কবিতার আস্তাবল ০২
একুশ বছর বয়েস হয়তো আমাদের মাপে খুব বেশী সময় না কিন্তু এ বয়েসেই সুকান্ত তার কবিতাগুলো লিখে প্রকাশ করে যক্ষায় মরে গেছে একাকী, আরোগ্যনিকেতনে কিংবা গৃহকোণে কোথাও না কোথাও বসে বন্ধুকে লেখা সুকান্তের চিঠিতে সুকান্তের প্রেমের সংবাদ ছিলো। সুকান্ত বন্ধুকে লিখেছিলো প্রেমের পড়বার পর সে আর কখনও প্রেমের কবিতা লিখে নি। শুধু সমাজ বদলের কবিতাই লিখেছে সুকান্ত এমনটা হয়তো নয় কিন্তু তার কবিতাসমগ্র-রচনাসমগ্রের কোথাও প্রেম নেই, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আর ভালোবাসা আছে, ভবিষ্যতের শিশুদের জন্য স্নেহ আছে, ব্যক্তিগত প্রেমের কবিতা তেমন নেই। হয়তো সেইসব কবিতার আড়ালে কোথাও প্রেম ছিলো, সেসব প্রেমময়তাকে তেমন প্রকাশযোগ্য বোধ করে নি সুকান্ত। বিখ্যাত হওয়ার অনেক সম্ভবনাই তৈরি হয়েছিলো কিন্তু নির্জনতার কবি হিসেবে পরিচিত জীবনানন্দের স্যুটকেস ঝেড়ে পুছে তার গল্প-কবিতা- উপন্যাস খুঁজে বের করতে যেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো সুকান্তের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে নি। তার প্রেমের কবিতাগুলো হয়তো বাতিল কাগজে সের দরে ঠোঙাওয়ালার দোকানে বিক্রি হয়ে গেছে, আমার জানা নেই। জীবনানন্দের কবিজীবন সুকান্তের তাবত জীবনকালের চেয়ে দীর্ঘ ।
কবিতা আর কবিতার পেছনের গল্প নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটা সম্পূর্ণ কবিতার বই আছে, সেখানকার ভূমিকায় শক্তি লিখেছিলেন আদতে একজন তার সমস্ত জীবনে একটি মাত্র কবিতাই লিখে, সেসব কবিতার খন্ড খন্ড বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়। শক্তির গদ্যে তার কবিতার মাদকতা আছে- তার এই একটি বক্তব্য এখনও বুঝতে পেরেছি এমনটা দাবি করবো না।
জীবনযাপন এক ধরণের অভ্যস্ততা- সেখানে প্রতিনিয়ত একই ধরণের অভাব-অনুভুতি- উপলব্ধি। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন অনুভবের সুযোগ নেই, আর সেসব নিয়ে শক্তির মতো প্রতিনিয়ত কবিতা লিখে যাওয়ার উদ্দামতা আমার নেই।তবে আমার ধারণা একটা পর্যায়ে নিজের অনুভবের পুনরাবৃত্তি ঘটে যাওয়া খুব সম্ভবপর- সকল অনুভবকেই কবিতায় উঠিয়ে আনা সম্ভব না, শব্দের সীমাবদ্ধতা থাকে- একই অনুভব ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধি আনে- সেসব আলাদা আলাদা উপলব্ধিগুলো একই অনুভবের ভিন্ন ভিন্ন উপস্থাপনও হয়ে উঠতে পারে। বারংবার একই দৃশ্যকল্পে ফিরে আসার গতানুগতিক পৌনপুনিকতা স্মৃতিকারাগারে বন্দিত্বের মতো। একটি বৃত্তে অবিরাম ঘুরপাক খেতে খেতে বলা আমার প্রতিটা পদক্ষেপই আসলে নতুন একটা পথের সূচনা করছে- পরিচিত কেউ কেউ এমন একটি বৃত্তে আটকা পরে গেছে এমনটা আমার মনে হয়েছে সময় সময়।
