সোহেল ভাই ০১৮
আচমকাই মঙ্গলবার দুপুরে দেখলাম সোহেল ভাইকে গটগট করে হাঁটছেন গলিতে- এমন সময় তো সোহেল ভাইয়ের থাকবার কথা না, সোহেল ভাই অনেক কিছুই করেন কিন্তু তার পাঙ্কচুয়ালিটির কদর আছে, তিনি সময়ের কাজ সময়ে করেন, গাফিলতি করেন না তেমন। মঙ্গলবারের আশেপাশে কোনো সরকারী ছুটি নেই- হতে পারে সোহেল ভাইয়ের মতো অন্য কাউকে দেখলাম। তেমন পাত্তা না দিয়ে চলে গেলাম বাসায়।
ইদানিং বিকেলগুলোতে নিয়মিত আড্ডা হচ্ছে না, অফিসপাড়ায়- বিভিন্ন অফিসের রিসেপশনে, চাকুরি নিয়োগ পরীক্ষার পড়া পড়তে পড়তে দিন যাচ্ছে। সন্ধ্যায় গা ম্যাজম্যাজ করলে একটু ময়না ভাইয়ের দোকানে এসে এলাকার হাওয়া বুঝে ঘরের পাখী ঘরে ফিরে যাই। ময়না ভাইকে একটা চায়ের কথা বলে বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সোহেল ভাইকে
আররে সোহেল ভাই আপনি এই সময়ে?
ক্যান মিয়া, আমার বাসাবাড়ী কি বিক্রী কইরা দিছি না কি? বাসায় আসবো না? তোমাগো হইলো টা কি? বিকাল থেকে বসে আছি তোমাগো কোনো পাত্তা নাই, কই রাজা উজির মারো এখন?
আরে না সোহেল ভাই, সেমিস্টার শেষ, রাশেদ, ফারুক এমবিএ'র পড়া দিচ্ছে মারুফ আর আমি বিভিন্ন জায়গায় ট্রাই করতেছি
কিন্তু আপনি এই সময়ে কি মনে করে?
আরে আগে সবাইকে আসতে বলো, একটু কথাবার্তা হোক, পুরা অফিসিয়াল ইনকোয়ারী শুরু কইরা দিলা কেন? ঐটা তো রেলওয়ে ভবনে হওয়ার কথা।
না ভাই খুব অবাক হইছি এই যা।
আরে মিয়া কইয়ো না,তোমাগো কি সরকারী চাকরি করার ইচ্ছা আছে? ভুলেও কইরো না, কোনো মান সম্মান নাই শালার--
কি হইছে বলবেন তো ভাই।
আরে আর কইয়ো না। বুঝোই তো ছোটো টাউনে আমার কাজ, ঐখানে এমপির বাপ হইলো চেয়ারম্যান- সে যদি না বলে তাহলে এমপিও মাইন্যা চলে তাকে। তো সেই লোকটা একদন অসভ্য-
কি অসভ্যতা করলো আপনার সাথে?
অফিসে বইসা আছি, চেয়ারম্যান আসলো, আমার অফিসের সামনে একটা কেরানি থাকে ওরে পাত্তা-পুত্তা না দিয়াই ঢুকলো- ঢুইক্যা চেয়ার টাইন্যা বইসা পরলো, তারপর বলে এই ছেলে শুনো
আরে শালার শালা আমি তোমার সমুন্ধির ছেলে হইছি না কি তুমি আইসা অফিসের ডেকোরাম না মাইন্যা ঢুইক্যা যাইবা- টার মানা গেলো চিনপরিচয় নাই তুমি আমারে তুমি কইরা বলবা? তুমি মানলাম চেয়ারম্যান কিন্তু আমাদেরও তো কিছু মানসম্মান আছে- কাউকে তো হুট কইরা তুমি বলা ঠিক না।
সরকারী অফিসারদের এক ধরণের ভারিক্কি ভাব চলে আসে, সোহেল ভাইয়েরও চলে এসেছে, এখন সরকারী প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা মানে সরকারের চেয়ে শক্তিশালী মানুষ- সরকার যাবে আসবে এইসব প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা দিব্যি টিকে থাকবে আর এই ব্যবস্থার উপরে কতৃত্ব করবে। ব্রিটিশদের তৈরি নিয়মের হাজার হাজার ফ্যাঁকরায় সরকারকে চাইলেই নাজেহাল করে ফেলতে পারে তারা।
চেয়ারম্যান তো বয়স্ক মানুষই সোহেল ভাই- বুঝে উঠতে পারে নাই-
রাখো মিয়া- শালার বাসায় বইসা থাকবো ২ মাস, ওর কাজ হইলে হবে না হইলে না হবে, আমি কোনো সিগনেচার করবো না ঐশালার ফাইলে।
মারুফ আসলো সবার আগে- সোহেল ভাইকে দেখে বললো বস কেমন আছেন। বিসিএসের তো রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম, কোনো ট্রিক আছে?
