উত্তরাধুনিক বিপ্লববটিকা বিতরণ -- সম্ভব কি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ গণপ্রতিরোধ মঞ্চ হয়ে ওঠা?
অবশেষে কেন্দ্র থেকে ঘোষণা এসেছে আজ বিকাল ৪টায় শাহবাগ বিক্ষোভের সাথে সংহতি জানাতে ৩ মিনিটের কর্মবিরতি নিরবতা পালন করবে বাংলার মানুষ। উদ্যোগের ট্যাগ লাইন যদিও "সংহতি" তবে আদতে এটা কেন্দ্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ। জনগণের অবচেতনে এক ধরণের নির্দেশনা দেওয়া, রশি আমার হাতে সুতরাং আমার টানেই নাচতে হবে তোমাকে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ ঘোষণা এসেছে আগামীকাল গণসংগীত আর বৃহঃস্পতিবার মোম বাতি ...জ্বালানো হবে।
এ ধরণের কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সুবিধা খুব সহজেই এসবে একাত্ম হওয়া যায়। তেমন বেআইনীও না আবার নিজের মানসিক প্রশান্তিও টিকে থাকে, সংগ্রামের বিক্ষুব্ধ ক্লেশকর পথ শেষে আত্মসচেতনতার উপলব্ধি এখানে নেই বরং রেডিমেড ইন্সট্যান্ট নুডলস খাওয়া লোকজন এইসব ঘোষণার সাথে একাত্ম হয়ে খুব সহজেই রেডিমেড বিপ্লবাসক্ত হয়ে যায়।
গণমানুষ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে শাহবাগের দিকে তাকিয়ে আছে, শাহবাগ প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরণের দুর্বিপাকে তেমন শক্ত নিয়ন্ত্রন আনতে পারে নি কর্মসূচির ঘোষণাতালিকায়, তবে এখন থেকে এটা প্রতিষ্ঠিত যে এলেমেলো নয় বরং শাহবাগ নিয়ন্ত্রন করবে বাংলাদেশ। এই ৩ মিনিটের কর্মবিরতি মূলত হুকুমতাবেদার মানসিকতা তৈরি কিংবা এক ধরণের অবচেতন অভ্যস্ততা তৈরি করা, যেই অবচেতন অভ্যস্ততায় পথচলতি মানুষ সিনেমায় কিংবা বাস্তবে জয় বাংলা শোনার সাথে সাথেই পালটা জয় বাংলা বলছে শাহবাগে।
সাধারণ মানুষ নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে কিছু করতে চায় না, স্বাধীন সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে তাদের বেশ অসস্তি এবং অনীহা আছে, তারা পরাজিত এবং ম্রিয়মান সুতরাং যদি পরাজিত হতে হয় সংশয় থেকে তারা নিজের উদ্যমে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করে ফেলতে আগ্রহী হয় না, তারা নিজের দায়্য-দায়িত্ব এড়াতে মালিক খুঁজে, তারা মূলত হুকুমের তাবেদার, মনে মনে প্রভু খুঁজে চলে।
পোষা কুকুরের সাথে মানুষ বল ছুড়ে ধরে নিয়ে আসা খেলা খেলে, সেই কুকুরের খেলার ভেতরেও এক ধরণের মালিক চাকর সম্পর্ক টিকে থাকে, কুকুর নিজ দায়িত্ব বল ছুঁড়ে কখনও বলতে পারে না খেলার এক পক্ষ তো তুমিও, যাও বল কুড়িয়ে আনো। বরং কুকুর ল্যাজ নাড়াতে নাড়াতে হারিয়ে যাওয়া বল খুঁজে নিজে আপ্লুত আহ্লাদিত হয়।
৪টা থেকে ৩ মিনিট নিরবতা পালন করে মূলত বাংলাদেশের মানুষ এই প্রভুভক্তির তালিম নিলো। আগামী কয়েকটা নির্দেশ অক্ষরে পালন করে নিজের দাস মানসিকতা বলিষ্ট হয়ে উঠলে শাহবাগ নির্দেশ দিয়ে প্রভুত্ব বজায় রাখবে আর সাধারণ মানুষ শাহবাগের ঘোষণা থেকে প্রাপ্তির আস্বাদ নিয়ে ঘরে ফিরে যাবে কেন্দ্রের নির্দেশে।