নিজের যেহেতু কোন প্রকাশনা নেই তাই আমার বৃত্তাবদ্ধতা আদতে পাঠকের আড়ালে রয়ে যায়, ভাবছি সকল পদক্ষেপই আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে আমাকে নিয়ে যাবে এমন নিশ্চয়তা কোথাও নেই। কোথাও যে পৌঁছাতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই আমার। বরং এই পথ চলা , এই ভ্রমন সেটাও এক ধরণের জীবনযাপনের আনন্দ। কোথও পৌঁছানোর তাড়াবিহীন এক ধরণের অলস ভ্রমণের বাইরে জীবনযাপনকে অন্য কোনোভাবে সংজ্ঞায়িত করা দুরহ। কোনো না কোনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে বলে যারা ছুটতে শুরু করেছিলো তাদের কাছে আশেপাশের দৃশ্যগুলো ক্রমশ: ঝাপসা হয়ে যায়, অর্জুনের মতো লক্ষ্যভেদী হয়ে উঠতে চেয়ে তারা শুধু গন্তব্যের মাইলফলকটুকুই চোখের সামনে দেখে এর আশেপাশের কোনো ঘটনাই তাকে আর স্পর্শ্ব করে না।
কেভিন কার্টার সুদানের দুর্ভিক্ষের একটি ছবি তুলেছিলেন, পরবর্তীতে তিনি আত্মহত্যা করেন, ফটোজার্নালিস্ট পুরস্কার পাওয়া কেভিন কার্টারের ছবিটির সমালোচনায় সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইমস লিখেছিলো- ছবিতে একটি শকুনকেই দেখা যাচ্ছে যদিও আরও একটা শকুন উপস্থিত দৃশ্যপটে, সে শকুনটি ক্যামেরার অন্যপাশে ফোকাস ঠিক করে শকুন আর মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া শিশুটির ছবি তুলছে।
তারা সমালোচনা করে বলেছিলো এ ছবি তুলতে যে সময় নিয়েছে কার্টার তার বদলে সে সময়টুকু সে ঐ শিশুটিকে সাহায্য করতে ব্যয় করতে পারতো, সেটা আরও মানবিক হতো। নিউজ পেপারের ছবি তোলার দায়িত্ব, পৃথিবীকে ধাক্কা দিয়ে এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে এমন একটা ছবি তোলার প্রয়োজনীয়তা বেশী না কি কয়ামেরা ঝোলায় পুরে শিশুটিকে সাহায্য করার প্রয়োজন ছিলো বেশী এটা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। জয়নুল আবেদীন দুর্ভিক্ষের ছবি না এঁকে লোঙ্গরখানায় খিচুড়ি বিলালে ভালো কাজ হতো নিশ্চিত ভাবেই, তা না করে তিনি কেনো দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ ছবি আঁকলেন মোটা তুলিতে?
প্রত্যেকের নিজস্ব প্রত্যুত্তর আছে- কেভিন কার্টার আত্মহত্যা করেছেন, আত্মহত্যার নোটে লিখেছেন তার দু:সহ স্মৃতি তাকে তাড়া করছে। আমাদের অতীত আমাদের তাড়া করে ফেরে কিন্তু আমরা দিগন্ত রেখার সবুজের দিকে তাকিয়ে ছুটে যাই ভবিষ্যতে।
দিনযাপন
এক জন্ম দুই জন্ম তিন জন্ম
প্রশ্নটা হলো প্রতিদিন সন্ধ্যায় যারা পথে নামে তাদের কজনের ঘর থাকে?
ফেরার আশ্রয় থাকে? গৃহশান্তি থাকে?
এই ধারাচুড়ো খুলে আটপৌরে জীবনযাপনসুখ থাকে?
এই যে অসংখ্য মানুষ যারা বাসের ক্ষিধের মুখে ঢুকে যাচ্ছে বাসের উদরে
তদের কতজন পেটের বাহিরে এসে সস্তিতে দাঁড়াবে
অত:পর বিধ্বস্ত শিরস্ত্রান সামলে, সারাদিন লড়াইয়ের খোলসটা পরিপাটি করে দাঁড়াবে গৃহেরদরজায়?
ক'জনর যাত্রাপথে উদ্বিগ্ন চোখের পাহারা থাকে?
ক'জনার ফেরার পথে অগণন প্রত্যাশা থাকে?