আমি কোনোমতে থামাতে চেষ্টা করতাম আগে জানলে কিন্তু এখন মনে হয় নতুন করে শুরু হবে সোহেল ভাইয়ের বক্তৃতা
শুনো মাফুর, ছোটো ভাই হিসেবে একটা কথা কই, কিছু মনে করবা না, েই মফস্বলে গিয়া সরকারী চাকরি করার চাইতে সামনের বাসার কুকুরের পাহারাদার হওয়া অনেক সম্মানের, অন্তত কুকুর তোমারে দেইখ্যা সম্মান করবো, মফস্বলে সরকারী কর্মচারীদের কেউ পাত্তাই দেয় না, তুই-তোকারি করে
মারুফ অবশ্য পরিস্থিতির বর্ণনা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলোম আমি তেমন কিছুই বললাম না। মারুফ বললো তাহলে কি করবো বলেন সোহেল ভাই- এখন তো চাকরি বলতে ব্যাঙ্কে আর বিসিএসে, আপনি বলতেছেন বিসিএস বাদ দিতে, তাহলে কি ব্যাঙ্কের জন্য ট্রাই করবো?
ব্যাঙ্কে বেতন ভালো, জাকজমক আছে কিন্তু তোমার কোনো লাইফ থাকবে না, আমি তো দুই বছর করছি, আমি জানি।
শুনো শেষ পর্যন্ত তোমার কাজ হইলো স্যুট টাই পরে অন্য মানুষের টাকার হিসাব রাখা- তুমি স্যার স্যার বলে অন্য মানুষের টাকা গুণে ওদের ব্যাগে ঢুকাবা, যদি ২ টাকাও জমা দেয় সেইটারও হিসাব রাখবা। যে আসবে তারে সব সময় সম্মান দিয়া কথা বলবা
এই কাজের জন্য তোমারে মাস গেলে ভালো বেতন দিবে- অফিস থেকে গাড়িও দিবে একটু বড় পোস্টে গেলে, কিন্তু তুমি দিনের শেষে অন্যের টাকা পয়সা গুনার কাজই করো।
কর্পোরেট জব এইটা সোহেল ভাই, দেশী ব্যাঙ্কে না হয়ে যদি বিদেশী ব্যাঙ্কে হয় তাহলে?
