পতাকা- দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হবে
প্রথমত বলে দেওয়া ভালো 'পতাকা' শিরোণামে গতকাল যা লেখা হয়েছিলো সেটা কোনো বানানো গল্প না, অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে এ ঘটনা ঘটেছিলো ১৯৭১ এর ১৪ই আগস্ট। সে দিন একটি পরিবারের তিন বোন এবং ঢাকা শহরে প্রবেশ করা প্রথম কয়েকজন গেরিলা এই অভাবনীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছিলো।
প্রতিটি ঘটনার কোনো না কোনো প্রেক্ষাপট থাকে, এই তিনবোনের নামের বাইরে বেশী কিছু আমার জানা নেই, তাদের পারিবারিক পরিবেশ, তাদের বাসার ঠিকানা আমি জানি না, কিন্তু এদের প্রত্যকেই একটা দীর্ঘ সময়ে এ শহরে বসবাস করেছেন, তাদের এই উজ্জ্বল স্মৃতি হয়তো তাদের সাথেই হারিয়ে যেতো যদি না গেরিলা যোদ্ধাদের একজন এসে জানাতেন।
লেখাটা যারা ভালো বলেছেন তাদের ধন্যবাদ কিন্তু বাবুলের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত যতটুকু লিখেছি 'পতাকা'র সে অংশটুকুর বাইরে বাকি অংশ আসলে অর্থহীন প্রলাপের মতো, সেখানে তেমন কিছু নেই। একটার পর একটা দৃশ্য সাজিয়ে একটা সময়কে উপস্থাপন করতে হলে অনেক ছোটোখাটো বিষয়ে নজর দিতে হয়, সেসব ছোটোখাটো বিষয় আসলে এখানে ততটা সবিস্তারে বলা সম্ভব হয় নি, সম্ভব হয় না কখনও। প্রতিনিয়ত পরিমার্জনের ভেতর দিয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলোর কোনো স্থিরচিত্র তৈরি করা সম্ভব না। এক একটা দৃশ্যে পরিবেশ এক এক রকমের আবহ তৈরি করে।
টুকরো টুকরো অনেক ভাবনাই আসবে এখানে, টুকরো টুকরো দৃশ্যগুলো পাশাপাশি সাজালে হয়তো একটা সময়ের ছবি ফুটে উঠবে এমনটা আমার আশা। বিপীন বাবুর বাসাটা তার অবর্তমানে স্থানীয় মসজিদের ইমামের আস্তানা হয়েছে, কিন্তু ৪ মাসের অবহেলায় বাসাটার সম্পূর্ণ অবয়বে এক ধরণের ক্ষয় নজরে আসে। বাসার ভেতরের তুলসীমঞ্চে সবুজ শ্যাওলার দায়, ঘরের দেয়ালের নোংরা দাগ মূলত সেই ইমামের সৈন্দর্য্যচেতনাহীনতাটুকুই প্রকাশ করে।
পূজার প্রয়োজনে বাসার দেয়ালের পাশে পাগানো জবা ফুলের গাছ, বারান্দার আশেপাশে সাজানো দোপাটি ফুলের গাছ, দেয়াল জুড়ে ফুটে থাকা লাল কমলা মাধবীলতা নিয়মিত পরিচর্যায় যে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে রাখতো, গেরস্ত অবর্তমানে সে মায়ার আঁচড় আর নেই, নিতান্ত ভালো একটা ঘরে থাকবার আনন্দে ইমাম নিজের সৌন্দর্যয়হীনতাকেই প্রকাশ করে বাসার অপরিচর্যায়। একটা বাসা শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই না, এখানে এক ধরণের স্বপ্ন নির্মিত হয়, প্রতিনিয়ত প্রতিটি শিশু প্রতিটি বধু, প্রতিটি সন্তান এক ধরণের ধারা তৈরি করে এখানে। তারা এই বসত ভিটার চার দেয়ালে নিজেদের ভাবনা ও নিজেদের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলে।
শোবার ঘরের দেয়ালা ঝুলানো ঠাকুরমুর্তি ইমাম উল্টো করে রেখেছে, গৃহদেবতা রাখবার অংশে সাজিয়েছে মোমবাতি, মোমবাতির আঁচে সেখানে কালো দাগ জমে গেছে। ছাদের কোনায় জমেছে মাকরসার জাল। এই সম্পূর্ণ দৃশ্যের ভেতরে কোনো সৌন্দর্য্য নেই। জবর দখলের মত নোংরামির প্রকাশ আছে সেখানে।
বাবুলের প্রত্যাবর্তনের সময়টা একেবারে এলেমেলো হয়েছে, সবাইকে না জানিয়ে উধাও হয়ে যায় নি বাবুল, যে যুবক ১লা মার্চ স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়েছে লাথি মেরে ভেঙেছে কায়েদ এ আজমের ছবির ফ্রেম সে যুবক তরুনী কিশোরী বোনদের হাত ধরে এসেছে রেসকোর্সের ময়দানে, তার যুদ্ধে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সেটা না ঘটাটাই বরং আশ্চর্য ঘটনা হতো। কুমিল্লা আখাউড়া হয়ে কিংবা নরসিংদি নারায়নগঞ্জ হয়ে মেঘনা কিংবা ভৌরবের শাখা ধরে ভারতের সীমান্তে যাওয়ার রাস্তাটা একেবারে বন্ধ ছিলো না। সেখানে নিয়মিত লোকজন যাতায়ত করেছে, সীমান্তের ওপারে গিয়ে আবার ফেরত এসেছে, এদের কাছেই হালনাগাদ জেনেছে পরিবার।
বাবুলের ফিরে আসার দৃশ্যে মায়ের মমত্ববোধের কমতি ছিলো, রুক্ষ চুলে তেল দিয়েআঁচড়ে দেওয়া, বিলি কেটে ঘুম পারিয়ে দেওয়ার সময়ে মায়ের সাথে ছেলের গল্পের কোনো অংশই সেখানে নেই, রানুর ভালোবাসামাখা চাউনি নেই, ঠোঁটের কোনো হাসি নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা বাবুল ক্লান্ত কিছুটা শীর্ণ হলেও এক ধরণের রুক্ষ সৌন্দর্য তার ভেতরে তৈরি হচ্ছে, সেই দৃশ্যগুলো শব্দের সাথে উঠে আসে না।
মানুষের মুখের অবয়বে তার ভাবনা ফুটে উঠে, সেই ভাবনাগুলো লিখে রাখা যায় কিন্তু ভাবনা কিংবা প্রশান্তি শব্দে আঁকা যায় না।





মন্তব্য করুন