালিকায় ছিলো এমন না, হয়তো কোনো এক সম্পাদনার মুহূর্তে সেসব কবিতাকে গ্রহনযোগ্য মনে হয়েছিলো, পরবর্তী পাঠে কি মনে হতো তা এখনও জানি না। পুরোনো খাতার জঞ্জালে খুঁজে পাওয়া কবিতাগুলোকে কোনো না কোন জায়গায় জমিয়ে রাখতে হবে- ট্রাশক্যান কিংবা সংগ্রহশালা যাই হোক না কেনো এখন চলতি ফ্যাশান অন্তর্জালে আবর্জনা জমিয়ে রাখা, রিসাইকেলিং এর যুগে অন্তর্জালে কবিতা জমিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ- সে লক্ষ্য পূরণ করবে কবিতার আস্তাবাল---
শিরোণামবিহীন:
ভীষনভাবে মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্ব নিয়ে আমি এর বেশী আর কিই বা করতে পারতাম, শোন মেয়ে কারণে বা অকারণে যদি কষ্ট পেয়েই থাকো-ভুলে যাও, প্রবোধ ভন্ডামির মাঝে অন্য রকম যুক্তি তর্কে জীবনের গলি উপগলিতে ঝামেলার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে পথে হাঁটি, শুধু উটকো ঝামেলা পোহাতে চাই না বরং নির্বিবাদী ভালোমানুষি চাই
ঐ ছেলেটা গোপনা হাত দিচ্ছে বুকে, দিক না, শরীর তো পঁচে যাচ্ছে না, ও না দিলে অন্য কেউ দিতো, ভালোবেসেই দিতো না হয় সেটাও তো সেই কামনামদির স্পর্শ্ব। বরং একটু সামলে চললেই হয়, এত ভীড়ে যাওয়ারই বা কি দরকার, জানোই তো এমন হয়, সব জেনে যখন ওই ভীড়ে গিয়েছো তখন এমন কাতর চোখে তাকিয়ে আছো কেনো?
বারবার বলেছি ভীড়ে লোভি মানুষের লোভি হাত উড়ে তবুও তোমাকে যেতেই হবে ভীড়ের গভীরে?
এত মানুষের ভীড়ে প্রত্যেকের হাতই তো যেতে পারে কাকে প্রতিপক্ষ করে রূখে দাঁড়াবো বলো
শোনো কল্পনায় প্রতিদিন দু চারশো মানুষ হত্যা কবি, বাপবাপান্ত করি সব শালাদের, চায়ের কাপ হাতে বলে দিতে পারি এ সরকার টিকবে না। আমি যেমন তেমন কেউ নই
শুধু সাবলীল মিছিলে কণ্ঠরোধ হয়ে আসে আর স্পষ্ট প্রতিপক্ষ নেই বিধায় সব শালাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি এবং উটকো ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছি না বলেই নেহায়েত, নইলে ..........
রাজহাঁসের মতো ভেসে আছি
রাজ হাঁসের মতো ভেসে আছি
জলজ সীমারেখার শেষে
গৃহসন্ন্যাসী মানুষ দেখছি
"সবাই জলে শুদ্ধ হতে নামে"
পাঁচটা গাঙচিল উড়ে গেলো
কে কাকে চমকে দিলো
আকাশকে পাখী নাকি
পাখীরা আমাকে।
মেঘ ফিরে গ্যাছে
মেঘ ফিরে গ্যাছে বর্ষাকুটিরে
খুলেছে উত্তুরে শীতের দরোজা
আকাশ থেকে গড়িয়ে পড়ছে
গড়িয়ে পড়ছে অলস মুক্তা
আমি দু পায়ে মুক্তা দলে
দাঁড়িয়েছি রাজপথে
এবার ফেরার পালা
গত রাত থেকে ভোর অব্ধি
অনেক হলো
কাব্য কাব্য খেলা।
মুগ্ধ কিশোরীকে
যদি কেউ ডাকে
সে অনায়াসে চলে যাবে
ভুল বাঁকে
ভুলে যাবে
কে দিয়েছিলো বেদনবহুল
জীবনযাপন স্মৃতি
যদি কেউ ডাকে
সে অবশ্যই যাবে
ভুলে গিয়ে বিরহসম্প্রতি
ভুলে যাবে
কে দিয়েছিলো বেদনাবহুল
জীবনযাপন স্মৃতি।
প্রেমের কবিতা:
শীত ঘুম শেষ
আদমোড়া ভেঙে ডাকে ভালোবাসা
আঠারো মাস পরে
তোমাকে আবার প্রেমের চিঠি লেখা
ভাবি নি সম্ভব হবে
অথচ দেখো
ভুলে ভরা এ জীবন
আবার নতুন করে পল্লবিত হয়
গত সন্ধ্যায় তোমাকে দেখে
লিখে রাখি অনেক দিনের পর প্রেমের কবিতা।
কোনো কোনো কবিতা হয়তো পূর্বেও কোথাও জমা আছে- কবিতার টালিখাতা নেই বলে সেসব আবর্জনা ঘেঁটে দেখলাম না অতীতে কোথায় কি জমা ছিলো।





আমার কাছে তো সুন্দর লাগছে কবিতাগুলা
ভেবেছিলাম থিওরিটা আমার নিজের আবিস্কার, মানে প্রাত্যহিক কবিতা লিখার ব্যাপারটা আর কি ! এখন দেখছি প্রচলিত ! হা হা হা । আমিও মাঝে মাঝে বিপুল বিক্রমে প্রতিদিন লিখতে শুরু করি তারপর মাঝপথে থেমে যাই। তবে লাভ যে হয় না তা নয়, হয়তো দেখা যায় বিশটা কবিতার মধ্যে অন্তত একটা পাঠযোগ্য হয়েছে
। আপনি কবিতা লিখা ছাড়বেন কেন? ভালো লিখেন তো। একটা কথা কিন্তু সত্যি মনে হয় , কবিতা সবাই লিখতে পারে না।
শিরোনামবিহীনে ভীড়ের গভীরে অংশটা সবচাইতে ভাল লাগলো। এইটা বাকিগুলার তুলনায় অনেক বেশি ম্যাচিওর লাগলো।
সিরিজ চলুক..
শিরোনামহীন সবচেয়ে ভালো লেগেছে।। ।। এরপর মুগ্ধ কিশোরীকে।
আমার সবকটি কবিতাই ভালো লেগেছে। এবং কবিতা লেখার গল্পও।
কবিতাগুলা ভালো লাগছে এবং কবিতা লেখার কথাগুলো।
সবগুলো কবিতা-ই সুন্দর!!!
পরের পর্বের অপেক্ষায়......
ভালো থাকুন
কবিতা ভাল হইছে কিন্তু
সবকটি কবিতাই ভালো লেগেছে।
মন্তব্য করুন