আরে রাখো তোমার কর্পোরেট, বাংলাদেশে কর্পোরেট কালচার বলে কিছু আছে না কি? মুদির দোকানের বাকির খাতায় হিসাব রাখতে রাখতে এরা এক একটা বড় বড় ইন্ড্রাস্ট্রি কউলছে, নাইলে অন্য মানুষের নামে থাকা জমি দখল করে সেইখানে কারখানা বানাইছে- এদের ভেতরে কর্পোরেট কালচার পাইবা কই- বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখনও প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী- এদের এখনও কর্পোরেট হয়ে উঠবার মানসিকতা তৈরি হয় নি। আরও দশ বছর পরে ধীরে ধীরে একটা কর্পোরেট কালচার তৈরি হবে- এখন এই বিভিন্ন অফিসে বিভিন্ন কিউবিকলে বলে কর্পোরেটের নামে আড্ডাবাজি হয়- লোকজন এখনও কর্পোরেট লড়াইটাতে ঢুকতে পারে নাই- বাংলাদেশে যেইসব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী আছে সেইসবের কোনোটাতেই উচ্চপর্যায়ে কিন্তু তুমি বাংলাদেশীদের দেখবা না। ওরা ময়ানেজারিয়াল পোস্টে নাই- কামলা পোস্টগুলাতে বাংলাদেশী ভরা। বাংলাদেশী এখনও কর্পোরেট কামলার উপরে উঠতে পারে নাই- ম্যানেজারিয়াল পোস্টগুলো সবই দেখবা ইন্ডিয়ান- পাকিস্তানী আর শ্রীলঙ্কানদের দখলে- আর দেশী কোম্পানিগুলার ম্যানেজারিয়াল পোস্টগুলাতে মালিকের পোলা মাইয়ারা থাকে- ওরা ব্যবসা শিখতে আসছে কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে নিজের বাপের তালুক ভাবনাটা ছাড়তে পারে নাই- এইগুলারে দিয়া তুমি কর্পোরেট বিচার করবা না।
তাহলে কি করবো সোহেল ভাই?
আরে কি করবা মানে, একটা নতুন কিছু করার চেষ্টা করো, এই যে বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে সেই জায়গাটাতে কোনো নতুন আইডিয়া আসতেছে না, তুমি নতুন একটা আইডিয়া দিয়া শুরু করো কাজ, যদি তেমন স্মার্ট হইতে পারো তাহলে শুধু ওয়েবপেজ বেচেই গুলশালে ফ্ল্যাট কিনতে পারবা।
সোহেল ভাই আমি তো কম্পিউটার মেজর না, আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেনো?
ব্যাটা বিল ফেটসকে দেখ, ও কিসের মেজর? ও তো পড়াশোনাই শেষ করতে পারলো না। কিন্তু ওর মাথা থেকে পার্সোনাল কম্পিউটারের আইডিয়াটা বাজারে আসলো, সেই আইডিয়া নিয়া কাজ করতে করতে এখন দেখ ওর টাকা গুনার জন্য আলাদা একটা কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি করছে ওর কর্মচারী।
রাশেদ আসলো, সাথে রফিক আর নান্নু-
আরে বস শুনছেন তো খবরটা?
কোন খবরটা বলো তো?
দেশে তো এভিয়ান ভাইরাস আসলো
লোকজন না কি অসুস্থ হইছে, আপনি কিছু জানেন না কি?
আরে ব্যাটা ফার্মে একটা ভালো এন্টি ভাইরাস লাগাইলেই হবে, আমি তো ক্যাসপারস্কি কিনছি, আরও একটা পিসিতে ইউজ করতে পারবি।
পোল্ট্রি ফার্মে তুই এন্টি ভাইরাস লাগাবি?
হ, আমি তো ফার্মভিলে আছি- আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না, পিসি একটু স্লো হয়ে যায়, কিন্তু তেমন সমস্যা হয় না।
তোর শরীরের সাথে তোর মাথার বুদ্ধিও মোটা হচ্ছে রফিক। আমি তোরে বলছিলাম তুই আমার সামনে কোনো কথাই বলবি না, তুই তারপরও কথা বললি ক্যানো?
মারুফ তিরিক্ষি হয়ে বললো কথাটা, রফিক অবশ্য কোনো কিছু মনে করলো না, ওর শরীরের সাথে সাথে ওর চামড়াও মোটা হচ্ছে।
আইচ্ছা ফার্মভিল কি? নান্নুর সরল জিজ্ঞাসা
তুই ফেসবুক দেখিস না?
দেখি তো, তবে হাতে টাইম না থাকলে আলাদা আলাদা দেখি, কিন্তু যদি সময় থাকে আর সেইরকম জিনিষ হয় তাহলে ফেস বুক দুইটাই দেখি।





কঠিন…...........

এ জোকটা আগেও শুনেছিলাম
মন্তব্য করুন