হয়তো তার ভেতরে কখনও প্রশ্নটা জাগবেই না, কেনো সে এই প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলো, কিসের প্রত্যাশা নিয়ে সে এখানে এসেছিলো, কেনোই বা কি প্রাপ্তি নিয়ে সে বাড়ী ফিরে গেলো? সাধারণ মানুষের এই প্রভুখোঁজা মানসিকতা কখনও তাকে নিজের ইচ্ছার দাসত্ব শেখায় নি, এই গণজাগরণে মানুষ স্বেচ্ছায় মিডিয়াতাড়িত ছুটে এসেছে, পরিবর্তনের গোপন তাগিদ তার ভেতরেও ছিলো কিন্তু এই গণজাগরণ তার ভেতরে নিজের উপরে প্রভুত্ব তৈরির শিক্ষা দিলো না
জনগণের অসচেতন ক্ষোভ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রনে এসেছে বিষয়টা এক দিক দিয়ে আশা তৈরি করেছে কারণ আজকে প্রমাণিত হয়েছে এই ক্ষোভ সহিংসতার পথে ধাবিত হচ্ছে না, একই সাথে সেটা দীর্ঘ মেয়াদে সংশয় তৈরি করেছে। কেন্দ্রের উত্তরাধুনিক সহজপাচ্য বিপ্লবের রেসিপি বিতরণ এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অতীত এক ধরণের সচেতন সংশয় তৈরি করেছে।
এখনও পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরা জামায়াত শিবিরের রাজনৈতিক বিনাশের পক্ষে কিন্তু উত্তরাধুনিক সহজপাচ্য ...বিপ্লবে অনায়াস অভ্যস্ততা থেকে তারা একটা পর্যায়ে মাঠ ছেড়ে দিবে, যদিও তারা বলছে দাবীর সবটুকু আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠ ছেড়ে যাবে না কিন্তু ধীরে ধীরে অবচেতনে তারা এক ধরণের প্রভুত্ব মেনে নিয়েই এখানে আছে, সুতরাং কেন্দ্রের নির্দেশের মোহে তারা নিজেদের হুকুমতাবেদারী ভুমিকায় নামিয়ে আনবে।
জনগণ নিজেদের সংগঠিত ক্ষমতা সম্পর্কে একধরণের ধারণা পেতে শুরু করেছে, সংঘবদ্ধতার শক্তির উপলব্ধি তার হচ্ছে, তার ভেতরে এক ধরণের ঐক্যের বোধ তৈরি হচ্ছে, এসব ধনাত্মক বিষয় দীর্ঘ মেয়াদে রাজনীতির জন্যে ভালো। ।
এখানে যারা দিন তার ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ করছে তাদের কয়েকজনকে নামে-চেহারায় চিনি আমি, আমি জানি এরা বাংলাদেশের জন্যে প্রচন্ড ভালোবাসা ধারণ করে এখানে এসেছে, এরা সবাই মূলত জামায়াতের রাজনৈতিক বিনাশ চায়। সংঘবদ্ধ জনতার শক্তির কাছে জামায়াত অসহায় হলেও এদের সাথে বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক যোগাযোগ আছে অপরাপর ক্ষমতাসীন মানুষদের। অর্থনৈতিক ক্ষমতার জায়গাটা জনতার ক্ষমতার জায়গার সাথে বিরোধাত্মক, স্বীয় স্বীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে ক্ষমতাবানেরা কখনই স্পষ্ট নৈতিকতা বজায় রাখেন নি, সুতরাং আজকের গণজাগরণে ভীত শঙ্কিত হলেও ক্ষমতাবানেরা স্বীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বিলুপ্ত করে দিবেন এ বিষয়ে এক ধরণের দ্বিধা আমার আছে। । ।
আন্দোলনের চুড়ান্ত ফলাফল বিবেচনা করলে আমার সংশয়ী অনুমাণ জনগণের মানসিকতার উপরে কঠোর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হওয়া মাত্রই জামায়াত শিবিরের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিনাশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার আসার আগেই আন্দোলন শাহবাগ থেকে বাসার জানালায় প্রদীপ জ্বালানো কর্মসূচিতে পর্যবসিত হবে।