কতজন এই এখানে একটু, ওখানে একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলে যাচ্ছে
সেই তো ঘরে ফিরে একটুকরো পৃথিবী সামলে চলা, বন্ধুর সামনে হাসি টেনে রাখা ঠোঁটে
আবার আসবেন কিন্তু,
তোমরাও এসো
চলি রে দেরী হয়ে গেলো
এই যা ওটাতো করাই হলো না
এতসব লৌকিকতার বহর, তারপর রাতের বালিশে মাথাগুঁজে
আবার চাহিদা দরজায় কড়া নাড়ে
সশস্ত্র শিরোস্তানশোভিত মানুষ পথে নামে
প্রতি সন্ধ্যায় একই বাসের উদরে ঘরে ফেরে। ।
সকালটা কেটে যাক
একটা খোলা জানালা, বাইরে যতদুর চোখ যায়
সারি সারি বাড়ীর কংকাল
টেবিলে চায়ের কাপ, খোলা ময়াগাজিন
তেরছা হয়ে আসা অবাক রোদ্দুর
বাইরে তারকাঁতায় বসে থাকা ফড়িংটাই
এখানে একমাত্র জীবন্ত দৃশ্য
দেয়ালের বছরের দিনলিপি, সবুজের মানচিত্র
বিছানায় ধেবড়ে যাওয়া কালচে রক্তের দাগ
বালিশের পাশে ওল্টানো প্রেমের কবিতা
শেষ রাতে বৃষ্টি হয়েছিলো
স্লানঘরে টুপটাপ পানি পরছে, একমাত্র জানালার
ওপাশের তারকাঁটার জালে একটা ফড়িং
ঐ দুরে কালো নিস্প্রাণ রাস্তা
দুরে ওই শেষ বাড়ীর কংকালের পাশের বাঁকে
আকাশের ঘর
আজ ওখানে উৎসব, নদী এসেছে, মেঘ আর বৃষ্টিও পৌঁছাবে দুপুরে
আজ শেষ বিকেলে যখন রংধনু যাবে
যখন নীলিমার বয়েস সত্তুর
আমি বিষাদের মতো
ও---ই কালো রাস্তা ধরে
সারবাঁধা বাড়ীর কংকাল পেরিয়ে
শেষ বাঁকটা ঘুরে
যাবো আকাশের বাড়ী
আপাতত ওই চায়ের কাপে ছোট্ট একটা চুমুক
একটা সিগারেট
সার ঘুলঘুলির নকশাকাটা
মাকরসার জাল দেখে সকাল কাটুক।
আত্মহত্যা
অদ্ভুত সব স্বপ্ন কিলবিল করতো তার মাথার ভেতরে
সে লিফটে চেপে উঠে যাচ্ছে চব্বিশতলা ভবনের ছাদে
কাছেপিঠে পাহাড় নেই কোনো যার চুঁড়োয় চেপে
সে অনায়াসে বলতে পারে
" সমস্ত পৃথিবী আমার পায়ের নীচে
আমি একা ছুঁয়েছি আকাশ"
এই শহরের সবচেয়ে উঁচু দালানের
সবচেয়ে উঁচু ছাদটিতে দাঁড়িয়ে সে দেখতে চেয়েছিলো
এত উপর থেকে পৃথিবীটাকে একটু অন্য রকম
মায়াময় মনে হয় কি না
আমরা এখনও জানতে পারি নি
সে অবশেষে কি জানতে পেরেছিলো?
বরং তার সেই তীব্র উৎফুল্ল ঝাঁপ দেখে
বিহ্বল পথচারী এবং রাস্তার থমকে যাওয়া সব গাড়ী
যখন হতভম্ব আকাশে তাকিয়ে আছে
তার দেহটা কালো পিচের রাস্তায় পড়লো
একটা শব্দ হলো
তারপর সব চুপচাপ
বোকা মানুষ বুঝতে পারে নি
যত উঁচুতে যে থাকে
তার পতনে তত বেশী রক্তের ছাপ।





শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথাটার মতো কথা আমারও ভাবনায় এসেছে অনেক বার। মনে হয়েছে এই যে কবিতা (বা তার নামে অপচেষ্টা) লিখি, সেগুলো একটা বিশাল মহাকব্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ।
বিষয়টা ঠিক কিভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হয়? জীবনবোধ বদলায়, রাজনীতি বদলায়, কোনো মতেই স্থির থাকছে না কেউ- এরপরও প্রতিটি বিষয়ই একটি ধারাবাহিকতা মেনে একই উপলব্ধির অংশভুক্ত হয়ে যায় কিভাবে?
এই লেখাটার কথাগুলো অনেক গোছানো, ভাল লাগলো।
কেভিন কার্টার আর এই ছবিটা নিয়ে অসাধারণ একটা মুভি আছে,
দ্যা ব্যাং ব্যাং ক্লাব।
দিনযাপন এর জন্য
হ্যাটস অফ টু ইয়ু..
ভাল্লাগছে
ভাল লেগেছে
কেভিন কার্টার যে বিতর্কে পড়েছিলেন সেটি ওতো বড় পরিসরে না হলেও এখানে প্রায়ই শুনতে হয়। বোধকরি সারা বিশ্বেই। এই বিতর্কের শেষও হবে না মনে হয়।
মন্তব্য করুন