সেই মুহূর্তে আজলে শাহবাগে টানা ৯ দিন নির্ঘুম স্বল্প ঘুমে কাটানো আমার সেইসব পরিচিত ছেলেদের নিরাপত্তার প্রশ্নটা সামনে চলে আসে। জামায়াত পুলিশের উপরে হামলা করে প্রমাণ করেছে তারা আসলে জঙ্গী সহিংসতায় আন্দোলন প্রতিরোধ করবে প্রয়োজনে। এইসব ভলেন্টিয়ারদের কারো কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নিরাপত্তা বলয় নেই, তাদের নিজের নিরাপত্তার প্রয়োজনে কোথাও না কোথাও নিজের টিকি বাঁধতে হবে। ।
সুতরাং আন্দোলনের বর্তমান পর্যায়ে অনেক ধরণের আপোষের জায়গা চলে আসছে। জনতার সংঘবদ্ধতার শক্তিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের উপরে ক্ষমতাচ্যুতির জাগ্রত ভীতি তৈরি করতে না পারলে তারা চুড়ান্ত বিবেচনায় দীর্ঘ মেয়াদী স্বার্থ চিন্তা করে জামায়াত শিবিরের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক বিনাশের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবে না। তারা কখনই নিবে না, তাদের পথে থেকে বাধ্য করতে হবে।
কেন্দ্রের হুমুক তাবেদার লোকগুলো এভাবে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে কি না, আমার পরিচিত ছেলেরা, যারা এখনই এক ধরণের ভীতির ভেতরে আছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তাদের সাথে কতটুকু ন্যায় হবে আমি জানি না। বড় আন্দোলন অনেক ধরণের বলির পাঁঠা খুঁজে নেয়, আমার পরিচিত ছেলেরা সেই বলির পাঁঠা হলে আমি দুঃখ পাবো। যেমনই হোক না কেনো আমি তাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল চাই।





সময় ঠিক করে দেবে সব কিছু!~
সামনে অনেক কিছু ঘটতে পারে... আন্দোলনের চরিত্র মুহুর্তে মুহুর্তে পাল্টায়... সো সাথেই আছি... চলতে থাকুক
আন্দোলনের এ-পর্যায়ে এমন একটি লেখা জরুরী ছিল।
রাসেল ভাই, স্যালুট শাহবাগ নিয়ে লেখা ভিনন মতের আপনার এ লেখাটির জন্য। মীর ভা'ইর একটি লেখায় মন্তব্য করেছিলাম, যার সারকথা ছিল ' বাংলার তরুণরা যুগে যুগে জেগেছে বারবার, রুখে দাড়িয়েছে অপশক্তির, রক্ত ঢেলেছে রাজপথে, বিজয় ছিনিয়ে এনেছে । কিনতু বিজয় ধরে রাখতে পারেনি কোনবার, হাইজ্যাক হয়েগেছে অলওয়েজ ।' তিনি [মীর ভাই ] বিরক্ত হয়েছেন খুব ।
শাহবাগের তারুণ্যকে যথেষ্ট সন্মানের সাথে বলছি, আমার মনে হয, নেতৃত্ব এবারো অন্য কারও হাতে চলে যাচছে । শাহবাগে চিহ্ননিত "সং" দের আনাগোনায় আমার শংকা । লাকী আক্তারের আহত হওয়া, তা নিয়ে সংস্লিষ্টদের এবং মিডিয়ার লুকোরি ভাল কোন ঈংগিত নয় । যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগীরাও সংহতি জানাচছে এখন বিবৃতি দিয়ে ।
আমার মনে হয় আমরা এদেশের জনতা নিরেট বোকা, নাহলেতো '৭১ এর যুদ্ধের পর আমাদের আর কোন যুদধের দরকার পরতোনা ।
ধন্যবাদ ।
যাই হোক না কেন জনগণের দাবি আদায় হোক। রাজাকারের ফাঁসি হোক।
যেমনই হোক না কেনো আমি তাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল চাই।
আপাতত এমন আর কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না।
মন্তব্য করুন